
NTRCA বাংলা উপন্যাস শওকত ওসমানের অবদান
প্রশ্ন : বাংলা উপন্যাস শওকত ওসমানের অবদান মূল্যায়ন কর।
উত্তর: বিভাগোত্তর কালে যাঁদের শ্রম ও সাধনায় বাংলা উপন্যাস সমৃদ্ধি লাভ করেছিল শওকত ওসমান ছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম। ভাবে বিষয়ে, আঙ্গিকে আর জীবন চেতনায় তাঁর উপন্যাস বাংলাদেশের উপন্যাসের ধারায় এক অনন্য সংজোযনা। বিষয় নির্বাচনে শওকত ওসমান ছিলেন বৈচিত্র্য অনুসন্ধানী আঙ্গিকে পরীক্ষা প্রিয় এবং জীবন দৃষ্টিতে উদার মানবতাবাদী। তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাসগুলো হলো-জননী (1961), ক্রীতদাসের হাসি (১৯৬২), সমাগম(১৯৬৭), চৌরসন্ধি(১৯৬৮), রাজা উপাখ্যান (১৯৭০), জাহান্নাম হইতে বিদায় (১৯৭১), নেকড়ে অরণ্য (১৯৭৩), দুই সৈনিক (১৯৭৩), জলাঙ্গী(১৯৭৬), আর্তনাদ(১৯৮৫)ইত্যাদি।
শওকত ওসমানের প্রথম উপন্যাস ‘জননী’। গ্রামীণ জীবন প্রেক্ষিতের উপর ভিত্তি করে এই উপন্যাসটি রচিত হয়েছে। এই উপন্যাসে শব্দবন্দী হয়েছে লেখের উদার মানবতাবাদী জীবন জিজ্ঞাসা। পশ্চিমবঙ্গের গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডের ধারে মহেশ ভাঙ্গা নামক গ্রামে কোন এক দরিয়া বেগমের রূপকে এখানে অভিব্যঞ্জিত হয়েছে সমাজ শৃঙখলে বন্দী গ্রামীণ নারীর নীরব সহনশীলতা এবং আত্ম-ত্যাগের ইতিকথা। ‘জননী’ মনীষাদীপ্ত উপন্যাস নয়, বরং আবেগ ধর্মী। প্রতিকূল সমাজ পরিবেশের বিরুদ্ধে তীব্র জীবন সংগ্রামের প্রেক্ষাপটে এ উপন্যাসে চিত্রিত হয়েছে চিরায়ত বাঙালি মাতৃ-স্নেহ।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পর বাংলাদেশের শিল্পী-লোকদের চেতনার যে ইতিবাচক জীবনদৃষ্টির স্ফুরণ ঘটে ছিল তা ১৯৫৮ সালের সামরিক শাসনে মধ্য দিয়ে বিলীন হয়ে যায়। জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে অনেক লেখক আপোষ করে। আবার কেউ আশ্রয় নেন রূপক প্রতীকের আড়ালে। শওকত ওসমান ছিলেন শেষোক্তদের দলে। এই পর্বে শওকত ওসমান রচনা করলেন ‘ক্রীতদাসের হাসি’, ‘সমাগম’, ‘চৌরসন্ধি’ এবং রাজা উপাখ্যান।
‘ক্রীতদাসের হাসি’ শুধু শওকত ওসমানের নয়, সমগ্র বাংলা উপন্যাসের ধারায় একটি অনন্য উপন্যাস। এই উপন্যাসে আইয়ুবী শাসনের বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলার শোষিত সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ উচ্চারিত হয়েছে প্রতীকী ব্যঞ্জনায়। বিষয় ভাবনার এবং আঙ্গিক স্বাতন্ত্র্যে এটি ব্যতিক্রমী ধারার উপন্যাস।
‘দীনার দৌলত দিয়ে ক্রীতদাস কেনা চলে, বান্দী কেনা সম্ভব, ক্রীতদাসের হাসি কেনা যায় না-’
উপন্যাসের নায়কের উল্লিখিত উক্তি সর্বকাল ও সর্ব সমাজের জন্য প্রযোজ্য।
‘সমাগম’ শওকত ওসমানের আরেকটি উল্লেখযোগ্য উপন্যাস। এই উপন্যাসে শওকত ওসমান।
ফ্যান্টাসির আশ্রয়ে সকল অপশক্তি এবং ধ্বংসের বিপরীতে বিশ্বশান্তি ও স্বস্তি কামনা করেছেন। যে সকল মনীষীর নিষ্ঠা ও সাধনায় পৃথিবী মানুষের বাসযোগ্য ও সুসংস্কৃত হয়েছে, সেই সব মনীষীর আত্মার সম্মেলন ঘটেছে সমাগম উপন্যাসে। এই উপন্যাসে শওকত ওসমান জাতীয় ও আর্ন্তজাতিক প্রেক্ষাপটে সমকালীন জীবন সত্যকে তুলে ধরেছেন।
‘চৌরসন্ধি’ একটি সামাজিক উপন্যাস। স্বার্থান্ধ মানুষের ক্লেদাক্ত জীবনের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে এই উপন্যাসে।
‘ক্রীতদাসের হাসির’র পরে ‘রাজা উপাখ্যান’-ই এই পর্বের উল্লেখযোগ্য উপন্যাস। এর ঘটনাংম পরিকল্পিত হয়েছে মহাকবি ফেরদৌসীর শাহানামা কাব্যের অসমাপ্ত কল্পিত অংশ অবলম্বনে। প্রাগৈতিহাসিক যুগের কাহিনী এমনভাবে তুলে ধরা হয়েছে এ গ্রন্থে যে তার সমস্যার আধুনিকতা ও সার্বজনীনতা স্বীকার না করে উপায় নেই। এই উপন্যাসে বিধৃত রাজা জাহুকের বন্দীশালা ষাটের দশকের স্বৈরশাসন কবলিত পাকিস্তান শাসিত বাংলাদেশের রূপক। এ সময়ের আত্মবিবরকামী ও পলায়ন পর সুবিধাবাদী মধ্যবিত্ত শ্রেণির সামনে হরমুজকে দৃষ্টান্ত হিসাবে উপস্থাপন করা হয়েছে এই উপন্যাসে। হরমুজ চরিত্রের মুখে উচ্চারিত হয়েছে শ্রেণির বিভক্ত ও শোষণ মুলক সমাজের চিত্র ব্যক্তি স্বার্থকে সবকিছুর উর্দ্ধে স্থাপন করার নিয়মের বিরুদ্ধে শৈল্পিক প্রতিবাদ। ‘রাজা উপাখ্যানে’ রূপকের আশ্রয়ে ঔপন্যাসিক ব্যক্তি স্বার্থ অপেক্ষা সমষ্টিক স্বার্থের জন্য মানুষের যে নিরন্তর সাধনা, তাই উপস্থিত করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের অনুষেঙ্গে শওকত ওসমান লিখেছেন চারটি উপন্যাস। উপন্যাসগুলো হলো ‘জাহান্নাম হইতে বিদায়’, নেকড়ে অরণ্য, দুই সৈনিক, এবং ‘জলাঙ্গী’। পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর বর্বরতা, মানুষের অসহায়তা, এবং বাঙালির প্রতিবাদ প্রতিরোধের চিত্র বর্ণিত হয়েছে ‘জাহান্নাম হইতে বিদায়’ উপন্যাসে। ‘নেকড়ে অরণ্য’ উপন্যাসটি মুক্তিযুদ্ধের কোন কেন্দ্রীয় বিষয় নিয়ে রচিত উপন্যাস নয়। এতে আছে পাক সেনাদের হাতে বন্দী বাঙালি নারীদের উপর বর্বর অত্যাচার আর ধর্ষণের স্থুল চিত্র।
শওকত ওসমানের দুই সৈনিক উপন্যাসের আখ্যানভাগ নির্মিত হয়েছে মখদুম মৃধা নামক রাজাকারের দালালী এবং তার বিপর্যয়কে কেন্দ্র করে। অন্য দিকে ‘জলাঙ্গী’ উপন্যাসে চিত্রিত হয়েছে এক ভীরু মুক্তিযুদ্ধার ছবি। যার কাছে বড় হয়ে উঠেছে প্রেম, যুদ্ধ নয়। পরিণামে তাকে রাজাকারের হাতে প্রাণ দিতে হয়। বস্তুত মুক্তি যুদ্ধ ভিত্তিক শওকত ওসমানে কোন উপন্যাসেই একাত্তরের বাঙালির উজ্জীবনের চিত্র নেই, অসীম বীরত্বের বীর গাঁথা নেই, আছে মুক্তি যুদ্ধের অনুষঙ্গে কিছু খণ্ড চিত্র।
স্বাধীনতা উত্তর সময়ে রচিত শওকত ওসমানের উল্লেখ যোগ্য উপন্যাস ‘পতঙ্গ পিঞ্জর’ (১৯৮৩)। এই উপন্যাসেও শওকত ওসমান প্রতীক ও রূপকের আড়ালে সমকালীন জীবন বাস্তবতাকে তুলে ধরেছেন। শুধু বিষয় ও জীবন দৃষ্টিতে নয়, আঙ্গিক চেতনায়ও শওকত ওসমান ছিলেন একজন অনন্য শিল্পী। কেননা, উপন্যাসের গঠন শৈলীতে শওকত ওসমান ছিলেন প্রতিনিয়ত পরীক্ষাপ্রিয়।
উপন্যাসের ভাষা নির্মাণেও শওকত ওসমান ছিলেন বাস্তবমুখী এবং তপস্যাশুদ্ধ। তাঁর উপন্যাসের ভাষা বৈদগ্ধ্য পূর্ণ, অংঙ্কার বহুল ও চেতনা প্রবাহী। তাঁর কাব্য কখনও সরল কখনও বা জটিল এবং চাতুর্যপূর্ণ। বিষয় ও বর্ণনার প্রয়োজনে শব্দ নিয়ে তিনি খেলতে পারতেন। ফলে বাককুশলতা তাঁর উপন্যাসের পরতে পরতে লক্ষ করা যায়। উপন্যাসের চরিত্র সৃজনেও তিনি চিলেন বাস্তবমুখী এবং উদার মানবতাবাদী।
বস্তুত, ভাব বিষয় আঙ্গিক এবং জীবন চেতনার প্রশ্নে শওকত ওসমানের উপন্যাস বাংলাদেশের উপন্যাসের ধারায় অভিনব এবং স্বাতন্ত্র্য বিলাসী।
ড. এ. আই. এম. মুসা
অধ্যাপক-বাংলা
+88 01713 211 910