
NTRCA অর্থালঙ্কার এবং অর্থালঙ্কারের বৈশিষ্ট্য
প্রশ্ন ৫ : অর্থালঙ্কার কাকে বলে? অর্থালঙ্কারের বৈশিষ্ট্য আলোচনা কর।
উত্তর: আলঙ্কারিকদের মতে, যা বাক্যকে সৌন্দর্যমন্ডিত করে তুলে তাই অলঙ্কার। তাঁরা এ অলঙ্কারকে প্রধানত দু’শ্রেণীতে বিভক্ত করেছেন। এগুলো হলো- শব্দালঙ্কার ও অর্থালঙ্কার। নিচে অর্থালঙ্কারের সংজ্ঞা ও বৈশিষ্ট্য আলোচনা করা হলো-
যে অলঙ্কার অর্থ-বৈচিত্র্য দ্বারা বাক্যের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে, তাকে অর্থালঙ্কার বলে। অন্যকথায়, যে অলঙ্কার একান্তভাবে বাক্যে ব্যবহৃত শব্দ বা শব্দাবলীর অর্থের আশ্রয় গ্রহণ করে সৃষ্ট হয়, তাকে অর্থালঙ্কার বলে। যেমন:
‘মরণ রে, তুঁহু মম শ্যাম সমান।’
এখানে মরণকে শ্যামের সাথে তুলনা করে একধরনের ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করা হয়েছে।
অর্থালঙ্কারের বৈশিষ্ট্য :
১। অর্থালঙ্কারের শব্দ ও ধ্বনি গৌণ, অর্থই প্রথম এবং প্রধান। এ জন্য এক শব্দের পরিবর্তনে সমার্থক আলাদা শব্দ প্রয়োগ করলেও অর্থাশ্রয়ী এ অলঙ্কারের আবেদন ক্ষুণ্ণ হয় না। যেমন : রবীন্দ্রনাথের ‘বসুন্ধরা’ কবিতায় আছে-
‘অনন্ত আকাশে
অনিমেষ জেগে থাকে নিদ্রাতন্দ্রাহত
শূন্যশয্যা মৃতপুত্রা জননীর মতো।’
এখানে উল্লিখিত উদাহরণের কিছু শব্দ পরিবর্তন করলে দ্বারায়-
অসীম গগনে
নির্নিমেষ বসে আছে নিদ্রতন্দ্রাহত
শূন্যশষ্যা পুত্রহারা প্রসূতির মতো।’
এর আবেদন ক্ষুণ্ন হয় নি বলেই মনে হয়।
২। অর্থালঙ্কার বক্তব্যকে সরস ও সুন্দর করে এবং বাক্যের অর্থকে সুষ্পষ্ট ও মনোরম করে তোলে।
যেমন: একটি অপহ্নুতি অলঙ্কারে পাই-
‘চোখে চোখে কথা নয় গো-আগুনে আগুনে কথা।’
এখানে চোখের সাথে আগুনের তুলনা করে উভয় চরিত্রের ক্ষোভের স্বরূপটিকে উন্মোচিত করা হয়েছে। ফলে অলঙ্কারের আবেদন শব্দের মধ্যে সীমিত না থেকে দুরসঞ্চারী হয়েছে।
৩। এই অলঙ্কার অর্থ নির্ভর হওয়ায় এতে ব্যাপক বৈচিত্র্য ও বিস্তৃতি পরিলক্ষিত হয়।
৪। অর্থালঙ্কার যেহেতু বৈচিত্র্যপূর্ণ সেহেতু এর শ্রেণী বিভাগও ব্যাপক বিস্তৃত। কেননা, এই অলঙ্কারের রয়েছে পাঁচটি প্রধান শাখা এবং এই শাখাগুলোর রয়েছে অনেকগুলো উপ-শাখা।
প্রশ্ন: উপমা কাকে বলে? প্রত্যেক প্রকার উপমার পরিচয় দাও।
উত্তর: যে অলঙ্কারে সমগুণ বিশিষ্ট ভিন্ন জাতীয় দুই বস্তুর মধ্যে সাদৃশ্য দেখানো হয়; তাকে উপমা বলে। যেমন- “পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন।”- এখানে পাখির বাসার সাথে চোখের তুলনা করা হয়েছে।
উপমাকে প্রধানত ছয় ভাগে ভাগ করা হয়। এগুলো হলো-
ক) পূর্ণোপমা, খ) লুপ্তোপমা, গ) মালোপমা, ঘ) বস্তুপ্রতিবস্তু ভাবের উপমা ঙ) বিম্ব-প্রতিবিম্ব ভাবের উপমা এবং চ) স্মরণোপমা।
নিচের এদের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেয়া হলো-
ক) পূর্ণোপমা : যে উপমায় উপমেয়, উপমান, তুলনাবাচক শব্দ ও সাধারণ ধর্ম- এ চারটি অবয়বই স্পষ্ট উল্লেখ থাকে, তাকে পূর্ণোপমা বলে। যেমন-
১) মুখখানি তার
নতবৃন্ত পদ্মসম এ বক্ষে আমার
নামিয়া পড়িল ধীরে।
২) কাকের চোখের মতো কালোচুল।
এখানে প্রথম উদাহরণে উপমেয়-মুখখানি; উপমান-পদ্ম; সাধারণ ধর্ম-নত হওয়া এবং তুলনাবাচক শব্দ হচ্ছে সম। দ্বিতীয় উদাহরণের উপমেয়- চুল; উপমান-কাকের চোখ; তুলনাবাচক শব্দ মতো; সাধারণধর্ম কালো।
খ) লুপ্তোপমা : যে উপমায় উপমেয় ব্যতীত অন্য তিনটি গুণের যে কোন একটি, দুটি বা তিনটিই অনুপস্থিত থাকে, তাকে লুপ্ত উপমা বলে। যেমন-
১) মরণ রে, তুহুঁ মম শ্যাম সমান।
এই উপমায় সাধারণ ধর্ম লুপ্ত।
২) মেঘলা দিনে দেখেছিলাম মাঠে
কালো মেয়ের কালো হরিণ চোখ।
এই উপমায় উপমান ও তুলনাবাচক শব্দ অনুপস্থিত।
গ) মালোপমা : যে উপমায় একটি উপমেয়ের একাধিক উপমান থাকে, তাকে মালোপমা বলে। যেমন-
১) উড়ে হোক ক্ষয়
ধুলিসম, তৃণসম, পুরাতন বৎসরের যত
নিষ্ফল সঞ্চয়।
এখানে উপমেয় পুরাতন বৎসরের সঞ্চয়। উপমান হলো দুটি- ধূলি ও তৃণ।
২) আমার হৃদপিণ্ডের যতো
আমার সত্তার মত
আমার অজানা স্নায়ুতন্ত্রী মত
সর্বক্ষণ সত্য আমার দেশ।
এখানে উপমেয় দেশ। এর সাথে হৃদপিন্ড, সত্তা ও স্বায়ুতন্ত্রী এই তিনটি উপমানের মালা গাঁথা হয়েছে। আর এ জন্যই এটি মালোপমা।
ঘ) বস্তু প্রতিবস্তু ভাবের উপমা : এ উপমায় সাধারণ ধর্মবাচক শব্দটি ভিন্ন ভাষায় প্রকাশিত হয়। যেমন-
১) ঔই সবুজ স্বচ্ছ জল
সাপের চিকন দেহের মতো।
এখানে উপমেয় ‘জল’; উপমান ‘সাপের দেহ’; তুলনাবাচক শব্দ- ‘মতো’ এবং সাধারণ ধর্ম ‘সবুজ স্বচ্ছ’ ও ‘চিকন’ ভিন্ন ভাষা কিন্তু ঝকঝকে।
ঙ) বিম্ব-প্রতিবিম্ব ভাবের উপমা : এই উপমায় উপমেয় ও উপমানের ধর্ম সম্পূর্ণ ভিন্ন হলেও এদের মধ্যে সুক্ষ্ম সাদৃশ্য অনুভূত হয়। যেমন-
১) আগুণে যেমন সব বিষ যায়,
প্রেমেও তেমনি সকলি শুচি।
উপমেয় ‘আগুন’; উপমান ‘প্রেম’। আগুন যেমন সবকিছুকে পুড়িয়ে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, তেমনি প্রেম হৃদয়ে ‘আগুন জ্বেলে’ সমস্ত পঙ্কিলতাকে বিনষ্ট করে নিজের মহিমা প্রকাশ করে, এ গভীরতর ক্ষমতা পরস্পরের সাদৃশ্য করে বিম্ব-প্রতিবিম্বভাবের সাধারণ ধর্মে পরিণত হয়েছে।
চ) স্মরণোপমা : কোন বস্তু বা বিষয়ের অনুভব থেকে যদি সে রকম অন্য কোন বস্তুর স্মৃতি জাগে তবে তাকে স্মরণোপমা বলে। যেমন-
১) কাল জল ঢালিতে সই কালা পড়ে মনে
নিরবধি দেখি শয়নে স্বপনে।।
কাল কেশ এলাইয়া বেশ নাহি করি
কাল অঞ্চন আমি নয়নে না পরি।
‘জল’, ‘কেশ’, ‘অঞ্জন’ দেখে কালা তথা কৃষ্ণকে মনে পড়ে রাধার। আর এই মনে পড়ার কারণ বর্ণগত সাদৃশ্য। এটি স্মরণ উপমা এই জন্য যে, এখানে উপমেয় ‘কালা’, উপমান ‘জল’, ‘কেশ’, ‘অঞ্জন’ এবং সাধারণ ধর্ম ‘কাল’।
ড. এ. আই. এম. মুসা
অধ্যাপক-বাংলা
+88 01713 211 910