
স্বরধ্বনি কাকে বলে? স্বরধ্বনি বিচারের মাপকাঠি কয়টি ও কী কী? ঐ সব মাপকাঠিতে বাংলা স্বরধ্বনিগুলোর বিচার
প্রশ্ন: স্বরধ্বনি কাকে বলে? স্বরধ্বনি বিচারের মাপকাঠি কয়টি ও কী কী? ঐ সব মাপকাঠিতে বাংলা স্বরধ্বনিগুলোর বিচার কর।
উত্তর: ব্লুমফিল্ড স্বরধ্বনির সংজ্ঞা দিতে যেয়ে বলেছেন -
‘Vowels are modifications of the voice sound that involve no closure, friction or contact of the tongue or lips .’
জিহ্বা বা ঠোঁটের সঙ্গে কোনরূপ স্পর্শ ছাড়া অর্থাৎ বিনা বাধায় ঘোষবৎ যে সব ধ্বনি উচ্চারিত হয়, সেগুলোই হল স্বরধ্বনি। স্বরধ্বনি অবশ্য অঘোষও গতে পারে।
স্বরধ্বনি বিচার ও শ্রেণি বিস্যাসের প্রধান মাপকাঠি তিনটি-
১। জিহ্বার অংশ
২। জিহ্বার উচ্চতা
৩। ঠোঁটের অবস্থা
এছাড়া পেশীসমূহের আপেক্ষিক অবস্থা বিচার করেও স্বরধ্বনি বিচার বা শ্রেণি বিন্যাস করা চলে। ব্লক এবং ট্রেগার স্বরধ্বনি বিচারের মাপকাঠি নির্দেশ করে লিখেছেন -
" There are three interacting criteria : The part of the tongue which acts articulator the height to which the tongue is raised and the position of the lips."
প্রথম মাপকাঠি: জিহ্বার অংশ
এই মাপকাটি অনুসারে স্বরধ্বনি জিহ্বর সম্মুখ মধ্য বা পশ্চাৎ কোন অংশ থেকে উচ্চারিত হচ্ছে তা বিচার্য এবং তদুনুসারে স্বরধ্বনির শ্রেণি বিন্যাস করা হয়।
জিহ্বার সম্মুখ অংশ থেকে উচ্চারিত স্বরধ্বনি সমূহকে সম্মুখ স্বরধ্বনি বলা হয়। সম্মুখ স্বরধ্বনি উচ্চারণে জিহ্বার সম্মুখ ভাগ শক্ত তালুর বিভিন্ন অংশের দিকে বিভ্ন্নি কৌণিকে উত্তোলিত হয়। বাংলায় তিনটি সম্মুখ স্বরধ্বনি রয়েছে।
/i/, /e/, /æ/
/ই/, /এ/, /অ্যা/
জিহ্বার মধ্য অংশ থেকে উচ্চারিত স্বরধ্বনি সমুহকে মধ্য স্বরধ্বনি বলা হয়। মধ্য স্বরধ্বনি উচ্চারণে জিহ্বার মধ্যবর্তী অংশ তালুর কেন্দ্রভাগের দিকে উত্তোলিত হয়। বাংলায় মধ্য স্বরধ্বনি একটি-/a/ /আ/
জিহ্বার পশ্চাৎ ভাগ থেকে উচ্চারিত স্বরধ্বনিসমূহকে পশ্চাৎ স্বরধ্বনি বলা হয়। পশ্চাৎ স্বরধ্বনি উচ্চারণের জিহ্বার পশ্চাৎ অংশ নরম তালুর দিকে উত্তোলিত হয়। বাংলায় পশ্চাৎ স্বরধ্বনির সংখ্যা তিনটি-
/u/, /o/, /כ /
/উ/, /ও/, /অ/
এই মাপকাঠি অনুসারে বাংলা স্বরধনি সমূহকে নিম্ন লিখিত ছকের মাধ্যমে দেখানো যায়-

দ্বিতীয় মাপকাঠি: জিহ্বার উচ্চতা
এই মাপকাঠি অনুসারে স্বরধ্বনি উচ্চারণের সময় জিহ্বা যে উত্তোলিত হয়েছে তার উচ্চতার পরিমাপ কতটুকু তা বিচার্য। জিহ্বার উচ্চতাকে উচ্চতার পরিমাপের দিক থেকে প্রধানত চার ভাগে বিভক্ত করা চলে। যথা: উচ্চ, উচ্চ মধ্য, নিম্ন মধ্য, এবং নিম্ন।
১। উচ্চ অবস্থায় জিহ্ববা মুখ গহ্বরের উপরিভাগের কোন অংশের দিকে সবচেয়ে বেশি উচু হয় এবং এভাবে গঠিত স্বরধ্বনিকে উচ্চ স্বরধ্বনি বলা হয় । বাংলায় দুটি উচ্চ স্বরধ্বনি রয়েছে-/ই/ , /উ/
২। উচ্চ মধ্য স্বরধ্বনি গঠনে জিভ উচ্চ স্বরধ্বনির চেয়ে সামান্য নিচুতে অবস্থান করে; এই প্রক্রিয়ায় বাংলায় /এ/, /ও/ স্বরধ্বনি গঠিত হয়ে থাকে।
৩। নিম্ন স্বরধ্বনি গঠনের সময় জিভ অপেক্ষাকৃত নিচে নেমে আসে এবং জিহ্বা প্রায় চ্যাপ্টা অবস্থায় থাকে। বাংলায় নিম্ন স্বরধ্বনি একটাভ যথা-/আ/
৪। নিম্নমধ্য স্বরধ্বনি গঠনের সময় জিভ নিম্ন স্বরধ্বনির চেয়ে উচুঁতে এবং উচ্চ মধ্য স্বরধ্বনির তুলনায় নিচে অবস্থান করে। বাংলায় নিম্ন মধ্য স্বরধ্বনি হচ্ছে / /æ/, /כ/
এই মাপকাঠি অনুসারে বাংলা স্বরধ্বনি সমূহকে নিম্ন ছকের মাধ্যমে সাজানো যায়-

তৃতীয় মাপকাঠি: ঠোঁটের অবস্থা
এই মাপকাঠি অনুসারে স্বরধ্বনি উচ্চারণের সময় ঠোঁট কি আকার ধারণ করে তা বিচার করা হয়।
স্বরধ্বনি উচ্চারণের ঠোঁট দুইটি নির্লিপ্ত থাকতে পারে কিংবা প্রসৃত হতে পারে, আবার গোলাকৃতি হয়ে বড় বা ছোট বৃত্তাকারে বাতাস বেরিয়ে যাবার পথ সৃষ্টি করে দিতে পারে।
ঠোঁট দুটির প্রসৃত অবস্থায় যে সব স্বরধ্বনি উচ্চারিত হয় সে সব স্বরধ্বনিকে প্রসৃত স্বরধ্বনি বলে। বাংলায় তিনটি প্রসৃত স্বরধ্বনি রয়েছে। যথা- /ই/,/এ/,/এ্যা/
যে সব স্বরধ্বনি উচ্চারণের সময় ঠোঁট দুইটি গোল রূপ ধারণ করে বাতাস বের করে দেয় সে সব স্বরধ্বনিকে গোলাকৃতি স্বরধ্বনি বলে। বাংলায় গোলাকৃতি স্বরধ্বনি সংখ্যা তিন- /উ/, /ও/,/অ/
উপর্যুক্ত বিভাজনটি ছিলো ঠোঁট কি আকার ধারন করে তার উপরভিত্তি করে। এছাড়া ঠোঁটের অবস্থা বিচার করে, স্বরধ্বনিকে সংবৃত, অসংবৃত, অর্ধ বিবৃত এবং বিবৃত এই চার ভাগে ভাগ করা সম্ভব। বাংলায় সংবৃত স্বরধ্বনি দুইটি-/ই/,/উ/ অর্ধ সংবৃত দুইটি-/এ/, /ও/,
অর্ধ বিবৃত দুটি-/এ্যা/ /অ/ এবং বিবৃত একটি-/আ/।
এই মাপকাঠি অনুসারে বাংলা স্বরধ্বনি সমূহকে নিম্ন ছকের মাধ্যমে সাজানো যায়:

চতুর্থ মাপকাঠি:
উল্লিখিত মাপকাঠিগুলো ছাড়াও স্বরধ্বনি উচ্চারণে পেশী সমূহকে আপেক্ষিত অবস্থান বিচার করে স্বরধ্বনিকে দৃঢ় এবং শিথিল এ দু’শ্রেণীতে বিভক্ত করা চলে। পেশী সমূহের আপেক্ষিক অবস্থা অনুসারে উচ্চ, উচ্চমধ্য, স্বরধ্বনি সমূহকে দৃঢ় এবং নিম্ন ও নিম্ন মধ্য স্বরধ্বনি সমূহকে শিথিল এই দুই শ্রেণিতে বিভক্ত করা যায়। বস্তুত উপর্যুক্ত মাপকাঠিগুলোর মাধ্যমেই বাংলা স্বরধ্বনি সমূহকে বিচার করা হয়ে থাকে। উপযুক্ত বিচারের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলা স্বরধ্বনি গুলোর বৈশিষ্ট্য দাড়ায় নিম্নরূপ:
/ই/ এটি একটি সম্মুখ, প্রসৃত, উচ্চ এবং সংবৃত স্বরধ্বনি।
/এ/ এটি একটি সম্মুখ, প্রসৃত, উচ্চ সধ্য এবং অর্ধ সংবৃত স্বরধ্বনি।
/এ্যা/ এটি একটি সম্মুখ, প্রসৃত, নিম্ন মধ্য এবং অর্ধ বিবৃত স্বরধ্বনি ।
/আ/ এটি একটি মধ্য, নিরপেক্ষ, নিম্ন এবং বিবৃত স্বরধ্বনি।
/ অ / এটি একটি পশ্চাৎ, নিম্ন মধ্য, গোলাকৃত এবং অর্ধ বিবৃত স্বরধ্বনি।
/ও/ এটি একটি পশ্চাৎ গোলাকৃতি উচ্চ মধ্য এবং অর্ধ সংবৃত স্বরধ্বনি।
/উ/ এটি একটি পশ্চাৎ গোলাকৃতি উচ্চ এবং সংবৃত স্বরধ্বনি।
+88 01713 211 910