
বাক্প্রত্যঙ্গ কাকে বলে? বাংলা ব্যঞ্জনধ্বনিগুলো উচ্চারণে কোন কোন বাক প্রত্যঙ্গ ব্যবহৃত হয়
প্রশ্ন: বাক্প্রত্যঙ্গ কাকে বলে? বাংলা ব্যঞ্জনধ্বনিগুলো উচ্চারণে কোন কোন বাক প্রত্যঙ্গ ব্যবহৃত হয় তা নিদের্শ করো।
উত্তর: পৃথিবীর যে কোন ভাষায় কথা বলতে গেলে দেহের কিছু অঙ্গ-প্রতঙ্গ ব্যবহারের প্রয়োজন হয়। ভাষা তৈরির নিমিত্তে ধ্বনি উচ্চারণে সহায়তাকারী এই সমস্ত অঙ্গ-প্রতঙ্গেকেই বাক প্রত্যঙ্গ বলে।
মুখ বিবর, নাসিকা কক্ষ, কন্ঠ ও ফুসফুসের মধ্যে অবস্থিত যে প্রত্যঙ্গগুলো পরিচালনা করা যায় এবং যে পেশী সমূহের সহায়তায় সে গুলোকে নাড়ানো যায় সে গুলোই হলো বাক প্রত্যঙ্গ।
ধ্বনি গঠনে সহায়তাকারী বাক প্রত্যঙ্গের ভূমিকা দু’রকম। প্রথমত এগুলো ধ্বনি গঠনে সহায়তা করে এবং দ্বিতীয়ত ধ্বনির প্রকৃতিগত পরিবর্তনে সাহায্য করে। ধ্বনি গঠনের ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, সমস্ত বাক প্রত্যঙ্গ সমান ভাবে অংশ গ্রহণ করে না। অর্থাৎ সব বাক প্রত্যঙ্গ সমান সক্রিয় নয়। তাই সক্রিয়তার দিক বিবেচনা করে বাক প্রত্যঙ্গগুলোকে দু’ভাগে ভাগ করা হয়েছে।
(ক) সক্রিয় বাক প্রত্যঙ্গ ( জিভ, ঠোঁট, নরম তালু);
(খ) নিষ্ক্রিয় বাক প্রত্যঙ্গ (শক্ত তালু ও দাঁত)।
নিচের বাক প্রত্যঙ্গগুলোর পরিচয় দেয়া হলো:

ফুসফুস (Lungs ) :ফুসফুস সব সময়ই সক্রিয় থাকে। এটি সব সময়ই শ্বাসগ্রহণ ও ত্যাগ করে। কথা বলার সময় ফুসফুস ভেতর থেকে বাইরে বাতাস বের করে দেয়, এই বায়ু তাড়নার মধ্যে একটি ছন্দ লক্ষ করা যায়। অনেক ভাষার অক্ষরে তথা Syllable এর স্থায়িত্বের সঙ্গে এর সঙ্গতি দেখা যায়। কথা বলার সময় নিঃশ্বাস প্রশ্বাস নেয়ার জন্যে কথার মধ্যে নিয়মিত ছেদ পড়ে, এক নিশ্বাসে যতটুকু কথা বলা যায়, সেটুকুকে Breath group বলে।
স্বরযন্ত্র (Larynges) : স্বরযন্ত্রের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো স্বরতন্ত্রী (Vocal cords)। কথা না বললে স্বরতন্ত্রীগুলো নিশ্চেষ্ট ভাবে থাকে এবং তাদের মধ্যে কিছুটা ফাঁক থাকে। এই উন্মুক্ত পথ দিয়ে নিঃশব্দে বাতাস যাতায়ত করতে পারে। অঘোষ ধ্বনি উচ্চারণের সময় স্বরতন্ত্রী গুলো অনেকটা এই অবস্থায় থাকে। বাংলা ব্যঞ্জন ধ্বনির ১ম ও ২য় বর্গের ধ্বনি অঘোষ ধ্বনি। এর বিপরীত অবস্থায় স্বরতন্ত্রীগুলো এমনভাবে সজোরে লেগে থাকতে পারে যাতে কোনো বাতাস বের না হয়। এই অবস্থায় যে ধ্বনি উচ্চারণ সম্ভব তাকে স্বরতন্ত্রীয় (Glottal) বলা হয়। আবার স্বরতন্ত্রীগুলোকে কিছুটা আলগা করে মুহূর্তের জন্য উন্মুক্ত ও রুদ্ধ করা হয়, যাতে সজোরে কিছু বাতাস বেরিয়ে যায় এবং স্বরতন্ত্রীগুলোতে অনুরণনের সৃষ্টি হয়। এই অবস্থায় যে ধ্বনি সৃষ্টি হয় তাকে ঘোষ ধ্বনি বলে। বাংলা ব্যঞ্জনধ্বনির তৃতীয় ও চতুর্থ বর্গের ধ্বনি ঘোষ ধ্বনি।
গলবিল ( Larynges ) : অন্ননালীর ঊর্ধ্বাংশস্থিত গহ্বরকে গলবিল বলে। ফুসফুস থেকে বাতাস গলবিলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়। স্বরযন্ত্রের মতো গলবিলের নিম্নাংশ ও জিহ্বামূলের সাহায্যে সম্পূর্ণ রুদ্ধ এবং উন্মুক্ত করা সম্ভব। এর ফলে যে ধ্বনির সৃষ্টি হয় তাকে গলানালীয় স্পৃষ্টধ্বনি বলা যেতে পারে।
জিহ্বামূল বা পশ্চাৎতালু এবং নাসিক্য কক্ষ (Veils and Nasal chamber): গলবিলের ঊর্ধ্বাংশ থেকে নাসিক্যকক্ষের প্রবেশ পথ হল জিহ্বা মূল বা পশ্চাৎ তালু অংশ। নাসিক্য কক্ষের প্রবেশ অংশেরই কেবল ধ্বনি উচ্চারণে কার্যকর ভূমিকা আছে। নাসা পথ বন্ধ বা উন্মুক্ত থাকতে পারে। পথটি উন্মুক্ত থাকলে যে ধ্বনি উচ্চারণ হয় তাকে নাসিক্য (Nasal) ধ্বনি বলে। বাংলা নাসিক্য ব্যঞ্জনগুলো হলো-ম,ন/ণ,ঙ/ং। নাসা পথ বন্ধ থাকলে যে ধ্বনির সৃষ্টি হয় তাকে মৌখিক ধ্বনি বলে।
মুখবিবর (Oral cavity): মুখ বিবরের মধ্যেই অধিকাংশ ধ্বনির উচ্চারণ কার্য সাধিত হয়। মুখ বিবরে উৎপাদিত ধ্বনি মূলত দু’প্রকার-স্বর এবং ব্যঞ্জন ধ্বনি। মুখ বিবরে নির্বিঘ্ন অনুরণন হলে স্বর এবং বিঘ্ন প্রাপ্ত আলোড়ন হলে ব্যঞ্জনধ্বনি সৃষ্টি হয়।
উচ্চারণ স্থান: (Position of Articulation) : ধ্বনি উচ্চারক বাক প্রত্যঙ্গগুলো মুখ বিবরের নিম্ন ভাগের এবং উচ্চারণ স্থানসমূহ মুখ বিবরের উপরিভাগের অংশ। জিহ্বার পশ্চাৎভাগ, মধ্যভাগ, জিভের পাতা, ডগা এবং নিম্ন ওষ্ঠ হল উচ্চারক প্রত্যঙ্গ। পশ্চাৎ তালু বা জিহ্বামূল, তালু, দন্তমূল, পশ্চাৎ দন্ত, উপরের ঠোঁট ইত্যাদি হলো উচ্চারণ স্থান। বিভিন্ন উচ্চারণ এবং উচ্চারক স্থানের মিলনে নিম্নরূপ ধ্বনি সমূহ উৎপাদিত হতে পারে।

জিহ্বামূলীয়, পশ্চজিহ্বা, পশ্চাত্তালু: জিহ্বার পশ্চাদভাগ হল জিহ্বার সম্মুখ ভাগের দেড় ইঞ্চি থেকে পেছন ভাগের গোড়া পর্যন্ত। পশ্চজিহ্বার ঠিক উপরিভাগে কোমল তালু অবস্থিত। কোমল তালুর শেষ অংশ থেকেই আলজিহ্বা ঝুলে আছে। পশ্চজিহ্বা এবং পশ্চাত্তালুর সংস্পর্শে জিহ্বামূলীয় বা পশ্চাত্তালু ধ্বনির সৃষ্টি হয়। বাংলায় জিহ্বমূলীয় ব্যঞ্জন ধ্বনি গুলো হলো- ক,খ,গ,ঘ ইত্যাদি।
জিহ্বার সম্মুখ এবং শক্ত তালুর সংস্পর্শে তালব্য ধ্বনিসমূহের উৎপত্তি। জিহ্বার অগ্রভাগ শক্ত তালুর সামনের দিকে স্পর্শ করলে অগ্রতালব্য, মধ্যে করলে মধ্য তালব্য এবং পিছনের দিকে করলে পশ্চাৎ তালব্য ব্যঞ্জনধ্বনির উৎপাদন হয়। বাংলায় তালব্য ব্যঞ্জনগুলো হলো- চ,ছ,জ,ঝ,শ ইত্যাদি।
মূর্ধা: জিভের ডগা শক্ত তালুর সংস্পর্শে এসে এই ধ্বনি উৎপাদন করে। বাংলায় মূর্ধা ধ্বনি গুলো হলো- ট,ঠ,ড,ঢ (ড়)(ত)(ষ)।
জিহ্বাগ্র বা দন্ত্য: জিহ্বাগ্র উপরের পাটি দাঁতের পশ্চাৎভাগে অথবা উপরের ও নিচের পাটি দাঁতের মধ্যে স্পর্শ করলে দন্ত্য ধ্বনি উৎপাদন হয়। বাংলায় দন্ত্য ধ্বনি-ত,থ,দ,ধ,ন,র,ল,স।
ওষ্ঠ্য: নিম্ন ওষ্ঠ্যের সাহায্যে উচ্চারিত ধ্বনিকে ওষ্ট্য ধ্বনি বলে। নিচের ঠোঁট উপরের ঠোঁটের সঙ্গে মিলে উভ ওষ্ঠ্য এবং উপরের পাটি দাঁতের সঙ্গে মিলে দন্তওষ্ঠ্য ধ্বনির সৃষ্টি হয়। বাংলায় ওষ্ঠ ধ্বনি গুলো হলো- প,ফ,ব,ভ,ম। নিচে চিত্রের সাহায্যে উচ্চারণ স্থানগুলো দেখানো হলো।

-০-
+88 01713 211 910