
NTRCA ‘চৈতন্যের আবির্ভাব ষোড়শ শতকের রেনেসাঁ’
‘চৈতন্যের আবির্ভাব ষোড়শ শতকের রেনেসাঁ’
প্রশ্ন: ‘চৈতন্যের আবির্ভাব ষোড়শ শতকের রেনেসাঁ’,-আলোচনা কর।
আলোচনা: বাংলা সাহিত্যের জন্য একটি বাক্য রচনা না করেও যিনি বাংলা সাহিত্যকে অভাবিতপূর্ণ ঋদ্ধি দান করেন, তিনি হলেন শ্রীচৈতন্য দেব। তাঁর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবে বাংলাদেশের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সমাজের ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয়। চৈতন্যের আবির্ভাবের কারণেই বাঙালির চিন্তা-চেতনায়, মনে-মননে এবং জীবনাচরণে সূচিত হয় ব্যাপক ইতিবাচক পরিবর্তন। আমরা আলোচ্য নিবন্ধে বাংলাদেশের ভাষা-সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সমাজে চৈতন্যের উল্লিখিত প্রভাবের স্বরূপ নির্ণয়ের প্রয়াস পাব।
কবি লিখেছেন-‘বাঙালির হিয়া অমিয় মথিয়া নিমাই ধরেছে কায়া’-চৈতন্যের আবির্ভাব সম্পর্কে কবির এই উচ্চারণ যথার্থ। কেননা, ঐতিহাসিক, সামাজিক সাংস্কৃতিক দিক থেকে বাঙালি জাতীয় মুক্তির পাথেয়র সন্ধান পায় চৈতন্যদেবের প্রভাবেই। তাঁর প্রভাবেই মানবপ্রেমাদর্শে সমৃদ্ধ বৈষ্ণবদর্শন ও ধর্মসম্প্রদায়ে গড়ে উঠে। তাছাড়া তাঁরই পরোক্ষ প্রভাবে অধ্যাত্মক ভাব, বিত্তসৌন্দর্য ও মধুর প্রেমরসের এক সমৃদ্ধ বৈষ্ণব সাহিত্য সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে চৈতন্য ও তাঁর পরিকরগণের তীর্থদর্শনের প্রেক্ষিতে বাঙালির ভৌগোলিক সঙ্কীর্ণতা দূরীভূত হয়।
সমাজের উপর চৈতন্যের প্রভাব ছিল ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী। বাঙালির শাসিত শ্রেণীর সাংস্কৃতিক প্রতিরোধকে তিনি সার্থক রূপ দান করেন। তিনি একদিকে অভিজাতদের মধ্যে স্বেচ্ছাচার রোধ করেন এবং অন্যদিকে জনসাধারণকে সংকীর্তন ও নামধমের সাহায্যে প্রেমধর্মে সমান অধিকার প্রদান করেন। সমাজের উচ্চশ্রেণী ও নিম্ন শ্রেণীর মধ্যে ধর্মাচরণের ভিতর দিয়ে সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। ধর্মের অনুষ্ঠান বাহুল্যকে বিদূরিত করেন। সমকালের প্রতি জনগণকে শ্রদ্ধাশীল করে তোলেন। যার জন্যই তাঁর ভক্তরা উচ্চারণ করতেন-‘প্রণমহ কলিযুগ সর্বযুগ সার।’ ফলে এই সাংস্কৃতিক সামজিক জাগরণে বাঙালির চেতনা সাহিত্যে সঙ্গীতে দর্শনে নানা দিক দিয়ে অপূর্ব ভাবৈশ্বর্যে মূর্ত হয়ে উঠে।
বাংলা সাহিত্যে চৈতন্যের প্রভাব অবিস্মরণীয় ঘটনারূপে পরিগণিত হয়। রাধার অধ্যাত্মমূর্তির মহিমাময় পূর্ণ প্রকাশ ঘটেছে চৈতন্যযুগে। তাই চৈতন্য পূর্ব ও চৈতন্য পরবর্তী পদাবলীর মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য বর্তমান। রাধাকৃষ্ণের লৌকিক প্রেমকাব্যকে আধ্যাত্বিকতার দৃষ্টিতে দেখা হয়েছে চৈতন্যের আবির্ভাবের পরিণাম হিসেবে। চৈতন্যের দিব্যভাব ও আচরণ এবং তাঁর পরিকরবর্গের জীবনাচরণের মধ্যে রাধার এক নতুন রূপ উপলব্ধি করা যায়। আর এই কারণেই বৈষ্ণব সাহিত্যে অধ্যাত্মরক এবং কাব্যরস একাকার হয়ে গেছে।
চৈতন্য সর্বদা জয়দেব, বিদ্যাপতি ও চণ্ডীদাসের পদাবলী শুনতে পছন্দ করতেন। আর এ থেকেই তাঁর ভক্তসমাজে পদাবলী রচনায় ও গানে আধ্যাত্বিক মূল্য আরোপিত হয়। এর প্রভাবে বাংলা সাহিত্যে পদাবলী সাহিত্যের ব্যাপক বিকাশ ঘটে। বাংলা সাহিত্যের এই বিকাশমান স্বরূপ আবলোকন করে অনেক সমালোচক মন্তব্য করেন-‘চৈতন্যের আবির্ভাব ষোড়ষ শতকের রেনেসাঁ’। এ প্রসঙ্গে ড. অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতামত প্রণিদানযোগ্য। তিনি বলেন-
‘চৈতন্যের প্রভাবেই বাংলা সাহিত্য তুচ্ছ মঙ্গলকাব্য ও নাথ সাহিত্যের
রহস্যময় ‘কাল্ট’ হইতে মুক্তি পাইয়া উদারতার পরিমণ্ডলে সম্প্রসারিত হইল।’
তাছাড়া চৈতন্যের প্রভাবের ফলেই বাংলা ভাষা গোঁড়া ব্রাহ্মণের নিকটও সংস্কৃতের ন্যায় আদরণীয় হয়ে উঠে। ফলে বাংলা সাহিত্য ধুলিধূসর পথ হতে রসিকজনের হৃদয়ে ঠাঁই করে নিতে সক্ষম হয়।
চৈতন্য দেবের পরোক্ষ প্রভাবও বাংলা সাহিত্যকে ব্যাপকভাবে ঋদ্ধি দান করে। তাঁর পরোক্ষ প্রভাবেই বাংলা সাহিত্যে জীবনী সাহিত্য রচনার সূত্রপাত হয়। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের ধারায় এই জীবনী সাহিত্য ভিন্ন বৈশিষ্ট্যে তাৎপর্যমন্ডিত। মধ্যযুগের সাহিত্যের মৌল বিষয় ছিল ধর্মীয় তত্ত্বকথা বা দেব-দেবীর লীলাকীর্তন। বাস্তব মানুষের জীবনাচরণের প্রতিচ্ছবি এতে সম্পূর্ণভাবে অনুপস্থিত ছিল। কিন্তু জীবনী সাহিত্যে এ অভিযোগ থেকে অনেকাংশেই মুক্ত। কেননা, জীবনী সাহিত্য মহাপ্রভু শ্রী চৈতন্যের বাল্য, কৈশোর, যৌবন, সংসার-ধর্ম, সাধনা ও সিদ্ধিকে আশ্রয় করেই রচিত হয়েছে। মানুষের মাঝে তিনি অবতার হিসাবে বিবেচিত হলেও প্রকৃত পক্ষে তিনি ছিলেন রক্ত মাংসের সামাজিক মানুষ। তাই তাঁর জীবনী চিত্রিত করতে যেয়ে জীবনীকারগণ সমসাময়িক সময়ের সামাজিক আচার-আচরণ, সাংষ্কৃতিক পরিমণ্ডল এবং রাষ্ট্রীয় বিধি-বিধানকেই চিত্রিত করেছেন। আর এ কারণেই জীবনী সাহিত্যগুলো একদিকে বাস্তবধর্মী শিল্পসফল সাহিত্য হয়েছে এবং অন্যদিকে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের দলিল হিসাবে প্রতিষ্ঠা পয়েছে।
শ্রী কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় তাই বলেন-
‘চৈতন্য প্রভাবে বাঙালির মানসক্ষেত্রে যে সর্বোতোমুখী বিকাশ ঘটিয়েছিল, তাহারই ফলে বাংলা সাহিত্যে সর্বপ্রথম তথ্যানুসৃতি ও ইতিহাস চেতনার উন্মেষ দেখা যায়। শ্রী গৌরাঙ্গ দেব তাঁহার লোকোত্তর চরিত্র-মাধুর্য ও দিব্যলীলা প্রকটনের দ্বারা জাতির মনে এরূপ গভীর রেখাপাত করেন যে এ যাবৎ ইতিহাসবিমুখ বাঙালি তাঁহার জীবনের ঘটনাবলী ও অলৌকিক অনুভূতি সমূহের পঙখানুপুঙখ বিবরণ লিপিবদ্ধ করিবার প্রেরণা লাভ করে।” (বাংলা সাহিত্য বিকাশের ধারা, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৯৮, ৩য় নং, কলকাতা, ১৯৬৭।)
বস্তুত, চৈতন্যচরিত সাহিত্য সমকালীন জীবন ও সমাজের নিখুঁত আলেখ্য, এ কথা দ্বিধাহীনভাবে বলা যায়। কেননা, চরিত্রগ্রন্থগুলো বাংলার চিরকালীন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসকেই তুলে ধরেছে। এর মধ্যদিয়ে এগুলো মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে এক অভিনব নতুন সাহিত্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে। শুধু তাই নয়, জীবনী সাহিত্যের প্রভাবে বাঙালির মনে-মননে, সমাজে ধর্মমতে উদার মানবিকবোধজাত প্রীতিসুন্দর বিনয়মধুর বাসন্তীর স্পর্শ লাগল।
বস্তুত চৈতন্যের প্রভাবেই মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের সবগুলো শাখা-উপশাখা পূর্ণ বিকশিত হয়ে উঠল। ষোড়শ শতকে চণ্ডীমঙ্গল এবং সপ্তদশ শতকে ধর্মমঙ্গল। কাব্য ধারার উদ্বোধন ঘটল। কৃষ্ণলীলাবিষয়ক কাব্য রচনায় বিশেষ উৎসাহ দেখা দিল। বাংলা অনুবাদ সাহিত্য চৈতন্য ভক্তিবাদের প্রভাবে মূল থেকে আরো দূরে সরে গেল। ভাগবতের বীর্যপূর্ণ কাহিনীর পরিবর্তে প্রেমমূলক কৃষ্ণলীলা আখ্যান দেখা দিল। রামায়ণ মহাভারতের অনুবাদেও ভক্তিরসের উচ্ছ্বাস দেখা দিল। মঙ্গলকাব্যের দেব-দেবীরা হিংস্রতা হারিয়ে মানবীয় চরিত্রের কাছাকাছি চলে এল। অনার্য দেবতা আর্য-সংস্কারের স্বীকৃতি পেল। কাহিনী কাব্যের মধ্যে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পদ স্থান পেতে শুরু করল। ফরল আখ্যান কাব্যের প্রথানুগত ধারায় কিঞ্চিত পরিবর্তন দেখা দিল। বাংলা সাহিত্যের এই সমস্ত পরিবর্তন লক্ষ করে ড. আহমদ শরীফ তাই তাঁর ‘বাঙালী ও বাঙলা সাহিত্য’ গ্রন্থে মন্তব্য করেন।-
‘ষোলশতক সর্বার্থেই অবিশেষ বাঙালী জীবনে রেনেসাঁসের যুগ। বস্তুত বাঙালীর মনে-মননে, সমাজে, ধর্মমতে উদার মানবিকতাবোধজাত প্রীতিসুন্দর বিনয়মধুর বাসন্তী হাওয়ার স্পর্শ লাগল, যার ফলে সাহিত্যে সংস্কৃতিতে সোনার ফসল ফলেছিল।[’ ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৩৩, ২য় সং, ২০০৩]
মোটকথা, ষোল শতকের মধ্যভাগ থেকে শুরু করে আঠারো শতকের প্রথম ভাগ পর্যন্ত এই দেড়শ বছর বাংলা সাহিত্যের এক সমৃদ্ধির যুগ। এই সমৃদ্ধিকে লক্ষ করেই সমালোচকগণ একে বাংলা সাহিত্যের রেনেসাঁসের যুগ হিসেবে অভিহিত করেছেন। আমরা উল্লিখিত আলোচনা থেকে বলতে পারি যে, সমালোচকদের উল্লিখিত মূল্যায়ন যথার্থ ও সুদূরপ্রসারী।
প্রসঙ্গ : “ভাবে ও বৈচিত্র্যে বাংলা রোমান্টিক প্রণয়কাব্যগুলো বাংলা সাহিত্যের অনন্য সম্পদ”- আলোচনা কর। ২০১৩
অথবা, মধ্যযুগের রোমান্টিক প্রণয়কাব্যের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও। (১২)
আলোচনা : বাংলা সাহিত্যের ধারায় মধ্যযুগে রচিত রোমান্টিক প্রণয় কাব্যগুলো এক অনন্য সম্পদ। সুচারু শিল্পকলা, সূক্ষ্ম-সৌন্দর্য বোধ ও নির্মল আনন্দ রসের অতুলনীয় মানস সম্পদ এই কাব্যগুলো। রোমান্টিক প্রণয় কাব্যের প্রধান রূপকার হলেন-মুসলিম কবিগণ। মুসলমান কবিদের রচনায় ধর্মের কথা থাকলেও মানবচরিত্রে কোথাও দেবত্ব আরোপিত হয়নি।
শাহ্ মুহম্মদ সগীর থেকে শুরু করে ঊনিশ শতক পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যে এই ধারার কাব্য চর্চা প্রচলিত ছিল। বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার ছেঁয়া লাগার সাথে সাথে এ ধারার সাহিত্য চর্চা ক্ষীণ হয়ে আসতে থাকে। নিচে প্রধান প্রধান প্রণয় কাব্য ধারার পরিচয় দেয়া হলো-
ইউসুফ-জোলেখা : ইউসুফ-জোলেখা কাহিনী নিয়ে কাব্য রচনার ক্ষেত্রে শাহ্ মুহম্মদ সগীর সবচেয়ে বেশি পরিচিত এবং সফল কবি। তিনি বাংলা সাহিত্যে প্রথম মুসলমান কবি হিসাবেও পরিচিত। পনের শতকে তিনি তাঁর কাব্য রচনা করেন বলে অনুমান করেছেন ড. ওয়াকিল আহম্মদ ও ড. এনামুল হক। তাঁর কাব্যে চট্টগ্রামের কিছু আঞ্চলিক শব্দ ব্যবহৃত হওয়ায় ড. এনামুল হক মনে করেন ডে, তিনি চট্টগ্রাম জেলার অধিবাসী ছিলেন।
শাহ্ মুহম্মদ সগীরের কাব্যে সুপ্রাচীন প্রণয় কাহিনী উপজীব্য করা হয়েছে। কোরআন শরীফ ও বাইবেলে এই কাহিনী নৈতিক শিক্ষাদানের মানসে সংযোজিত হয়েছে। কিন্তু বাঙালি কবির কাব্যে মানবীয় চৈতন্যই প্রাধান্য পেয়েছে বেশি।
লায়লী-মজনু : লায়লী মজনু কাব্যের কাহিনীর আদি উৎস আরবীয় লোকগাথা বলে অনুমান করা হয়। তবে ফরাসী কবি নিজামীর কাব্যে অনুসরণ করেই বাহরাম খান তাঁর কাব্য রচনা করেন। দু’চারটি ঘটনা বাদে প্রায় সমস্ত আখ্যানভাগই নিজামীর কাব্যের অনুরূপ। তবে নিজামীর কাব্যে অনুসরণ করে কাব্য রচনা করলেও তিনি মৌলিক কবি প্রতিভার পরিচয় দিতে সমর্থন হয়েছেন।
বিদ্যাসুন্দর : বিদ্যাসুন্দর নিছক মানবীয় প্রেমের কাহিনী। লৌকিক জীবন থেকে এটি উদ্ভুত হয় নি; এটি শিক্ষিত কবির চিন্তার ফসল।’ ‘বিদ্যাসুন্দর’ উপাখ্যানের আদি উৎস কাশ্মীরের কবি বিলহন রচিত সংস্কৃত কাব্য ‘চৌরপঞ্চাশিকা।’
মধুমালতী : ‘মধুমালতী’ কাব্যের কাহিনীর উৎস ভারতীয় উপাখ্যান। তবে সংস্কৃতে এ কাব্যের কোন অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। হিন্দি ও ফারসিতে কয়েকজন কবি এ কাহিনী নিয়ে কাব্য রচনা করেন। হিন্দি কবি মনঝনেই প্রবীণ লোকগাথা নিয়ে সর্বপ্রথম এ কাব্য লিখেন। বাঙালি কবি মনঝনের অনুস্মরণ করেছেন বলে অনুমান করা হয়। কোন কোন পন্ডিত মনে করেন যে, মুহম্মদ কবীর প্রত্যক্ষভাবে হিন্দি কাব্যকে অনুসরণ না করে ফারসী কাব্যকেই অনুসরণ করেছিলেন।
সতীময়না-লোরচন্দ্রানী : কাজী দৌলত আরাকান রাজসভার সভাকবি ছিলেন। সতীময়না-লোরচন্দ্রানী কাহিনী নিয়ে কাব্য রচনায় তাঁর কৃতিত্ব অনস্বীকার্য। তিনি ১৬২২ খ্রী. থেকে ১৬৩৮ খ্রি. এর মধ্যে তাঁর কাব্য রচনা করেন। তবে তিনি সমস্ত কাব্যটি রচনা সমাপ্ত করতে পারেন নি। কাব্য সমাপ্তির পূর্বেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। অবশেষে কাব্যটি সমাপ্ত করেন মধ্যযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি আলাওল। বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী অনুমান করা হয় যে, তিনি চট্টগ্রাম জেলার অধিবাসী ছিলেন।
চন্দ্রাবতী : চট্টগ্রামের চক্রশালার অধিবাসী ছিলেন কোরেশী মাগন ঠাকুর। চট্টগ্রাম তখন আরাকান রাজ্যভুক্ত ছিল। মাগনের কাব্যের নাম ‘চন্দ্রাবতী’। এটি একটি রোমান্টিক প্রণয়কাব্য। ড. এনামুল হক এ কাব্যের কাহিনীকে রূপকথা শ্রেণির বলে মনে করেন। এ কাব্যের প্রধান দুটি চরিত্রের নাম বীরভান ও চন্দ্রাবতী।
পদ্মাবতী : আলাওলের সাহিত্য কর্মের ধারায় পদ্মাবতীই সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি। হিন্দি কবি মালিক মুহম্মদ জায়সীর ‘পদুমাবৎ’ কাব্য থেকে তিনি এ কাব্যের অনুবাদ করেন এবং এ কাব্য অনুবাদে পৃষ্ঠপোষকতা দান করেন মাগন ঠাকুর। ১৬৫১ সালের দিকে এই কাব্য অনুবাদ সম্পন্ন করেন বলে ড. এনামুল হক দাবী করেন। ‘পদ্মাবতী’ অনুবাদ কাব্য হলেও আলাওলের বিরল কবি প্রতিভার স্পর্শে একটি মৌলিক কাব্যের চরিত্র অর্জন করেছে।
উল্লিখিত কাব্য-ধারা ছাড়াও রোমান্টিক প্রণয়কাব্য ধারার আরো কিছু কাব্যের পরিচয় পাওয়া যায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-‘সয়ফুলমূলক-বদিউজ্জামাল’ এবং ‘গুলেবকাওয়ালী’।
মোটকথা, মধ্যযুগের বাংলা কাব্য সাহিত্যের ধারায় রোমান্টিক প্রণয় কাব্যসমূহ বিশেষ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। কেননা, মধ্যযুগের কাব্যে যেখানে ধর্মতত্ত্ব এবং দেব-দেবীর মাহাত্ম্য প্রচারই প্রাধান্য লাভ করেছে সেখানে প্রণয় কাব্য ধারায় মানব মহিমাই মুখ্য হয়ে উঠেছে। তবে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠাই এ ধারার কাব্য প্রসারের পটভূমি নির্মাণ করেছে।
ড. এ. আই. এম. মুসা
অধ্যাপক-বাংলা
+88 01713 211 910