
NTRCA, মানসিংহ ভবানন্দ উপাখ্যান অবলম্বনে তৎকালীন সমাজ জীবনের পরিচয়
প্রশ্ন: মানসিংহ ভবানন্দ উপাখ্যানে তৎকালীন সমাজ জীবনের যে পরিচয় পাওয়া যায়
তা আলোচনা কর।
আলোচনা: মধ্যযুগে রচিত সমস্ত মঙ্গল কাব্য একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য এবং বাঁধাধরা কাহিনীকে আশ্রয় করেই রচিত হয়েছে। তাই বিধিবদ্ধ কাহিনীর আওতায় সমকালীন জীবন ও সমাজের যথার্থ রূপায়ণ অত্যন্ত দুরূহ কাজ। কিন্তু প্রতিভাধর কবি মাত্রই এই বাধাকে অতিক্রম করেছেন। অনন্য প্রতিভাধর কবি ভারতচন্দ্রও এর ব্যতিক্রম নন। দেব-কাহিনীর আড়ালেই তিনি সমকালীন জীবনকে জীবন্ত করে তুলেছেন।
মধ্যযুগের সামন্তবাদী সমাজ ব্যবস্থায় কবি মানস শাসিত হয়েছে ধর্মীয় অনুশাসন এবং রাজার ঐচ্ছিক শাসন দ্বারা। কবির ব্যক্তিক আকাঙ্ক্ষা এবং শৈল্পিক বাসনা শৃঙখলিত থেকেছে ধর্ম্ ও রাজ শৃঙখলে। তাই দেবতা ও রাজ স্তুতিই ছিল কাব্য সাধনার বিষয়। সে সময়ে ধর্ম ও রাজ্যের অসঙ্গতির বিরুদ্ধে কথা বলা ছিল দুঃসাধ্য। কিন্তু প্রতিভাধর কবিমাত্রই এই বাধা অতিক্রম করেছেন। মুকুন্দরাম ব্যক্তিক অভিজ্ঞতার আড়ালে এবং পশু-পাখির জবানিতে সমকালীন সমাজের অন্তর্গত স্বরূপকে অত্যন্ত সুন্দর ভাবে তুলে ধরেছেন। ভারতচন্দ্রও দেবপুত্র নলকুবরের জবানিতে এবং ভূত-প্রেতের উৎপাত বর্ণনা প্রসঙ্গে সমকালীন সমাজের বাস্তবতাকে তুলে ধরেছেন। বস্তুত মধ্যযুগের বাংলায় রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলায় শাসক চক্রের অরাজকতায় সর্বত্র অস্থিরতা বিরাজ করছিল। দুঃখ–দুদর্শা অত্যাচার প্রভৃতি ছিল জীবনের নিত্যসঙ্গী। শঠ, ধূর্ত লোক আর নিষ্ঠুর শাসকের উৎপীড়নের জনজীবনে তখন বিষাদের কালোছায়া নেমে এসেছিল। এক দিকে ছিল শাসকচক্রের কালোহাত অন্য দিকে সুদ-বাট্টাভোগী মহাজনদের অপশক্তি। ফলে লোকজনকে অনেক সময় দেশ ছেড়ে পালাতে হয়েছিল। মধ্যযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি মুকুন্দরামকেই মামুদ সরীপ নামক এক ডিহিদারের অত্যাচারে দেশ ছেড়ে পালাতে হয়েছিল। কবি তাঁর বিরুপ অভিজ্ঞতার কথা চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে এইভাবে তুলে ধরেছেন।
সরকার হৈল কাল খীলভূমি লেখে লাল
বিনি উপকারে খায় ধুতি
পোতাদার হৈলযম টাকা আড়াই আনা কম
পাই লভ্য খায় দিন প্রতি।
সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের এইরূপ বিশৃঙখলার চিত্র ভারতচন্দ্রের কাব্যেও পাওয়া যায়। ধর্মাশ্রয়ী সামন্ত সমাজে উঁচু –নীচু, বাছ-বিচার ছিলনা। রাষ্ট্র ও সমাজের প্রশ্রয়ে চোরই সাধু বেশে চলা-ফেরা করত। সমাজ জীবনের এইরূপ ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিকে ভারতচন্দ্র তুলে ধরেছেন এভাবে-
এ কি ভুতাগত দেশের
না জানি কি হবে শেষেরে।।
উত্তম অধম না হয় নিয়ম
কেহ নাহি ধর্ম লেশেরে।
দাতা ছিল যারা ভিক্ষা মাগে তারা
চোর ফেরে সাধু বেশেরে।।
তৎকালীন সমাজ জীবন যে, বিশৃঙ্খলায় পূর্ণ ছিল তার পরিচয় পাওয়া যায় নলকূবরের জবানিতেও। দেবী অন্নদা নলকুবরকে তাঁর পূজা প্রচারের জন্য মর্ত্যে যেতে বললে নল কুবর মর্ত্যেও তৎকালীন সমাজে যাবার পরিবর্তে নরকে যেতে রাজী আছে বলে জানায়।
সামন্ত সমাজে সামন্ত প্রভু, তাদের তাঁবেদার ও তথাকথিত সমাজপতিরা বিলাস বহুল এবং আড়ম্বর পূর্ণ্ জীবন যাপন করত। কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবন ছিল অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত। সমগ্র দিন, সমগ্রজীবন তাদেরকে উদরের চিন্তাই ব্যস্ত থাকতে হতো। সুখ-সমৃদ্ধির আকার। তাদের কাছে ছিল স্বপ্নের মতো। তাই নলকুবরের উচ্চারণে জানা যায়।
অধম নরের ঘরে যাব।
কোন গুণে অন্নদারে পাব।।
ব্যস্ত হব উদর ভরণে।
কি জানিব ভজন পূজনে।।
তবে এ কথা সত্য অথৈনৈতিকভাবে নীচুস্তরের মানুষের জীবন ছিল নির্বিঘ্ন। সমাজের নীচুস্তরে পরস্পরের মধ্যে দ্বন্দ্ব সংঘাত ছিলনা বললেই চলে। কিন্তু কুলীন সমাজে দ্বন্দ্ব সংঘাতই ছিল মুখ্য। ঈশ্বরী পাটনীর মুখে তাই শুনতে পাই
“পাটুনী বলিছে আমি বুঝিনু সকল
যেখানে কুলীন জাতি সেখানে কন্দল।।
অন্যদিকে সমাজের সাধারণ মানুষের জীবনের প্রত্যাশা ও ছিল সাধারণ। দু’বেলা খেয়ে বেঁচে থাকাটাই ছিল তাঁদের স্বপ্ন। তাঁদের সন্তান সন্ততিও যাতে নির্বিঘ্নে জীবন যাপন করতে পারে এটাই ছিল তাঁদের আকাঙ্ক্ষা। দেবীর কাছে বর চাইতে যেয়ে ঈশ্বরী পাটনী তাই উচ্চারণ করে
প্রণমিয়া পাটুনী কহিছে জোড় হাতে
আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে।
বস্তুত এই উচ্চারণের মধ্যদিয়ে সমকালীন সাধারণ মানুষের জীবনাকাঙ্ক্ষাই মূর্ত হয়ে উঠেছে। ভারতচন্দ্র ছিলেন সমাজনিষ্ঠ শিল্পী। যদিও তাঁর সমাজ নিষ্ঠতা প্রশ্নতীত নয়। কিন্তু সমাজের বিভিন্ন অসঙ্গতিকে তিনি তাঁর কাব্যে অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন।
বহুবিবাহ তৎকালীন পুরুষতান্ত্রিক সমাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল। ধনবান সমাজপতি মানেই একাধিক বার পরিগ্রহ করবেন, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই কারণে পারিবারিক জীবনের স্বাভাবিক শান্তি বিঘ্নিত হতো। তাই ভারতচন্দ্র সমাজ জীবনের এই অসঙ্গতিকে ব্যঙ্গরসাত্মক ভাষায় অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। ভাবানন্দের দুই স্ত্রী পদ্মমুখী চন্দ্রমুখীর কোন্দলই এর প্রমাণ।
মানসিংহ ভবানন্দ উপখ্যানে ভারতচন্দ্র রান্নার বর্ণনার মধ্য দিয়ে বাঙালির খাদ্যভ্যাসের স্বরূপটিকে উন্মোচন করেছেন। এর মধ্য দিয়ে কবি বাঙালির চিরায়ত খাদ্যরুচির পরিচয়ও তুলে ধরেছেন।
দেবমাহাত্মকীর্তনই মঙ্গল কাব্যের কবিদের প্রধান অভিপ্রায়। কিন্তু এর মধ্য দিয়েও মঙ্গল কাব্যের কবিগণ সমকালীন লোকজ জীবনকে বাণীরূপ দিয়েছেন। তবে এ কথা সত্য যে , অপরাপর মঙ্গল কাব্যের কবিগণ লোকজ জীবনের স্বরূপকে উন্মোচন করতে যতটা দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন ভারতচন্দ্র ততটা সফল হতে পারেন নি। তিনি তাঁর কাব্যে পান্ডিত্য, শিল্প চাতুর্য এবং লিপিকুশলতার যেরূপ পরিচয় দিয়েছেন, সমাজ মনস্কতা রূপায়ণে সেরূপ গৌরব অর্জন করতে পারেন নি। তাই অরবিন্দ পোদ্দার বলছেন-ভারতচন্দ্র বিদগ্ধ নাগরিক রুচির পরিতৃপ্তি সাধন করেছেন, কালবিধৃত জীবনকে সৃষ্টি করেন নি। সমালোচকের এই মূল্যায়নকে স্বীকার করে নিয়েও বলা যায় যে, ভারতচন্দ্রের কাব্যে চিরায়ত বাঙালির শাশ্বত জীবনাচরণ বাণীরূপ পেয়েছে।
ড. এ. আই. এম. মুসা
অধ্যাপক, বাংলা
+88 01713 211 910