
NTRCA সনেট: সনেটের বৈশিষ্ট্য ও স্বরূপ
প্রশ্ন : সনেট কাকে বলে? সনেটের বৈশিষ্ট্য ও স্বরূপ আলোচনা কর।
উত্তর: ‘সনেট’ (Sonnet) ইংরেজি শব্দ। এই শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে ইতালীয় Sonnetto শব্দ থকে। সনেটো শব্দের অর্থ হলো মৃদু ধূনি। এটি এক প্রকার মন্ময় কবিতা। কবি হৃদয়ের একটি অখণ্ড ভাব বা অনুভূতি যখন একটি বিশেষ পদবন্ধের মধ্য দিয়ে চতুর্দশ অক্ষর সমন্বিত চতুর্দশ চরণ দ্বারা বাণীমূর্তি লাভ করে, তখন তাকে সনেট বলে। সনেটের জন্ম দাতা হলেন ইতালীয় কবি পেত্রাক। ইংরেজি সাহিত্যে সিডনি, শেক্সপীয়ার, মিল্টন, ওয়ার্ডস ওয়ার্থ, কীটস, এলিজাবেথ ব্যারেট, ব্রাউনিং, ডি. জি. রসেটি, আর্নল্ড, রুপার্ট ব্রুক প্রভৃতি সুবিখ্যাত সনেট রচয়িতা।
সনেটে মোট চৌদ্দটি পঙক্তি থাকে। মাইকেল মধুসূদন দত্ত ১৪ অক্ষরই বাংলা সনেটের জন্য নির্ধারিত করে দিয়েছিলেন। আজ পর্যন্ত এই নিয়মই সনেট রচয়িতাগণ মেনে চলেছেন। সনেটের প্রথম আট পঙক্তিতে যে কল্পনার ইঙ্গিত করা হয়, তাকে অষ্টক বলা হয়। ইংরেজিতে একে বলে Octave বলা হয়। পরবর্তী যে ছয় পঙক্তিতে পূর্বোক্ত ভাবকল্পনার বিস্তৃতি সাধন বা ব্যাখ্যা করে, তাকে ষটক বলে। ইংরেজিতে একে Sestet বলে। অনেক কবি এই দুইটি বিভাগ না মেনে এই জাতীয় কবিতাকে একটি অখণ্ড কবিতামূর্তি দান করেন। অষ্টকের আট পঙক্তি আবার দুই ভাগে বিভক্ত। চার পঙক্তিতে সজ্জিত এর প্রত্যেকটি বিভাগকে চতুষ্ক (Quatrain) বলে। ষটকের তিন পঙক্তি সমন্বিত প্রত্যেক ভাগকে ত্রিপিকা বলে। তবে কবিতার আন্তর্বিভাজন যাই থাক না কেন, কবিকে মনে রাখতে হবে সমগ্র কবিতাটি যেন একটি অখণ্ড ভাবের দ্যোতনা করে।
সনেটের পঙক্তিগুলোর মিলর্বিন্যাসেও রয়েছে বিশিষ্টতা এবং বৈচিত্র্য। সাধারণত সনেটের পঙক্তির মিলবিন্যাস হয়ে থাকে - কখখক, কখখক, গঘঙ, গঘঙ অথবা কখখক, কখখক, গঘ, গঘ, গঘ। শেক্সপীয়ার এই সনাতন পন্থা মেনে চলেন নি। তবে মিল্টন ও ওয়ার্ডস ওয়ার্থ প্রায়শই ইতালীয়ান রীতি অনুসরণ করেছেন। শেক্সপীয়ারের সনেটের মিলবিন্যাস ছিল এরকম - কখ, কখ, গঘ, গঘ, চ, চ ছছ। তিনি অষ্টক ও ষটক বিভাগ মেনে চলেন নি।
অনেক সমালোচক মনে করেন সনেটে কবি আত্মজীবনীকথা বিবৃত করেন। সনেট মন্ময় বা ব্যক্তিগত কবিতা। কাজেই কথাটি একেবারে অমূলক নয়। কিন্তু আধুনিক কাব্যের মন্ময়তা এত ব্যাপক যে, যে কোনো বিষয় অবলম্বন করেই সনেট রচিত হতে পারে। তাই বিষয়ের দিক থেকে মিল্টন ও ওয়ার্ডস ওয়ার্থের সনেটকে বিচিত্রভাগে ভাগ করা যেতে পারে।
উল্লিখিত আলোচনা শেষে আমরা সনেটের কতিপয় বৈশিষ্ট চিহ্নিত করতে পারি। এগুলো হলো নিম্নরূপ :
(১) সনেট সাধারণত ১৪টি অক্ষরের সমন্বয়ে ১৪টি পঙক্তিতে রচিত হয়।
(২) এটি একটি মাত্র ভাবের দ্যোতনা করে।
(৩) অষ্টক ও ষটকের বিভাগ রক্ষা করা সনাতন রীতি হলেও শেক্সপীয়ারসহ অনেকেই এই রীতি মেনে চলেন নি।
(৪) সনেটের ভাবে গভীরতা ও ভাষায় ঋজুতা থাকবে।
(৫) বিশেষ নির্মাণ রীতি অনুসরণ করতে হয় বলে সনেটের স্বতঃস্ফূর্তি অন্যান্য গীতি কবিতার তুলনায় কম।
বাংলা সাহিত্যে সনেট রচয়িতার পথিকৃৎ হলেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত। তিনি বাংলা সনেটের আকৃতি ও মিলবিন্যাস নির্ধারিত করে দিয়েছিলেন। মধুসূদন রচিত সনেটগুলোর মধ্যে কপোতাক্ষ নদ, বঙ্গভাষা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। তাছাড়া আরো যাঁরা সনেট লিখে বাংলায় খ্যাতি অর্জন করেছেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন - রবীন্দ্রনাথ, প্রমথ চৌধুরী মোহিতলাল মজুমদার প্রমুখ।
ড. এ. আই. এম. মুসা
অধ্যাপক-বাংলা
+88 01713 211 910