
সিরাজউদ্দৌলা নাটক: নামকরণের সার্থকতা।
প্রশ্ন: সিরাজ-উ-দ্দৌলা নাটকের নামকরণের সার্থকতা বিচার কর ।
উত্তর : ‘সিরাজ-উ-দ্দৌলা' নাটক সিকানদার আবু জাফরের কালজয়ী সৃষ্টি। নামকরণের প্রশ্নে এই নাটকটি অনন্যতা লাভ করেছে। এ নাটকের নামকরণের সার্থকতা নিরুপদ্মণের পূর্বে সাহিত্য শিল্পের নামকরণের ব্যবহারিক ও নান্দনিক প্রসঙ্গ সম্বন্ধে পরিপূর্ণ ধারণা নেয়া অপরিহার্য। অন্যথায় আমাদের বিবেচনা বিভ্রন্তির চোরাবলিতে নিমজ্জিত হতে বাধ্য ।
সাহিত্য শিল্পের নামকরণের ক্ষেত্রে প্রধানত দু'টি দিককে বিবেচনা করা হয়। প্রথমতঃ সাহিত্য বা শিল্পের পরিচিতি তথা ব্যবহারিক দিক।
দ্বিতীয়ত : এর অন্তর্নিহিত বক্তব্যের দিক
এ বিশ্বে নামহীন বন্তর অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না । নামই একটি বস্তকে আরেকটি বস্ত থেকে পৃথক হলেও কেবল নাম উচ্চারণের মাধ্যমেই এরা আমাদের কাছে স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্য উদ্ভাসিত হয় । তেমনি সমাজ জীবন একজন ব্যক্তি বা বস্তর নাম উচ্চারণের সাথে সাথেই এর ব্যবহারের দিকটি আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠে । এদিক থেকে নামই ব্যক্তি বা বস্তর পরিচিতির অনিবার্য স্মারক । সাহিত্যের অন্যতম শাখা নাটক সম্বন্ধে ও উল্লিখিত মুল্যায়ণ প্রাসঙ্গিক । কারণ নামের কারনেই একটি নাকট সমজাতীয় সকল নাটক থেকে পৃথক । কৃষ্ণকুমারী, নীলদর্পণ, রক্তকরবী, ডাকঘর, জমিদার দর্পন, আলেয়া, কবর রক্তাক্ত প্রান্ত নেমেসিস নামের কারণেই পরস্পর থেকে পৃথক এবং আমরা সহজেই বুঝি এগুলি এক একটি নাটক । সিকানদার আবু জাফর এর সিরাজ-উ-দ্দৌলা নাকট ও নামের কারণেই সকল নাটক থেকে স্বতন্ত্র ।
দ্বিতীয়তঃ নাটকের অন্তনির্হিত দিকটিকে প্রাধান্য দিয়েও নামকরণ হয়ে থাকে ।
একজন সাহিত্যিক রচনা করেন তাঁর অস্বিষ্ট বক্তব্যকে সুষ্ট সাহিত্যে তোলে ধারার জন্য । জগৎ ও জীবন সম্বন্ধে সাহিত্যিকের দৃষ্টিভঙ্গী এবং অন্তর্গত চেতনাই প্রাণ প্রায় তার সুষ্ট সাহিত্যে । বক্তব্যহীন সাহিত্যে বা শিল্পের অস্তিত্ব মোটেও সম্ভব নয়। আমাদের আলোচ্য সিরাজ-উ-দ্দৌলা নাটক সম্বন্ধেও এ সত্য প্রাসঙ্গিক ।
সম্রাজ্যবাদের পোষক ও ইংরেজদের খয়ের খাঁ শ্রেণীর ঐতিহাসিকসহ ইংরেজ ঐতিহাসিকগণ সিরাজকে কলংকিত করে অংকন করেছেন । কিন্তু উত্তরকালে নিরপেক্ষ গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, সিরাজ ছিলেন স্বাধীনচেতা স্বদেশ প্রেমিক প্রজাবৎসল শাসক এবং অন্যান্য মানবীয় সদগুণে বিভূষিত আদর্শ মানুষ । সিকান্দার আবু জাফর শেষোক্ত সিরাজকেই আলোচ্য নাটকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন । এ প্রসঙ্গে নাট্যকারের বক্তব্য স্মরণীয় -
“প্রকৃত ইতিহাসের কাছাকাছি থেখকে এবং
প্রতি পদক্ষেপে ইতিহাসকে অনুসরণ করে
আমি সিরাজ-উ-দ্দৌলার জীবনাট্য
পূননির্মাণ করেছি ।
তাই গিরিশ ঘোষের মত সিকান্দার আর জাফরের সিরাজ দুর্বল চিত্ত নয় কিংবা শচীন সেনের সিরাজের মতো আবেগ প্রবণ নয়; বরং তাঁর সিরাজ সাহসী এবং প্রজাবৎসল। স্বদেশ ও স্বজাতির স্বাধীনতাই তাঁর কাছে কাম্য ।
সিরাজকে সিকান্দার আবু জাফর চিত্রিত করেছেন স্বাধীনচেতা আদর্শ নৃপতি হিসাবে । দেশের স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্বই ছিল তাঁর কাছে একান্ত কাম্য । তাই এ স্বাধীনতা রক্ষার জন্যই তিনি পলাশীর যুদ্ধে অবতীর্ণ হন । যুদ্ধে অভিজ্ঞতা তার সুখের হয়নি । দেশীয় আমাত্যদের ষড়যন্ত্রে তাকে পারাজয় বরণ করতে হয়। অতঃপর তিনি রাজধানী মুর্শিদাবাদে ফিরে যান এবং পুনরায় সৈন্য সংগ্রহের প্রয়াস পান ।
বস্তুত, সিরাজ চরিত্রকে নাট্যকার সর্বাধিক সহানুভূতি দিয়ে অংকন করেছেন । সিরাজ চরিত্র অংকনের মাধ্যমেই নাট্যকার তার কাঙ্খিত বক্তব্যকে তোলে ধরার প্রয়াস পেয়েছেন । অর্থাৎ সিরাজ চরিত্রই হল তার প্রধান তার প্রধান উপজীব্য। আর একটি চরিত্র যখন কোনো উপন্যাস বা নাটকের উপজীব্য হয়ে উঠে, তখন সেই নাটক বা উপন্যাসের নামকরণ ও সেই নির্দিষ্ট চরিত্রের নামেই হয়ে থাকে উদাহরণ হিসেবে কৃষ্ণকুমারী, মেঘনাদ বধ কাব্য, গোরা, শাহজাহান, নুরজাহান, ছত্রপতি শিবাজী, প্রভৃতির উল্লেখ করা যায় ।
তাছাড়া সিকান্দার আবু জাফরের সাহিত্য সাধনার অন্তলীন । প্ররণার উৎস ছিল- জাত্যানুসন্ধান ও সত্ত্বানুসন্ধান । এ লক্ষ্য অর্জনে জাতীয়বাদী চেতনার উন্মোষ ও বিকাশ তিনি ছিলেন একনিষ্ঠ সাহিত্যকর্মী। যারজন্য তিনি স্বাভাবিক ভাবেই ইতিহাসের আশ্রয় গ্রহণ করেন । আর এ প্রেরনার অনিন্দ্য নিযার্স আমাদের আলোচ্য সিরাজ- উ-দ্দৌলা নটকটি ১৯৬৫ সালে প্রকাশিত হলেও এর রচনা কাল ১৯৫২ সাল । আর বাঙ্গালী জাতীয় জীবনে এ সময় কাল হলো আত্ম জাগরণের কাল। ১৯৪৭ সালে যে স্বপ্ন ও বিশ্বাস নিয়ে পাকিস্তান সৃষ্টি হয়, ১৯৫২ সালের ভাষান্দোলনের মধ্য দিয়ে তার সমাধি রচিত হয় । এবং নতুন বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের উন্মোষ হয়ে উঠে অনিবার্য। এ উন্মোষ ধারাকে শক্তিশালী ও বেগবান করাই ছিল সিরাজ- উ-দ্দৌলা নাটক রচনার মৌল অম্বিষ্ট । এ কারণে সিরাজ ছিল নাট্যকারের অভিপ্রেত । কেননা সিরাজ বাংলার শেষ নবাব হয়েও তিনি ছিলেন ভিন্ন তাৎপর্যে বিশিষ্ট। এদিক বিবেচনায় ও সিরাজ -উ-দ্দৌলা নাটকের নামকরণ সিরাজের নামেই হয়েছে ।
অন্যদিকে সিরাজ-উ-দ্দৌলা নাটকের নামকরণ, পলাশীর প্রান্তর, মীর জাফর, স্বদেশ প্রেম হতে পারত । কিন্তু গভীরতার বিবেচনায় তা ভ্রান্ত প্রমাণিত হয় । কেননা নাটকের ১২ টি দৃশ্যের মধ্যে আটটিতেই সিরাজের সক্রিয় পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যায়। অন্যান্য চরিত্র এবং ঘটনাও সিরাজকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে । তাই সিরাজ- উ-দ্দৌলা নাটকের নামকরণ সিরাজ-উ-দ্দৌলাই যথার্থ হয়েছে।
বস্তুত, সিরাজ- উ- দ্দৌলা নাটকের নামকরণ সিরাজ-উ-দ্দৌলাই যুক্তিযুক্ত এবং অনিন্দ্য হয়েছে। এ নাটকের এ নাম শুধু এর পরিচিত ও ব্যবহারিক দিককেই স্ফটিকায়িত করেনি ; বরং নাটকের মুল বক্তব্য এবং নাট্যকারে জীবন দর্শনকেও করেছে উন্মোচিত ।
+88 01713 211 910