
স্বরবৃত্ত ছন্দ: বৈশিষ্ট্য ও বিকাশ
স্বরবৃত্ত ছন্দের সংজ্ঞা, বৈশিষ্ট্য ও বিকাশ
যে ছন্দে যুগ্মধ্বনি সবসময় এক মাত্রা গণনা করা হয় এবং প্রত্যেক পর্বের প্রথম শব্দের আদিতে শ্বাসাঘাত পড়ে তাকে স্বরবৃত্ত ছন্দ বলে। যেমন-
বাঁশ বাগানের /মাথার উপর/ চাঁদ উঠেছে/ওই (৪+৪+৪+১)
মাগো আমার/শোলক বলা/ কাজলা দিদি/কই। (৪+৪+৪+১)
বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে বাংলা কবিতার ছন্দকে প্রধানত তিন শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। এগুলো হলো নিম্নরূপ:
ক. স্বরবৃত্ত, খ. মাত্রাবৃত্ত ও গ. অক্ষরবৃত্ত।
বিভিন্ন ছন্দ বিশেষজ্ঞগণ এই তিন শ্রেণির ছন্দকে বিভিন্ন নামে অভিহিত করেছেন। তবে আমরা আব্দুল কাদির ও মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের দেয় উল্লিখিত নামই ব্যবহার করব।
উল্লিখিত তিন শ্রেণির ছন্দের মধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে যেমন মিল রয়েছে, তেমনি অমিলও রয়েছে। মাত্রাবৃত্ত ও অক্ষরবৃত্ত ছন্দ ভারতীয় সাহিত্যের প্রাচীন ঐতিহ্য থেকে প্রাপ্ত। কিন্তু স্বরবৃত্ত ছন্দ বাংলা কবিতার নিজস্ব সম্পদ। লোকজ চৈতন্যে সৃষ্ট ছড়াই এর আদি উৎস।
স্বরবৃত্ত ছন্দের বিভিন্ন প্রকার বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যাতে এ ছন্দকে অন্য ছন্দ থেকে পৃথক করে চেনা যায়। নিচে এই বৈশিষ্ট্যগুলো আলোচনা করা হলো :
১। স্বরবৃত্ত ছন্দে বদ্ধাক্ষর ও মুক্তাক্ষর-সর্বত্রই একমাত্রার হয়। যেমন-
দি-নের আ-লো/নি-ভে এ-ল/সুজ-জি ডো-বে/ ডো-বে
আ-কাশ ঘি-রে/মে-ঘ ক-রে-ছে/চাঁ-দের লো-ভে/লো-ভে।
তবে এ নিয়মের ব্যতিক্রমও দেখা যায় মুক্তাক্ষর ও বদ্ধাক্ষর উভয় ক্ষেত্রেই দু’মাত্রা গণনাও লক্ষ করা যায়।
২। স্বরবৃত্ত ছন্দের প্রতিটি পূর্ণ্ পর্ব সাধারণত চার মাত্রার হয়। এর আদর্শ পর্ববিন্যাস হলো-৪/৪/৪/২। যেমন-
আজ বিকালে/কোকিল ডাকে/শুনে মনে/লাগে (৪+৪+৪+২)
বাংলাদেশে /ছিলাম যেন/তিনশো বছর/আগে।(৪+৪+৪+২)
তবে এর ব্যতিক্রমও দেখা যায়। কোথাও কোথাও দুই বা তিন মাত্রার অপূর্ণ পর্বের পরিচয় পাওয়া যায়। যেমন-
বাইরে কেবল /জলের শব্দ/ঝুপ ঝুপ/ঝুপ(৪+৪+২+২)
দস্যি ছেলে/গল্প শুনে /এক্কেবারে/চুপ।(৪+৪+৪+২)
তাছাড়া এ ছন্দে ৩/৩/৩/২ কিংবা ৫/৫/৫/২ মাত্রার পর্ব বিন্যাসও দেখা যায়।
৩। স্বরবৃত্ত ছন্দ মূলত মৌখিক ছন্দ। তাই এর যে কোন অপর্ণূ পর্ব শ্বাসাঘাত দ্বারা প্রলম্বিত হয়ে পূর্ণ পর্বের রূপ লাভ করতে পারে। যেমন-
পাখি সব/ করে রব/রাতি পোহাইল
কাননে/কুসুম কলি/সকলি ফুটিল।
৪। স্বরবৃত্ত ছন্দে বদ্ধাক্ষর ও মুক্তাক্ষরে সর্বত্রই এক মাত্রা গণনা করা হয় বলে এর তাল হয় দ্রুত। যেমন-
বৃষ্টি পড়ে/টাপুর টুপুর /নদেয় এল/বাণ
৫। দীর্ঘ আখ্যান রচনার জন্য এ ছন্দ উপযোগী নয়। শিশুতোষ রচনার জন্যই এ ছন্দ বেশি উপযোগী।
৬। বাংলা ছন্দের অন্য দু’টির উৎস সাহিত্য। কিন্তু স্বরবৃত্ত ছন্দের উৎস লোকজীবন।
৭। স্বরবৃত্ত ছন্দে প্রবল শ্বাসাঘাত ও যুগ্ম-ধ্বনির প্রভাবে এক প্রকার ধ্বনি তরঙ্গের সৃষ্টি হয়।
৮। এ ছন্দের লয় খুব দ্রুত হয়।
স্বরবৃত্ত ছন্দের বিকাশ
স্বরবৃত্ত ছন্দ বাংলা কবিতার নিজের ছন্দ। এ ছড়া লৌকিক জীবন থেকে আসার কারণে এর মধ্যে আছে লৌকিক চঞ্চলতা। বিভিন্ন লোকজ ছড়ার মধ্যে লঘু সুর থাকার কারণে কখনও কখনও এ ছড়ার মধ্যে মাত্রাবৃত্তের তাল লক্ষ করা যায়। এটি ছড়ার ছন্দ হওয়ার কারণে এটিই বাংলা কবিতার প্রাচীন ছন্দ। যা পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে।
স্বরবৃত্ত ছন্দে সুরাশ্রয়ী অতিরেক থাকার কারণে আধুনিক কবিরা এ ছন্দ ব্যবহার করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন নি। রবীন্দ্রনাথই প্রথম এ ছন্দ ব্যবহার করে একে জনপ্রিয় এবং আধুনিক করে গড়ে তুলুন। ক্ষণিকা কাব্যে তিনি এ ছন্দের সফল প্রয়োগ করেছেন। একটি ধারণা প্রচলিত ছিল যে, স্বরবৃত্ত ছন্দ হালকা ভাব ও বিষয়ের জন্যই উপযোগী। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ এ ধারণা ভুল প্রমাণ করে অনেক গভীর এবং গম্ভীর বিষয়ও এ ছন্দের মাধ্যমে প্রকাশ করেন।
রবীন্দ্রোত্তর কাব্যে স্বরবৃত্ত ছন্দের ব্যবহার খুব একটা লক্ষ করা যায় না। তবে এক্ষেত্রে সুধীন্দ্রনাথ দত্ত ব্যতিক্রম। কেননা, তিনি স্বরবৃত্তের সফল প্রয়োগে সাফল্য লাভ করেছেন। তিনি স্তবক বিন্যাসের মাধ্যমে স্বরবৃত্তকে মুক্তক স্বরবৃত্তে রূপান্তরিত করেন। ফলে গভীর ভাব বহনে এ ছন্দ উপযোগী হয়ে উঠে।
বাংলাদেশ পর্বে বিভিন্ন কবিদের মধ্যে এ ছন্দ ব্যবহারের আগ্রহ লক্ষ করা যায় তবে সমাজনিষ্ঠ ও রাজনৈতিক কবিতায় এর প্রয়োগ বেশি।
*********************************
ড. এ. আই. এম. মুসা
অধ্যাপক-বাংলা
www.onlinereadingroombd.com
+88 01713 211 910