
অর্ধ-স্বরধ্বনি কাকে বলে? বাংলা অর্ধ-স্বরধ্বনির পরিচয়।
প্রশ্ন: অর্ধ-স্বরধ্বনি কাকে বলে? বাংলা অর্ধ স্বরধ্বনিগুলোর পরিচয় দাও।
আলোচনা: ড. রফিকুল ইসলাম তাঁর ‘ভাষাতত্ত্ব’ গ্রন্থে অর্ধ-স্বরধ্বনির সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেন-
‘আক্ষরিক স্বরধ্বনির পরিপ্রেক্ষিতে অনাক্ষরিক স্বরধ্বনিকেই অর্ধ-স্বরধ্বনি (semivowel) বলে।’
অর্থাৎ A non-syllabic vowel in relation to a contiguous syllabic vowel is a semivowel.
অর্ধ-স্বরধ্বনি উচ্চারণের প্রক্রিয়ার দিক থেকে স্বরধ্বনি ও ব্যঞ্জনধ্বনির মধ্যবর্তী হয়। অর্থাৎ এ গুলো উচ্চারণের সময় স্বর ও ব্যঞ্জন উভয় ধ্বনির প্রকৃতি বহন করে থাকে। অর্ধ-স্বরধ্বনি স্বরধ্বনি মত স্বরিত নয়। তার কারণ, এগুলো শ্রুতিজনিত আওয়াজ ছাড়াই দ্রুত উচ্চারিত হয়।
ব্রিটিশ ভাষাতাত্ত্বিকদের মতানুযায়ী- অর্ধ-স্বরধ্বনি এমন একটি gliding sound শ্রুতি বা পিচ্ছিল ধ্বনি যার উচ্চারণে জিহ্বার গতি উচ্চ ও সংকীর্ণতর একটি স্বরধ্বনি দিক থেকে প্রশস্ততর একটি স্বরধ্বনি দিক অগ্রসর হয়। আমেরিকার ভাষাবিজ্ঞানী ব্লক ও ট্রেগার বলেন, আক্ষরিকতা। এবং অনাক্ষরিকতা বিচারে তাদের আক্ষরিক স্বরধ্বনিটিই অর্ধ-স্বরধ্বনি।
ব্রিটিশ ভাষাতাত্ত্বিকদের প্রদত্ত সংজ্ঞার উদাহরণ হিসাবে উল্লেখ করা যায় ‘পিয়া’ শব্দটির কথা। এর ‘ইয়া’ উচ্চারণ করার সময় জিহ্বা উচ্চ ও সংবৃত স্বরধ্বনি ‘ই’ থেকে প্রশস্ততর ‘য়া’ ধ্বনির দিকে পিছলে যাবার ফলে উভয়ের মাঝ খানে একটি শ্রুতিধ্বনি ‘য়, উৎপাদন করে। আর এই ‘য়’ হলো অর্ধ-স্বরধ্বনি।
মার্কিন ধ্বনিবিজ্ঞানীদের সংঞ্জার উদাহরণ হিসাবে বলা যায় ‘পাও’ শব্দটির কথা। শব্দটির ‘আও’ অংশটির ‘আ’ এর চূড়া এবং ‘ও’ খাদ গঠন করে। এখানে স্থিতিবাচক ‘ও’ অর্ধ-স্বরধ্বনি।
বাংলা ভাষার উচ্চারণ প্রক্রিয়ায় দেখা যায় যে, দুই স্বরধ্বনির মাঝখানে কিংবা এক শব্দের শেষে ও পরবর্তী শব্দে আদিতে একই স্বরধ্বনি থাকলে উচ্চারণে বাগযন্ত্রের অসুবিধা হয়। এই অসুবিধা দূর করার জন্য যে অস্পষ্ট gliding ধ্বনিগুলো উৎপন্ন হয় সে গুলোই অর্ধ-স্বরধ্বনি। যেমন- ‘মা আমার’-দ্রুত উচ্চারণ করার সময় আমরা উচ্চারণ করি ‘মায়মার’ কিংবা মা’ য়ামার’। এখানে একটি অর্ধ-স্বরধ্বনি ‘য়’ (y) উৎপন্ন হয়েছে।
উল্লিখিত সংজ্ঞা থেকে আমরা অর্ধ-স্বরধ্বনির কয়েকটি বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করতে পারি।
(১) অর্ধ-স্বরধ্বনি উচ্চারণের সময় বাক প্রত্যঙ্গগুলো ততখানি সক্রিয় থাকে না বলে অনেক সময় স্বরধ্বনিগুলো ততখানি অনুরণিত হয় না এবং কম দ্যোতনার সৃষ্টি করে। ফলে এর প্রকৃতি পরিবর্তিত হয়ে যায়।
(২) অর্ধ-স্বরধ্বনি ধ্বনিগত প্রক্রিয়ার জন্য পিচ্ছিল ধ্বনি হিসাবে বিবেচিত হতে পারে।
(৩) ধ্বনি গঠনের সময় অপেক্ষাকৃত কম জোরে এই শ্রেণীর ধ্বনি উচ্চারিত হয়। তাই একে পূর্ণ স্বরধ্বনির মত প্রলম্বিত করা যায় না।
(৪) জিহ্বার অবস্থানের দিক থেকে অর্ধ-স্বরধ্বনির নির্দিষ্ট কোন স্থান নেই। তাই জিহ্বার ঠিক কোন স্থান থেকে অর্ধ-স্বর উচ্চারিত হয় তা যথার্থ ভাবে বলা যায় না।
(৫) অর্ধ-স্বর দ্রুতগামী বলে অর্ধ-স্বরের উচ্চারণকাল অতি অল্প।
বাংলায় অর্ধ-স্বরধ্বনির ব্যবহার সীমিত না হলেও এগুলোর সংখ্যা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ লক্ষ্য করা যায়। পূর্ববর্তী ভাষাবিজ্ঞানীদের মধ্যে সুনীতিকুমার ও সুকুমার সেন দুটো অর্ধ-স্বরের উল্লেখ করেছেন। এ দুটো অর্ধ-স্বর হচ্ছে অন্তঃস্থ-য় ও অন্তঃস্থ-ব। পরবর্তী কালে মুহম্মদ আব্দুল হাই এ দুটোকে অর্ধ-স্বরধ্বনি হিসাবে স্বীকার করে নিয়ে আরো একটি অর্ধ-স্বরধ্বনিকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। সেটি হলো- ই শ্রুতি। ড. আব্দুল কালাম মনজুর মোরশেদ উল্লিখিত তিনটি অর্ধ-স্বরধ্বনিকে বাংলায় গ্রহণ করে নিতে চান নি। কারণ, বাংলায় এই তিনটি অর্ধ-স্বরের ব্যবহার নেই। তিনি বাংলায়/ ই এ ও/ এই তিনটিকে অর্ধ-স্বরধ্বনি হিসাবে গ্রহণ করেছেন। নিম্নলিখিত উদাহরণ দিয়ে তিনি এই তিনটি অর্ধ-স্বরধ্বনির প্রয়োগ দেখিয়েছেন। যেমন-
ক. /ই/ জা-ই ja-i
(আমার ছোট জা-ই এ কাজ করেছে)
যাই Jai
( আমি আজ যাই)
খ. /এ/ জা-এ Ja-e
(এট আমার জা-এ করেছে)
যায় Jae
( সে রোজ বাজার যায়)
গ. /ও/ জা-ও Ja- o
(আমার জা-ও সিনিমায় যাবে)
যাও Jao
( তুমি এখন বাড়ি যাও)
চার্লস ফার্গুসন ও মুনীর চৌধুরী বাংলায় চারটি অর্ধ-স্বরধ্বনির উল্লেখ করেছেন। তাঁদের বর্ণিত চারটি অর্ধ-স্বরধ্বনি হলো- / ই এ ও উ/। ড. রফিকুল ইসলামও এই চারটিকেই বাংলায় অর্ধ-স্বরধ্বনি হিসাবে গ্রহণ করেছেন।তাঁদের বর্ণিত চারটি অর্ধ-স্বরধ্বনি হলো - /ই এ ও উ/।
ড. এ. আই. এম. মুসা
অধ্যাপক-বাংলা
www.onlinereadingroombd.com
+88 01713 211 910