
প্রসঙ্গ : ব্যক্তিগত চিঠি বা পত্র এবং ব্যক্তিগত চিঠির অংশ।
প্রসঙ্গ : ব্যক্তিগত চিঠি বা পত্র এবং ব্যক্তিগত চিঠির অংশ।
ব্যক্তিগত চিঠি:
ব্যক্তিগত প্রয়োজনে, দায়িত্ববোধ থেকে কিংবা নিতান্ত কুশল-সংবাদ জানার প্রয়োজনে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবের কাছে লেখা পত্রই ব্যক্তিগত পত্র। ব্যক্তিগত ভাব-ভাবনার আদান-প্রদান এ ধরনের পত্রের বৈশিষ্ট্য। এ ধরনের পত্রে ব্যক্তিগত ভাবাবেগ ও উচ্ছ্বাসের প্রকাশ থাকে। আন্তরিকতার স্পর্শে এ ধরনের পত্র প্রায়শ হয় হৃদয়গ্রাহী। সম্পর্কভেদে পত্রের ভাব-ভাষা হতে পারে বৈচিত্র্যপূর্ণ এবং প্রয়োজন মতো পত্র হতে পারে বড় কিংবা ছোট।
ব্যক্তিগত চিঠির প্রধান অংশ দুটি :
ক. পত্রের মূল কাঠামো বা ভেতরের অংশ ।
খ. পত্রের আনুষঙ্গিক কাঠামো বা বাইরের অংশ ।
ক. পত্রের মূল কাঠামো বা ভেতরের অংশ
ব্যক্তিগত চিঠির মূল কাঠামো পাঁচটি অংশে বিভক্ত :
১. শিরোনাম, ২. সম্ভাষণ, ৩. মূল পত্রাংশ, ৪. পত্র সমাপ্তি ও বিদায় সম্ভাষণ, ৫. নাম-স্বাক্ষর।
১. শিরোনাম (পত্র-লেখকের ঠিকানা ও তারিখ) : ব্যক্তিগত পত্রের ডান দিকে পত্র-লেখকের ঠিকানা ও তার নিচে তারিখ লিখতে হয়। পত্র-লেখক যেখান থেকে চিঠি লিখছেন, সেই ঠিকানাই এখানে প্রযোজ্য। গ্রাম ও শহরের ঠিকানায় কিছুটা পার্থক্য থাকে। যেমন :
গ্রামের পত্র-লেখকের ঠিকানা :
গ্রাম: মজলিসপুর
ডাকঘর : দামপাড়া
জেলা : কিশোরগঞ্জ
কোড: ২৩০০
২ এপ্রিল ২০২৪
শহরের পত্র-লেখকের ঠিকানা :
১৬৯ দারুস সালাম
মিরপুর-১২০০
২ এপ্রিল ২০২৪
লক্ষণীয় : এক কালে ব্যক্তিগত পত্রের উপরে মাঝামাঝি জায়গায় পত্র-লেখকের ধর্মবিশ্বাস অনুযায়ী মঙ্গল শব্দ লেখা হত। মুসলমানরা লিখতেন : এলাহি ভরসা, হাবিব ভরসা, খোদা ভরসা, বিসমিল্লাহ ইত্যাদি। আর হিন্দুরা লিখতেন : ওঁ, ওঁ মা, শ্রী শ্রী দুর্গা সহায়, শ্রীহরি ইত্যাদি। এটা লেখা না লেখা ব্যক্তিগত অভিরুচির উপর নির্ভরশীল। বর্তমানে ব্যক্তিগত চিঠিতে এগুলো লেখা হয় না ।
২. সম্ভাষণ : পত্র-প্রাপককে সম্বোধন বা সম্ভাষণ করতে হয় পত্রের বাম দিকে। পত্র-প্রাপকের সঙ্গে পত্র লেখকের সম্পর্ক অনুসারে এবং পত্র-প্রাপকের মান, মর্যাদা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠা অনুযায়ী সম্ভাষণের হেরফের হয় সম্প্রদায়ের পার্থক্যের কারণেও সম্ভাষণের পার্থক্য হতে পারে। শ্রদ্ধা, সম্মান, সখ্যভাব বা স্নেহ-প্রীতির সম্পর্ক অনুযায়ীও সম্ভাষণের প্রকৃতি পৃথক হয় ।
ব্যক্তিগত পত্রের সম্ভাষণ রীতি
শ্রদ্ধাভাজন পুরুষ : শ্রদ্ধাস্পদেষু, পরম শ্রদ্ধাস্পদ, মাননীয়, মাননীয়েষু, মান্যবরেষু, মান্যবর, শ্রদ্ধাভাজনেষু ইত্যাদি।
শ্রদ্ধাভাজন মহিলা : মাননীয়া, মাননীয়াসু, শ্রদ্ধেয়া, শ্রদ্ধাস্পদাসু ইত্যাদি ।
সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি : সুধী, মান্যবর, সৌম্য ইত্যাদি ।
সমবয়স্ক প্রিয়জন বন্ধু (পুরুষ) : বন্ধুবরেষু, অভিন্নহৃদয়েষু, প্রিয়বরেষু, প্রিয়, প্রিয়বর, বন্ধুবর প্রিয় বন্ধু, সুপ্রিয়, সুহৃদবরেষু, প্রীতিভাজনেষু, প্রীতিনিলয়েষু, প্রিয়বর, প্ৰিয়মনা ইত্যাদি।
সমবয়স্ক প্রিয়জন বা বন্ধু (মহিলা) : প্রীতিনিলয়াসু, সুহৃদয়াসু, প্রীতিভাজনীয়াসু, প্রিয়তমা, সুচরিতাসু ইত্যাদি ।
বয়ঃকনিষ্ঠ ছেলে : কল্যাণীয়, কল্যাণীয়েষু, স্নেহাস্পদেষু, স্নেহভাজনেষু, স্নেহের, প্রিয়, প্রীতিভাজনেষু, প্রীতিনিলয়েষু ইত্যাদি।
বয়ঃকনিষ্ঠ মেয়ে : কল্যাণীয়া, কল্যাণীয়াসু, স্নেহের, স্নেহভাজনীয়া, স্নেহভাজনীয়াসু ইত্যাদি। এবং এর পর নাম ৷
৩. মূল পত্রাংশ : চিঠির মূল অংশ এটি। এই অংশে পত্র-লেখকের মূল বক্তব্য, উদ্দেশ্য, ইচ্ছা, ভাব, অনুভূতি, ঔৎসুক্য ইত্যাদি লিপিবদ্ধ হয়। সহজ, সরল ও হৃদয়গ্রাহী করে লেখার ওপরই এ ধরনের চিঠির সার্থকতা নির্ভর করে। রচনার গুণে এ ধরনের চিঠি উৎকর্ষমণ্ডিত ও শিল্পনিপুণ হয়ে উঠতে পারে। বক্তব্য বিষয় হওয়া উচিত গোছানো। চিঠির বক্তব্যে পূর্বাপর সঙ্গতি, সামঞ্জস্য ও ধারাবাহিকতা রক্ষা করেই তা অর্জন করতে হয়। এ জন্যে বক্তব্যকে প্রয়োজন মতো অনুচ্ছেদে বিভক্ত করে সাজাতে হয়। যেমন : প্রথম অনুচ্ছেদে শুভেচ্ছা বা সালাম জানিয়ে চিঠি লেখার কারণ বর্ণনা করে ভূমিকা প্রদান, দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে বক্তব্য পরিবেশন, তৃতীয় অনুচ্ছেদে ইচ্ছা বা অভিপ্রায় প্রকাশ এবং এভাবে বক্তব্যকে সাজিয়ে এবং প্রয়োজনে বক্তব্যের আরও বিস্তার ঘটিয়ে শেষে সমাপ্তি টানা যেতে পারে। এ ধরনের চিঠি চলিত ভাষায় লিখলেই হৃদয়গ্রাহী হয়। ব্যক্তিগত চিঠির আবেদন হৃদয়স্পর্শী হয় এর আন্তরিকতায়।
৪. পত্র-সমাপ্তি ও বিদায় সম্ভাষণ: পত্রের শেষ দিকে পত্র-সমাপ্তিসূচক বিদায় সম্ভাষণ জানানোর রীতি সৌজন্যের পরিচায়ক। পত্র-সমাপ্তিসূচক শব্দ হিসেবে সাধারণত ইতি, নিবেদন ইতি ইত্যাদি লেখাই দীর্ঘকাল ধরে প্রচলিত। তবে এখন ইতি না লেখার প্রবণতাও যথেষ্ট। এখন ইতি না লিখে শুভেচ্ছান্তে, ধন্যবাদান্তে, ধন্যবাদসহ, সালামান্তে, প্রণামান্তে, নিবেদনান্তে ইত্যাদি প্রয়োজন ও অভিরুচি অনুযায়ী ব্যবহৃত হচ্ছে। পত্র-সমাপ্তিসূচক অভিব্যক্তির পর বিদায় সম্ভাষণ হিসেবে পত্র-প্রাপকের সঙ্গে লেখকের সম্পর্কসূচক বিশেষণ ব্যবহার করতে হয়। পত্র-প্রাপকের সঙ্গে সম্পর্ক অনুসারে এক্ষেত্রে পার্থক্য দেখা যায় :
প্রাপক শ্রদ্ধাভাজন : পত্র-লেখক পুরুষ : স্নেহধন্য, স্নেহাকাঙ্ক্ষী, প্রীত্যর্থী, গুণমুগ্ধ, প্রণত, বিনীত, প্রীতিধন্য, প্রীতিস্নিগ্ধ, আপনারই ইত্যাদি ৷
: পত্র-লেখক মহিলা : স্নেহধন্যা, প্রীত্যর্থিনী, প্রণতা, বিনীতা, সেবিকা, গুণমুগ্ধা, প্রীতিধন্যা, প্রীতিস্নিগ্ধা, আপনারই ইত্যাদি ।
প্রাপক অনাত্মীয় সম্মানীয় লোক : পত্র-লেখক পুরুষ : নিবেদক, ভবদীয়, বিনীত, বিনয়াবনত ইত্যাদি।
: পত্ৰ-লেখক মহিলা : নিবেদিকা, বিনীতা, বিনয়াবনতা ইত্যাদি।
প্রাপক বন্ধুস্থানীয় বা প্রিয়ভাজন : পত্র-লেখক পুরুষ : প্রীতিধন্য, প্রীতিমুগ্ধ, অভিন্নহৃদয়, আপনারই, তোমারই ইত্যাদি।
: পত্ৰ-লেখক মহিলা : প্রীতিধন্যা, প্রীতিমুগ্ধা, অভিন্নহৃদয়া ইত্যাদি ।
প্রাপক বয়সে ছোট : আশীর্বাদক/ আশীর্বাদিকা, শুভাকাঙ্ক্ষী, শুভার্থী, শুভানুধ্যায়ী ইত্যাদি ।
বিদায় সম্ভাষণে সম্পর্কসূচক বিশেষণ পত্রের ডান দিকে লিখতে হয় ।
৫. নাম-স্বাক্ষর : বিদায় সম্ভাষণের নিচে পত্র-লেখকের নাম-স্বাক্ষর থাকে। নাম-স্বাক্ষরের আগে কেউ কেউ ‘তোমার স্নেহের পুত্র', ‘তোমার হতভাগ্য সন্তান', ‘তোমার সাথি বন্ধু' ইত্যাদি পরিচিতি লিখে তারপর নাম-স্বাক্ষর করে । নাম-স্বাক্ষরের ক্ষেত্রে মনে রাখা দরকার যে, বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজন কিংবা ঘনিষ্ঠ বন্ধু-বান্ধবের কাছে চিঠি লিখতে গিয়ে পুরো নাম লেখা উচিত নয়। কেবল নামের মূল অংশ বা ডাক-নাম ব্যবহার করাই এক্ষেত্রে সঙ্গত ।
খ. পত্রের আনুষঙ্গিক কাঠামো বা বাইরের অংশ
এই অংশে পোস্টকার্ড বা খামে পত্র-প্রাপকের ও পত্র-প্রেরকের নাম-ঠিকানা লিখতে হয়। স্বভাবতই এটি দুটি অংশে বিভক্ত :
১. প্রাপকের নাম-ঠিকানা : খামের ডান দিকে ওপরের অংশে প্রয়োজনীয় ডাকটিকিট লাগাতে হয় এবং নিচে প্রাপকের নাম-ঠিকানা লিখতে হয়।
২. প্রেরকের নাম-ঠিকানা : বাঁ দিকে প্রেরকের নাম-ঠিকানা দিতে হয়।
লক্ষণীয় : পোস্টকার্ডে নির্দিষ্ট জায়গায় প্রথমে পত্র-প্রাপকের এবং তার নিচে প্রেরকের নাম-ঠিকানা লিখতে হয় ।
ড. এ. আই. এম. মুসা
www.onlinereadingroombd.com
+88 01713 211 910