
অগ্নিবীণা কাব্য অবলম্বনে নজরুলের ঐতিহ্য চেতনার স্বরূপ
প্রসঙ্গ : অগ্নিবীণা কাব্য অবলম্বনে নজরুলের ঐতিহ্য চেতনার স্বরূপ বিশ্লেষণ কর।
উত্তর: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৮৬১-১৯৪১ পর, বাংলা সাহিত্যে, কাজী নজরুল ইসলাম ১৮৯৯-১৯৭৬ যথার্থ অর্থেই প্রথম মৌলিক কবি। বিষয় ভাবনা ও শিল্প-শৈলীর দিক থেকে তিনি বাংলা কাব্যের ইতিহাসে এক স্বতন্ত্র ধারার স্রষ্টা। ‘অগ্নিবীণা’ ১৯২২ কাব্যের মাধ্যমেই তিনি এই নব-ধারার সূচনা করেন। ‘অগ্নিবীণা’ ১৯২২ নজরুল ইসলামের প্রথম এবং সর্বাপেক্ষা উজ্জ্বল কাব্য গ্রন্থ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে পৃথিবী ব্যাপী সার্বিক অবক্ষয় এবং ভারতের স্বাধিকার আন্দোলনের রাজনৈতিক পট্ভূমিতে রচিত হয়েছে আলোচ্য কাব্য। পরাধীনতার বন্ধন থেকে মুক্তির প্রত্যাশায় সচেতন ভারতবাসী যখন অবতীর্ণ হয়েছে কঠিন সংগ্রামে, ঠিক তখনি অগ্নিবীণায় বিদ্রোহের সুরমূর্ছনা তুললেন নজরুল। বস্তুত, ভাবপরিমন্ডল, জীবনদৃষ্টি এবং শিল্প-শৈলীর প্রশ্নে ‘অগ্নিবীণা’ বাংলা কাব্য ধারায় এক সম্পূর্ণ নতুন নির্মাণ।
ঔপনিবেশিক শোষণ, সামন্ত-মূল্যবোধ এবং ধমীর্য় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সচেতন বিদ্রোহী রূপে অগ্নিবীণা কাব্যে আত্মপ্রকাশ করেছেন নজরুল। রোমান্টিক অনুভবের মধ্যদিয়ে মানবতার স্বপক্ষে তিনি উচ্চারণ করেছেন বিদ্রোহের বাণী। সত্য, সুন্দর ও মঙ্গলের আকাঙক্ষায় তিনি বিদ্রোহী ঘোষণা করেছেন যাবতীয় অপশক্তির বিরুদ্ধে। বিদ্রোহ করেছেন ধমীর্য় গোড়ামী, সকল প্রকার শোষণ ও জীর্ণ-সনাতন মূল্যবোধের বিরুদ্ধে। কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর এই বিদ্রোহ চেতনাকে বাস্তব রূপ দেয়ার জন্যই পুরাণ ও ঐতিহ্যের শরণ নিয়েছেন। তাঁর এই ঐতিহ্য দু ধারায় বিভক্ত-ভারতীয় পূরাণ বা ঐতিহ্য এবং পশ্চিম এশিয়া বা মুসলিম ঐতিহ্য। তাঁর এই এক ঐতিহ্য থেকে আরেক ঐতিহ্যে অবগাহনের পিছনে একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য ছিল। এই উদ্দেশ্য হলো সমাজ বিনির্মাণের জন্য বিদ্রোহের স্বপক্ষে শক্তি সঞ্চার করা।
অগ্নিবীণা কাব্যে নজরুলের অন্যতম স্বাতন্ত্র্য এই যে, ভারতীয় পুরাণ এবং পশ্চিম এশীয় ঐতিহ্য ব্যবহারে তিনি অর্জন করেছেন সমান সাফল্য। নজরুল জন্ম সূত্রে ভারতীয় তাই ভারতীয় উত্তরাধিকারকে তিনি আপন উত্তরাধিকার বলেই জেনেছেন এবং গ্রহণ করেছেন। অপরদিকে ধর্ম সূত্রে তিনি ছিলেন পশ্চিম এশীয় তথা অতীত গৌরব ও ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী। তিনি সচেতন ভাবেই উভয় ঐতিহ্যকে লালন করেছেন আপন কবি সত্তায়।
নজরুল তাঁর কবিতায় পুরাণ ব্যবহার করেছেন একদিকে ঔপনিবেশিক সমাজকে ভাঙার উদ্দেশ্যে অন্যদিকে সেই ভাঙনের মধ্যদিয়েই নতুন সৃষ্টির আকাঙ্ক্ষায়। এ ক্ষেত্রে নটরাজ শিব এবং দুর্গার চিত্রকল্পে উপস্থাপিত হয়েছে তাঁর পূরাণ স্মরণের দ্বৈত উদ্দেশ্য। কেননা, শিব এবং দুর্গা দুটি পৌরাণিক চরিত্রেই আছে ধ্বংস ও সৃষ্টির যুগল অনুষঙ্গ।
অগ্নিবীণা কাব্যের যে সমস্ত কবিতায় ভারতীয় ঐতিহ্য ও পুরাণের সফল রূপায়ণ ঘটেছে সেগুলো হলো- ‘প্রলয়োল্লাস’, ‘বিদ্রোহী’, ‘রক্তাম্বরধারিণী মা’, ‘আগমনী’ ও ‘ধুমকেতু’। প্রলয়োল্লাস কবিতায় কবি শিবের নটরাজ মূর্তির চিত্রকল্পে উপস্থাপন করেছেন তাঁর মানস আকাঙ্ক্ষায়
“ঐ ভাঙা –গড়া খেলা যে তার কিসের তরে ডর?
তোরা সব জয়ধ্বনি কর।
বধুরা প্রদীপ তুলে ধর।
কাল ভয়ঙ্করের বেশে এবার ঐ আসে সুন্দর
তোরা সব জয়ধ্বনি কর।”
‘বিদ্রোহী’ কবিতায়ও আছে এই শিব-স্মরণ। শৈব-মিথিক অনুষঙ্গে এখানে কবি ছড়িয়ে দিয়েছেন বিদ্রোহের আগুন, সৃষ্টির উল্লাস।
নটরাজ শিব যেমন নজরুলকে উদ্দীপ্ত করেছে তেমনি আদ্যশক্তি দুর্গাও করেছে উদ্দীপ্ত। অগ্নিবীণা কাব্যের ‘রক্তাম্বরধারিণী মা’ এবং ‘আগমনী’ কবিতায় আছে দুর্গার চন্ডীরূপ, আর তার সৃষ্টিশীলতার অনুষঙ্গ। সমকালীন অবক্ষয় এবং বিপন্নতা অতিক্রমের বাসনায় দুর্গার দ্বৈত সত্তা আকাঙক্ষা করেছেন নজরুল-
“শ্বেত-শতদল বাসিনী নয় আজ
রক্তাম্বরধারিণী মা
ধ্বংসের বুকে হাসুক মা তোর
সৃষ্টির নবপূর্ণিমা।”
পুরাতনকে ভেঙ্গে নবসৃষ্টির আকাঙক্ষায় নজরুল তাঁর ‘অগ্নিবীণা’ কাব্যের যে সমস্ত কবিতায় মুসলিম ইতিহাস ও ঐতিহ্যের রূপায়ণ ঘটিয়েছেন সেগুলো হলো-‘কামালপাশা’ ‘আনোয়ার’, ‘শাত-ইল-আরব’, ‘খেয়াপারের তরণী’, ‘কোরবানী’ ও ‘মোহররম’।
‘কামালপাশা’ কবিতায় কবি আধুনিক তুরঙ্কের জনক কামাল পাশার স্মরণ করেছেন। কামাল পাশা যেমন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সকল প্রকার শৃঙখল থেকে জাতিকে মুক্ত করেছেন; নজরুলের প্রত্যাশা, ভারতীয় যুব সমাজও তেমনি জাতিকে ঔপনিবেশিক শৃঙখল থেকে মুক্ত করুক। তাই তিনি উচ্চারণ করেছেন-
‘ঐ ক্ষেপেছে পাগলী মায়ের দামাল ছেলে কামাল ভাই,
অসুর-পুরে শোর উঠেছে জোরসে সামাল সামাল তাই
কামাল তুনে, কামাল কিয়া ভাই।।’
‘কামাল পাশা’র ন্যায় ‘আনোয়ার’ এবং ‘রণ-ভেবী’ কবিতা দু’টিও তুরস্কের ঘটনাকে নিয়ে রচিত হয়েছে। কবিতা দু’টির মূল আবেগ হলো-পৌরুষ বলিষ্ঠতা ও স্বাধীনতার আবাহন এবং ভীরুতা ও কাপুরুষতার প্রতি ঘৃণা প্রকাশ। আবার ‘কোরবানী’ কবিতায় যুব সমাজকে বিদ্রোহ-সম্ভব করে তোলার লক্ষ্যে ইব্রাহীমের ত্যাগ ধর্মে উদ্বুদ্ধ হতে আহ্বান জানিয়েছেন-
‘ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্য-গ্রহ’ শক্তির উদ্বোধন’
‘মোহররম’ কবিতায়ও কবি ত্যাগের আহবান জানিয়েছেন। তাছাড়া এ কবিতায় কবি শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। এই কবিতায় কবির দৃঢ় বিশ্বাস, শোককে শক্তিতে পরিণত করতে পারলেই দেশের মুক্তি হবে ত্বরাণ্বিত।
‘শাত-ইল-আরব’ কবিতায়ও ইসলামী ঐতিহ্যের যথার্থ রূপায়ণ ঘটেছে। এখানে কবি ইরাকের পরাধীনতার সাথে স্বীয় দেশের পরাধীনতাকে এক করে দেখেছেন এবং এই পরাধীনতা থেকে মুক্তিও প্রত্যাশা করেছেন আলোচ্য কবিতায়।
ইসলামী ঐতিহ্য রূপায়ণে ‘খেয়াপারের তরণী’ কবিতাটিও বিশেষ গুরুত্ববহ। এই কবিতায় কবি ইসলামের স্থপতি হযরত মোহাম্মদ সা. এবং তাঁর খলিফার প্রসঙ্গ উত্থাপন করেছেন এবং তাদের উত্থাপনের মধ্য দিয়ে কবি ভারতীয় যুবসমাজের মনে শক্তি সঞ্চারিত করতে চেয়েছেন। আর এ শক্তির উপর ভর করেই কবি এদেশ থেকে সকল প্রকার অন্যায় অত্যাচার বিতাড়িত করতে চান। তবে প্রতীকের মধ্য দিয়েই কবি তাঁর এ বক্তব্যকে উপস্থাপন করেছেন-
“নি:শেষে নিশাচর গ্রাসে মহাবিশ্বে
ত্রাসে কাঁপে তরণীর পাপী যত নি:শ্বে।”
বস্তুত, কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন জনজীবন সম্পৃক্ত কবি। তাই তাঁর ঐতিহ্যবোধও ছিল জীবন সম্পৃক্ত। অতীত ইতিহাস এবং ঐতিহ্যকে তিনি অন্ধভাবে অনুসরণ করেন নি বরং সৃষ্টি করেছেন নতুন ভাবে; নতুন জীবন ভাবনায়। ব্যাপক ঐতিহ্যের অধিকারী ছিলেন বলেই নজরুল একই সঙ্গে ভারতীয় পুরাণ এবং পশ্চিম এশীয় ইতিহাস ও ঐতিহ্য ব্যবহারে অর্জন করেছেন পরম সিদ্ধি।
ড. এ. আই. এম. মুসা
বাংলা বিভাগ
সরকারি বেগম রোকেয়া কলেজ
+88 01713 211 910