
এইচএসসি : সারাংশ
এইচএসসি : সারাংশ
১
মানুষের জীবনকে একটি দোতলা ঘরের সাথে তুলনা করা যেতে পারে। জীবসত্তা সেই ঘরের নিচের তলা আর মানবসত্তা বা মনুষ্যত্ব উপরের তলা। জীবসত্তার ঘর থেকে মানবসত্তার ঘরে উঠতে মই হচ্ছে শিক্ষা। শিক্ষাই আমাদের মানবসত্তার ঘরে নিয়ে যেতে পারে।অবশ্য জীবনসত্তার ঘরেও যে কাজ করে; ক্ষুৎপিপাসায় বাস্তবিক করে তোলা তার অন্যতম কাজ। কিন্তু তার আসল কাজ হচ্ছে মানুষকে মনুষ্যত্বলোকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। অন্য শিক্ষার যেমন প্রয়োজনের দিক আছে, তেমনি অ্রেয়োজনের দিকও আছে। আর অপ্রয়োজনের দিকই তার শ্রেষ্ঠ। সে শেখায় কী করে জীবনকে উপভোগ করতে হয়। কী করে মনের মালিক হয়ে অনুভূতি ও কল্পনার রস আস্বাদন করা যায়।
সারাংশ: জীবসত্তা আর মানবসত্তার সমন্বয়ই মানুষের জীবন। জীবসত্তা থেকে মানবসত্তায় উত্তরণের পথ হচ্ছে শিক্ষা। শিক্ষা মানুষকে প্রয়োজনের দিক যেমন শেখায় তেমনি অপ্রয়োজনের দিকও শেখায়। তবে অপ্রয়োজনীয় দিকটিই মানব জীবনের শ্রেষ্ঠ দিক। কেননা, এর মধ্য দিয়ে মানুষ অনুভূতি ও কল্পনার রস আস্বাদন করতে পারে।
২
ক্রোধ মানুষের পরম শত্রু। ক্রোধ মানুষের মনুষ্যত্ব নাশ করে। যে লোমহর্ষক কাণ্ডগুলি পৃথিবীকে নরকে পরিণত করিয়াছে, তাহার মূলে রহিয়াছে ক্রোধ। ক্রোধ যে মানুষকে পশুভাবাপন্ন করে তাহা একবার ক্রুদ্ধ ব্যক্তির মুখের প্রতি দৃষ্টিপাত করলেব স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়। যে ব্যক্তির মুখখানা সর্বদা হাসিমাখা, উদারতায় পরিপূর্ণ, দেখলেই তোমার মনে আনন্দ ধরে, একবার ক্রোধের সময় সেই মুখখানির দিকে তাকাইও; দেখিবে, সে স্বর্গের সুষম আর নাই-নরকাগ্নিতে বিকট রূপ ধারণ করিয়াছে। সমস্ত মুখ কি এক কালিমায় ঢাকিয়া গিয়াছে। তখন তাহাকে আলিঙ্গন করা দূরে থাকুক, তাহার নিকটে যাইতেও ইচ্ছা হয় না। সুন্দরকে মুহূর্তের মধ্যে কুৎসিত করতে অন্য রিপু ক্রোধের ন্যায় কৃতকার্য হয় না।
সারাংশ: ক্রোধ মানুষের সর্বাপেক্ষা বড় শত্রু। কেননা এ সমাজে অধিকাংশ অমঙ্গলজনক কাজগুলো ক্রোধের কারণেই হচ্ছে। ক্রোধান্বিত মানুষ যে কোন লোমহর্ষক কাণ্ড ঘটাতেও দ্বিধা করে না। সুন্দরকে মুহূর্তের মধ্যে কুৎসিতে রূপান্তর করতে ক্রোধের মতো অন্য কোনো রিপু এত কার্যকর নয়।
৩
জাতি শুধু বাইরের ঐশ্বর্য-সম্ভার, দালান-কোঠার সংখ্যা বৃদ্ধি কিংবা সামরিক শক্তির অপরাজেয়তায় বড় হয় না, বড় হয় অন্তরের শক্তিতে, নৈতিক চেতনায় আর জীবন পণ করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর ক্ষমতায়। জীবনের মূল্যবোধ ছাড়া জাতীয় সত্তার ভিত কখনো শক্ত আর দৃঢ়মূল হতে পারে না। মূল্যবোধ জীবনাশ্রয়ী হয়ে জাতির সর্বাঙ্গে ছড়িয়ে পড়লে তবেই জাতি অর্জন করে মহত্ব আর মহৎ কর্মের যোগ্যতা। সব রকম মল্যূবোধের বৃহত্তর বাহন ভাষা তথা মাতৃভাষা, আর তা ছড়িয়ে দেয়ার দায়িত্ব লেখক আর সাহিত্যিকদের।
সারাংশ: জাতির সম্মান দালান-কোঠার আধিক্যে বৃদ্ধি পায় না। তার জন্য চাই মূল্যবোধের উন্নয়ন। মনের ঐশ্বর্য এবং জীবনাশ্রয়ী মানবিক মূল্যবোধ জাতিকে পৌছায় সম্মানের উচ্চ শিখরে। আর এ কাজ একমাত্র লেখক আর সাহিত্যিকেরাই করতে পারেন।
৪
আজকের দুনিয়াটা আশ্চর্যভাবে অর্থের বা বিত্তের উপর নির্ভরশীল। লাভ ও লোভের দুর্নিবার গতি কেবল আগে যাবার নেশায় লক্ষ্যহীন প্রচণ্ড বেগে শুধূ আত্মবিনাশের পথে এগিয়ে চলেছে। মানুষ যদি এই মূঢ়তাকে জয় না করতে পারে, তবে মনুষ্যত্ব কথাটিই হয়তো লোপ পেয়ে যাবে। মানুষের জীবন আজ এমন এক পর্যায়ে এস পৌঁছেছে সেখানে থেকে আর হয়তো নামবার উপায় নেই। এবার উঠবার সিঁড়ি না খুঁজলেই নয়। উঠবার সিঁড়িটা না খুঁজে পেলে আমাদের আত্মবিনাশ যে অনিবার্য তাতে আর কোন সন্দেহ থাকে না।
সারাংশঃ মানুষ বর্তমানে অর্থের নেশায় যতই ধাবিত হচ্ছে প্রকারন্তরে ততই সে আত্মহনন করে চলছে। এ পথে এসে পেছনে ফেরার পথ নেই। তাই এখনই এই মরণ নেশা হতে নিজেকে সংযত করা দরকার।
৫
রূপার চামচ মুখে দিয়ে জন্মায় আর কটি লোক। শতকরা নিরানব্বইটি মানুষকেই চেষ্টা করতে হয়, জয় করে জিততে হয় তার ভাগ্যকে। বাঁচে সেই-যে লড়াই করে প্রতিকূলতার সঙ্গে। পলাতকের স্থান জগতে নেই সমস্ত কিছুর জন্যই চেষ্টা দরকার। চেষ্টা ছাড়া বাঁচা অসম্ভব। সুখ চেষ্টারই ফল-দেবতার দান নয়। তা জয় করে নিতে হয়। আপনা এটা পাওয়া যায় না। সুখের জন্য দু’রকম চেষ্টা দরকার, বাইরের আর ভিতরের। ভিতরের চেষ্টায় মধ্যে বৈরাগ্য একটি। বৈরাগ্য ও চেষ্টার ফল, তা অমনি পাওয়া যায় না। কিন্তু বাইরের চেষ্টার মধ্যে বৈরাগ্যের স্থান নাই।
সারাংশঃ পৃথিবীতে উন্নত জীবযাপনের নিশ্চয়তা নিয়ে জন্মানো ব্যক্তির সংখ্যা নগণ্য। অধিকাংশ ব্যক্তিই চরম প্রতিকূলতার সাথে যুদ্ধ করে সফল হয়েছেন। সুখ চেষ্টার ফল।
৬
মাতৃস্নেহের তুলনা নাই। কিন্তু অতি স্নেহ অনেক সময় অমঙ্গল আনায়ন করে। যে স্নেহের উত্তাপে সন্তানের পরিপুষ্টি, তাহারই আধিক্যে সে অসহায় হইয়া পড়ে। মাতৃহৃদয়ের মমতার প্রাবল্যের মানুষ আপনাকে হারাইয়া আপন শক্তি মর্যাদা বুঝিতে পারে না। নিয়ত মাতৃস্নেহের অন্তরালে অবস্থান করিয়া আত্মশক্তির সন্ধান সে পায় না। দুর্বল, অসহায় পক্ষীশাবকের মতো চিরদিন স্নেহাতিশয্যে আপনাকে সে একান্ত নির্ভরশীল মনে করে। ক্রমে জননীর পরম সম্পদ সন্তান অলস, ভীরু, দুর্বল ও পরনির্ভরশীল হইয়া মনুষ্যত্ব বিকাশের পথ হইতে দূরে সরিয়া যায়। অন্ধ মাতৃস্নেহ সে কথা বুঝে না-অলসকে সে প্রাণিপাত করিয়া সেবা করে- ভীরুতার দুর্দশা কল্পনা করিয়া বিপদের আক্রমণ হইতে ভীরুকে রক্ষা করিতে ব্যপ্ত হয়।
সারাংশঃ মাতৃস্নেহের তুলনা নেই।। কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত মাতৃস্নেহ সন্তানের অমঙ্গল আনায়ন করে। মাত্রাতিরিক্ত মাতৃস্নেহ সন্তানকে মনুষ্যত্বের বিকাশ ও সার্বিক উন্নয়নের পথ হতে দূরে সরিয়ে দেয়।
৭
আমারা ছেলেকে স্কুল কলেজে পাঠিয়ে ভাবি যে, শিক্ষা দেয়ার সমস্ত কর্তব্য পালন করলাম। বৎসরের পর বৎসর পাস করে গেলেই অভিভাবকরা যথেষ্ট তারিফ করনে । কিন্তু তলিয়ে দেখেন না, যে কেবল পাস করলেই বিদ্যার্জন হয় না। বাস্তবিক পক্ষে ছাত্রের বা সন্তানের মনে জ্ঞানানুরাগ বা জ্ঞানে প্রতি আনন্দজনক শ্রদ্ধার উদ্রেক হচ্ছে কিনা, তাই দেখবার জিনিস। জ্ঞান চর্চার মধ্যে যে এক পরম রস ও আত্মপ্রসাদ আছে, তার স্বাদ কোন কোন শিক্ষার্থী একবিন্দুও পায় না।
সারাংশঃ শুধুমাত্র পাস করলেই বিদ্যার্জন হয় না। শিক্ষক এবং অভিভাবকদের সচেতনতা এই বিষয় কম। মূলত, শিক্ষার্থীদের মধ্যে জ্ঞান অর্জনের স্বাদ এবং জ্ঞান অর্জনের স্পৃহা জাগানোতেই শিক্ষার প্রকৃত আদর্শ নিহিত।
৮
অনেকে বলেন , স্ত্রীলোকের উচ্চ শিক্ষার প্রয়োজন নাই। মেয়েরা চর্ব্যচোষ্য রাঁধিতে পারে, বিবিধ প্রকার সেলাই করিতে পারে, দুই চারিখানা উপন্যাস পাঠ করিতে পারে, ইহাই যথেষ্ট। আর বেশি আবশ্যক নাই। কিন্তু ডাক্তার বলেন যে, অবশ্যক আছে, যেহেতু মাতার দোষগুণ লইয়া পুত্রগণ ধরাধামে অবতীর্ণ হয়। এই জন্য দেখা যায় যে, আমাদের দেশে অনেক বালক শিক্ষকের বেত্রতাড়নায় কণ্ঠস্থ বিদ্যার জোরে এফ. এ. বি. এ. পাস হয় বটে কিন্তু বালকের মনটা তাহার মাতার সহিত রান্নাঘরেই ঘুরিতে থাকে।
সারাংশঃ শিক্ষিত মা ছাড়া প্রকৃত শিক্ষিত সন্তান লাভ অসম্ভব। অথচ আমাদের সমাজে এ বিষয়টি উপক্ষিত। ফলে প্রকৃত শিক্ষিতের সংখ্যা এখনও অল্প।
৯
মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ প্রাণী । জগতের অন্যান্য প্রাণীর সহিত মানুষের পার্থক্যের কারণ মানুষ বিবেক ও বুদ্ধির অধিকারী। এই বিবেক বুদ্ধি ও জ্ঞান নাই বলিয়া আর সকল প্রাণী মানুষ অপেক্ষা নিকৃষ্ট। জ্ঞান ও মনুষ্যত্বের উৎকর্ষ সাধন করিয়া মানুষ জগতের বুকে অক্ষয় কীর্তি স্থাপন করিয়াছে, জগতের কল্যাণ সাধন করিতেছে, তাই পশুবল ও অর্থবল মানুষকে বড় বা মহৎ করিতে পারে না। মানুষ বড় হয় জ্ঞান ও মনুষ্যত্বের বিকাশে; জ্ঞান ও মনুষ্যত্বের প্রকৃত বিকাশে জাতির জীবন উন্নত হয়। প্রকৃত মানুষই জাতীয় জীবনের প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়ন আনায়নে সক্ষম।
সারাংশ: পশু বল কিংবা অর্থ বল দুটোই মনুষ্যত্বের অন্তরায়। কেননা একমাত্র মানুষই বিবেক-বুদ্ধি ও জ্ঞানসম্পন্ন প্রাণী। আর এজন্যই জগতে মানুষের কীর্তি অক্ষয় ও অম্লান। জাতীয় জীবনের উন্নতি সাধনেও জ্ঞান ও মনুষ্যত্বের বিকাশই যথাযথভাবে কার্যকর।
১০
কিসে হয় মর্যাদা? দামি কাপড়, গাড়ি-ঘোড়া, ‘না ঠাকুর দাদার কালের উপাধিতে? না মর্যাদা এই সব জিনিসে নাই। আমি দেখতে চাই, তোমার ভিতর, তোমার বাহির, তোমার অন্তুর। আমি জানতে চাই, তুমি চরিত্রবান কি-না। তুমি সত্যের উপাসক কিনা। তোমার মাথা দিয়ে কুসুমের গন্ধ বেরোয় কিনা, তোমায় দেখলে দাস-দাসী দৌড়ে আসে, প্রজার তোমায় দেখে সন্ত্রস্ত হয়, তুমি মানুষের ঘাড়ে চড়ে হাওয়া খাও, মানুষকে দিয়ে জুতা খোলাও, তুমি দিনের আলোতে মানুষের টাকা আত্মসাৎ কর। বাপ-মা, শ্বশুর-শাশুড়ি তোমায় আদর করেন; আমি তোমায় অবজ্ঞায় বলবো যাও।
সারাংশঃ মানুষের প্রকৃত পরিচয় ধনে নয়, মনে। সবচেয়ে দুর্লভ লোভনীয় ধন হলো: মানুষের মন। এই হৃদয় যার যতটুকু বড় সেই ব্যক্তি ততটুকু বড়। আর বড়ত্বের মাপকাঠিতেই মর্যাদা।
১১
মানুষের মূল্য কোথায়? চরিত্রে, মনুষ্যত্বে, জ্ঞানে ও কর্মে। বস্তুত চরিত্র বলেই মানুষের জীবনের যা কিছু শ্রেষ্ঠ তা বুঝতে হবে। চরিত্র ছাড়া মানুষের গৌরব করার আর কিছুই নেই। মানুষের শ্রদ্ধা যদি মানুষের প্রাপ্য হয়, মানুষ যদি মানুষের শ্রদ্ধা করে, সে শুধু চরিত্রের জন্য, অন্য কোন কারণে মানুষের মাথা মানুষের সামনে এত নত করার দরকার নেই। জগতে যে সকল মহাপুরুষ জন্মগ্রহণ করেছেন, তাঁদের গৌরবের মূলে এই চরিত্রশক্তি। তুমি চরিত্রবান লোক, এই কথার অর্থ এই নয় যে, তুমি লম্পট নও। তুমি সত্যবাদী, বিনয়ী এবং জ্ঞানের প্রতি শ্রদ্ধা পোষণ কর; তুমি পরদুঃখ কাতর, ন্যায়বান এবং মানুষের স্বাধীনতাপ্রিয়; চরিত্রবান মানে এই।
সারাংশঃ মানুষের প্রকৃত মূল্য চরিত্রে, মনুষ্যত্বে, জ্ঞানে ও কর্মে। চরিত্রবান ব্যক্তি হচ্ছে সত্যবাদী, বিনয়ী, জ্ঞানী, পরদুঃখকাতর ও স্বাধীনতাপ্রিয় মহৎ মানুষ। এই শ্রেষ্ঠ সম্পদ যার মাঝে রিবাজ করে, সে সবার কাছে প্রিয়।
১২
সমাজের কাজ কেবল টিকে থাকার সুবিধা দেওয়া নয়, মানুষকে বড় করে তোলা, বিকশিত জীবনের জন্য মানুষের জীবনের আগ্রহ জাগিয়ে দেওয়া। স্বল্পপ্রাণ, স্থুল বুদ্ধি ও জবরদস্তিপ্রিয় মানুষে সংসার পরিপূর্ণ। তাদের কাজ নিজের জীবনকে সার্থক ও সুন্দর করে তোলা নয়। অপরের সার্থকতার পথে অন্তরায় সৃষ্টি করা। প্রেম ও সৌন্দর্যের স্পর্শ লাভ করেনি বলে এরা নিষ্ঠুর ও বিকৃতবুদ্ধি। এদের একমাত্র দেবতা অহংকার। পারিবারিক অহংকার, জাতিগত অহংকার-এ সবরে নিশান উড়ানোই এদের কাজ।
সারাংশ: সমাজের দায়িত্ব মানুষকে বড় করে গড়ে তোলা। অথচ সমাজের সুবিধাবাদী শ্রেণি নিজেদের স্বার্থ-চিন্তায় মগ্ন থাকে। এরা হয় নিষ্ঠুর, বিকৃতবুদ্ধি, প্রতিহিংসাপরায়ণ ও অহংকারী। সকল প্রকার অহংকারের জয়গান করাই এদের কাজ
+88 01713 211 910