
NTRCA বিভিন্ন অলঙ্কার এবং এদের পরিচয়
প্রশ্ন : উদাহরণসহ উপমা, উৎপ্রেক্ষা, ব্যাজস্তুতি, অপহ্নুতি, ব্যতিরেক, বিষম, কারণ মালা, সন্দেহ, অনুপ্রাস ও শ্লেষ অলঙ্কারের পরিচয় দাও।
উত্তর: নিচে উপমা, উৎপ্রেক্ষা, ব্যাঞ্জন্ততি, অপহ্নুতি, ব্যতিরেক, বিষম, কারণ মালা, সন্দেহ, অলঙ্কারের পরিচয় দেয়া হলো।
উপমা
যে অলঙ্কারে সমগুণ বিশিষ্ট ভিন্ন জাতীয় দুই বস্তুর মধ্যে সাদৃশ্য দেখানো হয়: তাকে উপমা বলে। যেমন-“পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন।” এখানে পাখির বাসার সাথে চোখের তুলনা করা হয়েছে।
উপমাকে প্রধানত ছয় ভাগে ভাগ করা হয়। এগুলো হলো-
ক) পুর্ণোপমা, খ) লুপ্তোপমা গ)মালোপমা
ঘ)বস্তুপ্রতিবস্তুভাবের উপমা, ঙ)বিশ্ব-প্রতিবিম্বভাবের উপমা এবং চ) স্মারণোপমা।
ক) পূর্ণোপমা : যে উপমায় উপমেয়, উপমান, তুলনাবাচক শব্দ ও সাধারণ ধর্ম-এ চারটি অবয়বই স্পষ্ট উল্লেখ থাকে, তাকে পূর্ণোপমা বলে। যেমন-
১)মুখখানি তার
নতবৃন্ত পদ্মসম এ বক্ষে আমার
নামিয়া পড়িল ধীরে।
২) কাকের চোখের মতো কালোচুল।
এখানে প্রথম উদাহরণে উপমেয়-মুখখানি: উপমান-পদ্ম; সাধারণ ধর্ম-নত হওয়া এবং তুলনাবাচক শব্দ হচ্ছে সম। দ্বিতীয় উদাহরণে উপমেয়-চুল; উপমান-কাকের চোখ; তুলনাবাচক শব্দ মতো; সাধারণধর্ম কালো।
খ) লুপ্তোপমা : যে উপমায় উপমেয় ব্যতীত অন্য তিনটি গুণের যে কোন একটি, দুটি বা তিনটিই অনুপস্থিত থাকে, তাকে লুপ্ত উপমা বলে। যেমন-
১) মরণে রে, তুহুঁ মম শ্যাম সমান।
এই উপমায় সাধারণ ধর্ম লুপ্ত।
২) মেঘলা দিনে দেখেছিলাম মাঠে
কালো মেয়ের কালো হরিণ চোখ।
এই উপমায় উপমান ও তুলনাবাচক শব্দ অনুপস্থিত।
গ) মালোপমা: যে উপমায় একটি উপমেয়ের একাধিক উপমান থাকে, তাবে মালোপমা বলে। যেমন-
১) উড়ে হোক ক্ষয়
ধুলিসম, তৃণসম, পুরাতন বৎসরের যত
নিষ্ফল সঞ্চয়।
এখানে উপমেয় পুরাতন বৎসরের সঞ্চয়। উপমান হলো দুটি-ধূলি ও তৃণ।
২) আমার হৃদপিণ্ডের যতো
আমার সত্তার মত
আমার অজানা স্নায়ূতন্ত্রী মত
সর্বক্ষণ সত্য আমার দেশ।
এখানে উপমেয় দেশ। এর সাথে হৃদপিন্ড, সত্তা ও স্বায়ুতন্ত্রী এই তিনটি উপমানের মালা গাঁথা হয়েছে। আর এ জন্যই এটি মালোপমা।
ঘ) বস্তু প্রতিবস্থু ভাবের উপমা: এ উপমায় সাধারণ ধর্মবাচক শব্দটি ভিন্ন ভাষায় প্রকাশিত হয়। যেমন-
১) ঔই সবুজ স্বচ্ছ জল
সাপের চিকন দেহের মতো।
এখানে উপমেয় ‘জল’; উপমান ‘সাপের দেহ’; তুলনাবাচক শব্দ- ‘মতো’ এবং সাধারণ ধর্ম ‘সবুজ স্বচ্ছ’ ও ‘চিকন’ ভিন্ন ভাষা কিন্তু ঝকঝকে।
ঙ) বিম্ব-প্রতিবিম্ব ভাবের উপমা : এই উপমায় উপমেয় ও উপমানের ধর্ম সম্পূর্ণ ভিন্ন হলেও এদের মধ্যে সূক্ষ্ম সাদৃশ্য অনুভূত হয়। যেমন-
১) আগুণে যেমন সব বিষ যায়,
প্রেমেও তেমনি সকলি শুচি।
উপমেয় ‘আগুন’; উপমান ‘প্রেম’। আগুন যেমন সবকিছুকে পুড়িয়ে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, তেমনি প্রেম হৃদয়ে ‘আগুন জ্বেলে’ সমস্ত পঙ্কিলতাকে বিনষ্ট করে নিজের মহিমা প্রকাশ করে, এ গভীরতর ক্ষমতা পরস্পরের সাদৃশ্য করে বিম্ব-প্রতিবিম্বভাবের সাধারণ ধর্মে পরিণত হয়েছে।
চ) স্মরণোপমা : কোন বস্তু বা বিষয়ের অনুভব থেকে যদি সে রকম অন্য কোন বস্তুর স্মৃতি জাগে তবে তাকে স্মরণোপমা বলে। যেমন-
১) কাল জল ঢালিতে সই কালা পড়ে মনে
নিরবধি দেখি শয়নে স্বপনে।।
কাল কেশ এলাইয়া বেশ নাহি করি
কাল অঞ্জন আমি নয়নে না পরি।
‘জল’, ‘কেশ’, ‘অঞ্জন’ দেখে কালা তথা কৃষ্ণকে মনে পড়ে রাধার। আর এই মনে পড়ার কারণ বর্ণগত সাদৃশ্য। এটি স্মরণ উপমা এই জন্য যে, এখানে উপমেয় ‘কালা’, ‘উপমান ‘জল’, ‘কেশ’, ‘অঞ্জন’ এবং সাধারণ ধর্ম ‘কাল’।
উৎপ্রেক্ষা
উৎপ্রেক্ষা : প্রবল সাদৃশ্যের জন্য যদি উপমেয়কে উপমান বলে সংশয় হয় তবে তাকে উৎপ্রেক্ষা বলে। উৎপ্রেক্ষা দু’প্রকার-
ক) বাচ্যেৎপ্রেক্ষা এবং
খ) প্রতীমানোৎপ্রেক্ষা।
ক) বাচোৎপ্রেক্ষা : যে উৎপ্রেক্ষায় সম্ভাবনাময় শব্দ ( যেন, মনে হয়, বুঝি, মনে ইত্যাদি) উল্লেখ থাকে, তাকে বাচ্যেৎপ্রেক্ষা বলে। যেমন-
১) “তার মধ্যে সীমান্ত খড়গের ধার জিনি
বলাহক মধ্যে যেন স্থির সৌদামিনী।”
২) ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়;
পূর্ণিমা চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।
খ) প্রতীয়মানোৎপ্রেক্ষা : যে উৎপ্রেক্ষায় সম্ভাবনা বাচক শব্দ (যেন, মনে হয়, বুঝি ইত্যাদি) উল্লেখ থাকে না অথচ সম্ভাবনার ভাবটি স্পষ্ট থাকে তাকে প্রতীয়মান উৎপ্রেক্ষা বলে। যেমন-
১) লুটায় মেখলাখানি ত্যাজি কটি দেশ
মৌন অপমানে।
২) আগে পিছে পাঁচটি মেয়ে- পাঁচটি রঙের ফুল।
অপহ্নুতি
অপহ্নুতি : উপমেয়কে ‘অপহ্নব’ বা অস্বীকার করে যদি উপমানকে উজ্জ্বলভাবে প্রকাশ করা বা প্রতিষ্ঠা করা হয়, তবে তাকে অপহ্নুতি অলঙ্কার বলে। যেমন-
১) চোখে চোখে কথা নয় গো- আগুনে আগুনে কথা
এখানে ‘চোখ’ উপমেয়, এবং ‘আগুন’ উপমান। চোখকে উপেক্ষা করে আগুন প্রভাব বিস্তার করেছে, তাই ‘আগুনে আগুনে কাথা’। চোখকে অপহ্নব বা অস্বীকার করা হয়েছে বলে এটি অপহ্নুতি অলঙ্কার।
২) মেয়ে তো নয় হলদে পাখির ছা।
এখানে ‘নয়’ শব্দ দিয়ে উপমেয় ‘মেয়ে’ শব্দকে অপহ্নব বা অস্বীকার করা হয়েছে। তাই এটি অপহ্নুতি অলঙ্কারের উদাহরণ।
সন্দেহ
সন্দেহ : উপমান ও উপমেয় দু’টোতেই যদি সংশয় বা সন্দেহ জাগ্রত হয়, তবে সন্দেহ অলঙ্কার হয়। যেমন-
১) অর্জুন। কাহারে হেরিনু? সে কি সত্য, কিম্বা মায়া?
এখানে উপমেয় ও উপমান উভয়ের উপরই সন্দেহ আরোপ করা হয়েছে। আর এই জন্য এইটি সন্দেহ অলঙ্কার।
২) আমি এখানে সত্যি বেঁচে আছি? নাকি জীবন্মৃত?
এখানে অনিশ্চিত অস্তিত্বের দ্বান্দ্বিক উপলব্ধতিতে প্রশ্নাকারে ব্যক্ত হয়েছে সন্দেহের বীজ। আর এর মধ্য দিয়েই সন্দেহ অলঙ্কারের বাতাবরণটি তৈরি হয়েছে।
ব্যতিরেক
ব্যতিরেক : উপমান অপেক্ষা উপমেয় উৎকর্ষ বা অপকর্ষ হিসাবে উপস্থিত হলে ব্যতিরেক অলঙ্কার হয়। যেমন-
১) কিমতে বোলিব ভাল তুলনা মৃগাঙ্ক
সকলঙ্ক চন্দ্রিমা ললাট নিষ্কলঙ্ক।
এখানে উপমেয়-‘ললাট’, উপমান চন্দ্র। চন্দ্র কলঙ্ক যুক্ত কিন্তু ললাট নিষ্কলঙ্ক, সুতরাং উৎকৃষ্ট। তাই এইটি ব্যতিরেক অলঙ্কার।
বিষম
বিষম : যেখানে কারণ ও কার্যের মধ্যে বৈষম্য ঘটে, প্রত্যাশিত ফলের পরিবর্তে অবাঞ্চিত ফল আসে এবং একান্ত অসম্ভব ঘটনার মিলন হয়, সেখানে বিষম অলঙ্কার হয়। যেমন-
১) জুড়াইতে চন্দন লোপিল অহর্নিশ
বিধির বিপাকে তাহা হয়ে উঠে বিষ।
২) আমিয় সাগরে সিনান করিতে
সকলি গরল ভেল।
ভ্রান্তিমান
ভ্রান্তিমান : গভীরতর সাদৃশ্যের কারণে যদি এক বস্তুকে অন্য বস্তু বলে ভুল হয় এবং সে ভুল যদি কবির বর্ণনায় চমৎকারিত্ব লাভ করে তবে তাকে ভ্রান্তিমান অলঙ্কার বলে। যেমন-
১) পদপরশনে রেণু রক্তবর্ণ হয়
সিন্দুর বলিয়া কুল রমণী পরয়
২) আঁখি তারা দুটি বিরলে বসিয়া
সৃজন করেছে বিধি
নীলপদ্ম ভাবি লুব্ধ ভ্রমরা
ছুটিতেছে নিরবধি
ব্যাজস্তুতি
ব্যাজস্তুতি : ‘ব্যাজ’ শব্দের অর্থ ছল বা কপটতা এবং ‘স্তুতি’ শব্দের অর্থ প্রশংসা। তাই নিন্দার মাধ্যমে প্রশংসা এবং প্রশংসার মাধ্যমে যদি নিন্দা প্রকাশ করা হয় এবং তা যদি কবির বর্ণনায় চমৎকারিত্ব লাভ করে তবে ব্যাজস্তুতি অলঙ্কার হয়। যেমন-
১) অতিবড় বৃদ্ধপতি সিদ্ধিতে নিপুণ
কোন গুণ নাই তার কপালে আগুন
২) “কি সুন্দর মালা আজি পরিয়াছে গলে,
প্রচেত:!
এখানে প্রথম দৃষ্টান্তে নিন্দার মাধ্যমে প্রশংসা এবং দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত প্রশংসার মাধ্যমে নিন্দা প্রকাশ করা হয়েছে।
রূপক
রূপক : উপমান উপমেয়ের তুলনা করতে গিয়ে যখন তাদের মধ্যে অভেদ কল্পনা করা হয়, তখন রূপক অলঙ্কার হয়। এমন ভাবে অভেদ কল্পনা করা হয় যাতে মনে হয় উপমান ও উমমেয়ের মধ্যে কোনো তফাৎ নেই । তবে এই পার্থক্য না থাকাটা কাল্পনিক। মোটকথা একের রূপ অন্যের উপর আরোপ করা হয় বলে এই অলঙ্কারের নাম হয়েছে রূপক অলঙ্কার।
কবি বর্ণনায় এবং কল্পনা-বৈচিত্র্যে রূপক অলঙ্কার চার প্রকার। যথা-
ক) নিরঙ্গ রূপক খ) সাঙ্গ রূপক
গ) পরস্পরিত রূপক ঘ) অধিকারূঢ় বৈশিষ্ট্য রূপক।
নিচের উল্লিখিত চার প্রকার রূপকের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেয়া হলো-
ক) নিরঙ্গ রূপক : এই রূপকের আরেক নাম সাধারণ রূপক। এই রূপকে একটি মাত্র উপমেয় ও একটি উপমানের অভেদ বোঝায়। যেমন-
১) আসল কথাটা চাপা দিতে ভাই
কাব্যের জাল বুনি--------
২) জীবন-সিন্ধু মথিয়া যে কেহ আনিবে অমৃত –বারি।
খ) সাঙ্গ রূপক : উপমান ও উপমেয়ের অভেদ আরোপের সঙ্গে সঙ্গে যদি এদের অঙ্গগুলোরও অনুরূপ অভেদ দেখানো হয়, তবে সাঙ্গ রূপক অলঙ্কার হয়। যেমন-
১) শোকের ঝড় বহিল সভাতে!
সুর সুন্দরীর রূপে শোভিল চৌদিকে
বামাকুল; মুক্তকেশ মেঘমালা; ঘন
নিশ্বাস প্রলয় বায়ু; অশ্রু বারিধারা
আসার; জীমূতমন্দ্র হাহাকার রব। -মধুসূদন
গ) পরস্পরিত রূপক : যখন একটি উপমান উপমেয়ের আরোপ আরেকটি উপমান উপমেয়ের আরোপের কারণ হয়, তখন যে রূপক হয় তাকে পরস্পরিত রূপক বলে। যেমন-
১) তুমি রবি, তব তাপে শুকাইয় যায়
করুণা নীহারবিন্দু ---নজরুল।
এখানে ‘তুমি’ দারিদ্রকে বোঝানো হয়েছে এবং সূর্য বা রবির সাথে রূপক করার ফরে করুণাকে ‘নীহারবিন্দু’ বলে রূপক করা হয়েছে।
২) রাতের পাহাড় থেকে
খসে যাওয়া পাথরের মতো
অন্ধকার ধসে ধসে পড়ছে-----আহসান হাবীব।
এখানে রাতকে পাহাড় বলে রূপক করার জন্য অন্ধকারকে পাথরের রূপক করা হয়েছে এবং উপমান পাথরের অনুগামী হয়েছে-‘ধসে ধসে পড়ছে’।
ঘ) অধিকারূঢ় বৈশিষ্ট্য রূপক: উপমানে যদি কোনো বিশেষ বা অসম্ভব গুণ আরোপ করা হয় এবং ঐ বিশেষ গুণযুক্ত উপমানকে যদি উপমেয়ের উপর অভিন্নভাবে স্থাপিত করে রূপক সৃষ্টি করা হয়, তখন সেই রূপককেই অধিকারূঢ় বৈশিষ্ট্য রূপক বলা হয়। যেমন-
১) নাহি কালদেশ তুমি অনিমেষ মুরতি-
তুমি অচপল দামিনী। --------রবীন্দ্রনাথ
দামিনী বা বিদ্যুতে অচপল ধর্ম আরোপ অবাস্তব। তাই এখানে অধিকারূঢ় বৈশিষ্ট্য রূপক হয়েছে।
সমাসোক্তি: সমান কাজ ও সমান বিশেষণ দ্বারা প্রস্তুত বিষয়ের উপর অপ্রস্তুত বিষয়ের ব্যবহার আরোপিত হলে যে অলঙ্কার হয়, তাকে সমাসোক্তি অলঙ্কার বলা হয়। অন্যকথায় বিষয়ের উপর বিষয়ীর ব্যবহার সমারোপিত হলে সমাসোক্তি অলঙ্কার হয়। সহজ কথায় সমাসোক্তি অলঙ্কার হলো-নির্জীব বা অচেতন উপমেয়ের উপর সজীব বা সচেতন উপমানের কাজ বা গুণ আরোপ করা। যেমন-
১) পর্বত চাহিল হতে বৈশাখের নিরুদ্দেশ মেঘ।
এখানে নিশ্চল পর্বতে চলিষ্ণু মেঘের গতিময়তা আরোপ করা হয়েছে।
২) আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ঐ।
এখানে পাহাড়ের উপর মানবীয় গুণের বৈশিষ্ট্য আরোপ করা হয়েছে।
রূপক ও সমাসোক্তি অলঙ্কার দু’টি এক মনে হলেও প্রকৃত পক্ষে দু’টি এক নয়। কারণ, রূপকে উপমান নিজেই উপমেয়ের উপর আরোপিত হয়। অন্যদিকে সমাসোক্তি অলঙ্কারে উপমেয়ের উপর উপমানের কার্য, প্রকৃতি ও ব্যবহার আরোপিত হয়। রূপকে উপমান নিজের রূপের আরোপে উপমেয়কে আচ্ছন্ন করে ফেলে। কিন্তু সমাসোক্তিতে উপমান নিজের ব্যবহার, আচরণ বা স্বভাব দ্বারা উপমেয়কে ব্যঞ্জনাপূর্ণ করে তুলে।
অনেক আলঙ্কারিক ইংরজি Personification বা Pathetic Fallacy-র সাথে সমাসোক্তিকে এক করে দেখেছেন। কিন্তু এই দুটি অলঙ্কার আসলে এক নয়। কারণ বর্ণনীয় চেতন, অচেতন, মানুষ কিংবা অন্য কোনো প্রাণী যাই হউক না কেন, তার উপর অন্য যে কোন বস্তুর স্বভাব আরোপ করলেই সমাসোক্তি অলঙ্কার হতে পারে। অন্যদিকে Personification h¡ Pathetic Fallacy-বলতে বোঝায় অপ্রাণীর উপর মানবীয় সংবেদনা বা অনুভবের আরোপ।
কারণমালা: যদি একটি কারণের কার্য পরবর্তী কার্যের কারণ হয় এবং এরকম একাধিক কার্যকারণ শৃঙখলাবদ্ধ হয়ে চলতে থাকে, তবে সেখানে কারণমালা অলঙ্কার হয়। যেমন-
১) লোভে পাপ পাপে মৃত্যু শাস্ত্রের বচন
অতএব কর সবে লোভ সম্বরণ।
এখানে ‘লোভ’ কারণের কার্য হচ্ছে ‘পাপ’ আবার এই পাপ হচ্ছে কারণ আর মৃত্যু হচ্ছে কার্য। সুতরাং এটি একটি সার্থক কারণমালার উদাহরণ।
২) বিদ্যা হতে জ্ঞান হয়, জ্ঞানে হয় ভক্তি,
ভক্তি হতে মুক্তি হয়, সেই সার যুক্তি।
‘বিদ্যা’ এই কারণের কাজ হলো- ‘জ্ঞান’ কিন্তুপরে দেকা যাচ্ছে, জ্ঞান ভাক্তি কাজের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরে আবার এইভক্তি মুক্তি কাজের কারণ হয়েছে।
বিরোধাভাস: যেখানে আপাতদৃষ্টিতে দুটো বস্তুর মধ্যে বৈপরীত্য বা বিরোধের ভাব স্পষ্ট; অথচ তাৎপর্য বিশ্লেষণে কিংবা সূক্ষ্ম বিচারে সে কবিকল্পিত মনোহর-বিরোধের অবসান ঘটে, সেখানে হবে বিরোধাভাস বা বিরোধ অলঙ্কার। যেমন-
১) ভবিষ্যতের লক্ষ আশা মোদের মাঝে সন্তরে
ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুদের অন্তরে।---- গোলাম মোস্তফা।
‘শিশুদের অন্তরে’ শিশুর পিতা ঘুমিয়ে আছে, আপাত বিরোধী বক্তব্য। কিন্তু "Child is the father of the man এ সত্যে বিরোধের অবসান।
কাব্যলিঙ্গ বা হেতু : যদি কোন পদের, পদগুচ্ছের বা বাক্যের অর্থকে ব্যঞ্জনার সাহায্যে কোনো বর্ণনীয় বিষয়ের কারণ স্বরূপ দেখানো হয়, তবে তাকে কাব্য লিঙ্গ বা হেতু অলঙ্কার বলা হয়। এই কাব্যলিঙ্গ বা হেতু অলঙ্কারের ‘হেতু’টিকে কোনো হেতুবাচক শব্দে সরা সরি উল্লেখ করলে এর চমৎকারিত্ব থাকে না এবং অলঙ্কারও হয় না। এই জন্য হেতুটি বাচক শব্দে নির্দিষ্ট না হয়ে, নির্দেশিত হয় ব্যঞ্জনার সাহায্যে। যেমন:
১) সেই মুহূর্তেই জানিলাম মনে, নারী
আমি। সেই মুহূর্তেই প্রথমে দেখিনু
সম্মুখে পুরুষ মোর।
এইখানে চিত্রাঙ্গদার নারীসত্তার জাগরণের হেতু বীর্যবান অর্জুনের সাক্ষাৎকার। আর এই কারণটি এখানে ব্যঞ্জনায় আভাসিত হয়েছে।
ড. এ. আই. এম. মুসা
অধ্যাপক-বাংলা
+88 01713 211 910