
উচ্চারণ রীতি অনুযায়ী বাংলা ব্যঞ্জনধ্বনিগুলোর শ্রেণিবিভাগ
প্রসঙ্গ: উচ্চারণ রীতি অনুযায়ী বাংলা ব্যঞ্জনধ্বনিগুলোর ধ্বনিতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ।
বিশ্লেষণ: বাংলা ব্যঞ্জন ধ্বনি বিচার বা বিশ্লেষণের অন্যতম একটি মাপকাঠি হলো, উচ্চারণ রীতি। নিম্নে উচ্চারণ রীতি অনুযায়ী বাংলা ব্যঞ্জন ধ্বনিগুলোর ধ্বনিতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করা হলো-
বাংলা ব্যঞ্জন ধ্বনি গঠনে ফুসফুস থেকে নির্গত বাতাস মুখের ভেতরে প্রত্যক্ষ বা অপ্রত্যক্ষ বাক্ প্রতঙ্গের সংস্পর্শের জন্যে সম্পূর্ণরূপে বা আংশিকভাবে সাময়িক অবরুদ্ধ হয়ে বিভিন্ন শ্রেণির ধ্বনি গঠন করে এই ধ্বনিগুলোই হলো স্পৃষ্ট বা স্পর্শ (Stop, Plosive) ব্যঞ্জন ধ্বনি।
স্পৃষ্ট ধ্বনি: উচ্চারণ স্থানে বায়ুপথ কিছুক্ষণের জন্য রুদ্ধ এবং পর মুহুর্তেই উন্মুক্ত হয়ে স্পৃষ্ট বা স্পর্শ ব্যঞ্জনধ্বনিগঠিত হয়। অর্থাৎ যে প্রত্যঙ্গগুলো উচ্চারণে অংশগ্রহণ করে, ফুসফুস আগত বাতাস তার পিছনে এস জমা হয় এবং মহূর্তকাল পরেই অংশগ্রহণকারী প্রত্যঙ্গদুটোকে পৃথক করে দিয়ে সজোরে বের হয়ে যায়। বাতাস বের হওয়ার সময় দু’ঠোঁট কিংবা তালু ও জিভের যে অংশ এ ধরনের বিশেষ ধ্বনি উচ্চারণে অংশগ্রহণ করে, ফুসফুস চালিত বাতাস পিছন থেকে ধাক্কা দিয়ে সে দুটোকে সজোরে পৃথক করে দেয় ফলে স্পৃষ্ট ধ্বনির সৃষ্টি হয়।
বায়ু পথ রুদ্ধ হওয়ার ফলে স্পৃষ্ট ধ্বনি গঠনে তিনটি স্তর লক্ষ করা যায়। এগুরো হরো-
১। যখন প্রত্যক্ষ বাক প্রত্যঙ্গ উচ্চারণ স্থান স্পর্শ করে, তখন প্রাথমিকভাবে বায়ুপথ রুদ্ধ হয়ে যায়।
২। মধ্যবর্তী পর্যায়ে বাতাস হঠাৎ করে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। ফলে নৈঃশব্দ বিরাজ করে। তবে বাতাস পিছনে জমা থাকে।
৩। শেষ পর্যায়ে বাক প্রত্যঙ্গ উচ্চারণ স্থান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং অবরুদ্ধ বাতাস সজোরে বের হয়ে যায়।
উল্লিখিত প্রক্রিয়ায় বাংলায় ২০টি ব্যঞ্জন ধ্বনি উচ্চারিত হয়। অর্থাৎ বাংলায় স্পৃষ্ট ব্যঞ্জন ধ্বনির সংখ্যা হলো বিশ। নিচের তালিকায় তা দেখানো হলো-

উল্লিখিত স্পৃষ্ট ধ্বনিগুলোকে ঘোষতা এবং প্রাণতা দিয়েও বিশ্লেষণ করা যায়। এই অনুযায়ী বাংলা স্পৃষ্ট ব্যঞ্জণ ধ্বনিকে ঘোষ অল্প প্রাণ ও ঘোষ মহাপ্রাণ এবং অঘোষ স্পল্প প্রাণও অঘোষ মহাপ্রাণ এইভাবে ভাগ করা যায়।
কথা বলার সময় যখন ফুসফুস থেকে বাতাস বেরিয়ে আসে তখন স্বরতন্ত্রীগুরো কিছুটা বিশ্লিষ্ট হয়ে মুহুর্তের জন্য উন্মুক্ত এবং রুদ্ধ হলে সজোরে কিছুটা বাতাস বেরিয়ে আসে এবং স্বরতন্ত্রী গুলোতে অনুরণনের সৃষ্টি হয়, ফলে ঘোস ধ্বনি সৃষ্টি হয় বাংলায় ঘোষ ধ্বনি হলো ১০ টি। যথা-
/g/, /gh/, /j/, /jh/, /d/, /dh/, /d/, /dh/, /b/, /bh/
অন্যদিকে স্বরতন্ত্রীগুলো নিশ্চেষ্টভাবে থাকলে তাদের মধ্যে কিছুটা ফাঁকা থাকে এবং উন্মুক্ত পথ দিয়ে নিঃশব্দে বাতাস যাতায়াত করে। এই অবস্থায় অঘোষ ধ্বনির সৃষ্টি হয়। বাংলায় অঘোষ স্পৃষ্ট ধ্বনি ১০টি। যথা
/k/, /kh/, /c/, /ch/, /t/, /th/, / t/, /th/, /p/, /ph/,
মহাপ্রাণ স্পৃষ্ট ব্যঞ্জন ধ্বনিঃ ফুসফুস তাড়িত বাতাসের চাপ অধিক হলে মহাপ্রাণ স্পৃষ্ট ধ্বনির সৃষ্টি হয়। বাংলায় মহাপ্রাণ স্পৃষ্ট ধ্বনির সংখ্যা দশ। যথাঃ
/kh/, /gh/, /ch/, /jh/, /th/, /dh/, /th/, /dh/, /ph/, /bh/
স্বল্পপ্রাণ স্পৃষ্ট ব্যঞ্জন ধ্বনিঃ ফুসফুস তাড়িত বাতাসের চাপ স্বল্প হলে স্বল্পপ্রাণ ধ্বনির সৃষ্টি হয়। স্বল্প প্রাণ স্পৃষ্ট ব্যঞ্জন ধ্বনির সংখ্যাও দশ। যথাঃ /k/, /g/, /c/, /j/, /t/, /d/, /t/, /d/, /p/, /b/
নাসিক্য ব্যঞ্জন ধ্বনিঃ বাংলা নাসিক্য ধ্বনি স্পৃষ্ট ধ্বনির ন্যায় বায়ুপথ সম্পূর্ণ রুদ্ধ অবস্তায় গঠিত হয়। তবে স্পৃষ্ট ধ্বনির সঙ্গে নাসিক্য ধ্বনিরপার্থক্য আছে। নাসিক্য ধ্বনি গঠনে বায়ুপথ গঠনে বায়ুপথ রুদ্ধ হলেও পিছনের তালুর পথ খোলা থাকে। তবে বাসাত অবরুদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও মুখ দিয়ে বের হতে না পেরে উচ্চারণের স্থানে জমা হয় না। বরং নাসিক্য গহ্বর দিয়ে বের হয়ে যায়। আর এই অবস্থায় যে ধ্বনি উচ্চারিত হয়, তাই নাসিক্য দ্বনি। বাংলায় তিনটি নাসিক্য ব্যঞ্জন ধ্বনি হয়েছে। যথাঃ-

উল্লিখিত নাসিক্য ধ্বনিসমূহ গঠনের সময় মৌখিক অনুদায়ের পার্থক্যের জন্য ভিন্নতর শ্রুতিগত বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়। তাছাড়া বাক প্রত্যঙ্গেও বিভিন্ন প্রকার আলোড়ন দেখা যায়। /ম/, ধ্বনি উচ্চারণের সময় ঠোঁটে দুটো বন্ধ থাকে। এ ধ্বনি উচ্চারণে জিভের অবস্তান তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। /ন/, উচ্চারণের সময় মৌখিক অবরোধ লক্ষণীয়। এ ধ্বনি উচ্চারণে নরম তালুও নিচে নেমে আসে। /ঙ/, ধ্বনি উচ্চারণের সময়ও নরম তালু নিচে নেমে আসে।
তাড়নজাত ধ্বনি (Flap)ঃ জিভের ডগায় উল্টো দিক ও দাঁতের গোড়ায় সামান্য স্পর্শে এ ধ্বনির সৃষ্টি হয়। এ ধ্বনি উচ্চারণের সময় জিভের ডগা ও তালু মিলে তাড়ন বা কম্পনের সৃষ্টি করে । বাংলায় দু’টি তাড়নজাত ধ্বনি রয়েছে। যথাঃ-

/ড়/, উচ্চারণের সময়, /র/-এর সমান বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা গেলেও উভয়ের মধ্যে স্বাতন্ত্র্য বিদ্যমান। /ড়/ উচ্চারণের সময় জিভের ডগা পুর্ব তালুর অংশ স্পর্শ করে।
পার্শ্বিক ব্যঞ্জন ধ্বনি()ঃ পার্শ্বিক ধ্বনি গঠনের সময় মুখ বিবরের মধ্যখানের বাতাস সম্পুর্ণ রুদ্ধ হয়ে পড়ে। কিন্তু পরক্ষনেই জিভের উভয় পাশ দিয়ে বের হয়ে যায়। আর এই প্রক্রিয়ায় যে ধ্বনি উচ্চারিত হয় তাকে পার্শ্বিক ধ্বনি বলে। অন্য কথায় ফুসফুস তাড়িত বাতাস জিভের দু’পাশ দিয়ে নির্গত হয়ে যে ধ্বনি সৃষ্টি করে তাকে পার্শ্বিক ধ্বনি বলে। বাংলায় পার্শ্বিক ধ্বনির সংখ্যা মাত্র এক। যথাঃ- /1, ল/।
উষ্ম বা শিস ধ্বনি (Spirant, Fricative)ঃ ফুসফুস থেকে বাতাস বেরিয়ে যাবার সময় মুখ বিবরে ঘষা লেগে, চাপ খেয়ে বা সংকীর্ণভাবে উষ্ম বা শিস ধ্বনির সৃষ্টি হয়। এ ধ্বনি উচ্চারণে ওষ্ঠ্য ও জিহ্বা ঈষৎ প্রসৃত হলে প্রশস্ত (Slit) এবং জিহ্বা কুঞ্চিত হলে সংর্কীণ(groove) উষ্মধ্বনির সৃষ্টি হয় বলে।
স্পৃষ্ট ধ্বনি উচ্চারণে শ্বাস পথ সম্পূর্ণরূওপ এবং উষ্মধ্বনি উচ্চারণের শ্বাস বায়ু আংশিক রূপে বাধাপ্রাপ্ত হয়। বাংলায় শিস ধ্বনি তিনটি যথাঃ / S/(স), š / (শ ষ), /h/(হ)
নিচে বাংলা ব্যঞ্জন ধ্বনি মুলের একটি তালিকা দেওয়া হলঃ

+88 01713 211 910