
সিরাজউদ্দৌলা নাটক: ঐতিহাসিকতা
প্রশ্ন: ঐতিহাসিক নাটক হিসেবে সিরাজউদ্দৌলা নাটকের সার্থকতা বিচার কর।
অনেক সমালোচক এ মন্তব্য করেন যে সিকানদার আবু জাফর যে পরিমাণ ইতিহাস সচেতন ছিলেন, সে পরিমাণের নাট্য সচেতন ছিলেন না সমালোচকদের এ মন্তব্য অনেকাংশেই যে যথার্থ নয়, তা আমরা এ প্রবন্ধে নিরুপনের প্রয়াসপাব । বস্তুত, পলাশীর কাহিনীকে আশ্রয় করে একটি সার্থক ঐতিহাসিক নাটক রচনায় সিকানদার আবু জাফর ছিলেন যেমন স্তিতধী তেমনি শিল্প সফলতার প্রশ্নেও তিনি ছিলেন লক্ষ্যমুখী।
ঐতিহাসিক নাটক হিসেবে সিরাজ-উ-দ্দৌলার সার্থকতা নিরুপনের পূর্বে ঐতিহাসিক নাটক সম্বন্ধে একটি পূর্ণাঙ্গ ধারণা নেয়া অপরিহার্য। অন্যথায় ঐতিহাসিক নাটক হিসেবে সিরাজ-উ-দ্দৌলার মুল্যায়ন বিভ্রান্তির চোরাবালিতে নিমজ্জ্বিত হতে বাধ্য
নাটক তথা সাহিত্য আর ইতিহাস এক বিষয় নয় । ইতিহাস শব্দের অর্থ হল ইতি-হ-আস অর্থাৎ-পূর্বে যা সংঘটিত হয়েছে । ইতিহাস ঘটনার যথার্থ উল্লেখ্যই মুখ্য । ঐতিহাসিককে কোনো অবস্থাতেই কল্পনা ও আবেগের বশবর্তী হওয়া চলে না । তাকে হতে হয় পুরিপূর্ণ ভাবে আবেগহীন এবং নিভপেক্ষ। কিন্তু অন্যদিকে নাটকে কল্পনা আবীর এবং আবেগের প্রলেপই মুখ্য। মনের মাধুরী মিশিয়ে নাট্যকার পূর্বের ঘটে যাওয়া ঘটনাকে চিত্রিত করেন । এ ক্ষেত্রে নাট্যকার সত্যঘটনার বশ হলেও দাস নন কোনো বিচারেই । ঐতিহাসিক নাটকে নাট্যকার পূর্বের ঘটনাকে আশ্রয় করে । জগৎ ও জীবন সম্বন্ধে নতুনতর সত্য উপলব্ধিতে উপনীত হন মাত্র। বস্তুত, ঐতিহাসিক নাটক নাটকই, তা ইতিহাস নয়। ঐতিহাসিক নাটকে ইতিহাস একটি গুণ মাত্র । তাই স্বাভাবিক নাটক বিচারের মূল্য মানকেই ঐতিহাসিক নাটক বিচারের জন্য গ্রহণীয়। তাই ঐতিহাসিক নাটক হিসেবে সিরাজ-উ-দ্দৌলা'র সার্থকতা মূল্যায়ন করতে হলো নিম্নরূপে, দু'টি মানদন্ডের আলোকেই করতে হবে ।
প্রথমত : বিষয়বস্তু তথা ঘটনাংশ নির্বাচন ও উপস্থাপন, গঠনশৈলী এবং চরিত্র- চিত্রণ।
দ্বিতীয়: জগৎ ও জীবন সম্বন্ধে নাট্যকারের উপলব্ধি ও অম্বিষ্ট তথা নাটকের রসনিস্পত্তির দিক ।
সিরাজ-উ-দ্দৌলা নাটকের নামকরণই নির্দেশ করে নাটকটি ঐতিহাসিক নাটক এবং বাংলার শেষ নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলা জীবনাশ্রয়ী। সিরাজসহ এই নাটকের প্রায় সব চরিত্রই ঐতিহাসিক । নাটকের ঘটনাংশ নির্বাচন এবং এর উপস্থাপনেও নাট্যকারের ইতিহাস নিষ্ঠা শিল্পসফলতার সমান্তরাল । সাম্রাজ্যবাদের পোষক ও ইংরেজদের খয়ের খাঁ শ্রেণীর ঐতিহাসিকসহ ইংরেজ ঐতিহাসিকগণ সিরাজকে কলংকিত করে উপস্থাপন করেছেন । কিন্তু উত্তরকালে নিরপেক্ষ গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, সিরাজ ছিলেন স্বাধীনচেতা-স্বদেশ প্রেমিক প্রজাবৎসল শাসক এবং অন্যান্য মানবীয় সদগুণে বিভূষিত একজন আদর্শ মানুষ । সিকানদার আবু জাফর শেষোক্ত সিরাজকেই আলোচ্য নাটকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন গিরিশ ঘোষের সিরাজের মত সিকানদার আবু জাফরের সিরাজ অসহায় দু' বলচিত্ত নয় কিংবা শচীন সেনের সিরাজের মতো আবেগ প্রবণ ও নয়; বরং তাঁর সিরাজ; সাহসী এবং প্রজাবৎসল। স্বদেশ ও স্বজাতির স্বাধীনতাই তার কাছে কাম্য । তাই তাকে উচ্চারণ করতে শুনা যায়ঃ
‘বাংলার বুকে দাড়িয়ে বাঙ্গালীর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরার স্পর্ধা ইংরেজরা পেল কোথেকে
আমি তার কৈফিয়ত চাই”[১ম অং/১ম দৃশ্য !
নবাব কর্তৃক ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ দখল, শওকত জঙ্গকে দমন, ঘসেটী বেগমের সাথে সিরাজের বিবাদ, মীর জাফরকে প্রধান সেনাপতি নিয়োগ, মীর জাফরের ষড়যন্ত্রে পলাশীর যুদ্ধে নবাবের পরাজয়, পাটনার পথে পলায়ন রত নবাব ধৃত ও মুর্শিদাবাদে নীত, অতঃপর তাঁকে হত্যা সব ঘটনাই ঐতিহাসিক সত্য । কেবল তৃতীয় অংকের প্রথম দৃশ্যে সিরাজের যে ব্যক্তি স্বরুপ নির্মিত হয়েছে তা ঐতিহাসিক সত্য নয়। এটি সম্পূর্ণ রুপেই নাট্যকারের সৃষ্টি । রাজ আমাত্য ও আপনজনদের ষড়যন্ত্রে নবাব অন্তরে অবসন্ন ও ক্লান্ত । রাজসুখ ও ভোগের চেয়ে একটি একান্ত গ্রহকোণই নবাবের কাছে কাম্য । তাই লুৎফার উদ্দেশ্যে নবাব উচ্চারণ করেন-
তোমার খুব কাছাকাছি বহুদিন আসতে পারিনি। আমাদের মাঝখানে একটি রাজত্বের দেয়া । মাঝে মাঝে ভেবেছি, এই বাধা যদি দুর হয়ে যেত, নিশ্চিত সাধারণ গৃহস্থের ছোট্ট সাজানো সংসার আমরা পেতাম”। [ ৩য় অংকের/১ম দৃশ্য]
ইতিহাসকে আশ্রয় করে নাটক রচনায় নাট্যকারের মৌল অম্বিষ্ট অর্জনে এই ঘটনাটি ছিল অপরিহার্য । নাট্যকারের উদ্দেশ্য ছিল সিরাজকে একজন দেশপ্রেমিক যথার্থ শাসক, বাঙালি বীর এবং আদর্শ মানুষ হিসাবে গড়ে তোলা । এদিক থেকে নাট্যকার সফল এবং নাটকটিও হয়েছে শিল্পগুণে গুণাম্বিত । ঘটনা নির্বাচন ও উপস্থাপনের মধ্যদিয়ে নাট্যকার যেমন পরিপূর্নভাবে ইতিহাস অনুগতছিলেন তেমনি চরিত্র নির্বাচন ও চিত্রণের মধ্যদিয়েও ছিলেন ইতিহাস অসুসারী । মীরজাফর, উমিচাঁদ, রাজবল্লভ, জগৎশেঠ, রায়দুলভ, মীরমদান, মোহনলাল প্রমুখ চরিত্র ইতিহাস থেকেই গৃহীত হয়েছে । ইতিহাসের মতই মীরজাফর, রাজবল্লভ, উমিচাঁদ, জগৎশেঠ, রায়দুর্লভ সিরাজ বৈরী ও ষড়যন্ত্রকারী । ইতিহাসের ন্যায় ঘসেটী বেগমকেও নাট্যকার কুচক্রী ও উচ্চাবিলাসী মানবী রুপে অংকন করেছেন । ইতিহাসের মতই ক্লাভ, ওয়াটস তঙ্কর ও ষড়যন্ত্রকারী । কেবল একটি চরিত্রের সাথে ইতিহাসের সহজ মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। তা হলো রাইসুল জুহালা । তবে তার চরিত্রের যথার্থ বিকাশ পর্যালোচনা করলে অতি সহজেই প্রতীয়মান হয় যে, রাইসুল জুহালা ইতিহাসের নারায়ন সিংহ ছাড়া আর কেউ নয় ।
সিকানদার আবু জাফরের সাহিত্য সাধনার অন্তর্লীন প্রেরণা ছিল- জত্যানুসন্ধান ও সত্তানুসন্ধান । এ লক্ষ্য অর্জনে জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ও বিকাশে তিনি ছিলেন একনিষ্ট সাহিত্য কর্মী । যার জন্য তিনি স্বাভাবিকভাবেই ইতিহাসের আশ্রয় গ্রহণ করেন। আর এ প্রেরনার অনিন্দ্য নির্যাস আমাদের আলোচ্য সিরাজ-উ-দ্দৌলা নাটক। নাটকটি ১৯৬৫ সালে প্রকাশিত হলেও এর রচনা কাল ১৯৫২ । আর বাঙ্গালী জাতীয় জীবনে এ সময় কাল হলো আত্মজাগরণের কাল । ১৯৪৭ সালে সে স্বপ্ন ও বিশ্বাস নিয়ে পাকিস্তান সৃষ্টি হয়, ১৯৫২ সালে ভাষান্দোলনের মধ্য দিয়ে তার সমাধি রচিত হয়। এবং নতুন বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষ হয়ে উঠে অনিবর্ষ। এ উন্মেষ ধারাকে শক্তিশালী ও বেগবান করাই ছিল সিরাজ-উ-দ্দৌলা নাটক রচনার মৌল অম্বিষ্ট । এ নাটক সম্বন্ধে মন্তব্য নিয়ে সিকানদার আবু জাফর বলেছেন -
“একান্ত প্রকৃত ইতিহাসের কাছাকাছি থেকে এবং প্রতিপদক্ষেপে ইতিহাসকে অনুসরণ
করে আমি সিরাজউদ্দৌলার জীবননাট্যনির্মাণ করেছি” ......
সুতরাং উপযুক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায় যে, ঘটনাংশ নির্বাচন ও উপস্থাপনে, চরিত্র চিত্রণে, গঠনশৈলীতে এবং রসনিষ্পত্তিতে সিকানদার আবু জাফরের সিরাজ-উ-দ্দৌলা একটি ঐতিহাসিক নাটক এবং এক্ষেত্রে নাট্যকারের সাফল্য প্রশংসানীয় এবং তুলনারহিত ।
+88 01713 211 910