
NTRCA বাংলাদেশের ছোটগল্পের গতি প্রকৃতি
প্রশ্ন : বাংলাদেশের ছোটগল্পের গতি প্রকৃতি আলোচনা কর।
১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে যে সমস্ত ছোটগল্প রচিত হয়েছে এর অধিকাংশ, বিশেষ করে প্রথম পর্যায়ের গল্প সমূহের পটভূমি গ্রামীণ জীবন। এই পর্বে নব বিকশিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রতিনিধি হিসাবে বাংলা সাহিত্যে যে সমস্ত লেখকের আর্বিভাব ঘটে তাঁরা বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত ছিলেন। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই তাদের গল্পে বাংলাদের গ্রামীণ জীবন প্রাণ পেয়েছে। উল্লিখিত সময় পরিসরে বাংলাদেশে যে সমস্ত গল্পকারের আর্বিভাব তারা হলেন-শওকত ওসমান, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, সরদার জয়েন উদ্দীন, শাহেদ আলী, আবু ইসহাক, শামসুদ্দিন আবুল কালাম, হাসান হাফিজুর রহমান, আলাউদ্দিন আল আজাদ, শওকত আলী, হাসান আজিজুল হক প্রমুখ। তাঁদের গল্পে বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনের অর্থনৈতিক বিপর্যয় সমাজ জীবনের দ্বন্দ্ব সংঘাতের চিত্র যেমন ফুটে উঠেছে, তেমনি রূপ লাভ করেছে গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ও অচরিতার্থতা জনিত হাহাকার, রক্তাক্ত অভিজ্ঞতা তাদের প্রতিবাদ সংগ্রাম, ব্যর্থতা বিজয় প্রভৃতি।
মানবতাবাদী জীবন মুখী শিল্পী শওকত ওসমান। তাঁর ছোটগল্পে বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবন এর সমস্ত বাস্তব দিক নিয়ে উপস্থিত। গ্রামীণ জীবনের অনুপঙখ রূপায়ণ লক্ষ্য করা যায় তাঁর রচিত পিজরাপোল, জুনু আপা ও অন্যান্য গল্প সাবেক কাহিনী প্রস্তাব ফলক, উভশৃঙ্গ প্রভৃতি গ্রন্থে। উপনিবেশ শৃঙখলিত সমস্ত ও আধা সামন্ত বাদী সমাজ ব্যবস্থার অন্তরালে অর্থনৈতিক ভাবে বিপর্যস্ত গ্রামীণ জীবনকেই চিত্রিত করেছেন এ সমস্ত গ্রন্থে। তাছাড়া গ্রামীণ জীবনের অবক্ষয়িত রূপটিও ফুটে ওঠেছে তার গল্পে। আবেদ আলির ও পাঁচুর জীবন অনুষঙ্গে শওকত ওসমান সমস্ত বাংলাদেশের কৃষকদের অবক্ষয়ের রূপটিই অংকন করেছেন-
“আবেদ আলির দেনা জমিয়া গিয়াছিল। প্রথম কিস্তি জমি হাতছাড়া হইয়া যায়।
দ্বিতীয় দফা হালের বলদ ও গাই-বাছুর। তৃতীয় কিস্তি বাকী।’ (কিরুপে স্বার্থে গেল/সাবেক কাহিনী)
অস্তিত্ববাদী দর্শনে মীমাংসিক শিল্পী সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ। বক্তব্য ও প্রকরণে তিনি সর্বজনীন ও বিশ্বপ্রসারিত হলেও বিষয় নির্বাচনে বাঙলাদের জনজীবনমূল সম্পৃক্ত। তাঁর গল্পে একদিকে যেমন নাগরিক জীবনের ব্যর্থতা, হাহাকার, রক্তাক্ত অভিজ্ঞতা, প্রত্যাশা ও অপ্রাপ্তির ব্যর্থতা জনিত যন্ত্রণা চিত্রিত হয়েছে তেমনি অন্যদিকে চিত্রিত হয়েছে গ্রামীণ জীবনের অবক্ষয় ও অনাহার শ্লিষ্ট মানুষের হাহাকার।
বস্তুত সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর গল্পে বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনের বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে। গ্রামের মানুষের বিশ্বাস, সংস্কার, ধর্মবোধ, আচার আচরণ এবং তাদের সংগ্রামশীলতা সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ ভুতনি আমু, করিম, তিনু আনু, তোতা, হাজুর বাপ হালুরমা প্রভৃতি চরিত্রের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন।
বাংলাদেশের চিরায়ত জীবনের বিশ্বাস্ত চিত্র পাওয়া যায় শাহেদ আলীর গল্পে। তার গল্পের শব্দচয়ন বাক্য বিন্যাস, ভাষা ব্যবহার, বিষয় নির্বাচন উপস্থাপনরীতি উপমা অলংকার ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশের কৃষ্টি, নিভূত গ্রামীণ জীবনের চিত্র ফুটে উঠেছে। সমাজ মূলের অসঙ্গতি রূপায়ণের চেয়ে তাঁর গল্পে প্রাধান্য পেয়েছে গ্রামীন জীবনের উপরিতলের ছবি। মোটকথা তার গল্পে চিরায়ত জীবনের সাদামাটা রূপটিই চিত্রিত হয়েছে।
পুঁজিবাদী সভ্যতা বিকাশের সাথে সাথে বাংলাদেশের মানুষের জীবনে যে সংকট দেখা দেয়, তাই রূপলাভ করেছে শামসুদ্দিন আবুল কালামের গল্পে। তাঁর ‘শাহের বানু’ ‘পথ জানা নাই’, অনেকদিনের আশা এদিক থেকে অনন্য। তবে তিনি গ্রামীণ জীবনের যে চিত্র অংকন করেছেন তা নেতিবাচক জীবনের দৃষ্টিতে ভারাক্রান্ত।–
‘সকালের আলো ম্লান করে কেমন একটা ভীতির ছায়া নামলো সবখানে। অশরীরি মনে হোল লালুকে। দেখলাম আরো কবর সারা গ্রাম সারা দেশে। কিন্তু সব যেখানে শেষ, সেখানে ভবিষ্যতের কী ভয়ানক স্বপ্ন দেখছে লালু?’
মানবিক মূল্যবোধ ও সামাজিক উত্তরণে অপরিসীম আস্থা হাসান হাফিজুর রহমানের গল্পে। তাই তিনি তাঁর গল্পে নবতর জীবন জিজ্ঞাসাকে উন্মোচিত করেছেন। হেছা মুদ্দিনীনের জীবনের মাধ্যমে হাসান হাফিজুর রহমান সমগ্র বাংলাদেশের গ্রামের অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত জীবনাকেই চিত্রিত করেছেন। কিন্তু মার্কসবাদী চেতনালব্ধ বিশ্ব দৃষ্টির ফলে তিনি প্রত্যাশাদীপ্ত সম্ভাবনাময় জীবনেরেই ইঙ্গিত দিয়েছেন ।
‘নিজেকে আর নিছক একা মনে করে না সে, তার চেতনারই অংশিদার সারা গাঁ। দুটো একটা কথায় মুখের আভায় জাগ্রত হৃদয়ের উত্তাপ ঠিকরে পড়ে। এই সামান্য সময় টুকুর মাধ্যেই তাদের সাথে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছে সে।’ (বৌ/আরো দুটি মৃত্যু)
আলাউদ্দিন আল-আজাদ হাসান হাফিজুর রহমানের মতোই মার্কসীয় বস্তুনিষ্ঠ জীবন দর্শনে বিশ্বাসী মানবতাবাদী শিল্পী। তাঁর রচিত ‘জেগে আছি’, ‘ধান কন্যা’, ‘অন্ধকার সিঁড়ি’ প্রভৃতি গল্প গ্রন্থে গ্রামীণ জীবনের বিপন্ন রূপ বিক্রিত হলেও তা স্থায়ীত্ব লাভ করেনি। বরং অন্তিমে সম্ভবনাময় জীবনের ইঙ্গিত অভিব্যঞ্জিত হয়েছে।
বস্তুত রহমান, লালু, রূপায়ণ গেদু, রাঙলা, মজিদ, শুকুর, (শিষ ফোটার গান/ ধান কন্যা) শহীদ সেকান্দার শেখ ফরিদ প্রভৃতি চরিত্র চিত্রাণের মাধ্যমে আলাউদ্দিন আল আজাদ বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনের চিরায়ত সংগ্রামশীল রূপটিকে যেমন চিত্রিত করেছেন তেমনি ব্যক্তির সাথে সমাজের সম্পর্ক ও সংঘাতের স্বরূপটিকেও উন্মোচিত করেছেন।
চিরায়ত মানবতাবাদী মূল্যবোধই শওকত আলীর গল্পের মৌল বিষয়। তাই তার গল্পে চিত্রিত রমজান আলী সুখলাল, লাল মোহাম্মদ, কলিম উদ্দিন মন্তাজ আলী সামন্ত শোষণের বিরুদ্ধে প্রকাশ করেছে ক্ষোভ; করেছে প্রতিবাদ, আর না কান্দে মা গল্পে রমজান ও লাল মোহাম্মদের মনোভাবে গ্রামীণ জীবনের বিপন্নতার পাশাপাশি তাদের প্রতিবাদ প্রকাশিত হয়েছে।
কথা সাহিত্যে গ্রামীণ জীবন রূপায়ণে অদ্বিতীয় শিল্পী আবু ইসহাক (১৯২৬-২০০৩)। এ দিক থেকে তাঁর ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ অতুলনীয়। ছোট গলেপও তিনি সমাধিক সাফল্য লাভ করেছেন। তাঁর গল্পে গ্রামীণ জীবনের কূসংস্কার মহাজনী শোষণ জোতদারদের বিকৃত লালসা, অনাহার ক্লীষ্ট মানুষের হাহাকার চিত্রিত হয়েছে। ‘হারেম’, ‘মহাপতঙ্গ’ গ্রন্থ দুটি এর পরিচয় স্থান।
বস্তুত বাংলাদেশের ছোট গল্পে বিকাশমান একটি জাতির অন্তরঙ্গ ছবি ফুটে উঠেছে। সমকালীন মানুষের আবেগ, উত্তাপ, স্বপ্ন, আশা, সংগ্রাম, ব্যর্থতা, সফলতা, হতাশা নৈরাশ্য শোষণ বঞ্চনা দুঃখ বেদনা, জয়-পরাজয় রূপায়ণে বাংলাদেশের ছোটগল্প পালন করেছে প্রশংসনীয় ভূমিকা। তাই বলা যায় যে, বাংলাদেশের ছোটগল্প শুধু গল্পই থাকেনি হয়ে উঠেছে সমাজ তাত্ত্বিক ইতিহাসের চিত্র ভাষ্য।
ড. এ. আই. এম. মুসা
অধ্যাপক-বাংলা
+88 01713 211 910