
এসএসসি পরীক্ষা: ”বোশেখে ”। কবিতার আলোচনা, বিশ্লেষণ ও মূলভাব ।
বোশেখ
আল মাহমুদ
[কবি-পরিচিতি: আল মাহমুদ ১৯৩৬ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার মোড়াইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর প্রকৃত নাম মীর আবদুস শুকুর আল মাহমুদ। তিনি দীর্ঘকাল সাংবাদিকতা পেশার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। পরে তিনি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে যোগদান করেন এবং পরিচালকের পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধ তাঁকে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করে। স্বাধীনতার পর তিনি 'দৈনিক গণকণ্ঠ' পত্রিকার সম্পাদক নিযুক্ত হন। তাঁর কবিতায় লোকজ শব্দের সুনিপুণ প্রয়োগ যেমন লক্ষণীয় তেমনি রয়েছে ঐতিহ্যপ্রীতি। তাঁর প্রকাশিত কাব্য: লোক লোকান্তর, কালের কলস, সোনালি কাবিন ইত্যাদি। কথাসাহিত্য: পানকৌড়ির রক্ত, পাখির কাছে ফুলের কাছে তাঁর শিশুতোষ কবিতার বই। কবি ২০১৯ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন।]
যে বাতাসে বুনোহাঁসের ঝাঁক ভেঙে যায়
জেটের পাখা দুমড়ে শেষে আছাড় মারে
নদীর পানি শূন্যে তুলে দেয় ছড়িয়ে
নুইয়ে দেয় টেলিগ্রাফের থামগুলোকে।
সেই পবনের কাছে আমার এই মিনতি
তিষ্ঠ হাওয়া, তিষ্ঠ মহাপ্রতাপশালী,
গরিব মাঝির পালের দড়ি ছিঁড়ে কী লাভ?
কী সুখ বলো গুঁড়িয়ে দিয়ে চাষির ভিটে?
বেগুন পাতার বাসা ছিঁড়ে টুনটুনিদের
উল্টে ফেলে দুঃখী মায়ের ভাতের হাঁড়ি
হে দেবতা, বলো তোমার কী আনন্দ,
কী মজা পাও বাবুই পাখির ঘর উড়িয়ে?
রামায়ণে পড়েছি যার কীর্তিগাথা
সেই মহাবীর হনুমানের পিতা তুমি?
কালিদাসের মেঘদূতে যার কথা আছে
তুমিই নাকি সেই দয়ালু মেঘের সাথী?
তবে এমন নিঠুর কেন হলে বাতাস
উড়িয়ে নিলে গরিব চাষির ঘরের খুঁটি
কিন্তু যারা লোক ঠকিয়ে প্রাসাদ গড়ে
তাদের কোনো ইট খসাতে পারলে নাতো।
হায়রে কতো সুবিচারের গল্প শুনি,
তুমিই নাকি বাহন রাজা সোলেমানের
যার তলোয়ার অত্যাচারীর কাটতো মাথা
অহমিকার অট্টালিকা গুঁড়িয়ে দিতো।
কবিদের এক মহান রাজা রবীন্দ্রনাথ
তোমার কাছে দাঁড়িয়েছিলেন করজোড়ে
যা পুরানো শুষ্ক মরা, অদরকারি
কালবোশেখের একটি ফুঁয়ে উড়িয়ে দিতে।
ধ্বংস যদি করবে তবে, শোনো তুফান
ধ্বংস করো বিভেদকারী পরগাছাদের
পরের শ্রমে গড়ছে যারা মস্ত দালান
বাড়তি তাদের বাহাদুরি গুঁড়িয়ে ফেলো।
গদ্যরূপ
কালবোশাখী ঝড়ের প্রচণ্ড শক্তিতে আকাশের বুনোহাঁসের ঝাঁক এলোমেলো হয়ে যায়। এই বাতাস আধুনিক প্রযুক্তির জেটের পাখাকে দুমড়ে-মুচড়ে মাটিতে আছাড় মারে, নদীর পানি শূন্যে ছড়িয়ে দেয় এবং টেলিগ্রাফের খুঁটিগুলোকে পর্যন্ত নুইয়ে দেয়।
প্রবল প্রতাপশালী এই বাতাসের কাছে কবির আকুল মিনতি হলো—সে যেন গরিব মাঝির নৌকার পালের দড়ি ছিঁড়ে না দেয় কিংবা অসহায় চাষির ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে না দেয়। টুনটুনি পাখির বাসা নষ্ট করা, বাবুই পাখির ঘর উড়িয়ে দেওয়া কিংবা অভাবী মায়ের ভাতের হাঁড়ি উল্টে দেওয়ার মধ্যে কোনো বীরত্ব নেই।
পুরাণ ও ইতিহাসে এই বাতাসকে মহাবীর হনুমানের পিতা এবং মহাকবি কালিদাসের ‘মেঘদূত’-এর দয়ালু সাথী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এমনকি এটি ছিল ন্যায়বিচারক রাজা সোলেমানের বাহন, যার কাজ ছিল অত্যাচারীর অহংকার চূর্ণ করা।
কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, কালবোশাখী গরিবের ঘরের খুঁটি উড়িয়ে নিলেও যারা মানুষকে ঠকিয়ে প্রাসাদ গড়েছে, তাদের একটি ইটও খসাতে পারে না। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কালবোশাখীর কাছে কেবল পুরনো ও অদরকারি জিনিসগুলো উড়িয়ে দেওয়ার প্রার্থনা করেছিলেন।
তবে আল মাহমুদ চান, এই তুফান যেন সেই সব শোষক ও ‘পরগাছাদের’ ধ্বংস করে যারা অন্যের পরিশ্রমে নিজেদের বিলাসিতা ও দালান গড়েছে। কবির দাবি, ঝড় যেন শোষকদের অন্যায় বাহাদুরি গুঁড়িয়ে দিয়ে সমাজে প্রকৃত সাম্য ও সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে।
সারমর্ম: বোশেখ
প্রকৃতির রুদ্ররূপ:
কবিতার শুরুতে কবি কালবোশাখী ঝড়ের প্রচণ্ড শক্তির বর্ণনা দিয়েছেন। এই ঝড় এতটাই শক্তিশালী যে তা বুনোহাঁসের ঝাঁক এলোমেলো করে দেয়, এমনকি আধুনিক প্রযুক্তির জেট বিমানের পাখাও দুমড়ে-মুচড়ে দেয়। নদীর পানি আকাশে ছুড়ে মারা বা টেলিগ্রাফের খুঁটি নুইয়ে দেওয়ার মাধ্যমে ঝড়ের এক প্রলয়ঙ্করী রূপ ফুটে উঠেছে।
কবির আকুতি ও বৈষম্যের চিত্র:
কবি এই মহাশক্তিশালী বাতাসের কাছে মিনতি করেছেন যেন সে গরিবের ক্ষতি না করে। ঝড়ে যখন গরিব মাঝির পালের দড়ি ছিঁড়ে যায়, চাষির ভিটে গুঁড়িয়ে যায়, কিংবা টুনটুনি ও বাবুই পাখির বাসা ধ্বংস হয়, তখন কবি ব্যথিত হন। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, অসহায় মানুষের ভাতের হাঁড়ি উল্টে দিয়ে বা তাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই কেড়ে নিয়ে প্রকৃতির কী আনন্দ?
ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক প্রসঙ্গ:
কবি ঝড়ের এই বাতাসকে বিভিন্ন ইতিহাস ও পুরাণের সাথে তুলনা করেছেন:
১। এটি মহাবীর হনুমানের পিতা (পবন দেব)।
২। এটি মহাকবি কালিদাসের ‘মেঘদূত’-এর সেই দয়ালু মেঘের সাথী।
৩। এটি ন্যায়বিচারক রাজা সোলেমানের বাহন, যার তলোয়ার অত্যাচারীর বিচার করত।
সামাজিক ন্যায়বিচারের দাবি:
কবিতার মূল সুরটি বেজে উঠেছে শেষ অংশে। কবি দেখেছেন, ঝড় গরিবের ঘরের খুঁটি উধাও করে দিলেও যারা মানুষকে ঠকিয়ে বড় বড় অট্টালিকা বা প্রাসাদ গড়েছে, তাদের একটি ইটও খসাতে পারে না। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কালবোশাখীর কাছে প্রার্থনা করেছিলেন সমস্ত পুরনো, জীর্ণ ও অদরকারি জিনিস উড়িয়ে দিতে।
কিন্তু আল মাহমুদ একটু ভিন্নভাবে চেয়েছেন—যদি ধ্বংসই করতে হয়, তবে ঝড় যেন সেই সব ‘বিভেদকারী পরগাছাদের’ ধ্বংস করে, যারা অন্যের পরিশ্রমে নিজেদের ভাগ্য গড়েছে। কবি চান কালবোশাখী যেন ধনীর অহংকার আর শোষকদের বাহাদুরি গুঁড়িয়ে দিয়ে সমাজে প্রকৃত সাম্য ও সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে।
মূল শিক্ষা:
প্রকৃতির শক্তি যেন কেবল দুর্বলের ওপর আঘাত না হেনে সমাজের অন্যায়, অবিচার আর শোষকদের দম্ভ চূর্ণ করার হাতিয়ার হয়ে ওঠে—এটাই এই কবিতায় কবির প্রত্যাশা।
কবিতার মূলবক্তব্য ১০ বাক্যে
১। কবিতার শুরুতে কালবোশাখী ঝড়ের এক প্রলয়ঙ্করী ও ধ্বংসাত্মক রূপ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
২। প্রবল শক্তির এই ঝড় বুনোহাঁসের ঝাঁক থেকে শুরু করে আধুনিক প্রযুক্তির জেটের পাখা পর্যন্ত দুমড়ে-মুচড়ে দেয়।
৩। কবি এই মহাশক্তিশালী বাতাসের কাছে অসহায় ও গরিব মানুষের ক্ষতি না করার জন্য মিনতি জানিয়েছেন।
৪। ঝড়ে যখন গরিব মাঝির পালের দড়ি ছেঁড়ে বা চাষির ভিটে গুঁড়িয়ে যায়, তখন কবির হৃদয়ে হাহাকার সৃষ্টি হয়।
৫। অসহায় টুনটুনি বা বাবুই পাখির বাসা ধ্বংস হওয়া এবং দুঃখী মায়ের ভাতের হাঁড়ি উল্টে যাওয়ার ঘটনায় কবি ব্যথিত হয়েছেন।
৬। পুরাণে বর্ণিত পবন দেব বা রাজা সোলেমানের ন্যায়বিচারক বাহন হিসেবে ঝড়ের যে গৌরবময় ইতিহাস আছে, কবি তা স্মরণ করেছেন।
৭। কবি আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন যে, ঝড় গরিবের ঘর উড়ালেও লোক ঠকানো মানুষদের অট্টালিকার কোনো ক্ষতি করতে পারে না।
৮। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো কবিরা কালবোশাখীকে সমস্ত জীর্ণ ও পুরনোকে ধ্বংস করে নতুন প্রাণ আনতে আহ্বান করেছিলেন।
৯। আল মাহমুদের কামনায় কালবোশাখী যেন সমাজের সেইসব পরগাছাদের ধ্বংস করে যারা অন্যের শ্রমে প্রাসাদ গড়েছে।
১০। পরিশেষে, কবি চান এই প্রচণ্ড ঝড় যেন কেবল দুর্বলের ওপর আঘাত না হেনে শোষক ও অত্যাচারীদের অহংকার গুঁড়িয়ে দিয়ে সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে।
কবিতার সার কথা ৫ পয়েন্টে।
১। প্রকৃতির রুদ্ররূপ: কালবোশাখী ঝড়ের প্রচণ্ড শক্তিতে বুনোহাঁসের ঝাঁক ভেঙে যায়, জেটের পাখা দুমড়ে পড়ে এবং নদীর পানি শূন্যে ছড়িয়ে পড়ে প্রকৃতির এক প্রলয়ঙ্করী রূপ প্রকাশ পায়।
২। অসহায়দের প্রতি সমবেদনা: কবি মহাপ্রতাপশালী বাতাসের কাছে মিনতি করেছেন যেন সে গরিব মাঝির পালের দড়ি না ছিঁড়ে কিংবা নিঃস্ব চাষির ভিটে ও পাখির বাসা গুঁড়িয়ে না দেয়।
৩। ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক প্রেক্ষাপট: ঝড় বা বাতাসকে কবি মহাবীর হনুমানের পিতা, কালিদাসের মেঘদূতের সাথী এবং ন্যায়বিচারক রাজা সোলেমানের বাহন হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
৪। সামাজিক বৈষম্যের আক্ষেপ: কবি গভীরভাবে লক্ষ করেছেন যে, ঝড় গরিবের ঘরের খুঁটি উড়িয়ে নিলেও যারা লোক ঠকিয়ে অট্টালিকা গড়েছে, তাদের একটি ইটও খসাতে পারে না।
৫। শোষক দমনের আহ্বান: কবি চান এই তুফান যেন সমাজের সেইসব ‘পরগাছাদের’ ধ্বংস করে, যারা অন্যের শ্রমে মস্ত দালান গড়ে নিজেদের বাহাদুরি জাহির করে।
এক বাক্যে ‘বোশেখ’ কবিতার মূলবক্তব্য :
কালবোশাখী ঝড়ের প্রলয়ঙ্করী রূপ বর্ণনার মাধ্যমে কবি শোষিত মানুষের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেছেন এবং শোষক ও অত্যাচারীদের বিনাশ কামনা করেছেন।
পাঠ-পরিচিতি: কবি আল মাহমুদের কবিতা সমগ্রের পাখির কাছে ফুলের কাছে কাব্য থেকে 'বোশেখ' কবিতাটি সংকলন করা হয়েছে। বাংলাদেশের একটি পরাক্রমশালী মাস বৈশাখ। ঋতুপরিক্রমায় বার বার সে রুদ্র সংহারক রূপে আবির্ভূত হয়। বৈশাখের নিষ্ঠুর করাল গ্রাসে এবং আগ্রাসী থাবায় কখনও কখনও লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় এক-একটা জনপদ। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এর শিকার হয় দুঃখী দরিদ্র মানুষ বা অসহায় কোন প্রাণী। ছিঁড়ে যায় গরিব মাঝির পালের দড়ি, উড়ে যায় দরিদ্র চাষির ঘর। ছোট্ট টুনটুনির বাসাও রেহাই পায় না। কিন্তু ধনীর প্রাসাদের কোন ক্ষতি হয় না। কবি তাই আক্ষেপ করে বলছেন, প্রকৃতির যত নিষ্ঠুরতা, নির্মমতা কেন শুধু এই গরিবের বিরুদ্ধেই ঘটবে? অবশেষে বৈশাখের কাছে তার আহ্বান, ধ্বংস যদি করতেই হয়, তাহলে গুঁড়িয়ে দাও সেইসব অট্টালিকা যা গড়ে উঠেছে শ্রমজীবী সাধারণ মানুষকে শোষণ করে। এই কবিতায় বৈশাখের বিধ্বংসী প্রতীকের মধ্য দিয়ে অত্যাচারীর অবসান কামনা করেছেন কবি।
সৃজনশীল প্রশ্ন
বন্যার্ত মানুষের জন্য ত্রাণের আয়োজন করা হয়। ত্রাণকমিটি খুবই কঠোরভাবে সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রাখে। হতদরিদ্র রাসুর পরিবারে লোকসংখ্যা বেশি থাকায় দুইবার ত্রাণ নিতে এলে অনিয়মের দায়ে তার কার্ড বাতিল করা হয়। বরাদ্দের চেয়ে কম চাল দেয়ার প্রতিবাদ করলে রহম আলীকে বেদম প্রহার করে রিলিফ ক্যাম্প থেকে বের করে দেওয়া হয়। এমন সময় যতীন্দ্রনাথ চক্রবর্তী ও শমসের আলী চৌধুরী এলে তাদের প্রত্যেককে এক মণ চাল, আধা মণ ডালসহ অন্য ত্রাণসামগ্রী নৌকায় পৌঁছে দিয়ে আসেন ত্রাণকমিটির প্রধান কর্তাব্যক্তি।
ক. 'তিষ্ঠ' কথার অর্থ কী?
খ. পবনের কাছে কবি মিনতি করেছেন কেন?
গ. উদ্দীপকে বর্ণিত দরিদ্র শ্রেণির সাথে রিলিফ কমিটির আচরণের মাধ্যমে ফুটে ওঠা দিকটি 'বোশেখ' কবিতার আলোকে ব্যাখ্যা কর।
ঘ. "উদ্দীপকটি 'বোশেখ' কবিতার একটা খণ্ডচিত্র মাত্র, পূর্ণরূপ নয়"- যুক্তিসহ বুঝিয়ে লিখ।
সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর
ক.
‘তিষ্ঠ’ কথার অর্থ হলো স্থির হও বা থামো।
খ.
পবন বা বাতাসের ধ্বংসাত্মক রূপ থেকে অসহায় ও দরিদ্রদের রক্ষা করার জন্য কবি তার কাছে মিনতি করেছেন।
কালবোশাখী ঝড় যখন প্রবল বেগে আঘাত হানে, তখন তা ধনী-দরিদ্রের বাছবিচার করে না। কিন্তু এর শিকল ছিঁড়ে যাওয়া, ঘর উড়ে যাওয়া কিংবা পাখির বাসা ধ্বংস হওয়ার মতো ক্ষতিগুলো কেবল গরিবদেরই সহ্য করতে হয়। প্রকৃতির এই রুদ্র সংহারক রূপে যেন নিঃস্ব মানুষের শেষ আশ্রয়টুকু কেড়ে না নেওয়া হয়, সেই মানবিক আবেদন থেকেই কবি পবনের কাছে শান্ত হওয়ার প্রার্থনা করেছেন।
গ.
উদ্দীপকে বর্ণিত দরিদ্র শ্রেণির সাথে রিলিফ কমিটির আচরণের মধ্য দিয়ে ‘বোশেখ’ কবিতায় বর্ণিত প্রকৃতির অন্ধ নিষ্ঠুরতা এবং সামাজিক বৈষম্যের দিকটি ফুটে উঠেছে।
‘বোশেখ’ কবিতায় দেখা যায়, কালবোশাখী ঝড় যখন আসে, তখন সে গরিব চাষির ঘরের খুঁটি উড়িয়ে নেয়, মাঝির পালের দড়ি ছিঁড়ে ফেলে এবং পাখির বাসা ধ্বংস করে। অথচ একই বাতাস যারা লোক ঠকিয়ে প্রাসাদ গড়েছে, তাদের একটি ইটও খসাতে পারে না। অর্থাৎ, শক্তিমান সর্বদা দুর্বলের ওপরই আঘাত হানে।
উদ্দীপকে রাসুর কার্ড বাতিল করা এবং প্রতিবাদ করায় রহম আলীকে প্রহার করার ঘটনাটি শোষিতের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে। ত্রাণকমিটির প্রধান ব্যক্তিরা শক্তিশালী বা প্রভাবশালী হওয়ায় তারা নিঃস্বদের ওপর কঠোরতা দেখান। প্রকৃতির ঝড় যেমন কেবল গরিবের ঘর ভাঙে, উদ্দীপকের ত্রাণকমিটিও তেমনি কেবল দরিদ্রদের বিপদে ফেলে। কবিতার সেই ‘নিঠুর বাতাসের’ মতো এখানে ত্রাণকর্তারাও দুর্বলের প্রতি নির্দয় এবং ধনীদের প্রতি অনুগত, যা সামাজিক বৈষম্যের চরম রূপ।
ঘ.
“উদ্দীপকটি 'বোশেখ' কবিতার একটা খণ্ডচিত্র মাত্র, পূর্ণরূপ নয়”— মন্তব্যটি যথাযথ। কারণ উদ্দীপকে কেবল শোষণের চিত্র থাকলেও কবিতায় এর প্রতিকার ও ধ্বংসের মাধ্যমে পরিবর্তনের আহ্বান রয়েছে।
উদ্দীপকে দেখা যায়, শোষক শ্রেণি (ত্রাণকমিটি) দরিদ্র রাসুর কার্ড বাতিল করে এবং প্রতিবাদী রহম আলীকে প্রহার করে। অন্যদিকে, তারা বিত্তশালী যতীন্দ্রনাথ বা শমসের আলীর তোষামোদে ব্যস্ত। এই অংশটি ‘বোশেখ’ কবিতার সেই পঙ্ক্তিগুলোর সাথে মিলে যায় যেখানে কবি আক্ষেপ করে বলেছেন যে, বাতাস কেবল গরিবের ঘরের খুঁটি নিলেও শোষকদের অট্টালিকার কোনো ক্ষতি করে না। এটি কবিতার একটি বিশেষ দিক অর্থাৎ শোষণের চিত্র।
কিন্তু ‘বোশেখ’ কবিতার পরিধি আরও বিস্তৃত। কবিতায় কবি কেবল বৈষম্য দেখিয়েই ক্ষান্ত হননি, তিনি কালবোশাখীকে একটি ‘বিধ্বংসী প্রতীক’ হিসেবে ব্যবহার করে অত্যাচারীদের বিনাশ চেয়েছেন। কবি তুফানকে আহ্বান করেছেন যেন সে ‘বিভেদকারী পরগাছাদের’ ধ্বংস করে এবং যারা অন্যের শ্রমে প্রাসাদ গড়েছে তাদের দম্ভ চূর্ণ করে দেয়। রবীন্দ্রনাথের মতোই কবি এখানে ধ্বংসের মাধ্যমে পুরাতন ও অদরকারি আবর্জনা পরিষ্কার করে সাম্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছেন।
উদ্দীপকে শোষণের বাস্তব চিত্র আছে, কিন্তু সেই শোষণ থেকে মুক্তির বা শোষকদের ধ্বংস করার কোনো বৈপ্লবিক আহ্বান নেই যা ‘বোশেখ’ কবিতার মূল সুর। তাই উদ্দীপকটি কবিতার একপাক্ষিক যাতনা বা শোষণের খণ্ডচিত্র তুলে ধরলেও কবিতার ন্যায়বিচার ও চূড়ান্ত বিপ্লবের পূর্ণরূপ প্রকাশ করতে পারেনি।
শব্দার্থ ও টীকা: বুনোহাঁস- যে হাঁস গৃহপালিত নয়, বনে থাকে। জেট- দ্রুতগতিসম্পন্ন উড়োজাহাজ। টেলিগ্রাফ- সংকেতের সাহায্যে দূরে বক্তব্য প্রেরণের জন্য ব্যবহৃত যন্ত্র। ১৮৩৭সালে আধুনিক এই যন্ত্র বিদ্যুতের সাহায্যে পরিচালিত হয়। (এখন এ ধরনের যন্ত্র আর ব্যবহার হয় না।)। তিষ্ঠ- স্থির হও। রামায়ণ- পৃথিবীর চারটি জাত মহাকাব্যের একটি। রচয়িতা বাল্মীকি। মহাবীর হনুমান- রামায়ণে বীর হনুমানের বীরত্বপূর্ণ বহু কর্মের কথা উল্লেখ আছে। রামায়ণোক্ত হনুমানকে মহাবীর হনুমান বলা হয়। কালিদাসের মেঘদূত- সংস্কৃত ভাষার শ্রেষ্ঠ কবিদের একজন কালিদাস। সংস্কৃত ভাষায় তাঁর অমর রচনা মেঘদূতম্ কাব্য। মেঘদূতকে বাংলায় মেঘদূত বলা হয়।
রাজা সোলেমান- ডেভিডের পুত্র এবং ইসরাইলের তৃতীয় রাজা। তিনি বীর ও দক্ষ যোদ্ধা ছিলেন। অদরকারি- যার প্রয়োজন নেই।
অনুশীলনী
কর্ম-অনুশীলন
১। কালবৈশাখী আমাদের সমাজ ও পারিবারিক জীবনে যে ক্ষতি করে তার তালিকা তৈরি কর।
বহুনির্বাচনি প্রশ্ন
১। বৈশাখের কীর্তিগাথা কোথায় আছে?
ক. মহাভারতে * রামায়ণে
গ. সোনালি কাবিনে ঘ. কালের কলসে
২। কবিতায় রবীন্দ্রনাথকে কীভাবে সম্বোধন করা হয়েছে?
ক. কবিগুরু খ. মহান কবি
* মহান রাজা ঘ. বিশ্বকবি
উদ্দীপকটি পড় এবং ৩ ও ৪-সংখ্যক প্রশ্নের উত্তর দাও:
এসো, এসো, এসো হে বৈশাখ
তাপস নিঃশ্বাস বায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে
বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক
যাক পুরাতন স্মৃতি যাক ভুলে যাওয়া গীতি,
অশ্রুবাষ্প সুদূরে মিলাক ।।
৩। উদ্দীপকে 'বোশেখ' কবিতার কোন দিক উন্মোচিত হয়েছে?
ক. ধ্বংসাত্মক রূপ খ. সৃজনশীল রূপ
* পরিশুদ্ধ রূপ ঘ. প্রখর রূপ
৪। উদ্দীপকের অনুভূতি 'বোশেখ' কবিতার কোন পঙ্ক্তির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ?
ক. যে বাতাসে বুনোহাঁসের ঝাঁক ভেঙে যায়
খ. উড়িয়ে নিলে গরিব চাষির ঘরের খুঁটি
গ. তুমিই নাকি বাহন রাজা সোলেমানের
* শোনো তুফান ধ্বংস করো বিভেদকারী পরগাছাদের
সৃজনশীল প্রশ্ন
বন্যার্ত মানুষের জন্য ত্রাণের আয়োজন করা হয়। ত্রাণকমিটি খুবই কঠোরভাবে সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রাখে। হতদরিদ্র রাসুর পরিবারে লোকসংখ্যা বেশি থাকায় দুইবার ত্রাণ নিতে এলে অনিয়মের দায়ে তার কার্ড বাতিল করা হয়। বরাদ্দের চেয়ে কম চাল দেয়ার প্রতিবাদ করলে রহম আলীকে বেদম প্রহার করে রিলিফ ক্যাম্প থেকে বের করে দেওয়া হয়। এমন সময় যতীন্দ্রনাথ চক্রবর্তী ও শমসের আলী চৌধুরী এলে তাদের প্রত্যেককে এক মণ চাল, আধা মণ ডালসহ অন্য ত্রাণসামগ্রী নৌকায় পৌঁছে দিয়ে আসেন ত্রাণকমিটির প্রধান কর্তাব্যক্তি।
ক. 'তিষ্ঠ' কথার অর্থ কী?
খ. পবনের কাছে কবি মিনতি করেছেন কেন?
গ. উদ্দীপকে বর্ণিত দরিদ্র শ্রেণির সাথে রিলিফ কমিটির আচরণের মাধ্যমে ফুটে ওঠা দিকটি 'বোশেখ' কবিতার আলোকে ব্যাখ্যা কর।
ঘ. "উদ্দীপকটি 'বোশেখ' কবিতার একটা খণ্ডচিত্র মাত্র, পূর্ণরূপ নয়"- যুক্তিসহ বুঝিয়ে লিখ।
(মুসা স্যার )
( প্রফেসর ড. এ. আই. এম. মুসা)
বিএ (সম্মান) এমএ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পিএইচডি. জা. বি.
ভূতপূর্ব : সহযোগী অধ্যাপক, রংপুর সরকারি কলেজ, রংপুর
গাইবান্ধা সরকারি কলেজ, গাইবান্ধা
সরকারি বেগম রোকেয়া কলেজ, রংপুর
বিভাগীয় প্রধান, সরকারি পিসি কলেজ, বাগেরহাট
অধ্যক্ষ, তারাগঞ্জ সরকারি কলেজ, রংপুর।
+88 01713 211 910