
NTRCA অর্থালঙ্কার ও অর্থালঙ্কারের শ্রেণিবিন্যাস
প্রশ্ন ২: অর্থালঙ্কার কাকে বলে? অর্থালঙ্কারের শ্রেণিবিন্যাস কর। প্রতিটি শ্রেণী থেকে একটি করে উদাহরণ দাও।
উত্তর: যে অলঙ্কার সম্পূর্ণরূপে বাক্যে ব্যবহৃত শব্দ বা শব্দাবলীর অর্থের উপর ভিত্তি করে সৃষ্টি হয়, তাকে অর্থালঙ্কার বলে। যেমন:
১) মুখ খানি তার
নতবৃন্ত পদ্মসম এ বক্ষে আমার
নামিয়া পড়িল ধীরে।
ক) কাকের চোখের মতো কালোচুল।
এখানে প্রথম উদাহরণে মুখের সাথে পদ্মের এবং দ্বিতীয় উদাহরণে কাকের চোখের সাথে চুলের তুলনা করা হয়েছে।
অর্থালঙ্কারে অর্থই প্রাধান্য পায়, অর্থই এখানে মুখ্য, শব্দধ্বনি এখানে গৌণ। এই জন্য এক শব্দের পরিবর্তে সমার্থক অন্য শব্দ প্রয়োগ করলেও অর্থাশ্রয়ী এই অলঙ্কারের আবেদন ক্ষুণ্ন হয় না। তবে শব্দালঙ্কারে যেহেতু শব্দই প্রধান, সেহেতু শব্দ পরিবর্তনে অলঙ্কারের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়।
অর্থালঙ্কারের শ্রেণি বিভাগ
শব্দার্থ যেহেতু বিচিত্র, সেই জন্য অর্থালঙ্কারের ব্যাপকতা অনেক বেশি। তাই অর্থালঙ্কারের শ্রেণীবিভাগ দুরূহ বিষয়। তবে তাদের শ্রেণিগত লক্ষণাদি বিচার করে অর্থালঙ্কারকে প্রধান পাঁচটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। এই পাঁচ শ্রেণির অলঙ্কারের আরো কতগুলো উপ-বিভাগ রয়েছে। এগুলো হলো নিম্নরূপ :
১) সাদৃশ্যমূলক অলঙ্কার : উপমা, উৎপ্রেক্ষা, রূপক, অপহ্নুতি, সন্দেহ, নিশ্চয়, ভ্রান্তিমান, ব্যতিরেক, প্রদীপ, সমাসোক্তি, অতিশয়োক্তি, দীপক, উল্লেখ, তুল্যযোগিতা, প্রতিবস্তুপমা, দৃষ্টান্ত, নির্দেশনা, স্মরণ, সামান্য, সহোক্তি ও অর্থশ্লেষ।
২) বিরোধমূলক অলঙ্কার : বিরোধাভাস, বিভাবনা, বিশেষোক্তি, বিষম, ব্যাঘাত, অসঙ্গতি, অধিক, অনুকূল ও অনোন্য।
৩) শৃঙখলামূলক অলঙ্কার : কারণমালা, মালাদীপক, একাবলী ও সার।
৪) ন্যায়মূলক অলঙ্কার : অর্থাপত্তি, অনুমান, উত্তর, কাব্যলিঙ্গ, তদগুণ, পর্যায়, পরিবৃত্তি, পরিসংখ্যা, সমুচ্চয়, সমাধি ও সামান্য।
৫) গূঢ়ার্থ-প্রতীতিমূলক অলঙ্কার : অর্থান্তরন্যাস, অপ্রস্তুত প্রশংসা, আক্ষেপ, উদাত্ত, ব্যাজস্তুতি, ব্যাজোক্তি, পর্যায়োক্ত, পরিকর, ভাবিক, স্বভাবোক্তি ও সূক্ষ্ম।
নিচের উল্লিখিত অলঙ্কারগুলোর প্রতিটি থেকে একটি করে উদাহরণ দেয়া হলো :
সাদৃশ্যমূলক অলঙ্কার
উৎপ্রেক্ষা : প্রবল সাদৃশ্যের জন্য যদি উপমেয়কে উপমান বরে সংশয় হয় তবে তাকে উৎপ্রেক্ষা বলে। উৎপ্রেক্ষা দু’প্রকার-
ক) বাচ্যোৎপ্রেক্ষা এবং
খ) প্রতীয়মানোৎপ্রেক্ষা।
ক) বাচোৎপ্রেক্ষা : যে উৎপ্রেক্ষায় সম্ভাবনাময় শব্দ (যেন, মনে হয়, বুঝি, মনে ইত্যাদি) উল্লেখ থাকে, তাকে বাচোৎপ্রেক্ষা বলে। যেমন-
১) “তার মধ্যে সীমান্ত খড়গের ধার জিনি
বলাহক মধ্যে যেন স্থির সৌদামিনী।”
২) ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়;
পূর্ণিমা চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।
খ) প্রতীয়মানোৎপ্রেক্ষা : যে উৎপ্রেক্ষায় সম্ভাবনা বাচক শব্দ ( যেন, মনে হয়, বুঝি ইত্যাদি) উল্লেখ থাকে না অথচ সম্ভাবনার ভাবটি স্পষ্ট থাকে তাকে প্রতীয়মান উৎপ্রেক্ষা বলে। যেমন-
১) লুটায় মেখলাখানি ত্যাজি কটি দেশ
মৌন অপমানে।
২) আগে পিছে পাঁচটি মেয়ে- পাঁচটি রঙের ফুল।
বিরোধমূলক অলঙ্কার
বিষম : যেখানে কারণ ও কার্যের মধ্যে বৈষম্য ঘটে, প্রত্যাশিত ফলের পরিবর্তে অবাঞ্চিত ফল আসে এবং একান্ত অসম্ভব ঘটনার মিলন হয়, সেখানে বিষম অলঙ্কার হয়। যেমন-
১) জুড়াইতে চন্দন লেপিল অহর্নিশ
বিধির বিপাকে তাহা হয়ে উঠে বিষ।
২)অমিয় সাগরে সিনান করিতে
সকলি গরল ভেল।
শৃঙখলামূলক অলঙ্কার
কারণমালা : যদি একটি কারণের কার্য পরবর্তী কার্যের কারণ হয় এবং এরকম একাধিক কার্যকারণ শৃঙখলাবদ্ধ হয়ে চলতে থাকে, তবে সেখানে কারণমালা অলঙ্কার হয়। যেমন-
১) লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু শাস্ত্রের বচন
অতএব কর সবে লোভ সম্বরণ।
এখানে ‘লোভ’ কারণের কার্য হচ্ছে ‘পাপ’ আবার এই পাপ হচ্ছে কারণ আর মৃত্যু হচ্ছে কার্য। সুতরাং এটি একটি সার্থক কারণমালার উদাহরণ।
২) বিদ্যা হতে জ্ঞান হয়, জ্ঞানের হয় ভক্তি,
ভক্তি হতে মুক্তি হয়, সেই সার যুক্তি।
‘বিদ্যা’ এই কারনের কাজ হলো ‘জ্ঞান’ কিন্তু পরে দেখা যাচ্ছে, জ্ঞান ভক্তি কাজের কারণ হয়ে দাড়িয়েছে। পরে আবার এইভক্তি মুক্তি কাজের কারণ হয়েছে।
ন্যায়মূলক অলঙ্কার
কাব্যলিঙ্গ বা হেতু : যদি কোন পদের, পদগুচ্ছের বা বাক্যের অর্থকে ব্যঞ্জনার সাহায্যে কোনো বর্ণনীয় বিষয়ের কারণ স্বরূপ দেখানো হয়, তবে তাকে কাব্যলিঙ্গ বা হেতু অলঙ্কার বলা হয়। এই কাব্যলিঙ্গ বা হেতু অলঙ্কারের ‘হেতু’টিকে কোনো হেতুবাচক শব্দে সরাসরি উল্লেখ করলে এর চমৎকারিত্ব থাকে না এবং অলঙ্কারও হয় না। এই জন্য হেতুটি বাচক শব্দে নির্দিষ্ট না হয়ে, নির্দেশিত হয় ব্যঞ্জনার সাহায্যে। যেমন :
১) সেই মূহূর্তেই জানিলাম মনে, নারী
আমি। যেই মুহূর্তেই প্রথমে দেখিনু
সম্মুখে পুরুষ মোর।
এইখানে চিত্রাঙ্গদার নারীসত্তার জাগরণের হেতু বীর্যবান অর্জুনের সাক্ষাৎকার। আর এই কারণটি এখানে ব্যঞ্জনায় আভাসিত হয়েছে।
গূঢ়ার্থ-প্রতীতিমূলক অলঙ্কার
ব্যাজস্তুতি : ‘ব্যাজ’ শব্দের অর্থ ছল বা কপটতা এবং ‘স্তুতি’ শব্দের অর্থ প্রশংসা। তাই নিন্দার মাধ্যমে প্রশংসা এবং প্রশংসার মাধ্যমে যদি নিন্দা প্রকাশ করা হয় এবং তা যদি কবির বর্ণনায় চমৎকারিত্ব লাভ করে তবে ব্যাজস্তুতি অলঙ্কার হয়। যেমন-
১) অতিবড় বৃদ্ধপতি সিদ্ধিতে নিপূণ
কোন গুণ নাই তার কপালে আগুন
২) “কি সুন্দর মালা আজি পরিয়াছ গলে,
প্রচেত :!
এখানে প্রথম দৃষ্টান্তে নিন্দার মাধ্যমে প্রশংসা এবং দ্বিতীয় দৃষ্টান্তে প্রশংসার মাধ্যমে নিন্দা প্রকাশ করা হয়েছে।
ড. এ. ্আই. এম. মুসা
অধ্যাপক-বাংলা
+88 01713 211 910