
বাংলা ব্যঞ্জনধ্বনি বিচারের মাপকাঠি এবং ঐ সব মাপকাঠিতে বাংলা ব্যঞ্জনধ্বনিগুলো বিচার
প্রশ্ন: বাংলা ব্যঞ্জনধ্বনি বিচারের মাপকাঠি কয়টি ও কী কী? ঐ সব মাপকাঠিতে বাংলা ব্যঞ্জনধ্বনিগুলো বিচার করো।
উত্তর: স্বাভাবিক পদ্ধতিতে কথাবার্তা বলার সময়ে ফুসফুস নির্গত বাতাস গলনালী, মুখুববর কিংবা মুখের বাইরে অর্থৎি ঠোঁটে বাধা পাওয়ার কিংবা শুতিগ্রাহ্য চাপা খাওয়ার ফলে যেসব ধ্বনি সৃষ্টি হয় সেগুলোই ব্যঞ্জনধ্বনি। যেমনঃ বাংলা ব্যাঞ্জন ধ্বনি-ক,চ,ট,ত,প ইত্যাদি।
ব্যঞ্জন ধ্বনি বিচার, শ্রেণিবিন্যাস বা বিশ্লেষণের মাপকাঠি প্রধানত দু’টি:
১। উচ্চারণ স্থান ও
২। উচ্চারণ রীতি।
নিচে উচ্চারণ স্থান ও রীতি অনুযায়ী বাংলা ব্যঞ্জন ধ্বনিগুলো বিচার করা হলো।
১। উচ্চারণ স্থানঃ মুখ বিবরের অন্তগর্ত বাক প্রত্যঙ্গগুলো দু’ভাগে বিভক্ত। প্রথমত, ধ্বনি উচ্চারক বাকপ্রত্যঙ্গ এবং দ্বিতীয়ত উচ্চারণ স্থান সমূহ। ধ্বনি উচ্চারক বাক প্রত্যঙ্গগুলো মুখ বিবরের নিম্নভাগের এবং উচ্চারণ স্থান সমূহ মুখ বিবরের উপরভাগের অংশ। জিহ্বার পশ্চাৎভাগ,মধ্যভাগ,জিভের পাতা, ডগা এবং নিম্ন ওষ্ঠ হলো উচ্চারক প্রত্যঙ্গ। পশ্চাত তালু বা জিহ্বামূল, তালু, দন্তমূল, পশ্চাৎ দন্ত, উপরের ঠোঁট ইত্যাদি হলো উচ্চারণ স্থান। বিভিন্ন উচ্চারক এবং উচ্চারণ স্থানের সমন্বয়ে বাংলায় কন্ঠ বা জিহ্বামূলীয়, তালব্য, মূর্ধা, দন্ত্য, এবং ওষ্ঠ্য ধ্বনি সৃষ্টি হয়।
নিম্নে উচ্চারণ স্থান সমূহকে একটি চিত্রের সাহায্যে দেখানো হলো-

কণ্ঠনালীয় ধ্বনি: অনেক ভাষাতাত্ত্বিক /হ/ব/, ধ্বনিকে কন্ঠনালীয় ধ্বনি বলেছেন। আবুল কালাম মঞ্জুর মোরশেদ এবং আব্দুল হাই তাঁদের গ্রন্থে /হ/ব/, ধ্বনিকে কন্ঠনালীয় বলে মত প্রকাশ করেছেন। ড. রফিকুল ইসলাম একে জিহ্বামূলীয় বলে মত প্রকাশ করেছেন।
জিহ্বামূলীয়: পশ্চজিহ্বা এবং পশ্চাত্তালুর সংস্পর্শে জিহ্বামূলীয় বা পশ্চাত্তালু ধ্বনির সৃষ্টি হয়। বাংলায় জিহ্বামূলীয় ব্যঞ্জন ধ্বনি গুলো হলো- /ক/, /খ/, /গ/, /ঘ/, /k/, /kh/, /g/, /gh/ ইত্যাদি।
তালব্যঃ জিহ্বার সম্মুখ এবং শক্ত তালুর সংস্পর্শে তালব্য ধ্বনি সমূহের উৎপত্তি। বাংলায় তালব্য ব্যঞ্জনগুলো হলো- /চ/, /ছ/, /জ//ঝ/ /শ/ /c/, /ch/, /j/, /jh/, /š/ ইত্যাদি।
মুর্ধাঃ জিভের ডগা শক্ত থালুর সংস্পর্শে এসে এই ধ্বনি উৎপাদন করে। বাংলায় মুর্ধা ধ্বনি গুলো হলো-
ট,ঠ,ড,ঢ,ড়, ঢ় //t/, /th/, /d/, /dh/,/r/ ।
জিহ্বাগ্র বা দন্ত্য: জিহ্বাগ্র উপরের পাটি দাঁতের পশ্চাৎভাগে অথবা উপরের ও নিছের পাটি দাঁতের মধ্যে স্পর্শ করলে দন্ত্য ধ্বনি উৎপাদন হয়। বাংলায় দন্ত ধ্বনি- ত,থ,দ,ধ ন,র ল,স
/t/,/th/,/d/,/dh/,/n/,/l/, /š/
ওষ্ঠ্য: নিম্ন ওষ্ঠ্যের সাহায্যে উচ্চারিত ধ্বনিকে ওষ্ট্য ধ্বনি বলে। নিচের ঠোঁট উপরের ঠোঁটের সঙ্গে মিলে উভ ওষ্ঠ্য এবং উপরের পাটি দাঁতের সঙ্গে মিলে দন্তে ঔষ্ঠ্য ধ্বনির সৃষ্টি হয়। বাংলায় ওষ্ঠ ধ্বনি গুলো হলো-
প,ফ,ব,ভ,ম
/p/,/ph/,/b/,/bh/,/m/
২। উচ্চারণরীতি: বাংলা ব্যঞ্জন ধ্বনি বিচার বা বিশ্লেষণের আরেকটি মাপকাঠি হলো, উচ্চারণ রীতি। নিম্ন উচ্চারণ রীতি অনুযায়ী বাংলা ব্যঞ্জন ধ্বনিগুলোর ধ্বনিতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করা হলো:
বাংলা ব্যঞ্জন ধ্বনি গঠনে ফুসফুস থেকে নির্গত বাতাস মুখের ভেতরে প্রত্যক্ষ আ অপ্রত্যক্ষ বাক প্রতঙ্গের সংস্পর্শের জন্যে সম্পূর্ণরূপে বা আংশিকভাবে সাময়িক অবরুদ্ধ হয়ে বিভিন্ন শ্রেণির ধ্বনি গঠন করে। এই ধ্বনিগুলোই হলো স্পৃষ্ট বা স্পর্শ (Stop, Plosive) ব্যঞ্জন ধ্বনি।
স্পৃষ্ট ধ্বনি: উচ্চারণ স্থানে বায়ুপথ কিছুক্ষণের জন্য রুদ্ধ এবং পর মুহূর্তেই উন্মুক্ত হয়ে স্পৃষ্ট বা স্পর্শ ব্যঞ্জনধ্বনি গঠিত হয়।

উল্লিখিত প্রক্রিয়ায় বাংলায় ২০টি ব্যঞ্জনধ্বনি উচ্চারিত হয়। অর্থাৎ বাংলায় স্পৃষ্ট ব্যঞ্জন ধ্বনির সংখ্যা হলো বিশ। নিচের তালিকায় তা দেখানো হলো-
উল্লিখিত স্পৃষ্ট ধ্বনিগুলোকে ঘোষতা এবং প্রাণতা দিয়েও বিশ্লেষণ করা যায়। এই অনুযায়ী বাংলা স্পৃষ্ট ব্যঞ্জন ধ্বনিকে ঘোষ অল্প প্রাণ ও ঘোষ মহাপ্রাণ এবং অঘোষ স্বল্প প্রাণ ও অঘোষ মহাপ্রাণ এইভাবে ভাগ করা যায়।
স্বরতন্ত্রী গুলোতে । অনুরণনের সৃষ্টি হয়ে যে ধ্বনি উৎপন্ন হয় তাই ঘোষ ধ্বনি। বাংলায় ঘোষ ধ্বনি ১০টি। যথা:
/গ/,/ঘ/,/জ/, /ঝ/, /ড/, /ঢ/, /দ/, /ধ//ব/, /ভ/
/g/, /gh/, /j/, /jh/, /d/, /dh/, /d/, /dh/, /b/, /bh/
অন্যদিকে স্বরতন্ত্রীগুলো নিশ্চেষ্টভাবে থাকলে যে ধ্বনি উৎপন্ন হয় তাই অঘোষ ব্যঞ্জনধ্বনি। বাংলায় অঘোষ স্পৃষ্ট ধ্বনি ১০টি। যথাঃ
/ক/, /খ/, /চ/, /ছ/, /ট/, /ঠ/, /ত/, /থ/, /প/, /ফ/
/k/, /kh/, /c/, /ch/, /t/, /th/, / t/, /th/, /p/, /ph/,
মহাপ্রাণ স্পৃষ্ট ব্যঞ্জন ধ্বনি: ফুসফুস তাড়িত বাতাসের চাপ অধিক হলে মহাপ্রাণ স্পৃষ্ট ধ্বনির সৃষ্টি হয়। বাংলায় মহাপ্রাণ স্পৃষ্ট ধ্বনির সংখ্যা দশ। যথা:
/খ/, /ঘ/, /ছ/, /ঝ/, /ঠ/, /ঢ/, /থ/, /ধ/, /ফ/, /ভ/
/kh/, /gh/, /ch/, /jh/, /th/, /dh/, /th/, /dh/, /ph/, /bh/
স্বল্পপ্রাণ স্পৃষ্ট ব্যঞ্জন ধ্বনি: ফুসফুস তাড়িত বাতাসের চাপ স্বল্প হলে স্বল্পপ্রাণ ধ্বনির সৃষ্টি হয়। স্বল্প প্রাণ স্পৃষ্ট ব্যঞ্জন ধ্বনির সংখ্যাও দশ যথাঃ
/ক/, /গ/, /চ/, /জ/, /ট/, /ড/, /ত/, /দ/, /প/, /ব/
/k/, /g/, /c/, /j/, /t/, /d/, /t/, /d/, /p/, /b/
নাসিক্য ব্যঞ্জন ধ্বনিঃ বাংলা নাসিক্য ধ্বনি স্পৃষ্ট ধ্বনির ন্যায় বায়ুপথ সম্পূর্ণ রুদ্ধ অবস্থায় গঠিত হয়। তবে স্পৃষ্ট ধ্বসির সঙ্গে নাসিক্য ধ্বনির পার্থক্য আছে। নাসিক্য ধ্বনি গঠনে বায়ুপথ রুদ্ধ হলেও পিছনের তালুর পথ খোলা থাকে। তবে বাতাস অবরুদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও মুখ দিয়ে বের হতে না পেরে উচ্চারণের স্থানে জমা হয় না। বরং নাসিক্য গহ্বর দিয়ে বের হয়ে যায়। আর এই অবস্থায় যে ধ্বনি উচ্চারিত হয়, তাই নাসিক্য ধ্বনি। বাংলায় তিনটি নাসিক্য ব্যঞ্জন ধ্বনি রয়েছে। যথা:

তাড়নজাত ধ্বনি (Flap): জিভের ডগার উল্টো দিক ও দাঁতের গোড়ার সামান্য স্পর্শে এ ধ্বনির সৃষ্টি হয়। এ ধ্বনি উচ্চারণের সময় জিভের ডগা ও তালু মিলে তাড়ন বা কম্পনের সৃষ্টি করে। বাংলায় দু’টি তাড়নজাত ধ্বনি রয়েছে। যথা:

পার্শ্বিক ব্যঞ্জন ধ্বনি (Lateral): ফুসফুস তাড়িত বাতাস জিভের দু’পাশ দিয়ে নির্গত হয়ে যে ধ্বনি সৃষ্টি করে তাকে পার্শ্বিক ধ্বনি বলে। বাংলায় পার্শ্বিক ধ্বনির সংখ্যা মাত্র এক। যথা:
/ল/
/l/
উষ্ম বা শিস ধ্বনি (Spirant, Fricative) : ফুসফুস থেকে বাতাস বেরিয়ে যাবার সময় মুখ বিবরে ঘষা লেগে, চাপ খেয়ে বা সংকীর্ণভাবে উষ্ম বা শিস ধ্বনির সৃষ্টি হয়। বাংলায় শিস ধ্বনি তিনটি যথা:
নিচে বাংলা ব্যঞ্জন ধ্বনি মূলের একটি তালিকা দেওয়া হলঃ

+88 01713 211 910