
NTRCA ৪৭ উত্তর বাংলাদেশের কবিতার গতি-প্রকৃতি
প্রশ্ন : ৪৭ উত্তর বাংলাদেশের কবিতার গতি-প্রকৃতি আলোচনা কর।
উত্তর : ১৯৪৭ সালে রাজনৈতিক কারণে ভারত বিভক্ত হলে বাংলা সাহিত্য দ্বি-ধারায় প্রবাহিত হয়। এর একটি ধার হলো-কলকাতা কেন্দ্রিক এবং অন্যটি পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা কেন্দ্রিক। ঢাকা কেন্দ্রিক বাংলাদেশের সাহিত্য স্বতন্ত্র ভাব ও জীবন চেতনায় উত্তরোত্তর সমৃদ্ধ হয়ে উঠে। বিশেষ করে ঢাকাকেন্দ্রিক কাব্য সাধনা ভিন্ন রূপ ও রসে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ হয়ে উঠে।
বিষয়, ভাব আঙ্গিক এবং জীবন-চেতনার প্রশ্নে বাংলাদেশের কাব্য সাধনার ধারাটিকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। যেমন-
১। প্রাক বিভাগোত্তর পর্ব। ২। বিভাগোত্তর ও ভাষা আন্দোলন পর্ব।
৩। সামরিক শাসন ও স্বাধীনতা পর্ব। ৪। স্বাধীনতা-উত্তর বা বাংলাদেশ পর্ব।
নিচে উল্লিখিত পর্ব সমূহের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেয়া হলো-
১। প্রাক বিভাগোত্তর পর্ব : দেশ বিভাগের পর বাংলাদেশের কবিতা একটি ভিন্ন মাত্রা লাভ করলেও এর ভিত্তি নির্মিত হয়ে ছিল প্রাক বিভাগোত্তর কালে। এ ধারা যাঁদের সাধনায় পুষ্টি লাভ করেছে তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন গোলাম মোস্তফা, শাহাদাৎ হোসেন, তালিম হোসেন প্রমুখ। এ পর্বের কবিদের রচনায় পাকিস্তানপন্থী অতীতমুখী চিন্তা-চেতনার প্রয়োগ লক্ষ করা যায় বেশি। এ পর্বের উল্লেখযোগ্য কাব্য গ্রন্থ হলো- বুলবুলিস্তান, হাসনাহেনা, কল্পরেখা, মৃদঙ্গ, চিত্রপট ইত্যাদি।
২। বিভাগোত্তর ও ভাষা আন্দোলন পর্ব : যে মোহ ও স্বপ্ন নিয়ে ১৯৪৭ সালে পূর্ববাংলার মুসলিম মধ্যবিত্ত মানস দেশ বিভাগকে সমর্থন ও সহযোগিতা করেছিল-সে মোহ ও স্বপ্ন ভঙ্গ হতে সময় লাগেনি। কেননা, ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা ছিল বাঙালি জাতির বিরুদ্ধে পাকিস্তানীদের একটা বৃহত্তর ষড়যন্ত্র। ষড়যন্ত্রের প্রক্রিয়া হিসেবে তারা সর্বপ্রথম আঘাত আনে বাঙালির মাতৃভাষা বাঙলার উপর সে আঘাতে সমস্ত বাঙালি সমাজ প্রতিবাদ মুখর হয়ে উঠে। সাহিত্য-শিল্পেও সমান ভাবে এর প্রভাব পড়ে। শিল্পী-সাহিত্যিকগণ সচেতন হয়ে উঠেন। জাতির স্বরূপ, জাতীয় জীবনের চরিত্র, জন-জীবন, ইতিহাস সংস্কৃতি সবকিছু নিয়ে আলোড়িত হয়ে উঠেন। ফলে এই পর্বের কবিতা ইতিবাচক জীবনচেতনা নিয়ে বিকশিত হয়। যাঁদের শ্রম ও সাধনায় এ পর্বটি ঋদ্ধি লাভ করেছে তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন-আহসান হাবীব, সিকান্দার আবু জাফর, আবুল হোসেন, হাসান হাফিজুর রহমান, আলাউদ্দিন আল আজাদ প্রমুখ। এই পর্বের কবিতায় দ্রোহই মুখ্য হয়ে উঠে। তাই আহসান হাবিব উচ্চারণ করেন-
মধ্যরাতে রাজপথে দেখি এক নারীর শরীর
যে নারী নায়িকা ছিলো কোনোকালে এই পৃথিবীর।
সর্বাঙ্গ পুড়েছে তার বণিকের তুষ্ণার উত্তাপে,
হৃদয়ের রক্ত নিয়ে রেখে গেছে নখবের ছাপ,
---------------------------------------
তনুর তনিমা ঘিরে আজ নেই হৃদয়ে ডাক
কুৎসিত কংকাল ঘিরে ইতিহাস নগরী নির্বাক। (আহসান হাবীব-ক্রান্তিকাল-ছায়াহরিণ)
জাতীয় মুক্তির চেতনার স্বরূপটিও এ পর্বের কোনো কোনো কবির কবিতায় স্পষ্ট হয়ে উঠে। যেমন-
কাজ কি দ্বিধার বিষন্নতায়
বন্ধী রেখে ঘৃণার অগ্নিগিরি?
আমার বুকেই ফিরিয়ে নিবো
ক্ষিপ্ত বাজের থাবা;
তুমি আমার জলস্থলের
মাদুর থেকে নামো
তুমি বাঙলা ছাড়ো। (সিকান্দার আবু জাফর/বাঙলা ছাড়ো/বাঙলা ছাড়ো)
৩। সামরিক শাসন ও স্বাধীনতা পর্ব : ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানের নের্তৃত্বে বাংলার বুকে, প্রথম বারের মতো, নেমে এল সামরিক শাসন। সামন্ত মূল্যবোধ ধ্যান ধারণা, ধর্মমোহ, ও সাম্প্রদায়িকতা পুনরুজ্জীবিত হল। প্রগতিশীল চিন্তা চেতনা-স্নাত, শিল্পী-মানস দ্বিধাগ্রস্ত হলেন। জীবিকার প্রয়োজনে কেউ কেউ হলেন সামরিক সরকারের ধামাধরা-পরিণত হলেন বেতন দাসে। আবার কেউ হলেন ফ্রয়েডে আশ্রয়ী; কেউ বা স্বল্পভাষী; কেউ আত্ম গোপন করলেন রোমান্টিক স্বপ্ন লোকে, ব্যঙ্গ বিদ্রুপে। ফলে একুশকে অনুসরণ করে যে, সুস্থ্য জীবনবোধ উত্তরণের প্রক্রিয়া শুরু হয়, তা ব্যাহত হয়। সমস্ত জাতির সাংস্কৃতিক জীবনে নেমে আসে বিশৃঙখল অবস্থা। আবদুল গণি হাজারীর একটা কবিতায় এ চিত্রটি অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।
ছত্রভঙ্গ মিছিল
দুমড়ানো ঝান্ডা
দেয়ালের গায়ে বিমর্ষ পোস্টার
মায়েদের কান্নায় ইস্তেহার বিলুপ্ত
এবং রাষ্ট্রের শূন্য খোলে
আত্মহননের সারী
তবুও অন্বিষ্ট শিশুর কান্নার আভাসে
হৃৎপিন্ড অস্থির।
(আব্দুল গণি হাজারী-গত রাত্রির দুঃস্বপ্ন প্রত্যেক রাত্রি-সূর্যের সিঁড়ি।)
তবে এই বিচ্ছিন্নতা ও অন্ধকার দূর হতে সময় লাগে নি। অতি দ্রুত এ পর্বের কবিদের কবিতায় মুক্তিসংগ্রাম ও স্বাধীনতার চেতনা মুখ্য হয়ে উঠে। পর্ববর্তী অনেক কবির কাব্য সাধনাই এ পর্বে অব্যহত থাকে। তবে এ পর্বে আরো যাঁদের
নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য তারা হলেন- শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, আলমাহমুদ প্রমুখ। তাঁদের কবিতায় স্বাধিকার ও স্বাধীনতার চেতনাটাই মুখ্য হয়ে উঠে। যেমন-শামসুল রাহমান উচ্চারণ করেন-
জিজ্ঞেস করুন
দগ্ধ, স্তব্ধ পাড়ার নিঃসঙ্গ যে ছেলেটা
বুলেটের ঝড়ে
জননীকে হারিয়ে সম্প্রতি খাপছাড়া
ঘোরে ইতস্ত, তাকে জিজ্ঞেস করুন,
হায় শান্তিপ্রিয় ভদ্রজন,
এখন বলবে তারা সমস্বরে যুদ্ধই উদ্ধার। (উদ্ধার, বন্দী শিবির থেকে)
৪। স্বাধীনতা-উত্তর বা বাংলাদেশ পর্ব : অতীতের অনেক কবির কাব্য সাধনা এ পর্বেও অব্যহত থাকে। এ পর্বে যাঁদের নাম বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য তাঁরা হলেন-মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, রফিক আজাদ, আব্দুল মান্নান সৈয়দ, হুমায়ুন আজাদ, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, নির্মলেন্দু গুণ, আবুল হাসন, শহীদ কাদরী, আজিজুল হক, হেলাল হাফিজ, রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, মহাদেব সাহা, ফরহাদ মজাহার, মুহম্মদ নুরুল হুদা, দাউদ হায়দার, ওমর আলী, আসাদ চৌধুরী প্রমুখ।
জীবন-চেতনায় এই পর্বের কবিদের কবিতা ছিল পরিপূর্ণভাবে মানবতাবাদী এবং জনমূল সংলগ্ন। তাছাড়া সমসাময়িক সময়, সমাজ ও রাজনৈতিক সংকটে এ পর্বের কবিতাকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে। ফলে সময় ও সমাজ এ পর্বের কবিতায় ভিন্নমাত্রায় উপস্থাপিত হয়েছে। তবে এই পর্বের কবিদের কাব্য সাধনায় আঙ্গিকের নতুন কোনো পরীক্ষা নিরীক্ষা লক্ষ করা যায় না। যদিও কলকাতা কেন্দ্রিক কবিতা থেকে বাংলাদেশের কবিতা একটি সার্বভৌম স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করে বিকশিত হয়েছে। যা বাংলাদেশের কবিতাকে দিয়েছে একটি ভিন্ন মর্যাদার আসন।
ড. এ. আই. এম. মুসা
+88 01713 211 910