
NTRCA school ‘বই কেনা' প্রবন্ধের মূল বক্তব্য
NTRCA school ‘বই কেনা' প্রবন্ধের মূল বক্তব্য আলোচনা কর।
বাংলাদেশের প্রবন্ধ সাহিত্যের ধারায় সৈয়দ মুজতবা আলী (১৯০৪-১৯৭৪) একটি বিশিষ্ট নাম। ভাবে, ভাষায়, জীবন-চেতনায় এবং সর্বোপরি প্রকাশভঙ্গীর স্বাতন্ত্র্যতায় তিনি বাংলা প্রবন্ধকে একটি ভিন্ন স্তরে উপনীত করেন। রবীন্দ্রযুগে আবির্ভূত হওয়ার কারণে তিনি রবীন্দ্র-অনুরগী হলেও রবীন্দ্র- অনুসারী ছিলেন না। বরং তিনি বাংলা প্রবন্ধের একটি স্বতন্ত্র ধারা নির্মাণ করেন। রঙ্গ-ব্যঙ্গ এবং মননশীলতাই ছিল সে ধারার প্রাণ। ‘দেশে-বিদেশে”, ‘পঞ্চতন্ত্র”, ‘চাচাকাহিনী’, ‘ময়ূরকণ্ঠী, “জলে ডাঙ্গায়” ইত্যাদি তাঁর উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি। তবে ‘পঞ্চতন্ত্রে’ তাঁর শিল্পী সত্তার প্রকৃত পরিচয় স্পষ্ট হয়ে উঠে। আলোচ্য গ্রন্থেরই একটি উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধ হলো 'বই কেনা' । এই প্রবন্ধে লেখক বাঙালির বই কেনা ও পড়ার প্রতি অনীহার কারণ বিশ্লেষণ করেছেন। আমরা আলোচ্য নিবন্ধে লেখকের উল্লিখিত বক্তব্যকেই তুলে ধরার প্রয়াস পাব ।
প্রবল জ্ঞান তৃষ্ণা ও রসবোধের বিপরীতে বই পড়া ও কেনায় সহজাত অনীহা বাঙালির একটি নেতিবাচক চরিত্রবৈশিষ্ট্য। প্রাবন্ধিক সৈয়দ মুজতবা আলী ‘ বই কেনা’ শীর্ষক রম্যপ্রবন্ধে বই পড়া ও কেনার প্রতি বাঙালির উদাসীনতার বিষয়টি তীব্র ব্যঙ্গ ও বিদ্রুপের আশ্রয়ে ব্যক্ত করেছেন। বস্তুত বই কেনার ক্ষেত্রে বাঙালির স্বভাব-অনীহার অবসান কামনাই ‘বই কেনা' প্রবন্ধ রচনায় লেখককে উদ্বুদ্ধ করেছে।
ব্যাক্তি ও সমাজ জীবনে বিশেষ করে শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিকাশে বই পালন করে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। বইয়ের মাধ্যমে মানুষ জ্ঞানের রাজ্যে প্রবেশের অধিকার পায়। এর ফলে তার দৃষ্টিভঙ্গির বিকাশ ঘটে। আনাতোল ফ্রাঁস মাছির মাথার চারিদেকে চক্রাকারে থাকা অসংখ্য চোখের দৃষ্টান্ত উপস্থান করে আপসোস প্রকাশ করলেও শেষে এই উপলব্ধিতে উপনীত হয়েছিলন যে, মাছির অসংখ্য চোখ থাকলেও তার মনশ্চক্ষু নেই। ফলে মাছি কেবল বস্তু জগৎকেই দেখতে পায়। কিন্তু মানুষ তার দুচোখ দিয়ে বইয়ের মাধ্যমে বিশাল জ্ঞান জগতে প্রবেম করতে পারে। বারট্রান্ড রাসলেও মনে করেন মানষের মনশ্চক্ষু আছে বলেই সে বইয়ের মাধ্যমে তার মনের চোখকে বিকশিত করতে পারে, সৃষ্টি করতে পারে, অসংখ্য নিজস্ব ভুবন। আনাতোল ফ্রাঁস এবং বারট্রান্ড রাসেল এভাবেই মানবজীবনে গ্রন্থের ভূমিকা চিহ্নিত করেছেন।
বাঙালির জ্ঞানতৃষ্ণা ও রসবোধের স্বীকৃতি সানন্দে তিনি দিয়েছেন, কিন্তু তীব্র ব্যঙ্গ ও বিদ্রুপবাণে বিদ্ধ করে বই পড়া ও কেনার ব্যাপারে বাঙালির উদাসীনতা, অনীহা ও খোড়া অজুহাতকে উপহাস করেছেন তিন। লেখক স্পষ্ট ভাষায় লিখেছেন :
‘পৃথিবীর আর সব সভ্য জাত যতই চোখের সংখ্যা বাড়াতে ব্যস্ত,
আমরা ততই আরব্য উপন্যাসের এক চোখা দৈত্যের মত ঘোঁৎ করি আর চোখ বাড়াবার কথা তুললেই চোখ রাঙাই।”
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর কালে বাংলা বইয়ের ক্রমবর্ধমান মূল্য বাঙালির গ্রন্থ বিমুখতার অন্যতম কারণ, তবে এটি মুখ্য কারণ নয। বইয়ের দাম যদি বেশি হয় তবে এর কাটতি বেশি হওয়ারই কথা । কিন্তু সংখ্যা বিচারে পৃথিবীতে বাংলা ভাষা-ভাষীদের অবস্থান ছয়/সাত নম্বরে হলেও ফারসি প্রকাশক যেখানে একটি গ্রন্থের বিশ হাজার কপি নির্দ্বিধায় ছাপাতে পারেন, সেখানে বাঙালি প্রকাশ দু'হাজার বই ছাপালেই তার নাভিশ্বাস উঠে। ফলে বইয়ের দাম বেশি বলে বাঙালি বই কিনে না, আবার বইয়ের কাটতি কম বলেই প্রকাশক দাম কমাতে পারেন না । পাঠক প্রকাশকের এই চক্র অচ্ছেদ্য। সম্পর্কের এ দুষ্টু চক্র ছিন্ন হওয়া আবশ্যক বলে লেখক মনে করেন। কিন্তু সে চক্র ছিন্ন করবে কে ? পাঠক না প্রকাশক ? লেখকের উত্তর অবশ্যই পাঠক। কারণ, তাঁর বিশ্বাস বই কিনে কেউ কখনও দেউলে হয় না। সমগ্র পৃথিবীর সভ্য মানুষ জ্ঞানের বাহন গ্রন্থ ক্রয় করার জন্য প্রভূত অর্থ ব্যয় করে। ধার করা বই ফেরৎ না দিয়ে তারা গড়ে তুলে গ্রন্থাগার। কিন্তু বাঙালির কাছে বই কেনা অপব্যয় তুল্য। অথচ গ্রন্থ ক্রয় করা যে খরচ নয়, বিনিয়োগ এ চিন্তা বাঙালি মাথায় রাখে না। বাঙালির বই দীনতা পীড়িত করেছে লেখককে। বাঙালি যদি আফ্রিকার কোনো আদিবাসী অসভ্য জনগোষ্ঠী হতো তাহলে কথা ছিল না। বাঙালির জ্ঞান তৃষ্ণা প্রবল কিন্তু বই কেনার সময় প্রচণ্ড উদাসীন এবং কৃপণ।
বই পড়া এবং বই কেনার প্রতি বাঙালির অনীহার এই বস কারণ ব্যঙ্গ বিদ্রূপ কৌতুক ও পরিহাসের ছলে উপস্থাপন করে বাঙালি মানসের এই গুরুত্বপূর্ণ নেতিবাচক বৈশিষ্ট্যের সংশোধন প্রত্যাশা করেছেন লেখক।
বই কেনা প্রবন্ধের গদ্য-শৈলী অভিনব। কেননা, এই প্রবন্ধের গদ্য হলো বৈঠকী রীতির গদ্য। বৈঠকী রীতির গদ্যের মাধ্যমে লেখক একটি গুরুগম্ভীর বিষয়কে লঘু আবরণে ঢেকে রেখেছেন। বক্তব্য বিষয়কে উপস্থাপনের জন্য তিনি এতে একাধিক জ্ঞানগর্ভ ও কৌতুক বা গল্পের অবতারণা করেছেন। ভাষার আলাপচারিতা বা বৈঠকি ঢং সৃষ্টির প্রয়োজনে তিনি আরবি ফারসি ও ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করেছেন। একটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি স্পষ্ট করা যেতে পারে -
‘কিন্তু বাঙালি নাগর ধর্মের কাহিনী শোনে না। তার মুখে ঐ
এক কথা - অত কাঁচা পয়সা কোথায় বাওয়া, যে বই কিনব।'
মোটকথা, যুক্তির ব্যবহার, বুদ্ধির প্রয়োগ, ভাষার সহজতা, আড্ডা বা বৈঠকের ভঙ্গি, বিভিন্ন ভাষার শব্দের উল্লেখ এবং কৌতুক বিদ্রূপ পরিহাস সৈয়দ মুজতবা আলীর গদ্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। উল্লিখিত বৈশিষ্ট্যসমূহের সবকটিরই প্রকাশ লক্ষ করা যায় ‘বই কেনা' প্রবন্ধে। তাই ‘বই কেনা’ সৈয়দ মুজতবা আলীর গদ্য শৈলীর বৈশিষ্ট্য সমৃদ্ধ এক উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধ।
মুসা স্যার
বাংলা
www.onlinereadingroombd.com
+88 01713 211 910