
ছোটগল্প কাকে বলে? ছোটগল্পের স্বরূপ ও বৈশিষ্ট্য
ছোটগল্প কাকে বলে? ছোটগল্পের স্বরূপ ও বৈশিষ্ট্য
সাহিত্যের আধুনিকতম এবং নবীনতম শাখা হলো ছোটগল্প। ইউরোপীয় শিল্পবিপ্লব-উত্তর পুঁজিবাদী জীবনের ভিত্তিভূমিতেই ছোটগল্পের উদ্ভব ঘটে। বর্তমানে সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় শাখা হলো ছোটগল্প। তবে এই জনপ্রিয় শিল্প-শাখাটির সংজ্ঞা স্বরূপ ও বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ অত্যন্ত দুঃসাধ্য ব্যাপার। বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্য, আকার-আকৃতি এবং স্বরূপগত বৈশিষ্ট্যই এর কারণ। তবে, এটা নিশ্চিত যে, ছোটগল্পকে ‘ছোট’ ও ‘গল্প’ হতে হয়। অর্থাৎ ছোটগল্পকে হতে হয় স্বল্প পরিসরের এবং একে গল্প হয়ে উঠতে হয়।
এখন প্রশ্ন হলো ছোটগল্প কতটুকু ছোট হবে? অর্থাৎ এই ছোটত্বের মাপকাঠি কী? আধুনিক সাহিত্যতাত্ত্বিকগণ এর কোন সীমারেখা টেনে দিতে নারাজ। বরং তাঁদের মতে তা নির্ভর করবে গল্পের বৈশিষ্ট্যের উপর। কেননা, এরকম দেখা গেছে যে, আধা পৃষ্ঠার গল্প ও ছোটগল্প আবার শত পৃষ্ঠার গল্পও ছোটগল্প। এই বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করেই অনেক সাহিত্যতাত্ত্বিক ছোটগল্পের সংজ্ঞা নিরূপণের প্রয়াস পেয়েছেন।
H. G. Wells ছোটগল্পের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছেন- ‘ছোটগল্প ১০ থেকে ৫০ মিনিটের মধ্যে শেষ হওয়া বাঞ্ছনীয়।’
অন্যদিকে E. A. Poe ছোটগল্পের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে প্রায় একই কথা বলেছেন- ‘যে গল্প আধা ঘণ্টা হতে দুই ঘণ্টার মধ্যে পড়ে শেষ করা যায় তাই ছোটগল্প’। E. A. Poe ছোটগল্পের স্বরূপ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আরো বলেন-
In the whole composition there should be no word written of which the tendency , direct or indirect , is not to the one pre established design........... undue brevity is just as exceptionable here as in the poem , but undue length is yet more to be avoided.
রুডিয়ার্ড কিপলিং ছোটগল্পের প্রকৃতি চিহ্নিত করতে গিয়ে বলেন-
‘ছোটগল্প চোরা লণ্ঠনের আলোর মত এক বিশেষ বস্তুর উপরই সে তার সমগ্র আলোকপাত কেন্দ্রীভূত রাখবে, অনাবশ্যক ব্যাপ্তিতে বিষয়টি ভারাক্রান্ত করে তুলবে না।’
মোটকথা ছোটগল্প ছোটও হবে আবার গল্পও হবে। সমগ্র মানব জীবন ছোটগল্পে উপস্থাপিত হবে না, কিন্তু জীবনের ক্ষুদ্র অংশের মধ্যেই সমগ্র জীবন প্রতিফলিত হবে। যাকে অনেকেই বলেছেন বিন্দুর মধ্যে সিন্দুর গভীরতা। তাই রবীন্দ্রনাথ ছোটগল্পের প্রকৃতি ও রীতি সম্বন্ধে তাঁর ‘সোনার তরী’ কাব্যের ‘বর্ষযাপন’ কবিতায় বলেন-
“ছোট প্রাণ, ছোট কথা ছোট ছোট দুঃখ ব্যথা
নিতান্তই সহজ সরল,
সহস্র বিস্মৃত রাশি প্রত্যেহ যেতেছে ভাসি
তারি দু’চারিটি অশ্রুজল,
নাহি বর্ণনার ছটা ঘটনার ঘন ঘটা,
নাহি তত্ত্ব নাহি উপদেশ,
অন্তরে অতৃপ্তি রবে সাঙ্গ করি মনে হবে
শেষ হ’য়ে হইল না শেষ।”
বস্তুত, ছোটগল্প আকারে ছোট বলে এতে জীবনের পরিপূর্ণ রূপ উপস্থাপিত হওয়া সম্ভব নয়। তবে, জীবনের খণ্ডাংশকে অবলম্বন করে গল্পকার যখন জীবনের পরিপূর্ণ রূপকে মূর্ত করে তোলেন তখন তা যথার্থ শিল্প হয়ে উঠে। আকারে ছোট বলে এখানে বহু ঘটনা সমাবেশ বা বহু চরিত্রের ভিড় সম্ভব নয়। এতে অনাবশ্যক কথা, অনাবশ্যক ভাষা, অনাবশ্যক চরিত্র ও ঘটনা প্রভৃতিকে নিষ্ঠুর ভাবে বর্জন করে গল্পকার শুধু একটি রসঘন নিবিড় মহূর্তের one pre-established design এর জয়োল্লাস পরিকল্পনায় মগ্ন থাকেন।
ছোটগল্পের শুরু ও শেষ নাটকীয় হওয়া বাঞ্ছনীয়। অল্প কিছু নির্বাচিত ঘটনার মাধ্যমে ইঙ্গিতপূর্ণ পরিণতি অর্জনই ছোটগল্পের উদ্দেশ্য। বিশেষ করে সারাটি গল্পে লেখকের যে মানস স্পর্শ থাকে তাই তাকে গীতি-কাব্যোচিত মাধুর্য দান করে। উপন্যাস ও নাটকে পরিণতি যেখানে স্পষ্ট, ছোটগল্পে পরিণতি সেখানে ইঙ্গিতপূর্ণ। মোটকথা, নিগুঢ় ব্যঞ্জনাই ছোটগল্পের সার্থকতা।
ছোটগল্প সম্পূর্ণভাবে লেখকের সচেতন শিল্পীমনের সৃষ্টি। এটি সৃষ্টির সময় লেখককে এর গঠনরীতি, বিষয়বস্তু, সংলাপ, পরিবেশ, বাণীভঙ্গি প্রভৃতির দিকে লক্ষ রাখতে হয়। অর্থাৎ উল্লিখিত বিষয়গুলোর যথাযথ সন্নিবেশই উৎকৃষ্ট ছোটগল্পের প্রাক শর্ত। তবে এই গুলোর জন্য কোন সীমারেখা টেনে দেয়া যায় না। এখানে লেখক পাঠকের বুদ্ধিবৃত্তি, অনুভূতি অথবা অন্তরতম প্রদেশের মানবীয় আবেদনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকেন।
শিল্প-সফল ছোটগল্প সৃষ্টির উদ্দেশ্যে লেখককে সবসময় রস-নিষ্পত্তির (Unity of effect) দিকে লক্ষ রাখতে হয়। আর এর জন্য গল্পকারককে যে কোন অবান্তর কাহিনী , ঘটনা, চরিত্র ইত্যাদি বর্জন করতে হয়।
ছোটগল্প কতগুলো উপাদান ও বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠবে। এগুলো হলো- কাহিনী বা বিষয় , চরিত্র, বর্ণনা্ এবং ভাষা। এখন প্রশ্ন ছোটগল্পের বিষয় কী হবে? এর উত্তরে বলা যায়-প্রায় সমস্ত বিষয় নিয়েই ছোটগল্প রচিত হতে পারে। তবে এই বিষয় নিবার্চনে গল্পকারকে অবশ্যই সময়, সমাজ ও মানবজীবন ঘনিষ্ট হতে হবে। মানব জীবন ও সমাজের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়, এমন বিষয় ছোটগল্পের বিষয় হতে পারবে না। ছোটগল্পের দ্বিতীয় উপাদান হলো চরিত্র নির্বাচনে ছোটগল্পকারকে বেশ সতর্ক হতে হয়। ছোটগল্পের পরিসর ক্ষুদ্র হওয়ায় চরিত্র সৃষ্টিতে গল্পকারকে হতে হয় বেশ সংযমী। তাছাড়া চরিত্রই যেহেতু গল্পকারের শৈল্পিক বোধ প্রকাশের একমাত্র উপায় সেহেতু চরিত্র সৃষ্টিতে গল্পকারকে মেনে চলতে হয় শৈল্পিক সীমা।
বর্ণনার প্রশ্নেও গল্পকারকে বেশ সংযমী হতে হয়। ছোটগল্পের পরিসর ছোট হওয়ায় এতে কোন প্রকার অতিকথনের সুযোগ নেই। লেখক তাঁর অভিব্যক্তি প্রকাশের জন্য শুধু প্রয়োজনীয় শব্দমালার সুবিন্যস্ত বর্ণনার আশ্রয় নেবেন। যা হবে অভিব্যক্তির ব্যঞ্জনাময় প্রকাশ। আর এই প্রকাশের মাধ্যমই হলো ভাষা। ছোটগল্পের ভাষা হবে সংযত, সংহত এবং মার্জিত এবং সেই ভাষা হবে গদ্য। মোটকথা ছোটগল্পের সবগুলো উপাদানের সংহত, সংযত এবং সংযমী বিন্যাসই একটি গল্পকে যথার্থ ছোটগল্পে পরিণত করতে পারে।
সুতরাং উপরের আলোচনা থেকে আমরা বলতে পারি যে, ছোটগল্প মানবজীবনের গভীরতর রহস্য ভেদ করতে চায় না, জীবনের বিরমাহীন স্রোতে ক্ষণপ্রাণ ও ক্ষণবলিয়ান যে তরঙ্গ উঠছে পড়ছে এবং ভাঙছে - লেখক তাকেই স্থির দৃষ্টিতে নিরীক্ষণ করেন। এতে নাটক, উপন্যাস বা মাহকাব্যের বিস্তৃতি নেই। জীবিনের খন্ডরূপ এখানে একটি বিশেষ রূপে দেখা দেয়। এ রকম সৃষ্টিকে সার্থক করে তোলার জন্য লেখক গল্পের উপাদাসমূহকে একটি মাত্র রসপরিণামমুখী করে তোলেন। আর এর মধ্য দিয়েই একটি গল্প সার্থক ছোটগল্পের অভিধা লাভ করে।
ড. এ. আই. এম. মুসা
অধ্যাপক বাংলা
www.onlinereadingroombd.com
+88 01713 211 910