
NTRCA বাংলা উপন্যাসে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর অবদান
প্রশ্ন : বাংলা উপন্যাসে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর অবদান মূল্যায়ন কর।
উত্তর: কোন শিল্পীর শিল্প-চেতনা ও জীবনবোধের জাগরণ ও বিকাশ নিরবলম্ব ভাবে সম্ভব নয়। সময় ও সমাজের গর্ভে বেদনাময় যুগচৈতন্যমুলে প্রত্যক্ষে কিংবা পরোক্ষে সংলগ্ন হয়েই শিল্পীর শিল্পদৃষ্টি ও জীবনবোধ উদ্ভব ও বিকাশ লাভ করে। বাঙলা সাহিত্যের অন্যতম ঔপন্যাসিক সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ (১৯২২-৭১) সম্পর্কেও এ সত্য প্রাসঙ্গিক। র্দীঘ দিন প্যারিসে অবস্থান কালে তিনি সমকালীন ইউরোপীয় শিল্প সাহিত্য আন্দোলন তথা-ইমপ্রেশনিজম, সাররিয়ালিজম ও একজিনসটেনসিয়লিজমের সাথে নিবিড় ভাবে পরিচিত। এই বিশ্বকেন্দ্রিক জীবন-পরিপ্রেক্ষিতের জন্যই ওয়ালীউল্লাহ জীবনবোধ ও শিল্প রচনায় জাতীয় ভাবধারার উর্ধে উঠে পরিস্নাত হয়েছেন আন্তর্জাতিক চেতনায় ও বিশ্বানুভূতিতে। জীবন অন্বেষার প্রশ্নে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ ছিলেন নিষ্ঠাবান। তাঁর রচনায় রাজনীতি-সজাগতা, সময় ও সমাজ সচেতনার পরিচয় অত্যন্ত স্পষ্ট। শিল্প সৃষ্টিতে তিনি ছিলেন অধ্যাবসায়ী, পরিশ্রমী। বিষয় নির্বাচনে তিনি বাঙালাদেশের জনজীবন মূল সম্পৃক্ত, কিন্তু বক্তব্য ও প্রকরণের সর্বজনীন, বিশ্বপ্রসারিত, স্বনিষ্ঠ, পরীক্ষা-প্রিয় ও আধুনিক। সখ্যাগত বিবেচনায় সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ উপন্যাস বেশি লিখেননি। তিনি তিনটি মাত্র উপন্যাস লিখে ছিলেন। যথা-
১। লালসালু [১৯৪৮]
২। চাঁদের অমাবস্যা [১৯৬৪]
৩। কাঁদো নদী কাঁদো [১৯৬৮]
কিন্তু জীবনবোধ, জীবন দৃষ্টি ও শিল্প প্রকরণের উজ্জ্বলতায় তাঁর উপন্যাসত্রয় শুধু বাঙলা উপন্যাস নয়, সমগ্র বিশ্ব উপন্যাসের পরিপ্রেক্ষিতে অভিনব এবং স্বাতন্ত্র্য বিলাসী।
১। লাল সালু (১৯৪৮) : বাঙলা সাহিত্যে সার্ত্রের এ অস্তিত্ববাদী দর্শনের সফল রূপকার সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ। তাঁর উপন্যাসত্রয়ের মধ্যে “লালসালু”তে এর সূচনা, “চাঁদের অমাবশ্যায়” তা ঘণীভূত, বলয়িত ও তত্ত্বস্নাত এবং “কাঁদে নদী কাঁদো” তে স্পষ্ট, তির্যক, গূঢ়তর, অন্তর্বতী ও দূরবিস্তারী। ‘লালসালু”তে উপকরণ হিসেবে বাঙলাদেশের গ্রামীণ জীবনকে অবলম্বন করেও অস্তিত্ববাদী দর্শনের সফল প্রয়োগে ওয়ালীউল্লাহর কৃতিত্ব অবিস্মরণীয়। এ উপন্যাসে ওয়ালীউল্লাহ বর্হিমুখী জীবন নয় রূপায়ণ করেছেন মজিদের অস্তিত্বের সংকটকে।
লাল সালুতে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর প্রকরণ নিষ্ঠা সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। এ উপন্যাসের প্লট সরল। ঘটনাকে প্রতিক্রিয়ার এবং প্রতিক্রয়ার আবেগকে চিত্রে অঙ্কন ইমপ্রেশনিষ্ট শিল্পীর বৈশিষ্ট্যকে ওয়ালীউল্লাহ স্পর্শ করতে পেরেছেন।
যেমন-
“খড়কুটো দিয়ে আগুন জ্বালিয়েছে, আলোকিত হয়ে উঠেছে সারা উঠানটা। ওপরে আকাশ অন্ধকার গনগনে আগুনের শিখা যেন সেই কালো আকাশে গিয়ে ছোঁয়। ও ধারে ধোঁয়া হয়, শব্দ হয় ভাঁপের। যেন শত সহস্র সাপ শিস দেয়।”
লাল সালু উপন্যাসে ওয়ালীউল্লাহ আপত: দৃষ্টিতে ব্যবহার করেছেন ঔপনাসিকের সবজ্ঞ দৃষ্টিকোণ। কিন্তু পরবর্তী পর্যায়ে চরিত্রের ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার সাথে সমান্তরাল ভাবে লেখকের দৃষ্টিকোণও পরিবর্তীত হয়েছে। মজিদের মহব্বত নগরে প্রবেশের পর থেকে মজিদের প্রেক্ষণ বিন্দু ব্যবহৃত হয়েছে। প্রকৃতভাবে এ উপন্যাসে লেখক ব্যবহার করেন চরিত্রের অন্তর্গত সংবেদনসিক্ত ও চেতনাময় অনেকান্ত নির্বাচিত দৃষ্টিকোণ। (Multiple Selective Omniscience Point of View)
লালসালু উপন্যাসের সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ ব্যবহার করেছেন-ইমপ্রেশনিস্ট, গীতময়, চিত্রাত্মক ও চিত্রকল্পময় ভাবানুষঙ্গে কখনো প্রতীকী পরিচর্যারীতি।
লাল সালু উপন্যাসের চরিত্র সমূহ সুঅঙ্কিত। চরিত্র ও ঘটনার বিন্যাসে কোথাও প্রগাঢ় রঙ ব্যবহৃত হয়নি। এ উপন্যাসের ভাষা জীবন ঘনিষ্ট, বিষয়ানুযায়ী এবং চরিত্রানুগ। ‘এমন করে হাটে না বিবি মাটি গোম্বা করে।’ বক্তার এ উক্তিতে শ্রোতার নয়, যেন বক্তারই ভয়ের সংকেতময় আভাস প্রকাশিত হয়। এ উপন্যাসে ব্যবহৃত আঞ্চলিক ভাষার সর্বজনীন রূপ এ উপন্যাসের ভাষার উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য।
২। চাঁদের অমাবস্যা (১৯৬৪) : সময়, সমাজ ও ইতিহাসের সত্যকে স্বীকৃতি দিয়েই লাল সালুর বর্হিবাস্তব চাঁদের অমাবস্যায় ব্যক্তি মনের জটিল অভিজ্ঞতায় রূপান্তরিত। এ উপন্যাসে ওয়ালীউল্লাহ অস্তিত্ববাদী দর্শনে মীমাংসিত। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ এ উপন্যাসে অস্তিত্ব দর্শন রূপায়ণে প্রয়সী হন দরিদ্র শিক্ষক আরেফ আলীর মর্মঘাতী এক অভিজ্ঞতার মাধ্যমে। এ উপন্যাসে আরেফ আলী ব্যক্তিগত স্বার্থ, সংস্কার ও সুখ স্বাচ্ছন্দ্যবোধের উর্ধ্বে উঠে বিমিশ্র সত্তা থেকে শুদ্ধ সত্তায় উত্তরণ লাভ করে।
জটিল প্লটে বিন্যাসকৃত চাঁদের অমবস্যায় আপত দৃষ্টিতে সর্বজ্ঞদৃষ্টিকোণ ব্যবহৃত হলেও, এ উপন্যাসে প্রকৃত পক্ষে ব্যবহৃত হয়েছে, অস্তিত্বসংকিত ভীতসন্ত্রস্ত আরেফ আলীর অতীসংবেদনশীল প্রেক্ষণ বিন্দু। চরিত্রের অন্তর্ক্রিয়া, দ্বন্দ্ব, সংঘাত, প্রত্যাশা, অচরিতার্থতা, রক্তাক্ত অভিজ্ঞতা প্রকাশের জন্যই সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ এ উপন্যাসে ব্যবহার করেছেন এক্সপ্রেশনিষ্ট পরির্চযারীতি।
৩। “কাঁদো নদী কাঁদো (১৯৬৮)”: এটি সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর শেষ উপন্যাস। ফর্ম নীরিক্ষায় এবং উপস্থাপন রীতিতে কাঁদো নদী কাঁদো অভিনব। বাস্তবতার ভিতরের দিকে দেখার ঘটনা ও মানবমনের অর্ন্তলোকে প্রবেশ এবং অবস্থান নেয়ার প্রক্রিয়াটি লাল সালুতে শুরু এবং চাঁদের অমাবস্যায় সর্ম্পূণ হতে দেখা যায়।
ব্যক্তির বিচ্ছিন্নতা ও নিজ মনোলোকে নিমজ্জিত হওয়ার ক্রিয়াটি এ পর্বে চূড়ান্ত হয়েছে। ‘কাঁদো নদী কাঁদো’ মেনোলোকের ভিতরের দিকে যাত্রার সঙ্গে আরো একটি বিষয় যুক্ত হয়েছে, তা হলো ব্যক্তি এখানে একক নয় এবং ঐ ব্যক্তির সমস্যা কেবল ঐ ব্যক্তির সমস্যা নয়। সমস্যাটি বহু মাত্রিক হয়ে জনগোষ্ঠীর সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।
এ উপন্যাসে দু’টি কাহিনী বর্ণিত হয়েছে একদিকে তবারক ভূইয়াঁর স্মৃতি অনুষঙ্গে প্রকাশ পেয়েছে বর্হিবাস্তবময় বিচ্ছিন্ন কুমুর ডাঙ্গার জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব ভীতি ও ভীতিমুক্তি। অপর পক্ষে তবারক ভূঁইয়ার উচ্চারিত সংলাপে শব্দ রূপ পেয়েছে মুহাম্মদ মুস্তফার মনস্তাপ ও আত্মবিলুপ্তির ইতিকথা। মুহাম্মদ মুস্তফা নিজেকে খোদেজার আত্মহত্যার কারণ বলে মেনে নেয়। ফলে অনুশোচনার তীব্র ভয় তাকে আতঙ্কগ্রস্ত করে তুলে। মৃত্যুচেতনা ও অস্তিত্ব বিলুপ্তি যার পরিণাম।
“কাঁদো নদী কাঁদো” উপন্যাসে ব্যবহৃত হয়েছে লেখকের সীমাবদ্ধ দৃষ্টিকোণ ও তবারক ভূইঞার নিয়ন্ত্রিত প্রেক্ষণবিন্দ। পরিচর্যারীতির প্রশ্নে ওয়ালীউল্লাহ এখানে লালসালু উপন্যাসের অনুরূপ।
কাঁদো নদী কাঁদো উপন্যাসের ভাষা; বিষয় ও চরিত্রানুগ। সকিনা, কফিলউদ্দীন, মোহনচাঁদ, কালুমিয়া প্রভৃতি চরিত্র চিত্রণের সাফল্য সমকালীন শিল্পরীতি অতিক্রান্ত।
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ জীবন বিমুখ আত্মবিনাসী অন্ধকারবাসী কিংবা নৈরাশ্যবিহারী কোন শিল্পীপুরুষ নন। তার কৃতিত্ব তিনি বুর্জোয়া সভ্যতাজাত প্রতিক্রিয়ার দর্শনকে বিবেচনা করেছিলেন ক্রমশ: হয়ে উঠা মানবীয় অস্তিত্বের কেন্দ্রবিন্দু দিয়ে। নিরস্তিত্বের শূন্যতায় ফুরিয়ে যাওয়া জীবন নয়, অন্ধকার ভেঙ্গে ভেঙ্গে অস্তিত্বের দায়িত্বশীল স্বাধীন সত্তায় উত্তরণই জীবন। মোট কথা স্বাতিক্রমণই এ জীবনার্থের মূল কথা। এ শিল্পরীতি ও জীবনবোধের রূপায়ণ ঘটেছে আলোচিত উপন্যাস ত্রয়ে।
ড. এ. আই.এম. মুসা
অধ্যাপক-বাংলা
+88 01713 211 910