
NTRCA শব্দালঙ্কার ও অর্থালঙ্কারের মধ্যে পার্থক্য
প্রশ্ন : শব্দালঙ্কার ও অর্থালঙ্কারের মধ্যে পার্থক্য আলোচনা কর।
উত্তর: আলঙ্কারিকদের মতে, যা বাক্যকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে তুলে তাই অলঙ্কার। তাঁরা এ অলঙ্কারকে প্রধানত দু’শ্রেণিতে বিভক্ত করেছেন। এগুলো হলো-শব্দালঙ্কার ও অর্থালঙ্কর। শব্দালঙ্কার ও অর্থালঙ্কারের রূপগত পার্থক্য যেমন রয়েছে; তেমনি এদের প্রয়োগ ও অর্থগত পার্থক্যও রয়েছে বিস্তর। নিচে শব্দালঙ্কার ও অর্থালঙ্কারের পার্থক্য উপস্থাপন করা হলো:
|
ক্রম |
শব্দালঙ্কার |
অর্থালঙ্কার |
|
১ |
শব্দের ধ্বনি প্রকাশে যে অলঙ্কার গুরুত্বপূণ ভূমিকা পালন করে তাকে সাধারণভাবে শব্দালঙ্কার বলে। শব্দের ধ্বনি রূপের আশ্রয়ে এর সৃষ্টি। যেমন:‘কাক কালো কোকিল কালো কালো কন্যার ক্যাশ।’ এখানে ‘ক’ ধ্বনির আবর্তন ধ্বনি মাধুর্য সৃষ্টি করেছে। |
পক্ষান্তরে, যে অলঙ্কার অর্থ-বৈচিত্র্য দ্বারা বাক্যের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে, তাকে অর্থালঙ্কার বলে। অন্যকথায়, যে অলঙ্কার একান্তভাবে বাক্যে ব্যবহৃত শব্দ বা শব্দাবলীর অর্থের আশ্রয় গ্রহণ করে সৃষ্ট হয়, তাকে অর্থালঙ্কার বলে। যেমন- ‘মরণ রে, তুহুঁ মম শ্যাম সমান।’ এখানে মরণকে শ্যামের সাথে তুলনা করে একধরনের ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করা হয়েছে।
|
|
২ |
শব্দালঙ্কারে শব্দ বা ধ্বনিই মুখ্য। এখানে শব্দের অর্থ তত প্রাধান্য পায় না। যার ফলে এখানে কবি যে শব্দ ব্যবহার করেন, এর সমার্থক শব্দ ব্যবহার করা যায় না। যেমন: ‘কুলায় কাঁপিছে কাতর কপোত।’ এই উদাহরণের শব্দগুলো যদি পরিবর্তন করা হয় তবে এর আবেদন ক্ষুণ্ন হতে বাধ্য। কুলায়, কাতর ও কপোত শব্দ তিনটির প্রতি শব্দ ব্যবহার করলে বাক্যটি দাড়ায়- ‘বাসায় কাঁপিছে ব্যাকুল পায়রা’ এ বাক্যের অর্থ ঠিক থাকলেও পুর্বের ধ্বনি মাধুর্য ও কাব্যিক সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন থাকেনি। |
অর্থালঙ্কারে শব্দ ও ধ্বনি গৌণ, অর্থই প্রথম এবং প্রধান। এ জন্য এক শব্দের পরিবর্তনে সমার্থক আলাদা শব্দ প্রয়োগ করলেও অর্থাশ্রয়ী ও অলঙ্কারের আবেদন ক্ষুণ্ন হয় না। যেমন-রবীন্দ্রনাথের ‘বসুন্ধরা’ কবিতায় আছে- ‘অনন্ত আকাশে অনিমেষ জেগে থাকে নিদ্রাতন্দ্রাহত শূন্যশয্যা মৃতপুত্রা জননীর মতো।’ এখন উল্লিখিত উদাহরণের কিছু শব্দ পরিবর্তন করলে দাঁড়ায়- ‘অসীম গগনে নির্নিমেষ বসে আছে নিদ্রাতন্দ্রাহত শূন্যশয্যা পুত্রহারা প্রসূতির মতো।” এর আবেদন ক্ষুণ্ন হয়নি বলেই মনে হয়। |
|
৩ |
শব্দালঙ্কার কবিতার ধ্বনিমাধুর্য বৃদ্ধি করে, একে শ্রুতি মধুর করে তোলে। যেমন : নন্দ নন্দন চন্দ চন্দন গন্ধ নিন্দিত-অঙ্গ। এখানে ‘ন্দ’ ধ্বনির আবর্তন একধরনের ধ্বনি মাধুর্য সৃষ্টি করেছে এবং কবিতাটিকে শ্রুতি মধু করে তুলেছে। |
অর্থালঙ্কার বক্তব্যকে সরস ও সুন্দর করে এবং বাক্যের অর্থকে সুস্পষ্ট ও মনোরম করে তোলে। যেমন : একটি অপহ্নুতি অলঙ্কারে পাই- ‘ চোখে চোখে কথা নয় গো-আগুনে আগুনে কথা’। এখানে চোখের সাথে আগুনের তুলনা করে উভয় চরিত্রের ক্ষোভের স্বরূপটিকে উন্মোচন করা হয়েছে। ফলে অলঙ্কারের আবেদন শব্দের মধ্যে সীমিত না থেকে দুরসঞ্চারী হয়েছে। |
|
৪ |
শব্দালঙ্কার ধ্বনি প্রধান অলঙ্কার হওয়ায় এর অর্থ বৈচিত্র্য অর্থালঙ্কারের মতো ব্যাপক ও বিস্তৃত নয়। |
এই অলঙ্কার অর্থ নির্ভর হওয়ায় এতে ব্যাপক বৈচিত্র্য ও বিস্তৃতি পরিলক্ষিত হয়। |
|
৫ |
শব্দালঙ্কার প্রধানত পাঁচ প্রকার। এগুলো হলো-অনুপ্রাস, যমক, শ্লেষ, বক্রোক্তি, পুনরুক্তবদাভাস। এই পাঁচ প্রকার অলঙ্কারের তেমন উপ-বিভাগ বা শাখা নেই। |
পক্ষান্তরে, অর্থালঙ্কার যেহেতু বৈচিত্র্যপূর্ণ সেহেতু এর শ্রেণী বিভাগও ব্যাপক বিস্তৃত। কেননা, এই অলঙ্কারের রয়েছে পাঁচটি প্রধান শাখা এবং এই শাখাগুলোর রয়েছে অনেকগুলো উপ-শাখা। |
ড. এ. আাই. এম. মুসা
অধ্যাপক-বাংলা
+88 01713 211 910