
এসএসসি পরীক্ষা: বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় (একাদশ অধ্যায়)। অর্থনৈতিক নির্দেশকসমূহ ও বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রকৃতি ।
একাদশ অধ্যায়
অর্থনৈতিক নির্দেশকসমূহ ও বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রকৃতি
অধ্যায়ের সার-কথা :
‘অর্থনৈতিক নির্দেশকসমূহ ও বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রকৃতি’ শীর্ষক অধ্যায়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি, এর বিভিন্ন সূচক এবং উন্নয়নের প্রকৃতি নিয়ে এখানে আলেঅচনা করা হয়েছে। এখানে জিডিপি (GDP), জিএনপি (GNP) এবং মাথাপিছু আয়ের সংজ্ঞা প্রদানের পাশাপাশি এগুলোর পরিমাপ পদ্ধতি ও পারস্পরিক পার্থক্য ব্যাখ্যা করা হয়েছে। টেক্সটটিতে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান তিনটি খাত—কৃষি, শিল্প ও সেবা—এবং জাতীয় আয়ে এগুলোর অবদান ও বিবর্তনের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এছাড়া উন্নত, অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের বৈশিষ্ট্যসমূহের আলোকে বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থান ও এর অগ্রগতির প্রতিবন্ধকতাগুলো বিশ্লেষণ করা হয়েছে। পরিশেষে, বিশ্বায়নের প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সাথে বাংলাদেশের রপ্তানি, আমদানি ও বৈদেশিক সহায়তার সম্পর্কটি স্পষ্ট করা হয়েছে। এই অধ্যায়টি মূলত একটি দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো বোঝার জন্য প্রয়োজনীয় তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক জ্ঞানের একটি সারসংক্ষেপ।
পূর্ণাঙ্গ সারসংক্ষেপ:
অর্থনৈতিক নির্দেশক ও পরিমাপের ধারণা
একটি দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ও গতিপ্রবাহ বোঝার জন্য প্রধান তিনটি নির্দেশক হলো— মোট জাতীয় উৎপাদন (GNP), মোট দেশজ উৎপাদন (GDP) এবং মাথাপিছু আয়। কোনো নির্দিষ্ট সময়ে (সাধারণত এক বছরে) কোনো দেশের নাগরিকরা দেশে বা বিদেশে অবস্থান করে যে পরিমাণ চূড়ান্ত পণ্য ও সেবা উৎপাদন করে, তার আর্থিক মূল্যই হলো জিএনপি। অন্যদিকে, জিডিপি বলতে একটি দেশের ভৌগোলিক সীমানার ভেতরে বসবাসকারী দেশি ও বিদেশি সকল ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত চূড়ান্ত পণ্য ও সেবার মোট অর্থমূল্যকে বোঝায়। কোনো দেশের মোট জাতীয় আয়কে সে দেশের মোট জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে মাথাপিছু আয় পাওয়া যায়। এটি জনগণের জীবনযাত্রার মান নির্ধারণের প্রধান সূচক। তবে শুধু আর্থিক আয় বাড়লেই জীবনমান বাড়ে না; যদি আয়ের সাথে সাথে দ্রব্যমূল্যও একই হারে বাড়ে, তবে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা বাড়ে না। এছাড়া আয়ের সুষম বণ্টন না থাকলে মাথাপিছু আয় বাড়লেও সাধারণ মানুষের জীবনমানের উন্নতি হয় না।
বাংলাদেশের অর্থনীতির খাতসমূহ ও প্রকৃতি
বাংলাদেশের অর্থনীতিকে প্রধান তিনটি খাতে ভাগ করা হয়: কৃষি, শিল্প ও সেবা। তবে আধুনিক হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে মোট ১৯টি উপখাত সক্রিয়। ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ এবং বর্তমানেও এটি অর্থনীতির ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত। দেশের শ্রমশক্তির একটি বিশাল অংশ (প্রায় ৪৫ শতাংশ) কৃষিতে নিয়োজিত এবং জিডিপিতে এর উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিল্প খাতের গুরুত্ব ক্রমবর্ধমান এবং বর্তমানে জিডিপিতে এর অবদান প্রায় ৩৭.৬৫ শতাংশ। তৈরি পোশাক শিল্প বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানিমুখী শিল্প। বিশ্বব্যাংকের শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী বাংলাদেশ বর্তমানে একটি 'নিম্ন মধ্য আয়ের' উন্নয়নশীল দেশ।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও অনগ্রসরতার কারণ
বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক অনগ্রসরতার মূলে রয়েছে দীর্ঘ ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণের ইতিহাস। প্রায় ২০০ বছরের ব্রিটিশ শাসন আমলে এদেশের কৃষি ও বিশ্বখ্যাত বস্ত্রশিল্প পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা হয়েছিল। ফলে বাংলাদেশ সমৃদ্ধ শিল্পপণ্য রপ্তানিকারক দেশ থেকে ব্রিটিশ শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহকারীতে পরিণত হয়। ১৯৪৭ সালের পর ২৪ বছরের পাকিস্তানি শাসনামলে পূর্ব বাংলা বাজেট বরাদ্দ, চাকরি ও বৈদেশিক সাহায্যের ক্ষেত্রে চরম বৈষম্যের শিকার হয়। এই দীর্ঘমেয়াদি শোষণ এদেশের অর্থনীতির ভিত্তিকে দুর্বল করে দিয়েছিল।
উন্নয়নের প্রতিবন্ধকতা ও বৈশ্বিক সম্পর্ক
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথে কিছু উল্লেখযোগ্য বাধা রয়েছে। এর মধ্যে অবকাঠামোর দুর্বলতা (বিদ্যুৎ, গ্যাস ও যাতায়াত ব্যবস্থা), জনসংখ্যাধিক্য, শিক্ষার নিম্নহার, দক্ষ জনশক্তির অভাব এবং ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রধান। এছাড়া ভারী শিল্পের অভাব এবং আমদানিনির্ভরতা বৈদেশিক বাণিজ্যে লেনদেনের ঘাটতি তৈরি করে। বাংলাদেশ প্রধানত তৈরি পোশাক ও জনশক্তি রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে। উন্নয়নের প্রয়োজনে দেশটি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা (যেমন- বিশ্বব্যাংক, এডিবি) ও উন্নত দেশগুলোর (যেমন- জাপান, যুক্তরাষ্ট্র) ঋণ ও সাহায্যের ওপরও নির্ভরশীল।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও টেকসই উন্নয়ন
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হলো জাতীয় আয়ের বার্ষিক বৃদ্ধির হার। কিন্তু প্রবৃদ্ধি মানেই প্রকৃত উন্নয়ন নয়। প্রবৃদ্ধি যখন জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারকে ছাড়িয়ে যায় এবং জনগণের জীবনযাত্রার ইতিবাচক ও কাঠামোগত পরিবর্তন আনে, তখনই তাকে অর্থনৈতিক উন্নয়ন বলা যায়। উন্নয়নের লক্ষ্য হলো জনগণের সর্বাধিক কল্যাণ নিশ্চিত করা। তবে আধুনিক ধারণায় টেকসই উন্নয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ— অর্থাৎ এমন উন্নয়ন যা বর্তমানের চাহিদা মেটানোর সময় প্রকৃতির ক্ষতি করে না এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সম্পদ ও পরিবেশ সুরক্ষিত রাখে।
পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশ তার ঐতিহাসিক সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক কর্মসূচির মাধ্যমে এগিয়ে যাচ্ছে। কৃষির আধুনিকায়ন, দ্রুত শিল্পায়ন এবং জনশক্তিকে মানবসম্পদে রূপান্তরের মাধ্যমেই একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ অর্থনীতি গড়া সম্ভব।
জিডিপি (GDP) কী?
মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি (GDP) বলতে একটি নির্দিষ্ট সময়ে, সাধারণত এক বছরে, কোনো দেশের ভৌগোলিক সীমানার অভ্যন্তরে বসবাসকারী সকল জনগণ কর্তৃক উৎপাদিত চূড়ান্ত পর্যায়ের দ্রব্যসামগ্রী ও সেবাকর্মের মোট অর্থমূল্যের সমষ্টিকে বোঝায়। এতে উক্ত সীমানার মধ্যে বসবাসকারী দেশের সকল নাগরিকের পাশাপাশি বিদেশি ব্যক্তি, সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত পণ্যের মূল্যও অন্তর্ভুক্ত হয়। তবে জিডিপি-র ক্ষেত্রে বিদেশে অবস্থানকারী ও কর্মরত দেশের নিজস্ব নাগরিকদের আয় বিবেচনা করা হয় না,। সংক্ষেপে বলতে গেলে, জিডিপি-র ক্ষেত্রে উৎপাদনের জন্য দেশের অভ্যন্তরীণ সীমানা বা ভৌগোলিক অবস্থানই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
জিএনপি (GNP) কী?
মোট জাতীয় উৎপাদন বা জিএনপি (GNP) হলো একটি নির্দিষ্ট সময়ে, সাধারণত এক বছরে, কোনো দেশের নাগরিকগণ তাদের শ্রম ও মূলধন ব্যবহার করে যে পরিমাণ বস্তুগত ও অবস্তুগত চূড়ান্ত দ্রব্য ও সেবা উৎপাদন করে, তার মোট অর্থমূল্য।
জিএনপি-র মূল বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:
এতে দেশের অভ্যন্তরে বসবাসকারী এবং বিদেশে কর্মরত বা অবস্থানকারী দেশের সকল নাগরিক, সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের আয় অন্তর্ভুক্ত হয়।
এক্ষেত্রে উৎপাদনের ভৌগোলিক সীমানার চেয়ে উৎপাদনকারী সেই দেশের নাগরিক কি না, তা বেশি গুরুত্বপূর্ণ ।
তবে দেশের অভ্যন্তরে বসবাসকারী ও কর্মরত বিদেশি ব্যক্তি বা সংস্থার উৎপাদন বা আয় জিএনপি-তে অন্তর্ভুক্ত হয় না ।
সহজভাবে বলতে গেলে, জিএনপি = জিডিপি + (বিদেশে অবস্থানরত দেশি জনগণের আয় - দেশে অবস্থানরত বিদেশিদের আয়)।
স্টাডি গাইড
অংশ ১: সংক্ষিপ্ত উত্তরধর্মী কুইজ
নির্দেশনা: নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর ২-৩টি বাক্যের মধ্যে প্রদান করুন।
১. মোট জাতীয় উৎপাদন (GNP) বলতে কী বোঝায়?
২. মোট জাতীয় উৎপাদন গণনায় কেন শুধুমাত্র 'চূড়ান্ত দ্রব্য' অন্তর্ভুক্ত করা হয়?
৩. মোট দেশজ উৎপাদন (GDP) এবং মোট জাতীয় উৎপাদনের (GNP) মধ্যে মূল পার্থক্য কী?
৪. মাথাপিছু আয় কীভাবে নির্ণয় করা হয়?
৫. জীবনযাত্রার মান নির্ধারণে মাথাপিছু আয়ের সাথে মূল্যস্তরের সম্পর্ক কী?
৬. বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান তিনটি বৃহত্তর খাত কী কী?
৭. বাংলাদেশের কৃষিখাতকে কেন আজও অর্থনীতির ভিত্তিস্বরূপ বলা হয়?
৮. অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের মধ্যে মূল পার্থক্য কী?
৯. বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রসরতার ঐতিহাসিক কারণ কী?
১০. মানবসম্পদ বলতে কী বোঝায় এবং এটি কীভাবে গঠিত হয়?
--------------------------------------------------------------------------------
অংশ ২: উত্তরপত্র (Answer Key)
১. মোট জাতীয় উৎপাদন (GNP): কোনো নির্দিষ্ট সময়ে সাধারণত এক বছরে কোনো দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ বা ভূমির ওপর সে দেশের মোট শ্রম ও মূলধন নিয়োগ করে যে পরিমাণ বস্তুগত ও অবস্তুগত দ্রব্য ও সেবা উৎপাদিত হয়, তার আর্থিক মূল্যকে GNP বলে। এতে দেশের অভ্যন্তরে বা বিদেশে বসবাসরত সকল নাগরিকের আয় অন্তর্ভুক্ত থাকে।
২. চূড়ান্ত দ্রব্যের অন্তর্ভুক্তি: অনেক দ্রব্য চূড়ান্ত পর্যায়ে আসার আগে একাধিকবার কেনাবেচা হয়; প্রতিটি ধাপে হিসাব করলে জাতীয় উৎপাদনের পরিমাণ ভুল বা অতিরিক্ত দেখাবে। তাই ভুল গণনা এড়াতে শুধুমাত্র চূড়ান্ত পণ্য যা সরাসরি ভোগ করা হয়, তার দামই জাতীয় উৎপাদনে ধরা হয়।
৩. জিডিপি বনাম জিএনপি: জিডিপি (GDP) বলতে দেশের ভৌগোলিক সীমানার ভেতরে উৎপাদিত পণ্য ও সেবার মূল্যকে বোঝায়, যেখানে উৎপাদক দেশি বা বিদেশি যে কেউ হতে পারে। অন্যদিকে, জিএনপি (GNP) শুধুমাত্র দেশের নাগরিকদের উৎপাদনকে বোঝায়, তারা দেশে বা বিদেশে যেখানেই অবস্থান করুন না কেন।
৪. মাথাপিছু আয় নির্ণয়: কোনো নির্দিষ্ট সময়ে একটি দেশের মোট জাতীয় আয়কে (GNI) সে দেশের মোট জনসংখ্যা দ্বারা ভাগ করলে মাথাপিছু জাতীয় আয় পাওয়া যায়। গাণিতিক সংকেতে এটি হলো: মাথাপিছু আয় = মোট জাতীয় আয় / মোট জনসংখ্যা।
৫. মাথাপিছু আয় ও মূল্যস্তর: মাথাপিছু আয় বাড়লেই জীবনযাত্রার মান বাড়ে না, যদি একই হারে দ্রব্যমূল্যও বৃদ্ধি পায়। প্রকৃত জীবনযাত্রার মান তখনই উন্নত হয় যখন দ্রব্যমূল্য অপরিবর্তিত থাকে অথবা আয় বৃদ্ধির হারের তুলনায় মূল্যস্তরের বৃদ্ধির হার কম থাকে।
৬. প্রধান তিনটি খাত: বাংলাদেশের অর্থনীতিকে প্রধান তিনটি বৃহত্তর খাতে ভাগ করা হয়: কৃষি (শস্য, বনজ, মৎস্য), শিল্প (ম্যানুফ্যাকচারিং, নির্মাণ, বিদ্যুৎ) এবং সেবা (শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যাংক, পরিবহন)। যদিও মোট ১৯টি উপখাত রয়েছে, তবে এই তিনটির মাধ্যমেই সামগ্রিক অর্থনীতি পরিচালিত হয়।
৭. কৃষিখাতের গুরুত্ব: বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ যেখানে ২০২২-২৩ অর্থবছরে জিডিপিতে কৃষির অবদান ছিল প্রায় ১১.৩০ শতাংশ এবং শ্রমশক্তির ৪৫ শতাংশ এই খাতে নিয়োজিত। এছাড়া শিল্পখাতের কাঁচামাল সরবরাহ এবং খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে এই খাত মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করে।
৮. প্রবৃদ্ধি বনাম উন্নয়ন: জাতীয় আয়ের বার্ষিক বৃদ্ধির হারকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বলে। অন্যদিকে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন হলো প্রবৃদ্ধির সাথে সাথে অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তন, আয়ের সুষম বণ্টন এবং জনগণের জীবনযাত্রার মানের ইতিবাচক রূপান্তর।
৯. ঐতিহাসিক কারণ: প্রায় দুইশ বছরের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন এবং চব্বিশ বছরের পাকিস্তানি শাসন আমলে অব্যাহত শোষণ ও লুণ্ঠন বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত্তি ধ্বংস করে দিয়েছিল। এই দীর্ঘ শাসনামলে কৃষি ও শিল্প ধ্বংস করে দেশটিকে কাঁচামাল রপ্তানিকারক ও পরনির্ভর অর্থনীতিতে পরিণত করা হয়েছিল।
১০. মানবসম্পদ: শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, কারিগরি জ্ঞান এবং সুস্বাস্থ্যের মাধ্যমে যখন কোনো জনগোষ্ঠী উৎপাদনশীল শক্তিতে রূপান্তরিত হয়, তখন তাকে মানবসম্পদ বলে। যথাযথ বিনিয়োগের মাধ্যমে সাধারণ জনসংখ্যাকে সম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব যা দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
--------------------------------------------------------------------------------
অংশ ৩: রচনামূলক প্রশ্ন (Essay Questions)
নির্দেশনা: নিচের বিষয়গুলোর ওপর বিস্তারিত আলোচনা করুন (উত্তর প্রদানের প্রয়োজন নেই)।
১. বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ বিশদভাবে আলোচনা করুন এবং বর্তমান প্রেক্ষাপটে শিল্পখাতের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব বিশ্লেষণ করুন।
২. "মাথাপিছু আয়ের সুষম বণ্টন ছাড়া প্রকৃত অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়" — এই উক্তিটি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মূল্যায়ন করুন।
৩. বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রসরতার প্রধান প্রতিবন্ধকতাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো উত্তরণের উপায় সম্পর্কে আপনার মতামত প্রদান করুন।
৪. উন্নত, উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ তুলনা করুন এবং বাংলাদেশকে কেন একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হয় তা ব্যাখ্যা করুন।
৫. বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি চিত্র এবং উন্নত দেশগুলোর সাথে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের প্রভাব আলোচনা করুন।
--------------------------------------------------------------------------------
অংশ ৪: গুরুত্বপূর্ণ শব্দকোষ
|
শব্দ/টার্ম |
সংজ্ঞা |
|
অর্থনৈতিক নির্দেশক |
মোট জাতীয় উৎপাদন, মোট দেশজ উৎপাদন এবং মাথাপিছু আয় যা একটি দেশের অর্থনীতির অবস্থা নির্দেশ করে। |
|
জিএনপি (GNP) |
কোনো নির্দিষ্ট সময়ে (সাধারণত এক বছরে) দেশের সকল নাগরিক দ্বারা উৎপাদিত চূড়ান্ত দ্রব্য ও সেবার মোট আর্থিক মূল্য। |
|
জিডিপি (GDP) |
একটি দেশের ভৌগোলিক সীমানার ভেতরে উৎপাদিত চূড়ান্ত দ্রব্য ও সেবার মোট আর্থিক মূল্য। |
|
জিএনআই (GNI) |
জিএনআই (GNI) বা মোট জাতীয় আয় হলো একটি নির্দিষ্ট সময়ে (সাধারণত এক বছরে) একটি দেশের উৎপাদনের উপাদানসমূহ—ভূমি, শ্রম, মূলধন ও সংগঠন থেকে অর্জিত মোট খাজনা, মজুরি, সুদ ও মুনাফার সমষ্টি |
|
মাথাপিছু আয় |
কোনো নির্দিষ্ট সময়ে কোনো দেশের নাগরিকদের গড় আয়, যা মোট আয়কে মোট জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করে পাওয়া যায়। |
|
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক দ্রব্য |
তুলা থেকে সুতা বা সুতা থেকে কাপড় তৈরির প্রক্রিয়ায় তুলা, সুতা ও কাপড় হলো প্রাথমিক বা মাধ্যমিক দ্রব্য। |
|
চূড়ান্ত দ্রব্য |
যে দ্রব্যটি ভোক্তা সরাসরি ক্রয় ও ভোগ করে এবং যা আর পুনরায় কেনাবেচা হয় না (যেমন: শার্ট)। |
|
শিল্পায়ন |
কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি থেকে ক্রমশ উৎপাদনশীল ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহৎ শিল্পপ্রধান অর্থনীতিতে রূপান্তরের প্রক্রিয়া। |
|
দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র |
নিম্ন আয় থেকে নিম্ন সঞ্চয়, নিম্ন সঞ্চয় থেকে নিম্ন বিনিয়োগ এবং এর ফলে পুনরায় নিম্ন আয়ের একটি ধারাবাহিক চক্র। |
|
আর্থসামাজিক অবকাঠামো |
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য (সামাজিক) এবং যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও ব্যাংক ব্যবস্থা (অর্থনৈতিক) যা উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। |
|
সুশাসন |
প্রশাসনে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং গণতন্ত্রের শক্তিশালী রূপ যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সহায়ক হয়। |
|
মানবসম্পদ উন্নয়ন |
শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জনসংখ্যাকে কর্মক্ষম ও দক্ষ করে তোলার প্রক্রিয়া। |
|
বৈদেশিক বাণিজ্য ঘাটতি |
যখন কোনো দেশের রপ্তানি আয়ের তুলনায় আমদানি ব্যয় বেশি হয়, তখন তাকে বাণিজ্য ঘাটতি বলে। |
পাঠ্য বইয়ের সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন :
প্রশ্ন : ১. উৎপাদনের উপাদানসমূহের মোট আয় কীভাবে নির্ণয় করা হয়? ব্যাখ্যা কর।
উত্তর: উৎপাদনের উপাদানসমূহের মোট আয় নির্ণয় করার পদ্ধতিটি নিচে সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করা হলো:
উপাদানসমূহ: উৎপাদনের চারটি প্রধান উপাদান হলো— ভূমি, শ্রম, মূলধন ও সংগঠন ।
আয়ের ধরণ: এই চারটি উপাদান থেকে অর্জিত আয়গুলো হলো যথাক্রমে খাজনা, মজুরি বা বেতন, সুদ ও মুনাফা।
নির্ণয় পদ্ধতি: কোনো নির্দিষ্ট সময়ে (সাধারণত এক বছরে) একটি দেশের উৎপাদনের এই উপাদানগুলো যে পরিমাণ আয় অর্জন করে, সেগুলোর সমষ্টিই হলো উপাদানসমূহের মোট আয়। অর্থাৎ, ঐ নির্দিষ্ট সময়ে অর্জিত মোট খাজনা, মজুরি, সুদ ও মুনাফা যোগ করে এই আয় পরিমাপ করা হয়।
সংক্ষেপে, উৎপাদনের উপাদানসমূহের মোট আয় = খাজনা + মজুরি + সুদ + মুনাফা । এই পদ্ধতিটিকে জাতীয় আয় পরিমাপের আয় পদ্ধতি হিসেবেও বিবেচনা করা হয়।
প্রশ্ন: ২. মোট জাতীয় উৎপাদন নির্ণয়ের সাংকেতিক সূত্রটি ব্যাখ্যা কর।
উত্তর: মোট জাতীয় উৎপাদন (GNP) নির্ণয়ের সাংকেতিক সূত্র: মোট জাতীয় উৎপাদন নির্ণয়ের সাংকেতিক সূত্রটি হলো: GNP = GDP + (X - M)
এখানে সূত্রটির ব্যাখ্যা নিচে দেওয়া হলো:
GNP: মোট জাতীয় উৎপাদন (Gross National Product)।
GDP: মোট দেশজ উৎপাদন (Gross Domestic Product)।
X: বিদেশে অবস্থানরত ও কর্মরত দেশি নাগরিকদের অর্জিত আয় ।
M: দেশের অভ্যন্তরে অবস্থানরত ও কর্মরত বিদেশি ব্যক্তি বা সংস্থার অর্জিত আয়। অর্থাৎ, একটি দেশের ভৌগোলিক সীমানার ভেতরের মোট উৎপাদনের (GDP) সাথে বিদেশে অবস্থানরত নাগরিকদের নিট আয় যোগ করলে মোট জাতীয় উৎপাদন পাওয়া যায়।
(X - M) কী?
[মোট জাতীয় উৎপাদন (GNP) নির্ণয়ের সূত্রে (X - M) বলতে মূলত বিদেশে অবস্থানরত দেশি নাগরিকদের নিট আয়কে বোঝানো হয়।
সূত্রের এই অংশটির বিস্তারিত ব্যাখ্যা নিচে দেওয়া হলো:
X (রপ্তানি আয় সদৃশ): এটি হলো বিদেশে অবস্থানরত ও কর্মরত দেশি নাগরিকদের অর্জিত মোট আয় ।
M (আমদানি ব্যয় সদৃশ): এটি হলো দেশের অভ্যন্তরে বা ভৌগোলিক সীমানার ভেতরে বসবাসকারী ও কর্মরত বিদেশি ব্যক্তি, সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের অর্জিত মোট আয় [১১]।
সহজ কথায়, (X - M) হলো আমাদের দেশের নাগরিকরা বিদেশ থেকে যে পরিমাণ টাকা আয় করে পাঠাচ্ছেন, সেখান থেকে আমাদের দেশে কর্মরত বিদেশিরা যে পরিমাণ টাকা তাদের দেশে নিয়ে যাচ্ছেন, তার বিয়োগফল। এই নিট আয় যখন মোট দেশজ উৎপাদনের (GDP) সাথে যোগ করা হয়, তখন আমরা মোট জাতীয় উৎপাদন (GNP) পাই।]
প্রশ্ন : ৩. কৃষি খাত বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে বিবেচিত কেন? ব্যাখ্যা কর।
উত্তর: কৃষি খাত বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাত হওয়ার কারণ: প্রাচীনকাল থেকেই বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ এবং বর্তমানেও এটি আমাদের অর্থনীতির ভিত্তিস্বরূপ। কৃষি খাতকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করার প্রধান কারণগুলো হলো:
কর্মসংস্থান: দেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৪৫.০০ শতাংশ মানুষ সরাসরি কৃষি খাতে নিয়োজিত।
জিডিপিতে অবদান: ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনে (GDP) কৃষিখাতের অবদান ছিল প্রায় ১১.৩০ শতাংশ।
খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা: ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্যশস্যের জোগান এই খাত থেকেই আসে, যার ফলে দেশ ধীরে ধীরে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠছে।
শিল্পের কাঁচামাল: আমাদের প্রধান প্রধান শিল্প যেমন— পাট, চা ও চামড়া শিল্পের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল কৃষি খাত থেকেই সরবরাহ করা হয়।
রপ্তানি আয়: দেশের রপ্তানি আয়েও কৃষি খাতের উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে।
বর্ণনামূলক প্রশ্ন
প্রশ্ন ১. মাথাপিছু আয় কীভাবে জীবনযাত্রার মান নির্ধারণ করে? বিশ্লেষণ কর।
উত্তর: মাথাপিছু আয় ও জীবনযাত্রার মান: মাথাপিছু আয় একটি দেশের মানুষের গড় আয় নির্দেশ করে এবং এটি জীবনযাত্রার মান নির্ধারণের প্রধান সূচক। তবে শুধু আর্থিক আয় বাড়লেই জীবনমান বাড়ে না; এর সাথে দ্রব্যমূল্য বা মূল্যস্তর বিবেচনা করতে হয়। যদি মাথাপিছু আয় যে হারে বাড়ে, দ্রব্যমূল্যও যদি একই হারে বাড়ে, তবে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ে না বলে জীবনযাত্রার মান একই থাকে। এছাড়া আয়ের সুষম বণ্টন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; কারণ আয় বণ্টনে বৈষম্য থাকলে গড় মাথাপিছু আয় বাড়লেও সাধারণ মানুষের জীবনমানের উন্নতি হয় না। অর্থাৎ, স্থিতিশীল মূল্যস্তরে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি এবং আয়ের ন্যায়সংগত বণ্টনই প্রকৃত জীবনমান উন্নত করে।
প্রশ্ন ২. মোট দেশজ উৎপাদনে অর্থনীতির খাতসমূহ কীভাবে অবদান রাখে? ব্যাখ্যা কর।
উত্তর: মোট দেশজ উৎপাদনে (GDP) অর্থনীতির খাতসমূহের অবদান: একটি দেশের অর্থনীতিকে প্রধান তিনটি খাতে ভাগ করা হয়— কৃষি, শিল্প ও সেবা খাত। জিডিপিতে এই খাতগুলোর অবদান নিচে ব্যাখ্যা করা হলো:
কৃষি খাত: এটি খাদ্যশস্য উৎপাদন এবং শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহ করে। ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপিতে এর অবদান ছিল ১১.৩০ শতাংশ।
শিল্প খাত: উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও দ্রুত উন্নয়নের জন্য এই খাত অপরিহার্য। বাংলাদেশের জিডিপিতে এর অবদান ক্রমবর্ধমান, যা ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে ছিল ৩৭.৬৫ শতাংশ।
সেবা খাত: শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যাংক, বিমা ও পরিবহনের মতো উপখাতগুলো সেবা খাতের অন্তর্ভুক্ত যা অর্থনীতির গতি সচল রাখে। এই খাতগুলোর উৎপাদিত চূড়ান্ত পণ্য ও সেবার মোট আর্থিক মূল্য যোগ করেই জিডিপি নির্ণয় করা হয়।
প্রশ্ন ৩. নিম্ন আয়ের দেশের ক্ষেত্রে জিডিপি, জিএনপি ও মাথাপিছু আয়ের তুলনামূলক বিশ্লেষণ কর।
উত্তর: নিম্ন আয়ের দেশের ক্ষেত্রে জিডিপি, জিএনপি ও মাথাপিছু আয়ের তুলনামূলক বিশ্লেষণ: নিম্ন আয়ের দেশগুলোর (যেমন- নাইজার, উগান্ডা) ক্ষেত্রে এই তিনটি নির্দেশকের চিত্র নিম্নরূপ:
জিডিপি ও জিএনপি: এসব দেশের জিডিপি মূলত কৃষিনির্ভর এবং শিল্প খাত অত্যন্ত ক্ষুদ্র। প্রাকৃতিক সম্পদ ও জনশক্তির অসম্পূর্ণ ব্যবহারের ফলে উৎপাদন ক্ষমতা কম থাকে, যা জিডিপি ও জিএনপি-কে নিম্নমুখী রাখে। এছাড়া এসব দেশ প্রায়ই বৈদেশিক সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল থাকে।
মাথাপিছু আয়: উচ্চ জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার এবং নিম্ন জাতীয় আয়ের কারণে এসব দেশে মাথাপিছু আয় অত্যন্ত কম (সাধারণত বার্ষিক ৬০০ থেকে ১০০০ ডলারের মধ্যে)।
তুলনা: উন্নত দেশের তুলনায় এদের জিডিপি ও জিএনপি যেমন কম, তেমনি মাথাপিছু আয় কম হওয়ায় সঞ্চয় ও বিনিয়োগের হারও নগণ্য। ফলে এই দেশগুলো একটি দারিদ্র্যের চক্রের মধ্যে আবর্তিত হয় এবং জনগণের জীবনযাত্রার মান অত্যন্ত নিম্ন থাকে।
অতিরিক্ত সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন
প্রশ্ন-১ : মাথাপিছু আয় কী? এটি নির্ণয়ের উপায় ব্যাখ্যা কর।
উত্তর: মাথাপিছু আয় হলো কোনো নির্দিষ্ট সময়ে (সাধারণত এক বছরে) কোনো দেশের নাগরিকদের গড় আয় । এটি মূলত একটি দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা এবং জনগণের জীবনযাত্রার মান নির্ধারণের প্রধান সূচক হিসেবে ব্যবহৃত হয় ।
মাথাপিছু আয় নির্ণয়ের প্রক্রিয়াটি নিচে সংক্ষেপে দেওয়া হলো:
নির্ণয় পদ্ধতি: একটি দেশের মোট জাতীয় আয়কে (GNI) ওই দেশের মোট জনসংখ্যা দ্বারা ভাগ করলে মাথাপিছু আয় পাওয়া যায় ।
গাণিতিক সূত্র: মাথাপিছু আয় = মোট জাতীয় আয় ÷ মোট জনসংখ্যা ।
জীবনযাত্রার মান: উচ্চ মাথাপিছু আয় সাধারণত উন্নত জীবনমান নিশ্চিত করে। তবে প্রকৃত জীবনমান বোঝার জন্য মাথাপিছু আয়ের পাশাপাশি দ্রব্যমূল্য বা মূল্যস্তর এবং আয়ের সুষম বণ্টন হওয়া জরুরি ।
বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা: ২০২২-২০২৩ অর্থবছরের হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশের মাথাপিছু জাতীয় আয় হলো ২,৭৪৯ মার্কিন ডলার বা ২,৭৩,০০০ টাকা ।
প্রশ্ন-২ : দরিদ্রের দুষ্ট চক্র কী? এ থেকে মুক্তির উপায় ব্যাখ্যা কর।
উত্তর: দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র হলো এমন একটি অর্থনৈতিক পরিস্থিতি যেখানে নিম্ন আয়, নিম্ন সঞ্চয় এবং নিম্ন বিনিয়োগের এক নিরবচ্ছিন্ন চক্রের কারণে একটি দেশ দারিদ্র্যের মধ্যে আটকে থাকে । অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশে জনগণের মাথাপিছু আয় কম হওয়ায় তাদের আয়ের প্রায় সবটুকুই জীবনধারণের জন্য ব্যয় হয়ে যায়, ফলে সঞ্চয় করার মতো উদ্বৃত্ত থাকে না । সঞ্চয় কম হওয়ার কারণে মূলধন গঠন বা পুঁজি তৈরি হয় না এবং নতুন বিনিয়োগের হারও অত্যন্ত নিম্নমুখী হয় । বিনিয়োগ কম হওয়ায় নতুন কর্মসংস্থান বা শিল্প গড়ে ওঠে না, ফলে জনগণের আয় পুনরায় নিম্নস্তরেই থেকে যায় এবং এভাবেই চক্রটি বারবার আবর্তিত হতে থাকে।
এই চক্র থেকে মুক্তির প্রধান উপায়গুলো নিচে দেওয়া হলো:
পরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মসূচি: সরকারের পক্ষ থেকে পরিকল্পিত এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা যা দারিদ্র্য নিরসনে সরাসরি ভূমিকা রাখবে ।
দ্রুত শিল্পায়ন ও আধুনিক কৃষি: শুধু কৃষির ওপর নির্ভরশীল না থেকে দেশে ভারী ও মৌলিক শিল্প স্থাপন করা এবং কৃষিক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ ঘটিয়ে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো ।
মানবসম্পদ উন্নয়ন: শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও স্বাস্থ্যের মান উন্নয়নের মাধ্যমে বিশাল জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করা, যাতে তারা উৎপাদন ও আয়ে অবদান রাখতে পারে ।
অবকাঠামো ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি: সড়ক, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের মতো অর্থনৈতিক অবকাঠামো উন্নত করা এবং বিনিয়োগকারীদের উৎসাহ দেওয়ার জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা।
প্রাকৃতিক সম্পদের দক্ষ ব্যবহার: দেশে বিদ্যমান ভূগর্ভস্থ খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদগুলোকে উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে আহরণ ও সেগুলোর পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করা ।
সৃজনশীল প্রশ্ন
১. অণিমা তার পরিবারের সদস্যদের সাথে মাইক্রোবাসে করে কুয়াকাটায় বেড়াতে যাচ্ছিল। যাওয়ার সময় দুটি ফেরি তারা নির্বিঘ্নে পার হলো। কিন্তু মহীপুরের ফেরি পার হতে গিয়ে দেখে যে, ব্যাপক জলোচ্ছ্বাসের কারণে ফেরিসংলগ্নে পন্টুনের তিন-চতুর্থাংশ পানির নিচে ডুবে গেছে। তাদেরকে ফেরি পার হওয়ার জন্য সেখানে চার ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। অণিমার বাবা সেখানকার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সাথে কথা বলে জানতে পারেন, সরকার এ ধরনের অবস্থা মোকাবিলার জন্য একটি বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ করেছে।
ক. অর্থনৈতিক উন্নয়নের ভিত্তি কী?
খ. বৈদেশিক বাণিজ্য বলতে কী বুঝায়?
গ. অণিমা ও তার পরিবার কুয়াকাটা যাওয়ার পথে দেশের কোন ধরনের অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়? ব্যাখ্যা কর।
ঘ. অণিমার বাবার জানা প্রকল্পটি কি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়ক হবে? তোমার উত্তরের সপক্ষে যুক্তি দাও।
--- নং প্রশ্নের উত্তর
ক.
মাথাপিছু আয় এবং আর্থসামাজিক অবকাঠামো হলো অর্থনৈতিক উন্নয়নের ভিত্তিস্বরূপ।
খ.
বৈদেশিক বাণিজ্য বলতে সাধারণত বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাথে পণ্য, সেবা বা শ্রমের আদান-প্রদান বা আমদানি ও রপ্তানি প্রক্রিয়াকে বোঝায়। এর দুটি দিক রয়েছে—রপ্তানি (আয়ের উৎস) এবং আমদানি (ব্যয়ের খাত)। সাধারণত একটি দেশের রপ্তানি আয় আমদানি ব্যয়ের চেয়ে কম হলে বৈদেশিক বাণিজ্যে ঘাটতি দেখা দেয় । অন্যদিকে রপ্তানি আয় আমদানি ব্যয়ের চেয়ে বেশি হলে বৈদেশিক বাণিজ্যে প্রবৃদ্ধি ঘটে।
গ.
অণিমা ও তার পরিবার কুয়াকাটা যাওয়ার পথে প্রধানত আর্থসামাজিক অবকাঠামোর দুর্বলতা এবং প্রকৃতিসৃষ্ট প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়েছে। পাঠ্য বই অনুসারে, সড়ক, সেতু বা ফেরি পারাপারের মতো যোগাযোগ ব্যবস্থা 'অর্থনৈতিক অবকাঠামোর' অন্তর্ভুক্ত। জলোচ্ছ্বাসের কারণে পন্টুন ডুবে যাওয়া এবং দীর্ঘ ৪ ঘণ্টা অপেক্ষা করা যোগাযোগ ব্যবস্থার অপর্যাপ্ততা ও দুর্বলতাকেই নির্দেশ করে । এছাড়া, বাংলাদেশ একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগকবলিত দেশ এবং জলোচ্ছ্বাস একটি নিয়মিত প্রকৃতিসৃষ্ট প্রতিবন্ধকতা, যা পথঘাট ও যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে অর্থনৈতিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে বাধাগ্রস্ত করে।
ঘ.
হ্যাঁ, অণিমার বাবার জানা বিশেষ প্রকল্পটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে নিশ্চিতভাবেই সহায়ক হবে। এর সপক্ষে যুক্তিগুলো হলো:
অবকাঠামোগত দৃঢ়তা: অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অবকাঠামোগত পরিবর্তন ও উন্নয়ন অপরিহার্য । দুর্যোগ মোকাবিলায় সক্ষম প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের অর্থনৈতিক অবকাঠামো শক্তিশালী হবে ।
সময় ও ব্যয় সাশ্রয়: উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা পণ্য ও যাত্রীবাহী পরিবহনকে গতিশীল করে এবং পরিবহন ব্যয় হ্রাস করে । পন্টুন ডুবে যাওয়ার মতো সমস্যা সমাধান হলে অণিমার পরিবারের মতো যাত্রী ও ব্যবসায়ীদের কর্মঘণ্টা নষ্ট হবে না, যা উৎপাদনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে ।
টেকসই উন্নয়ন: প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে প্রতিবছর নতুন করে উৎপাদন শুরু করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ ধরনের প্রকল্প দুর্যোগের ঝুঁকি কমিয়ে উন্নয়নের ধারাকে টেকসই করবে।
আয় বৃদ্ধি: অবকাঠামো উন্নত হলে শিল্প ও সেবা খাতের প্রসার ঘটে, যা দেশের জিডিপি এবং জনগণের মাথাপিছু প্রকৃত আয় বৃদ্ধিতে সরাসরি সহায়তা করে।
সুতরাং, দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারের এই বিশেষ প্রকল্প দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
+88 01713 211 910