
সিরাজউদ্দৌলা নাটক: সিরাজ চরিত্র
সিরাজ চরিত্রের বৈশিষ্ট্য :
সিকান্দার আবু জাফর-এর কালজয়ী সৃষ্টি সিরাজউদ্দৌলা (১৯৬৫) নাটক । আলোচ্য নাটকে নাট্যকার সিরাজকে জাতীয় বীরের আদর্শ হিসাবে আমাদের সম্মুখে তুলে ধরেছেন।
সাম্রাজ্যবাদের পোষক ও ইংরেজদের খয়ের খাঁ শ্রেণীর ঐতিহাসিক ইংরেজ ঐতিহাসিকগণ সিরাজকে কলঙ্কিত করে অঙ্কন করেছেন । কিন্তু উত্তরকালে নিরপেক্ষ গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, সিরাজ ছিলেন স্বাধীনচেতা স্বদেশ প্রেমিক প্রজাবৎসল শাসক এবং অন্যান্য মানবীয় সদগুণে বিভূষিত আদর্শ মানুষ। সিকান্দার আবু জাফর শেষোক্ত সিরাজকেই আলোচ্য নাটকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন । এ প্রসঙ্গে নাট্যকারের বক্তব্য স্মরণীয় -
জাতীয় চেতনা নতুন খাতে প্রবহিত হয়েছে । কাজেই নতুন মুল্যবোধের তাগিদে ইতিহাসের বিভ্রান্তি এড়িয়ে ঐতিহ্য এবং প্রেরণার উৎস হিসাবে সিরাজ-উ-দ্দৌলাকে আমি নুতন দৃষ্টিকোণ থেকে আবিস্কারের চেষ্টা করেছি'
আলোচ্য নাটকে সিরাজ তাই একই সাথে সাহসী ও বীর সৈনিক, বিচক্ষণ সেনাপতি ও যোদ্ধা, স্বদেশ প্রেমিক ও প্রজাবৎসল নৃপতি, বিনয়ী, ভদ্র, উদার ও ধর্মভীরু শাসক, দরদী প্রাণ ও পত্নী প্রেমিক আদর্শ মানুষ । বস্তুত একজন পূর্ণাঙ্গ শাসক এবং পরিপুর্ণ মানুষ হিসাবেই সিরাজকে নাট্যকার আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন।
সিরাজ ছিলেন সাহসী যোদ্ধা এবং জাতীয় বীর । অথচ ইংরেজ দাক্ষিণ্যে লালিত ঐতিহাসিকগণ সিরাজকে ভীরু ও কাপুরুষ হিসাবেই আমাদের সামনে তুলে ধরে ছিলেন । কিন্তু সিকানদার আবু জাফর সিরাজ-উ-দ্দৌলা নাটকে সিরাজের অসীম সাহসিকতা ও বীরত্বকেই উন্মোচিত করেছেন অত্যন্ত শিল্প – সফল ভাবে । আলোচ্য নাটকে সিরাজ ছিলেন অকুতভয়, অদম্য সাহসী এবং পরিণাম ভীতি শুন্য যোদ্ধা । সিরাজ এবং বীরের ন্যায় উচ্চারণ করেন –
বাংলার বুকে দাঁড়িয়ে বাঙ্গালীর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরার স্পর্ধা ইংরেজ পেলো
কোথা থেকে আমি তার কৈফিয়ত চাই।” [প্রথম অংক/প্রথম দৃশ্য
সিকানদার আবু জাফরের সিরাজ দেশাত্ববোধেও অনন্য । সিরাজের পূর্ব পুরুষগণ অবাঙ্গালি হলেও সিরাজ ছিলেন মনে- প্রাণে ও আচরণে বাঙ্গালী। তিনি বাংলার আকাশ- বাতাস, ফুল-ফল, পশু-পাখি, আলো-পানি, মাটি আর এ আত্মীয় । এই দেশ এবং দেশবাসীর কল্যাণই ছিল তার পরম প্রত্যাশার বস্তু দেশাত্মবোধের এই ঐশী সত্তার সিরাজ ছিলেন সুস্তির স্তিতধী।
শুধু তাই নয় সিকানদার আবু জাফর সিরাজকে একজন যথার্থ প্রজাবৎসল নৃপতি হিসাবেও নির্মাণ করেছেন। অথচ ইংরেজ ঐতিহাসিক গণ সিরাজকে নিষ্ঠুর ও প্রজা- পীড়নকারী হিসাবেই ইতিহাসে স্থান দিয়ে ছিলেন । কিন্তু প্রকৃত পক্ষে সিরাজ ছিলেন প্রজা সাধারণের কল্যাণে নিবেদিত প্রাণ । ব্যক্তিগত জীবনের সুখ - সুবিধার চেয়ে প্রজাদের সুখ- সুবিধাই ছিল তার কাছে বড় !
আমার নালিশ আজ আমার নিজের বিরুদ্ধে। বিচারক আপনারা । বাংলার প্রজা সাধারণের সুখ- স্বাচ্ছন্দ্য বিধান করতে পারিনি বলে আমি তাদের কাছে অপরাধী । আজ সেই অপরাধের জন্যে আপনাদের কাছে আমি বিচার প্রার্থী।” [ দ্বিতীয় অংক/ প্রথম দৃশ্য
সিরাজকে সিকানদার আবু জাফর চিত্রিত করেছেন স্বাধীনচেতা আদর্শ নৃপতি হিসাবে । দেশের স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্বই ছিল তার কাছে একান্ত কাম্য । তাই এ স্বাধীনতা রক্ষার জন্যই তিনি পলাশীর যুদ্ধে অবতীর্ণ হন ।
তাছাড়া সিরাজ ছিলেন একজন আদর্শ শাসক। একজন আদর্শ শাসকের পরিপূর্ণ গুণ দিয়েই সিকানদার আবু জাফর সিরাজ চরিত্রকে অলঙ্কৃত করেছেন । দেশ পরিচালনা ও প্রজা- প্রতিপালনসহ সবকিছুতেই সিরাজ ছিলেন একজন আদর্শ শাসকের দৃষ্টান্ত স্বরূপ। তাই পলাশীর প্রান্তরে চরম বিপর্যয়ের সময় ও দেশের স্বার্থে উৎসর্গকৃত মীর মর্দানের লাশ দাফন করার কথা ভুলেন না ।
সিরাজ ছিলেন অত্যন্ত নম্র ও বিনয়ী চরিত্রের লোক । তিনি আচরণে উগ্র এবং দুর্বিনীতি ছিলেন না । সম্মানী ব্যক্তিদের প্রতি ছিল তার অসাধারণ শ্রদ্ধা। দেশের মঙ্গলের জন্য রাজ দরবারে তাকে কখনও কখনও উত্তেজিত দেখা গেলেও তা ছিল সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত
সিকান্দার আবু জাফর সিরাজকে সরল এবং উদার প্রকৃতির ব্যক্তিত্ব হিসাবেও চিত্রিত করেছেন । সিরাজ ছিলেন বয়সে তরুণ । ফলে তারণ্যের উচ্ছাস এবং সারল্য তার চরিত্রে পূর্ণভাবে সক্রিয় ছিল। রাজ অমাত্যগণ তার বিরুদ্ধে গভীরতর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত জেনেও তিনি তাদের প্রতি কঠোর হন নি । বরং দেশ -প্রেম নৈতিকতা, ধৈর্যের বাণী এবং ভালোবাসা দিয়ে তাদেরকে সৎপথে ফিরিয়ে আনতে চেয়ে ছিলেন ।
প্রকৃতপক্ষে সিরাজ ছিলেন পরিপূর্ণভাবে একজন ধর্মভীরু মানুষ । ইসলাম ধর্মের প্রতি তাঁর ছিল অবিচল আস্থা ও বিশ্বাস । ইসলামী শরীয়তের প্রতিটি বিধান তিনি অনুপুঙ্খভাবে মেনে চলেছেন । মৃত্যুর সময় ও তিনি পরম করুণাময়ের কথা ভোলেন নি । পরম মমতায় উচ্চারণ করেন-
“ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ-- -”[চতুর্থ অংক/দ্বিতীয় দৃশ্য
বস্তুত সিরাজ-উ-দ্দৌলা, নাটকে সিরাজ চরিত্র নির্মাণে সিকানদার আবু জাফর ছিলেন লক্ষ্যমুখী। সে লক্ষ্য অর্জনে তিনি সফল হয়েছেন। ঔপনিবেশিক চক্রান্তের বিপরীতে তিনি সিরাজকে ধর্ম ও নৈতিক আদর্শে বিভূষিত করেছেন । শুধু তাই নয় সিরাজের মধ্যে সকল প্রকার মানবীয় সদগুণের সমাবেশ ঘটিয়ে তাকে জাতীয় বীর এবং জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসাবে করেছেন সুপ্রষ্ঠিত ।
+88 01713 211 910