
ট্রাজেডি কাকে বলে? ট্টাজেডির স্বরূপ ও বৈশিষ্ট্য
প্রসঙ্গ: ট্রাজেডি কাকে বলে? ট্টাজেডির স্বরূপ ও বৈশিষ্ট্য
আত্মদ্বন্দ্বে পরাভূত মানব জীবনের করূণ কাহিনীকেই ট্রাজেডি বলে। ট্রাজেডির সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সাহিত্য সমালোচক ও কবি মহিতলাল মজুমদার কবিতার ভাষায় বলেন-
“দেবতা-দোসর বীর, তারি পরাজয়-কথা,
সে হৃদয় সাগর মন্থন;
নীলাকাশে উষাসম গরলে অমৃত-রাগ
মৃত্যুজয়ী জীবন-কাহিনী।”
তবে ট্রাজেডির সর্বোৎকৃষ্ট সংজ্ঞা প্রদান করেছেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রীক দার্শনিক Aristotle । তিনি বলেন-
Tragedy is an imitation of an action that is serious , complete and of a certain magnitude in language embellished with each kind of artistic ornament , the several kinds being found in the separate parts of the play ; in form of action not of narrative through pity and fear effecting the proper purgation of these emotions .''
অতএব উল্লিখিত সংজ্ঞা থেকে আমরা ট্রাডেজির নিম্নরূপ বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করতে পারি।
প্রথমত, ট্রাজেডিতে কোন হালকা বিষয় নয়, বরং গভীর ও গম্ভীর ‘action that is serious' তথা মৃত্যুজয়ী জীবন কাহিনী উপস্থাপিত হয়।
দ্বিতীয়ত, এই ‘মৃত্যুজয়ী জীবন-কাহিনী’ উপস্থাপন প্রক্রিয়া হয় ঘটনা প্রধান, বর্ণনা প্রধান তথা narrative নয়।
তৃতীয়ত, ট্রাজেডি হয় আদি মধ্য অন্ত সমন্বিত কাহিনী ভিত্তিক।
চতুর্থত, সাহিত্য কর্মের বিচিত্র ঘটনাপুঞ্জ একটিমাত্র পরিণাম মুখীনতার (Unity of action) সুরকে তুলে ধরে।
পঞ্চমত, ট্রাজেডির ভাষা হয় গুরুগম্ভীর, সমৃদ্ধ ও গীতধর্মী।
ষষ্ঠত, ট্রাজেডি ভীতি ও করুণা উদ্রেকের মধ্য দিয়ে আনন্দ সৃষ্টি করে।
শেষত, ট্রাজেডিতে জীবনের নেতিবাচকতা নয়, ইতিবাচকতা রূপায়িত হয়।
সাহিত্য সমালোচকগণ ট্রাজেডিকে বৈশিষ্ট্যের আলোকে প্রধানত দু’শ্রেণীতে বিভক্ত করেছেন। এগুলো হলো- গ্রীক ট্রাজেডি এবং শেক্সপীয়ারীয়ান ট্রাজেডি। গ্রীক ট্রাজেডিতে ব্যক্তির ভুল ক্রটির পরিবর্তে, দৈব-দুর্বিপাকের কারণে ব্যক্তির জীবনের বিপর্যয় বর্ণিত হয়। কিন্তু শেক্সপীয়ারীয়ান ট্রাজেডিতে ব্যক্তির ভুলক্রুটির জন্যই ব্যক্তির জীবনে বিপর্যয় নেমে আসে।
উল্লিখিত দু’শ্রেণীর ট্রাজেডিকে স্মরণে রাখলে ট্রাজেডি নাটকের কিছু বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়।
শেক্সপীয়ারিয়ান ট্রাজেডিতে কোন খ্যাতিমান, বিশিষ্ট ও উচ্চপদস্থ ব্যক্তির পতন দেখানো হয়। এই জাতীয় ট্রাজেডিতে নায়কের ব্যক্তিগত দুর্বলতার জন্য বা সামান্য ভুলক্রুটির জন্য জীবনে চরম বিপর্যয় নেমে আসে। কখনো দৈব বা অদৃষ্ট পীড়িত হয়ে নায়ককে সীমাহীন বেদনায় পতিত হতে হয়। আর নায়কের এই বেদনাকে নাট্যকার বিশেষ গুরুগম্ভীর বাণী ভঙ্গিতে উন্মোচিত করেন। নায়ক গভীর অন্তদ্বর্ন্দ্বে ও বহিদ্বর্ন্দ্বে ক্ষত বিক্ষত হতে থাকে। একদিকে সে আপনার সঙ্গে আপনার দ্বন্দ্বে (Internal Conflict) অন্যদিকে বাহিরের ঘটনাবলীর সঙ্গে দ্বন্দ্বে (External Conflict) লিপ্ত থাকে। এই দ্বিবিধ দ্বন্দ্ব মূলত আত্মদ্বন্দ্বের দু’টি দিক। এই দ্বন্দ্বে বারবার পরাজিত হয়েও সে শুধু ইচ্ছা শক্তির (Will of Power) প্রাবল্যে বিপযর্য় কাটিয়ে উঠার চেষ্টা করে। আর এভাবেই নায়ক চরম বিপর্যয়ে পতিত হয়েও সকলের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা আকর্ষণ করে এবং তার জীবন কাহিনী হয়ে উঠে ‘মৃত্যুজয়ী জীবন কাহিনী।’
অর্থাৎ শেক্সপীয়ার এবং তার পরবর্তী নাটকে চরিত্রই প্রধান। এই জন্য শেক্সপীয়ারের নাটককে কেউ কেউ Character is Distiny বলে আখ্যায়িত করেছেন। এই ধরনের নাটকে নায়কের চরিত্রের ব্যক্তিগত দুর্বলতাই তার ট্রাজেডির মূল কারণ।
আবার শেক্সপীয়ারের ট্রাজেডিতে মুত্যুই স্বাভাবিক পরিণতি। মৃত্যুর মধ্য দিয়েই ট্রাজেডির অনুভবকে তীব্র করে তুলে। কিন্তু আধুনিক যুগের ট্রাজেডিতে মুত্যুকে সকল সময় ট্রাজেডি পরিণতি রূপে গ্রহণ করা হয় না। বরং কোন ব্যক্তি বিশেষের জীবন ঘটনাচত্রেু বা স্বীয় দুর্বলতার কারণে ব্যর্থ হয়ে গেলে, সেই ব্যর্থতার ইতিহাসই ট্রাজেডি নাটকের উপজীব্য হিসাবে গ্রহণ করা হয়। আর এ ধরনের নাটকে ব্যর্থতার বেদনাই ট্রাজেডি জাগিয়ে তুলে। ফলে অনেক সমালোচক ট্রাজেডি নাটককে বিয়োগান্তক নাটক না বলে বিষাদাত্মক নাটক বলা সমীচীন বলে মনে করেন।
অন্যদিকে গ্রীক ট্রাজেডিতে চরিত্রের পরিবর্তে – Plot কেই প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। এই ধারায় ট্রাজেডিতে নায়কের ব্যক্তিগত ক্রুটির কারণে নয়, বরং গ্রহ বৈগুণ্যে, ঘটনাচক্রে এবং দৈব দুর্বিপাকেই নায়কের জীবনে চরম বিপর্যয় নেমে আসে। তবে এ ক্ষেত্রের চরিত্র হবে সৎ এবং যথোপযোগী জীবন সত্যের অনুগামী।
ট্রাজেডিতে মৃত্যুর ভয়াবহতা এবং জীবনের চরম বিপযর্য় প্রদর্শিত হলেও তা পরিণামে আমাদের মনে আনন্দ সৃষ্টি করে। চরম বিপর্যায়ের পরও আমাদের মনে ট্রাজেডি কেন আনন্দ সৃষ্টি হয়, তা-ই আমরা এখন বিবেচনা করব।
পূর্বেই বর্ণিত হয়েছে যে, ট্রাজেডিতে মানব জীবনের চরম বিপযর্য উপস্থাপিত হয়। এই বিপর্যয় প্রত্যেক্ষ করে দর্শকের মনে একই সাথে Pity J Fear এর উদ্রেক হয়। এইরূপ ভীতি ও করুণা উদ্রেকের পিছনে দুটি কারণ প্রত্যক্ষভাবে সক্রিয় থাকে। প্রথমত, উপস্থাপিত বিপর্যয় প্রত্যক্ষ করে আমাদের মনে এই ভাবনার উদ্রেক হয় যে, এই বিপযর্য় আমাদের জীবনেও ঘটতে পারত। এইরূপ আত্মমগ্ন চিন্তায় আমরা ভীত হই। দ্বিতীয়ত, বিপর্যস্ত চরিত্রের মত আমরাও মানুষ। সুতরাং, মানুষ হিসাবে মানুষের প্রতি আমাদের মনে করুণা জাগ্রত হয়। এইভাবে ট্রাজেডি উপভোগ করার ফলে আমাদের নবজন্ম হয়। নায়ক বা নায়িকার জীবনের দুঃখ, কষ্ট, বিপদ, বিষাদ ও যন্ত্রণা আমাদের নিজের বলে মনে হয়। ফলে তাদের দুঃখ বিমোক্ষণের মধ্য দিয়ে আমাদের বিমোক্ষণ ঘটে। Aristotle যাকে বলেছেন Catharsis বা Purgation। আধুনিক সমালোচকদের মতে, করুণা ও ভীতি এই দু’টি বিপরীতমুখী প্রবণতার সমন্বয় সাধনই ট্রাজেডির মুখ্য উদ্দেশ্য।
ট্রাজেডির আনন্দ দায়িনী শক্তি বুঝাতে গিয়ে যে আনন্দের কথা বলেছেন, তা মুলত নৈতিক হলেও একালে আমরা তাকে সাহিত্যের আনন্দ রূপেই আখ্যায়িত করতে পারি।
**************************************
ড. এ. আই. এম. মুসা
অধ্যাপক
বাংলা বিভাগ
www.onlinereadingroombd.com
+88 01713 211 910