
NTRCA, কাব্য ভাষা নির্মাণে ভারতচন্দ্রের দক্ষতা বিচার
প্রশ্ন: “কাব্যের ভাষা সৃষ্টিতে ভারতচন্দ্র এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গীর প্রবক্তা।”-আলোচনা কর।
অথবা-কাব্য ভাষা নির্মাণে ভারতচন্দ্রের দক্ষতা বিচার কর।
অথবা-“ভারতচন্দ্র কাব্য রচনা করতে গিয়ে শব্দ ও অনুপ্রাসের খেলায় মেতে উঠেন।”-আলোচনা কর।
আলোচনা: শুধু মধ্যযুগে নয়, সমগ্র বাংলা সাহিত্যে ভারতচন্দ্র ছিলেন স্বতন্ত্র ধারার কবি। কাব্যভাষা নির্মাণের অপরিসীম দক্ষতাই তাঁকে এই স্বাতন্ত্র্য দান করেছে। এ বিষয়ে তিনি নিজেও সচেতন ছিলেন। তাই তিনি তাঁর কাব্যের ভণিতায় লিখেছেন-
ভারতের রচিতে গীত অমৃতেরভার
ভাষাগীত সুললিত অতুলিত সার।
প্রকৃত পক্ষে বাংলা কাব্যের শিল্পিত বাণীরূপ রচনায় ভারতচন্দ্র, কেবল মধ্যযুগে নয়, সমকাল পর্যন্ত বাংলা কাব্য ধারায় এক অনুপম কবি ব্যক্তিত্ব। বস্তুত, শব্দ নির্বাচন ও ব্যবহারে, বিষয় ও বর্ণনা অনুযায়ী ভাষা সৃষ্টিতে ভারতচন্দ্র ছিলেন নিপুণ কারুশিল্পী। তাই সমালোচক যর্থাথই উচ্চারণ করেছেন-
“কাব্যের ভাষা সৃষ্টিতে ভারতচন্দ্র নতুন দৃষ্টিভঙ্গীর প্রবক্তা।”
সাধারণত কবিতা বলতে আমরা রসের বাণী মূর্তিকেই বুঝে থাকি। ভারতচন্দ্রের কাব্য সেদিক থেকে ছিল অনন্য। চিত্তহারী বাণী নির্মাণে ভারতচন্দ্র বাংলার প্রথম সারির কবিদের মধ্যে ছিলেন অগ্রগণ্য। আধুনিক যুগের কবি মধুসূদন “শব্দে শব্দে বিয়া দেয় সেইজন’-তাঁকে কবি বলতে কুণ্ঠিত হয়েছেন। কিন্তু “Best words in the best order কে-ই Coloridge যথার্থ অর্থে কাব্য বলেছেন। আমাদেরও বিশ্বাস তাই। নির্দিষ্ট শব্দটি যখন যথার্থ ভাবের বাহন হয়ে উঠে তখনই তা কবিতা পদবাচ্য হয়। আর ভারতচন্দ্র সেদিক থেকে ছিলেন তুলনারহিত। উল্লিখিত বক্তব্যের সমর্থনে তাঁর কাব্যের যে কোন স্থান থেকেই উদাহরণ তুলে দেয়া যায়। যেমন-
অতিবড় বৃদ্ধপতি সিদ্ধিতে নিপুণ
কোন গুণ নাই তার কপালে আগুন
কু-কথায় পঞ্চমুখ কণ্ঠ ভরা বিষ
কেবল আমার সঙ্গে দ্বন্দ্ব অহর্নিশ।
ভাবের সাথে শব্দের এ রকম মিল বন্ধনই তাঁর কাব্যকে মহিমান্বিত করেছে এবং অভিনব কাব্য ভাষার প্রবক্তা হিসাবে বাংলা কাব্যের ইতিহাসে তার স্থানকে সুদৃঢ় করেছে।
ভারতচন্দ্রের এই গুণের জন্যই মধুসূদন তাঁকে Man of elegant genius-বলেছেন। বঙ্কিমচন্দ্রও ভারতচন্দ্রকে শ্রেষ্ঠ ভাষা শিল্পীর মর্যাদা দিতে কুণ্ঠিত হন নি। দীনেশচন্দ্র সেনও একই মনোভাব ব্যক্ত করেছেন। যদিও তিনি ভারতচন্দ্রের কাব্যের বিশেষ করে বিদ্যাসুন্দরের ভাবরসের প্রতি অত্যন্ত বিরূপ ছিলেন। তবে তিনি ভারতচন্দ্রের শব্দমন্ত্রের উচ্ছ্বসিত স্থুতি করে উচ্চারণ করেছেন-
“ভারতচন্দ্রের ভাব বিচার না করিয়া ভাষা বিচার করিলে তাঁহাকে প্রাচীন কালের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি বলিতে হয়।”
স্তরে স্তরে পাণ্ডিত্যের পরিচয় পাওয়া যায়। তবে তাঁর পান্ডিত্য কাব্যের শিল্পরসকে ভারাক্রান্ত করেনি। বরং কাব্যকে করে তুলেছে সহজবোধ্য এবং রসালো। আরবি, ফারসি এবং সংস্কৃত ভাষায় পান্ডিত্য অর্জ্ন করলেও ভারতচন্দ্র সাধারণের বোধগম্য ভাষাকেই কাব্যে ব্যবহার করেছেন। এ বিষয়ে তিনি পূর্ণ সচেতন ছিলেন। তাই উচ্চারণ করেন-
‘উচিত যে আরবী পারসী হিন্দু স্থানী
পড়িয়াছি সেই মত বর্ণিবারে পারি
কিন্তু সে সকল লোকে বুঝিবারে ভারি
না রবে প্রাসাদগুণ না হবে রসাল
অতএব কহি ভাষা যাবনী মিশাল।’
তাই তিনি কাব্যের ভাষাকে অলঙ্কারে কারুকার্যময় করার সাথে সাথে রসময়ও করে তোলার প্রয়াসী ছিলেন। কেননা তিনি জানতেন-
‘‘প্রাচীন পন্ডিতগণ গিয়েছেন কয়ে
যে হৌক সে হৌক ভাষা কাব্য রস লয়ে।”
আর এ কারণেই তিনি তার কাব্যের ভাষায় প্রচুর প্রবাদ প্রবচনেরও ব্যবহার করেছেন। এর ফলে কাব্যের ভাষা যেমন সহজবোধ্য হয়েছে তেমনি হয়েছে গভীর অর্থ প্রকাশে সক্ষম। শুধু তাই নয়, এর মধ্যে দিয়ে কবি হাজার বছরের বাঙালি বিশ্বাস এবং অভিজ্ঞতাকেও তুলে ধরেছেন। নিচে তাঁর কাব্যে ব্যবহৃত প্রবাদ প্রবচনের কতিপয় দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হলো-
১। সে কহে বিস্তর মিছা যে কহে বিস্তর।
২। যেখানে কুলীন জাতি সেখানে কন্দল।
৩। মন্ত্রের সাধন কিংবা শরীর পতন।
বস্তুত Epigram বা সুভাষিত বুলি কিংবা প্রবচনধর্মী বাক্ নির্মিতিতে ভারতচন্দ্র ছিলেন অনন্য। শুধু মধ্যযুগে নয়, সমগ্র বাংলা সাহিত্যেই তাঁর সাথে কেউ তুলিত হতে পারেন না। ইংরেজি সাহিত্যে, শেক্সপিয়ার, ফারসীতে সা’দী এবং সংস্কৃতে চানক্যই তাঁর সাথে তুলিত হতে পারেন। মোটকথা এর মধ্য দিয়ে ভারতচন্দ্র পান্ডিত্যপূর্ণ বাক বৈদগ্ধ্যের পরিচয় দিয়েছেন। ভারতচন্দ্রের ভাষা ব্যবহারে এই দক্ষতা মূল্যায়ন করতে গিয়ে প্রথম চৌধুরী বলেন-
`As regards Bharat chandra’s
Language, there nothing more
Graceful or more elegant in the
Whole of Bengali literature.’
শুধু বাকবৈদগ্ধ্যে নয়, শব্দ ব্যবহার তথা লিপি কুশলতায়ও ভারতচন্দ্র ছিলেন অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী। তিনি তাঁর কাব্যে আরবি, ফারসি, সংস্কৃত ও বাংলা শব্দের অনায়াস ব্যবহার করেছেন। বিচিত্র শব্দ ব্যবহারই তাঁর কৃতিত্ব নয়, তাঁর কৃতিত্ব এই সমস্ত বিভিন্ন ভাষার শব্দে অপূর্ব মিলন এবং সামঞ্জস্য স্থাপনে। তাঁর শব্দ ব্যবহারের কুশলতায় ফারসি ও সংস্কৃত শব্দ একান্ত শ্রুতিমধুর হয়ে উঠেছে। যেমন-
লিখাইয়া পঞ্চ ফরমানের নকল
নানা মতে সাবধানে রাখিলা আসল।
মোটকথা ভারতচন্দ্র নিজস্ব Style অনুযায়ীই তাঁর কাব্যের ভাষা নির্মাণ করেছেন। আর এই Style –এর-ই প্রতিফলন ঘটিয়েছেন শব্দ প্রয়োগে, উপমা সৃষ্টিতে এবং অনুপ্রাস নির্মাণে। এবং এর মধ্য দিয়ে কবি তাঁর কাব্যে সৃষ্টি করতে চেয়েছেন এক ধরনের ধ্বনি মাধুর্য। যা একটি স্বতন্ত্র কাব্য ভাষা নির্মাণে রেখেছে বিশেষ ভূমিকা। তাছাড়া এটি কবির কাব্য রচনার রীতি ও রুচির দিকটিকেও উজ্জ্বল করে তুলেছেন। হয়তো এই দিকটি লক্ষ করেই সমালোচক মন্তব্য করেছেন-
“ভারতচন্দ্র কাব্য রচনা করতে গিয়ে শব্দ ও অনুপ্রাসের খেলায় মেতে উঠেন।”
ড. এ. আই. এম. মুসা
অধ্যাপক- বাংলা
+88 01713 211 910