
NTRCA শব্দালঙ্কার ও শব্দালঙ্কারের শ্রেণি বিন্যাস
প্রশ্ন : শব্দালঙ্কার কাকে বলে? শব্দালঙ্কারের শ্রেণি বিন্যাস কর। প্রতিটি শ্রেণি থেকে একটি করে উদারহণ দাও।
উত্তর: শব্দালঙ্কারের ভিত্তি হলো-শব্দ বা ধ্বনি। সুতরাং শব্দ বা ধ্বনিকে আশ্রয় করে যে অলঙ্কার সৃষ্টি হয় তাকে ‘শব্দালঙ্কার’ বলে। এখানে শব্দ বা ধ্বনিই মুখ্য। শব্দ বা ধ্বনিই বাক্যকে শ্রুতিমধুর ও সৌন্দর্য মণ্ডিত করে তুলে। যেমন-
ক) ফুলিয়া ফুলিয়া ফেনিল সলিল।
খ) কুলায় কাঁপিছে কাতর কপোত।
উল্লিখিত প্রথম ও দ্বিতীয় উদাহরণে যথাক্রমে ‘ফ’ ও ‘ক’ ধ্বনির আবর্তন বাক্যকে শ্রুতিমধুর ও সৌন্দর্য মণ্ডিত করে তুলেছে। শব্দলঙ্কার প্রধানত পাঁচ প্রকার। যথা- ১) অনুপ্রাস ২) যমক ৩) শ্লেষ ৪) বক্রোক্তি এবং ৫) পুনরুক্তবদাভাস।
ড. শুদ্ধসত্ত্ববসু উল্লিখিত পাঁচ প্রকার অলঙ্কার ছাড়াও ধ্বন্যুক্তি নামক আরেক প্রকার অলঙ্কারের কথা উল্রেখ করেছেন। নিচে উল্লিখিত শব্দালঙ্কারসমূহের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেয়া হলো।
১। অনুপ্রাস : বাক্যের মধ্যে যুক্ত বা বিযুক্তভাবে যদি কোন বর্ণ বা বর্ণগুচ্ছ একাধিকবার আবর্তিত হয়, তবে তাকে অনুপ্রাস বলে। অনুপ্রাস প্রধানত ছয় প্রকার । যথা :
ক) আদ্যানুপ্রাস খ) মধ্যানুপ্রাস গ) অন্ত্যানুপ্রাস ঘ) বৃত্ত্যনুপ্রাস ঙ) শ্রুত্যনুপ্রাস চ) ছেকানুপ্রাস।
নিচের উল্লিখিত অনুপ্রাসসমূহের পরিচয় দেয়া হলো-
ক) আদ্যানুপ্রাস : বাক্যের আদিতে যে অনুপ্রাস হয় তাই আদ্যানুপ্রাস। যেমন-
১) যাঁহা যাঁহা নিকসয়ে তনু তনু জ্যোতি।
তাঁহা তাঁহা বিজুরি চমকময় হোতি।
২) যতবার লেখা শুরু করি
ততবার ধরা পড়ে, এ খবর সহজ তো নয়।
খ) মধ্যানুপ্রাস : বাক্যের মধ্যে যে অনুপ্রাস সৃষ্টি হয় তাই মধ্যানুপ্রাস। যেমন-
১) শুধ বিঘে দুই ছিল মোর ভূইঁ আর সবি গেছে ঋণে। ২) চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা।
গ) অন্ত্যানুপ্রাস : একটি বাক্যের শেষ শব্দের সাথে অন্য বাক্যের শেষ শব্দের যে অনুপ্রাস হয়, তাই হলো অন্ত্যানুপ্রাস। যেমন-
১) চীর চন্দন হার উরে না দেলা।
সো অব নদী গিরি আঁতর ভেলা।
২) উচ্চ কণ্ঠে উঠির হাসিয়া।
তুচ্ছ ছলনা গেলা সে ভাসিয়া।
ঘ) বৃত্ত্যানুপ্রাস : একটি ধ্বনি দুই –এর অধিকবার বাক্যে আবর্তিত হলে যে অনুপ্রাস হয় তাই বৃত্ত্যানুপ্রাস। যেমন-
১) জাগে রথ রথী গজ অশ্ব পদাতিক
এখানে ‘জগ, ‘গ’, ‘র’ এবং ‘থ’ ধ্বনির আবর্তন হয়েছে।
২) কাক কালো কোকিল কালো কালো কন্যার কেশ।
‘ক’ ধ্বনি নয় বার আবর্তিত হয়েছে।
ঙ) শ্রুত্যানুপ্রাস: বর্ণ বা ধ্বনি স্বতন্ত্র হলেও শ্রুতিগত দিক থেকে যে অনুপ্রাস সৃষ্টি হয় তাই শ্রুত্যানুপ্রাস। যেমন-
১) বলে দাও মোর সারথিরে ডেকে
ঘোড়া বেছে নেয় ভালো ভালো দেখে।
২) তুমি শুয়ে রবে তে-তলার পরে আমরা রহিব নিচে
অথচ তোমারে দেবতা বলিব, সে ভরসা আজ মিছে।
চ) ছেকানুপ্রাস : দুই বা তার অধিক ব্যঞ্জন ধ্বনি যুক্ত বা বিযুক্ত হয়ে যে অনুপ্রাস সৃষ্টি করে তাই ছেকানুপ্রাস। যেমন-
১) লঙ্কার পঙ্কজ রবি যাবে অস্তাচলে। ২) অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ থাকে?
উল্লিখিত ছয় প্রকার অনুপ্রাস ছাড়াও আরো তিন প্রকার অনুপ্রাসের কথা কোন কোন আলঙ্কারিক বলে থাকেন। এগুলো হলো:
ক) সরলানুপ্রাস, খ) গুচ্ছানুপ্রাস ও গ) মালানুপ্রাস।
নিচে এদের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেয়া হলো:
ক) সরলানুপ্রাস : একটি বা দুটি বর্ণ একাধিকবার আবর্তিত হলে তাকে সরলানুপ্রাস বলে। যেমন:
১) রাজদণ্ড যত খণ্ড হয় তত তার দুর্বলতা, তত তার ক্ষয়।
‘ত’ ধ্বনির আটবার ধ্বনিত হয়েছে।
২) হবে সে সূর্যের সেবাদাসী
‘স’ ধ্বনি চারবার আবর্তিত হয়েছে।
খ) গুচ্ছানুপ্রাস : একাধিক ব্যঞ্জনবর্ণ বা ব্যঞ্জনবর্ণের গুচ্ছ ধারাবাহিকভাবে আবর্তিত হলে তাকে গুচ্ছানুপ্রাস বলে। যেমন:
১) নন্দ নন্দন চন্দ চন্দন
গন্ধ নিন্দিত –অঙ্গ।
যুক্ত ‘ন্দ’ ক্রমানুসারে পাঁচবার আবর্তিত।
২) মালঞ্চের চঞ্চল অঞ্চল
যুক্ত ‘ঞ্চ’ ধ্বনি ক্রমানুসারে তিনবার আবর্তিত।
গ) মালানুপ্রাস : অনুপ্রাসের মালা অর্থাৎ একাধিক অনুপ্রাস থাকলে তাকে মালানুপ্রাস বলে। যেমন:
১) আজন্ম সাধন-ধন সুন্দরী আমার
কবিতা কল্পনালতা।
২) কুসুম কুন্তলা মহী মুক্তমালা গলে।
লাটানুপ্রাস নামে আরেক প্রকার অনুপ্রাসের কথা আলঙ্কারিকগণ উল্লেখ করেছেন। তবে এর ব্যবহার বাংলায় অত্যন্ত কম।
২। যমক : একাধিক ব্যঞ্জনধ্বনি স্বরধ্বনিসহ নির্দিষ্টক্রমে সার্থক বা নিরর্থকভাবে যদি বাক্যের মধ্যে আবর্তিত হয়, তবে তাকে যমক বলে। প্রচলিত অলঙ্কার শাস্ত্রে চার ধরনের যমকের উল্লেখ আছে। এগুলো হলো- আদ্যযমক, মধ্যযমক, অন্ত্যযমক ও সর্বযমক।
নিচে উদাহরণ দেয়া হলো-
আদ্য যমক : ১) ভারত ভারত খ্যাত আপনার গুণে। ২) কীর্তিবাস র্কীর্তিবাস কবি /এ বঙ্গের লঙ্কার।
মধ্যযমক : ১) তোমার এ বিধি, বিধি, কে পারে বুঝিতে
২) দুরূহ বিরহকাল কাল যেন দেখি সমুখে।
অন্ত্যযমক : ১) বলরাম দাসে কর সাজাইয়া রাণী
নেহারে গোপাল-মুখ কাতর পরানি।
২) কবির রমণী বাঁধি কেশপাশ
বসি একাকিনী বাতায়ন পাশ।
সর্বযমক : ১) কান্তার আমোদপূণ কান্তসহকারে
কান্তার আমোদপূর্ণ কান্ত সহকারে।
৩। শ্লেষ : একটি শব্দ একবার মাত্র ব্যবহার করেও কবি যদি এর মধ্য দিয়ে ভিন্নার্থক ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করতে পারেন তবে তাকে শ্লেষ অলঙ্কার বলা হয়। শ্লেষ অলঙ্কার দুই প্রকার-
ক) সভঙ্গশ্লেষ ও খ) অভঙ্গশ্লেষ
নিচে এদের পরিচয় দেয়া হলো-
ক) সভঙ্গশ্লেষ : কবির ব্যবহৃত শব্দ ভেঙ্গে যদি ভিন্নার্থক ব্যঞ্জন পাওয়া যায়, তবে তাকে সভঙ্গ শ্লেষ বলে।
যেমন- জগৎটা কার বশ? (বগৎ টাকার বশ)
এখানে ‘টাকা’ শব্দকে ভাঙ্গে ‘টা’ এবং ‘কার’ হয়। ‘টা’ জগতের সঙ্গে মুক্ত করলে প্রশ্ন সূচক বাক্য তৈরি হয়। আর না ভাঙলে এর উত্তর হয়। তাই এটি সভঙ্গ শ্লেষের উদাহরণ।
খ) অভঙ্গ শ্লেষ : কবির ব্যবহৃত শব্দকে না ভেঙ্গেই যদি ভিন্নার্থক ব্যঞ্জনা পাওয়া যায় তবে তাকে অভঙ্গ শ্লেষ বলে। যেমন-
১) কে বলে ঈশ্বর গুপ্ত ব্যাপ্ত চরাচর
যাহার প্রভায় প্রভা পায় প্রভাকর?
২) অতিবড় বৃদ্ধপতি সিদ্ধিতে নিপুণ,
কোন গুণ নাই তার কপালে আগুন
কুকথায় পঞ্চমুখ কণ্ঠভরা বিষ,
কেবল আমার সঙ্গে দ্বন্দ্ব অহর্নিশ।
৪। বক্রোক্তি : এক অর্থে ব্যবহার করা শব্দকে যদি প্রশ্ন বা স্বর-বিকৃতির দ্বারা অন্য অর্থে সংযোজন করে ব্যাখ্যা করা হয় তবে বক্রোক্তি অলঙ্কার হয়। বক্রোক্তি অলঙ্কার দু ধরনের । যেমন-
ক) শ্লেষ বক্রোক্তি ও খ) কাকুবক্রোক্তি।
ক) শ্লেষ বক্রোক্তি :
প্রশ্ন : বিপ্র হয়ে সুরাসক্ত কেন মহাশয়? উত্তর: সুর না সেবিলে বল মুক্তি কিসে হয়?
এখানে প্রশ্নকর্তা ‘সুরাসক্ত’ বলতে মদে আসক্তি বুঝিয়েছেন কিন্তু উত্তর দাত্তা ‘সুর’কে দেবতা অর্থে ধরে উত্তর দিয়েছেনব। তাই এটি শ্লেষ বক্রোক্তির উদারহণ।
খ) কাকুবক্রোক্তি: ‘কাকু’ মানে স্বরভক্তি। বক্তা যখন উচ্চারিত কথায় কণ্ঠস্বরের বিশেষ ভঙ্গির সহায়তায় নিষেধাজ্ঞাত্মক বক্তব্যকে ইতিবাচক, আবার ইতিবাচক শব্দকে নিষেধাজ্ঞাত্মক অর্থে প্রকাশ করেন; তখন কণ্ঠস্বরের বিশেষ ভঙ্গির ওপর সৃষ্ট এই বক্রোক্তিকেই বলা যায় কাকুবক্রোক্তি। যেমন-
১) আমি কি ডরাই, সখি, ভিখারী রাঘবে?- না অর্থে ব্যবহৃত।
২) তুমি কি কেবলি ছবি, শুধু পটে লিখা?- না অর্থে ব্যবহৃত।
৫। পুনরুক্তবদাভাস : স্বাভাবিক দৃষ্টিতে যদি মনে হয় যে, বাক্যে একই অর্থে একাধিক শব্দ প্রয়োগ করা হয়েছে অথচ একটু মনোযোগ সহকারে বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায় যে, আসলে তারা ভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে- তখন সেখানে পুনরুক্তবদাভাস অলঙ্কার হয়। যেমন-
১) তনু দেহে রক্তাস্বর নীবী বন্ধে বাঁধা
চরণে নূপুরখানি বাজে আধা-আধা।
‘তনু’ ও ‘শরীর’ দুয়ের অর্থই দেহ। কিন্তু এখানে ‘তনু’ ছিপছিপে অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।
ড. এ. আই. এম. মুসা
অধ্যাপক-বাংলা
+88 01713 211 910