
NTRCA School ‘সাহিত্যে খেলা' প্রবন্ধের মূল বক্তব্য
NTRCA School ‘সাহিত্যে খেলা' প্রবন্ধের মূল বক্তব্য নিজের ভাষায় লিখ ।
উত্তর : বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসে প্রমথ চৌধুরী (১৯৬৮-১৯৪৬) ছিলেন অসাধারণ শিল্পী ব্যক্তিত্ব। একটি স্বাতন্ত্র্যধর্মী সহিত্য ও নবতর ভাষা শৈলীর প্রতিষ্ঠাতা হিসাবেই বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তিনি অমর হয়ে আছেন।
বাংলা গদ্যে সর্বপ্রথম চলিত রীতির উদ্ভাবক ও প্রবর্তক প্রমথ চৌধুরী “ সাহিত্যে খেলা” শীর্ষক প্রবন্ধে সাহিত্য চর্চার উদ্দেশ্য ও স্বরূপ অন্বেষণের প্রয়াস পেয়েছেন । ‘সাহিতের উদ্দেশ্য সকলকে আনন্দ দেয়া কারও মনোরঞ্জন করা নয়, কাউকে শিক্ষা দেওয়াও নয়'-
যুক্তির পরিশীলিত ও যুক্তিনির্ভর বিশ্লেষণই আলোচ্য প্রবন্ধটির মূল প্রতিপাদ্য বিষয়।
সাহিত্যের আদর্শ ও উদ্দেশ্য বর্ণনা করা ‘সাহিত্যে খেলা' প্রবন্ধের প্রধান আলোচ্য বিষয়। প্রবন্ধকার সমস্ত প্রবন্ধেই যুক্তিতর্কের মাধ্যমে চিত্ত বিনোদন এবং শিক্ষার সঙ্গে সাহিত্যের উদ্দেশ্যগত প্রভেদ নিরূপণ করেছেন। সাহিত্যের মূল উদ্দেশ্য কি হওয়া উচিৎ সে সম্পর্কে একটি পরিচ্ছন্ন ধারণা তিনি দিয়েছেন
প্রথমত, তিনি উল্লেখ করেছেন যে, প্রবৃত্তির স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ থেকে একজন কবি, শিল্পী, সাহিত্যিক ও লেখক তার সৃষ্টিকর্ম নির্মাণ করেন । এটা তাঁর অনুশীলনের রপ্ত কোন খেলা নয়, এটা স্বাভাবিক মেধা ও যোগ্যতার ফল। নিজের স্বতঃস্ফূর্ত সৃষ্টি দ্বারা লোকের সস্তা হাততালি পাওয়া শিল্পীর উদ্দেশ্যে হতে পারে না। কারণ, চিত্ত বিনোদনের মাধ্যমে জনসাধারণের মনোরঞ্জন কখনই প্রকৃত সাহিত্যের লক্ষ্য নয় । এ কারণেই লেখক বলেছেন-
‘ যিনি কোন রূপ কার্য-উদ্ধারের অভিপ্রায়ে লেখনী ধারণ করেন, তিনি গীতের মর্মও বোঝেন না, গীতার ধর্মও বোঝেন না ।”
কিংবা সাহিত্য নিছক কোন খেলার সামগ্রীও হতে পারে না যা যখন ইচ্ছা তখন খেলতে খেলতে ভেঙে ফেলা যাবে। কবি সাহিত্যিকদের সৃষ্টিও একটি খেলা। খেলা হচ্ছে জীবজগতের একমাত্র নিষ্কাম কর্ম। কবির সৃষ্টি যেন বিশ্বসৃষ্টির অনুরূপ। কেননা, সে সৃজনের মূলে অভাব দূর করার কোন অভিপ্রায় নেই। এ সৃষ্টির মূলে আছে অন্তরাত্মার স্ফূর্তি এবং তার ফল আনন্দ। এক কথায় সাহিত্য সৃষ্টি জীবাত্মার লীলামাত্র এবং সে লীলা বিশ্বলীলার অন্তর্ভূক্ত। কেননা জীবাত্মা পরামাত্মা অংশ। সাহিত্যের প্রকৃত উদ্দশ্যে সকলকে আনন্দ দান। কিন্তু গুটিকয়েক প্রচারমুখী সাহিত্যিক এ মূল লক্ষ্য হতে বিচ্যুত হয়ে লোকরঞ্জনে নির্বিষ্ট হন । ফলে সাহিত্য হারিয়ে ফেলে তার গভীরতা এবং মহত্ব । কেননা
“যে খেলার ভিতর আনন্দ নেই কিন্তু উপরি পাওনার
আশা আছে, তার নাম খেলা নয়, জুয়া খেলা৷”
অন্যদিকে সাহিত্যের উদ্দেশ্য শিক্ষা দান করাও নয় । কারণ, পাঠ্যবিষয় মানুষ পড়ে অনিচ্ছায় এবং বাধ্য হয়ে । পক্ষান্তরে সাহিত্যের রসাস্বাদন করে মানুষ স্বেচ্ছায় ও আনন্দে। শিক্ষা হচ্ছে সেই বস্তু যা মানুষ নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও গলদকরণ করতে বাধ্য হয়-জীবন, জীবিকা, জ্ঞান আহরণ ও উপার্জনের প্রয়োজনে । অপর দিকে -
কাব্যরস লোকে শুধু স্বেচ্চায় নয় সানন্দে পান করে অমৃত মনে করে ।’
লেখকের মতে-
‘শিক্ষার উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষের মনকে বিশ্বের খবর জানানো,
সাহিত্যের উদ্দেশ্য মানুষের মনকে জাগানো।
সমকালীন বিশ্ব-বাস্তবতায় টিকে থাকার প্রয়োজনে বিশ্বের পূর্বাপর তথ্যাবলী এবং চলমান খবরাখবর জেনে রাখা আবশ্যক। অপরদিকে সাহিত্যের উদ্দেশ্য টিকে থাকার সাথে সম্পর্কিত নয় । বরং মানুষের অন্তরাত্মার স্বতঃস্ফূর্ততাকেই সাহিত্য জাগ্রত করে তোলে। সাহিত্য পাঠের অভিজ্ঞাতায় মানুষ প্রতিনিয়ত বিস্ময়কর আত্ম-আবিষ্কারের অভিভূত হয়। তাঁর এ অনির্বচনীয় আনন্দ শিক্ষার মাধ্যমে লাভ করা সম্ভব নয়।
অভাব বোধ থেকে শিক্ষার উৎপত্তি। কিন্তু সাহিত্যর উদ্ভব কবি মনের পরিপূর্ণতা থেকে। কিন্তু আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা পাঠক এবং লেখকের মাঝে শিক্ষককে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। তাই পাঠক কূল সাহিত্যের রসাস্বাদনে পূর্ণ সুযোগ পচ্ছে না। এ কারণেই প্রবন্ধকার লেখক এবং পাঠকের মাঝে শিক্ষকের উপস্থিতি বাঞ্ছনীয় নয় বলে মত প্রকাশ করেছেন ।
প্রথম চৌধুরী তাঁর প্রবন্ধের সমগ্র অবয়ব জুড়ে ক্ষুরধার লেখনির কুশলীপনায় সাহিত্যের আদর্শ ও স্বরূপ উন্মোচনের সর্বাত্মক প্রয়াস চালিয়েছেন। তিনি গভীর বিশ্বাসের সাথে বলেছেন যে শিল্প সাহিত্য কোন মতবাদ প্রচারের বাহন নয়, এমন কি নয় কোন শিক্ষাদানের মত উদ্দেশ্যমূলক বিষয়। “ সাহিত্য ছেলের হাতের খেলনাও নয়, গুরুর হাতের বেতও নয়”- এ হচ্ছে আনন্দের সেই সৌন্দর্য লোক- যেখান থেকে আনন্দের প্রাচুর্যে মানবাত্মা আলোড়িত হয়। এখানে লেখক তৃপ্ত হন সৃষ্টির আনন্দে আর পাঠক তা পাঠ করে হন, আলোড়িত, রোমাঞ্চিত এবং আনন্দিত । এটাই তো সাহিত্যের চিরন্তনতা ।
মুসা স্যার
বাংলা
www.onlinereadingroombd.com
+88 01713 211 910