
NTRCA “ভারত চন্দ্র আঙ্গিকে মধ্যযুগীয়, কিন্তু অন্তর্গত ভাব-ধারায় অনেকাংশে আধুনিক”
প্রশ্ন: “ভারত চন্দ্র আঙ্গিকে মধ্যযুগীয়, কিন্তু অন্তর্গত ভাব-ধারায় অনেকাংশে আধুনিক”-আলোচনা কর।
আলোচনা: বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত (১৮১২-১৮৫৯) যুগ সন্ধিক্ষণের কবি হিসাবে বিবেচিত। কারণ, তাঁর সাহিত্যে মধ্যযুগের সাহিত্য ধারার অনুকরণ যেমন আছে, তেমনি আধুনিক যুগের লক্ষণও অত্যন্ত সুস্পষ্ট। তবে কোন কোন সমালোচক এই মত ব্যক্ত করেছেন যে, ঈশ্বরগুপ্তের অনেক পূর্বে সাহিত্য সাধনা করলেও ভারতচন্দ্রের কাব্যে আধুনিকতার বৈশিষ্ট্য পরিস্ফুট হয়ে উঠে ছিল। তাঁরা বলেন-ভারতচন্দ্র বিষয়বস্তু ও আঙ্গিকে মধ্যযুগীয় হলেও অন্তর্নিহিত ভাবধারায় অনেকাংশে আধুনিক।
মোটকথা, পান্ডিত্য, মনীষা ও শিল্প-চাতুর্যে ভারতচন্দ্র ছিলেন এক অনন্য কবি ব্যক্তিত্ব। মধ্যযুগের গতানুগতিক ধারায় কাব্য সাধনা করেও জীবন-বোধ ও শিল্পদৃষ্টির প্রশ্নে তিনি ছিলেন আধুনিক জীবন চেতনায় পরিস্রত। মঙ্গল কাব্যের গতানুগতিক বিষয় নিয়ে কাব্য রচনা করলেও কাহিনী নির্মাণ, চরিত্র চিত্রণ, কাব্য ভাষা নির্মাণ এবং জীবন অনুধ্যানে ছিলেন আধুনিক শিল্প বৈশিষ্ট্য পরিস্রত। কাহিনী বিন্যাস, জীবনদৃষ্টি ও শিল্পদৃষ্টির প্রশ্নে ভারতচন্দ্র সম্বন্ধে উল্লিখিত মূল্যায়ন যে অনেকাংশেই প্রাসঙ্গিক, নিম্নরূপ আলোচনার মাধ্যমেই আমরা তা বিবেচনার প্রয়াস পাব।
ভারতচন্দ্র মঙ্গল কাব্যের গতানুগতিক বিষয় নিয়েই কাব্য রচনা করেছেন। তবে কাহিনী বিন্যাসে তিনি অভিনবত্বের পরিচয় দিয়েছেন। দেবমাহাত্ন্যের কাব্যের মধ্যেও ঐতিহাসিক চরিত্র ও ঘটনাকে সন্নিবেশ করে তিনি স্বীয় প্রতিভার স্বাতন্ত্র্যকেই নির্দেশ করেছেন। শুধু তাই নয়, দেব-দেবীর চরিত্রের মধ্যেও মানবীয় গুণাবলীকেই মুখ্য করে তুলেছেন, যা আধুনিক সাহিত্যের এই চেতনাকেই ভারতচন্দ্র তাঁর কাব্যে চিত্রিত করেছেন। তাই নলকুবেরের পুত্রের জবানিতে ভারতচন্দ্র উচ্চারণ করেছেন-
“এ নব বয়সে ছাড়িয়ে এ রসে
কার পূজা করে কেটা।।
এ সুখ যামিনী এ নব কাহিনী
এ আমি নব যুবক।।”
বস্তুত দেবমহিমা কীর্তনের পরিবর্তে মানব মহিমাকীর্তনই আধুনিক সাহিত্যের অন্যতম কীর্তন। যা ভারতচন্দ্রের কাব্যে পুরোপুরি বর্তমান ছিল।
দেব শক্তির মহিমাকে বিনা বিচারে মেনে নেয়াই ছিল মধ্যযুগের মঙ্গল কাব্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। কিন্তু ভারতচন্দ্রের কাব্যে তা লক্ষ করা যায় না। তাঁর দেবতারা হয়েছে অবজ্ঞার প্রাত্র। নলকুবরের মুখে আমরা শুনতে পাই-
অন্নদা যেমন কতেক তেমন
আছয়ে মোর ভান্ডারে
শঙ্কর ভিখারী সে ত তারি নারী
আমি মর্ম জানি তার।।
এখানে দেবতার মানুষ্য রূপ প্রাপ্তির মধ্য দিয়ে কবির আধুনিক জীবন-দৃষ্টিই প্রতিফলিত হয়েছে।
জগৎ ও জীবন সম্বন্ধে নিরন্তর অনুসন্ধান এবং সুখ-দুঃখের সাংসারিক চক্র সম্বন্ধে বিরামহীন জিজ্ঞাসা আধুনিক মননের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। অর্থাৎ মধ্যযুগীয় দেব-নির্ভরতার পরিবর্তে জগৎ ও জীবন সম্পর্কিত ভাবনার কেন্দ্রে মানুষ দেবতাকে সরিয়ে নিজেকে স্থাপন করেছে। তাই এ কালের সাহিত্য তার দেবতার জয়গান নয় বরং মানুষের সুখ-দুঃখ আশা-আকাঙক্ষার বিজয় গাঁথা। ভারত চন্দ্রের কাব্যেই সেই মানবতান্ত্রিক বিজয় গাঁথার জয়িষ্ণু আত্ম প্রকাশ।
ভারতচন্দ্র শুধু দেবতার নয়, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং চেতনারও হেনস্থা করেছেন। তবে এ ক্ষেত্রে কবি স্বীয় বক্তব্যকে প্রত্যক্ষভাবে তুলে ধরেননি। কাব্যের চরিত্রের জবানিতেই স্বীয় বক্তব্যকে তুলে ধরেছেন। হিন্দু ধর্ম-সম্বন্ধে স্বীয় মনোভাবকে কবি তুলে ধরেছেন জাহাঙ্গীরের জবানিতে-
হালাল না কবি করে নাহক হালাক
যতকাম করে হিন্দু সকলি নাপাক।
আবার মুসলমানদের ধর্ম সম্বন্ধে স্বীয় মনোভাবকে কবি তুলে ধরেছেন ভবানন্দের জবানিতে-
পশ্চিমে সূর্য অস্ত সে মুখে নামাজ
যত করে মুসলমান সকলি অকাজ।
তবে ধর্ম-নিরপেক্ষ মনোভাব বিষয়ে কবি সচেতন ছিলেন। তাই মধ্যযুগীয় পরিচয় দেন নি, আঙ্গিক বিবেচনায়ও অনেক ক্ষেত্রে আধুনিক মনস্কতার পরিচয় দিয়েছেন। কাহিনী কেন্দ্রিক সাহিত্যে চরিত্র চিত্রণ দক্ষতা আধুনিকভাবে লক্ষণ হিসাবে বিবেচ্য। ভারতচন্দ্র এ দিক থেকে ছিলেন অভিনব। যদিও চরিত্র চিত্রণে তিনি মুকুন্দরামের সমকক্ষ ছিলেন না। তবে অপ্রধান চরিত্র চিত্রণে ভারতচন্দ্র অনেকাংশেই সফল হয়ে ছিলেন। হিরা মালিনী, সাধী-মাধী, চন্দ্রমুখী, পদ্মমুখী চরিত্র এ দিক থেকে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তবে ভারতচন্দ্রের অবিস্মরণীয় চরিত্র ঈশ্বরী পাটনী। সে যখন উচ্চারণ করে ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে’ –তখন চিরায়ত মূর, -----মূক বাঙ্গালির শাশ্বত স্বরূপটি স্পষ্ট হয়ে উঠে। তাছাড়া এ উচ্চারণের মধ্য দিয়ে কবির ঐতিহ্য চেতনাও উন্মোচিত হয়, যা আধুনিকতারই লক্ষণ বলে বিবেচিত।
ভারতচন্দ্র ছিলেন নাগরিক কবি। তাঁর কাব্য সাধনার মর্মমূলে ছিল আধুনিক নাগরিক চেতনা। ফলে মধ্যযুগীয় গোষ্ঠী চেতনার পরিবর্তে তাঁর কাব্যে গণ মানুষের আকাঙক্ষাই মুখ্য হয়ে উঠে। আর এ দিক লক্ষ রেখেই তিনি কাব্যের ভাষা নির্মাণে হয়ে উঠলেন গণ মুখী। তিনি উচ্চারণ করলেন-
‘উচিত যে আরবী পারসী হিন্দু স্থানী
পড়িয়াছি সেই মত বর্ণিবারে পারি
কিন্তু সে সকল লোকে বুঝিবারে ভারি
না রবে প্রাসাদগুণ না হয়ে রসাল
অতএব কহি ভাষা যাবনী মিশাল।’
বস্তুত রাজসভায় বসে কাব্য রচনা করেও গণমানুষের প্রত্যাশাকে বিস্মাত হতে পারেন নি। যা কবির আধুনিক জীবন-চেতনাকেই প্রতিফলিত করে। ভারতচন্দ্রের শিল্প-চেতনা ও জীবনবোধের স্বারূপ চিহ্নিত করতে গিয়ে গোপাল হাদার তাঁর বাংলা সাহিত্যের রূপরেখা গ্রন্থে বলেন-
“ভারত চন্দ্রকে আধুনিক যুগের কবি বলাও
অসম্ভব, মধ্য যুগের কবি বলাও দুঃসাধ্য।”
বস্তুত ভারত চন্দ্রের কাব্যে মধ্যযুগীয় প্রবণতা যেমন ছিল তেমনি ছিল আধুনিক চেতনাও। বিষয়ের দিক থেকে তিনি ছিলেন গতানুগতিক এবং মধ্যযুগীয়। কিন্তু বিষয় বিন্যাস এবং চিন্তা-চেতনায় ভারতচন্দ্র ছিলেন আধুনিক মননের অধিকারী। তাই সমালোচক যথাযথই উচ্চারণ করেছেন-“ভারতচন্দ্র আঙ্গিকে মধ্যযুগীয়, কিন্তু অন্তর্নিহিত ভাবধারায় অনেকাংশে আধুনিক।”
+88 01713 211 910