
সিরাজউদ্দৌলা নাটক: ট্রাজেডি
প্রশ্নঃ- “ট্রাজেডি নাটক” কাকে বলে? ট্র্যাজেডি নাটক হিসেবে সিকানদার আবু জাফর রচিত সিরাজ-উ-দ্দৌলা” নাটকের সার্থকতা বিশ্লেষণ কর ।
উত্তরঃ ভারত বিভাগোত্তর (১৯৪৭) সময়ে যে কয়জন সাহিত্যিক শ্রম, সাধনা ও মেধা বাংলাদেশের সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছিল তাদের মধ্যে সিকানদার আবু জাফর (১৯১৮-১৯৭৫) অন্যতম । ভাব,বিষয়, ভাষা, আঙ্গিক এবং জীবনদৃষ্টির প্রশ্নে তার সাহিত্য বাংলাদেশের সাহিত্যে ব্যতিক্রমধনী সংযোজন । প্রধানত কবি হিসেবে পরিচিত লাভ করলেও বহুমুখি প্রতিভার অধিকারী এ লেখক নাটক রচনার ক্ষেত্রেও বিশিষ্ট্যতা অর্জন করেছেন । তার রচিত মাকড়সা শুকুন্ত উপাখ্যান, মহাকবি আলাউল, এবং সিরাজ-উ-দ্দৌলা (১৯৬৫) নাটক বাংলা নাটকের সমৃদ্ধ ধারাকে আরো ঋদ্ধ করেছে । সিরাজ-উ-দ্দৌলা (১৯৬৫) নাটকাটি এ ক্ষেত্রে স্বতন্ত্রতার দাবী রাখে । পলাশীর কাহিনী নিয়ে ইতোপূর্বে গিরিশ চন্দ্র ঘোষ, শচীন সেন নবীন চন্দ্র সেন প্রমুখ সাহিত্যিক সাহিত্য রচনা করলেও সিকানদার আবু জাফরের “ সিরাজ উ দ্দৌলা নাটকটি ভাব, বিষয়, ভাসা আঙ্গিক বিবেচনায় এবং জীবন দৃষ্টির প্রশ্নে নান্দনিক ভিন্নতার অনুসারী । বিষয় গুণে সিরাজ-উ-দ্দৌলা নাটকটি হলেও রস- বিচারে এটি ট্রাজেডি ধনী নাটক । তবে ট্রাজেডি নাটক হিসাবে সিরাজ-উ-দ্দৌলা নাটকের সার্থকতা বিবেচনার পূর্বে ট্রাজেডি নাটকের সংজ্ঞার্থ স্বরুপ ও বৈশিষ্ট্য নিরুপণ করা প্রয়োজন এবং সে আলোকেই নাটকটি বিবেচনা কাম্য ।
আত্ম-দ্বন্দ্বে পরাভূত মানব জীবনের করুণ কাহিনীকেই ট্রাজেডি (Tragedy)বলা হয় ! ট্রাজেডি স্বরুপ নির্ণয়ার্থে অন্যতম সাহিত্য সমালোচক মোহিতলার মজুমদার কবিতায় ভাষায় বলেছেন --
দেবত-দোসর বীর, তারি পরাজয়- কথা
সে হৃদয়-সাগর- মহুন;
নীলাকাশে উষাসম গরলে অমৃত- রাগ
মৃত্যু জয়ী জীবন কাহিনী।”
তবে ট্রাজেডির কালজয়ী সংজ্ঞা নির্ণয়ের প্রয়াস পেয়েছেন বিশ্বসেরা গ্রীক দার্শনিক (Aristotle)এ্যারিস্টটল। তিনি বলেন-
"Tragedy is an imitation of an action that is Serious' Complete, and of a certain magnitude in language embellished with each kind of artistic ornament, the Several kinds being found in separate parts of the play; in the form of action, not of narrative through pity and fear, effecting the proper purgation of these emotions."
অর্থাৎ বঙ্গমঞ্চে নায়ক বা নায়িকার গতিমান জীবন কাহিনীর দৃশ্যপরস্পরা উপস্থিত করতঃ যে নাটক দর্শকের হৃদয়ে উদ্রিক্ত ভীতি ও করণা প্রশম করে তার মনে করুণ রসের আনন্দ সৃষ্টি করে, তা-ই ট্রাজেডি (Tragedy) নাটক।”
ট্রাজেডির উপর্যুক্ত সংজ্ঞা সমূহ বিশ্লেষণ করে নিম্নরুপ বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়-
প্রথমত- ট্রাজেডিতে কোনো হালকা বিষয় নয়, বরং গভীর ও গম্ভীর Action that is serious তথা, মৃত্যুজয়ী জীবন-কাহিনী উপস্থাপিত হবে।
দ্বিতীয়- ট্রাজেডি হবে Artistic ornament সমৃদ্ধ।
তৃতীয়- ট্রাজেডি হবে- ঘটনা প্রধান, বর্ণনা প্রধান তথা narrative নয় !
চতূর্থত- সর্বোপরি ট্রাজেডি ভীতি ও করুণা উদ্রেকের মধ্যদিয়ে আনন্তদ সৃষ্টি করবে ।
এখন এই বৈশিষ্ট্য সমূহের আলোকে ট্রাকেডি নাটক হিসেবে সিরাজউ দ্দৌলা নাটটি বিবেচনা করা যাক ।
প্রথমত- সিরাজ-উ-দ্দৌলা” নাটক । পলাশীর যুদ্দকে কেন্দ্র করেই এ নাটকে রচিত । এর এক পক্ষ বাংলার শেষ নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলা এবং অন্য পক্ষ ষড়যন্ত্রকারী ইংরেজ বেণীয়া । সিরাজ বাংলার মুক্তিকামী মানুষের স্বাধীনতা প্রতীক । এ নাটকে সিরাজউদ্দৌলা জাতীয় বীর রুপ চিত্রিত হয়েছে। স্বজাত্যবোধ ও দেশপ্রেম পরিশ্রুত সিরাজ যে কোনো প্রকার জাতীয় অনিষ্টে শংকিত এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষার সদ্য সচেষ্ট । তাই তার মুখে শুনি-
বাংলার বুকে দাঁড়িয়ে বাঙ্গালীর বিরুদ্দে অস্ত্র ধরবার স্পর্ধা ইংরেজ
পেলো কোথা থেকে আমি তার কৈফিয়ৎ চাই!” [ প্রথম অংক/১ম দৃশ্য
কিন্তু সকল প্রকার ক্ষমতা, যোগ্যতা ও সম্ভবনা থাকা সত্যেও পলীশীর যুদ্ধে সিরাজকে পরাভব স্বীকার করতে হয়। এবং মেনে নিতে হয় জীবনের করুণ পরিণতিকে । তবে এ পরিণতির পিছনে সক্রিয় ছিল ইংরেজদের ষড়যন্ত্র এবং দেশীয়দের বিশ্বাসঘাতকতা।
দ্বিতীয়তা-- কাহিনী বিন্যাসের ক্ষেত্রেও সিরাজ-উ-দ্দৌলা নাটক ট্রাজেডির বৈশিষ্ট্যকে স্পর্শ করতে পেরেছে কাণ এখানে কাহিনী বর্ণনায় বর্ণনাত্মক পরিচর্যা রীতি ব্যবহৃত হয়নি । বরং নাটকের শুরু থেকে সমাপ্ত নাট্যক আবহ সক্রিয় থেকেচে । নাটকের প্রথম অংকের প্রথম দৃশ্যেই সিরাজ কর্তৃক ফোট উইলিয়াম দুর্গ দলখ, সিরাজের বিরুদ্ধে ইংরেজ ও মীরজাফর জগৎশেঠ, রাজভল্লবের ষড়যন্ত্র এবং শওকত জঙ্গের সাথে সিরাজের বিরোধের আভাস । আর এ গুলোর মধ্য দিয়েই নাটকীর সংঘাতের সৃষ্টি। একদিকে স্বদেশ ও স্বজাতির স্বাধীনতা অন্যদিকে রাজ অমাত্যের ষড়যন্ত্র সিরাজকে অস্থির করে তোলে । তাই সিরাজ উচ্চারণ করেন-
'আমার সারা অস্তিত্ব জুড়ে কেবল যেন দেয়ালের ডিম।
---আমার অদৃষ্ট আর কল্যাণের মাঝখানে শুধু দেয়াল আর দেয়াল । (তৃতীয় অংক/ প্রথম দৃশ্য)
তৃতীয়- ট্রাজেডি সাটকের ভাষা হবে ভাব-গম্ভীরর্যময়, গতিশীল এবং বিয়ায়ানুগ । এ প্রশ্নেও সিরাজ-উ-দ্দৌলা নাটকে ব্যতিক্রম লক্ষ করা যায় না । বরং এতে ব্যবহৃত হয়েছে গতিশীল ও বিষয়ানুগ ভাষা। দেশের প্রতি আনুগত্যের প্রশ্নে সিরাজে একটি মুল্যায়ন-
ভীরু প্রতারকের দল চিরকালই পালায়। কিন্তু তাতে বীরের মনোবল ক্ষুণ্ণ হয় না
এমনি করে পালাতে পারতেন মীরমদাদ, মোহনরাল, বদ্রী আলী, নৌবেসিং ।
তার বদলে তার পেতেন শত্রুর অনুগ্রহ প্রভূত সম্পদ এবং সম্মান। [তৃতীয় অংক/প্রথম দৃশ্য৷
সাধারণত দু'ধরনের ট্রাজেডি নাটকের পরিচয় পাওয়া যায়। গ্রীক ট্রাজেডি ও শেক্সপী রবিয়ান ট্রাজেডি । গ্রীক ট্রাজেডিতে মানব পরিণতি নির্ধারিত হয়- মানুষের স্বীয় কর্মদ্বারা সিরাজ-উ-দ্দৌলা নাটক শেক্সপীয়ারিয়ান ধারার নাটককে স্পর্শ করেছে । এখানে সিরাজের করুণ পরিণতির জন্য তার স্বদেশ প্রেম এবং অমাত্যদের প্রতি অগাধ বিশ্বাসেই দায়ী। সিরাজের উচ্চারণে তা স্পষ্ট
আমার বিশ্বাস ছিল যে, সিপাহসালার মীর জাফর,
রাজা রাজবল্লভ, জগৎশেঠ, রায় দুর্লভ, তাদের
দায়িত্ব সম্বদ্দে সজাগ থাকবেন । আমার পথ বিঘ্ন সংকুল
হয়ে উঠবে না [২য় অংক/ প্রথম দৃশ্য]
কিন্তু অমাত্যগণ বিশ্বাস রাখেনি, যার পরিনামে সিরাজের জীবনে নেমে আসে করুণ পরিণতি ।
ট্রাজেডির নায়ক আত্মদ্বন্দ্বে ও বহিদ্বন্দ্বে ক্ষতবিক্ষত হবে সিরাজের ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম ঘটেনি । যখন তাকে উচ্চারণ করতে শুনি -
রাজবল্লভ, জগৎ শেঠকে কয়েদ করলে, মীর জাফরকে ফাঁসী
দিলে প্রতিকার হতো, কিন্তু সেনাবাহিনী তা বরদাস্ত করত কিনা কে জানে/ [৩য় অংক/ প্রথম দৃশ্য!
বস্তুত- এই দ্বান্দ্বিক অবস্থাই সিরাজকে করুণ পরিণতি স্বীকার করতে বাধ্য করে !
শেষ-ত- ট্রাজেডি ভীতি ও করুণ্য উদ্রেকের মাধ্যমে আনন্দ সৃষ্টি করবে । সিকানদার আবুজাফরের সিরাজ-উ-দ্দৌলা নাটক এর ব্যতিক্রম নয় । সিরাজের করুণ পরিণতি আমাদের মনে ভয়ের উদ্রেক করলেও তার দেশপ্রেম, স্বজাত্যবোধ, এবং দেশের আত্মত্যাগ আমাদের আনন্দ দেয় ।
সুতরাং ধটনা বিন্যাস, কাহিনী নিমার্ণ, চরিত্র চিত্রণ, ভাষা প্রয়োগ এবং রসনিস্পত্তিতে সিকানদার আবু জাফর এর সিরাজউদ্দৌলা নাটক একটি সার্থক ট্রাজেডি ধনী নাটক । এবং বাংলা নাটকের ধারায় এটি একটি অনিন্দ্য সংযোজন ।
+88 01713 211 910