
NTRCA School, প্রশ্ন : ‘প্রাগৈতিহাসিক' গল্প অবলম্বনে ভিখু চরিত্র
NTRCA School, প্রশ্ন : ‘প্রাগৈতিহাসিক' গল্প অবলম্বনে ভিখু চরিত্র আলোচনা কর ।
অথাব, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত 'প্রাগৈতিহাসিক' গল্পের ভিখু চরিত্র আলোচনা কর ।
অথাব, 'ভিখু প্রবলভাবে সংগ্রামশীল ও অস্তিত্ববাদী- মন্তব্যটির আলোকে 'প্রাগৈতিহাসিক' গল্পের ভিখু চরিত্র আলোচনা কর ।
উত্তর: ‘প্রাগৈতিহাসিক’ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি বিখ্যাত, বিতর্কিত ও বহুল আলোচিত গল্প। গল্পটি চরিত্র প্রধান । মুখ্য চরিত্র ভিখু-র হৃদয় গভীরে লালিত সত্ত্বার অনাবৃত প্রকাশই এর মূখ্য আকর্ষণ ও কেন্দ্রীয় বিষয়।
সাহিত্যের চরিত্র বলতে ব্যক্তির অন্তর্গত জাগরণ ও তার সত্তার বিকাশকে বোঝায়। চরিত্র আবার অকস্মাৎ নির্মিত হয় না । এর সংগঠন স্তর-ভিত্তিক । জগৎ, জীবনরীতি, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, ইতিহাসবোধ ইত্যাদির সমবায়েই ব্যক্তি চরিত্র গড়ে উঠে।
‘প্রাগৈতিহাসিক' গল্পের ভিখুর মনস্তাত্ত্বিক বিকাশ ও অন্তর্গত চরিত্র স্বরূপ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তাকে তিনটি পর্যায়ে বিভাজন করে উল্লেখ করা যায়।
প্রথম পর্যায় : ভিখুর শ্রেণী চরিত্র ও জীবনবোধের পরিচয়-কাল।
দ্বিতীয় পর্যায় : আহত ভিখুর নৈঃসঙ্গবোধ ও রোগ মুক্তির পর্ব।
তৃতীয় পর্যায় : ভিখুর ভিক্ষুক জীবন
প্রথম পর্যায়ে গল্পকার ভিখুকে তার শ্রেণী চরিত্রসহ চিহ্নিত করে তার পরিচয় ও আচরণ তুলে ধরেছেন। ভিখু ছিল অপরাধ জগতের অধিবাসী এবং এই পৃথিবীর লোভ, আকাঙ্ক্ষা ও কদমতা তাকে আমুল স্পর্শ করেছিল। আষাঢ় মাসে বসন্তপুরের বৈকুণ্ঠ সাহার গদিতে ডাকাতি করতে গিয়ে সে খুন করে ও আহত হয়। ভিখু জানে বাইরের মুক্ত পৃথিবী কারান্তরালের নিরন্ধ অন্ধকার থেকে অনেক ভালো । তাই সে পুলিশের হাতে ধরা না দিয়ে এবং গভীর রাত্রে নয় ক্রোশ পথ হেঁটে তারই সহকর্মী চিতলপুরের পেহলাদের বাড়ি উপস্থিত হয়েছে। পেহলাদ জানে ভিখুকে সামাল দেয়া যাবে না । তাছাড়া তার শরীরের একসময় পচন ধরবে এবং সেই দুর্গন্ধ ছাড়িয়ে পড়বে। পেহলাদ তাই ভিখুকে নিকটবর্তী জঙ্গলে বাসের পরামর্শ দেয় ও তার ব্যবস্থা করে। সেখানে মাত্র তিনদিন ভিখু ছিল। এ জীবন মানব বাসের অনুপযোগী। আহত ভিখু এভাবে বাঁচতে পারে নি । সহানুভূতি পরবশ হয়ে মুমূর্ষু ভিখুকে তাই পেহলাদ নিজের বাড়ি নিয়ে আসে । তারই ঘরের মাচার উপর খড় দিয়ে শয্যা রচনা করে ভিখুকে থাকতে দেয়।
পেহলাদের বাড়িতে অবস্থানকালে থেকে সুচিত হয় ভিখুর জীবনের দ্বিতীয় পর্যায়। এ পর্যায়ের জীবন যেন ভিখুর অরণ্যবাদী জীবন থেকে সুখপ্রদ । মানুষের জীবন খবুই কঠিন এবং সকল ব্যবস্থায়ই মানুষ বেঁচে থাকতে পারে । কিছু দিনের মধ্যেই ভিখুর অবস্থার উন্নতি হয়। তার ডান হাতটা চিরদিনের জন্যে পঙ্গু হলেও সে বেঁচে ওঠে। বহুচারী ভিখু প্রবৃত্তির বশে এতদিন চালিত হয়েছে। গৃহের শাসন গার্হস্থ্য জীবনের সংযম তাই তাকে তৃপ্ত করতে পারে না। অচিরেই তার অবচেতন মনের প্রবৃত্তিগুলো নখদন্ত বিস্তার করে এবং ভিখুর সে প্রবৃত্তি যখন পেহলাদের কাছে প্রকাশিত হয়। তখন সে এই অকৃতজ্ঞকে আর আশ্রয় দেয় নি। বিতাড়িত ভিখু অতঃপর আরেক রাত্রির অন্ধকারে নতুন আশ্রয়ের জন্যে যাত্রা করে সেই সঙ্গে সুচিত হয় তার জীবনের তৃতীয় পর্বের ।
এ পর্যায়ের ভিখু অনেক বেশি উজ্জ্বল, প্রবৃত্তি- তাড়িত এবং উপভৌগিক মানসিকতাসহ প্রকাশমান। বিশ-ত্রিশ মাইল দূরের এক মহকুমা শহরে শুরু হয়েছে ভিখুর নতুন জীবন। পূর্বের শক্তি তার আর এখন নেই। সে এখন খাঁচাবদ্ধ সিংহ, তাই শত আন্দোলন সত্ত্বেও জীবনের প্রয়োজনে ভিখুকে হতে হয়েছে ভিক্ষুক। ভিখারীজীবনের কারণ- কৌশল প্রথমে সে আয়ত্ব করতে পারে নি। কিন্তু অচিরেই অভিজ্ঞতা ভিখুকে সব শিখিয়ে দিয়েছে। দিনের বেলা বাজারের রাস্তার পাশে এক তেঁতুল গাছের নিচে সে ভিক্ষা করে । আর রাতে বিষ্ণু মাঝির ভাঙ্গা চালায় নিদ্রা যায়। কিন্তু জীবন তার বড়ই নিঃসঙ্গ, ঊষর মরুভূমির মতোই নীরক্ত মনে হয় । কোন অনির্বচনীয়ের আকাঙ্ক্ষায় তাই সে উদগ্রীব হয়ে থাকে। তার এই মানসিকতাকে ভিখুর লিবিডো চেতনার রূপ হিসেবে উল্লেখ করা যায়। স্মরণীয়, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে উত্তরকালে মানুষের চিরন্তন বিশ্বাস ও জীবনবোধে ফাটল ধরেছে। জীববিজ্ঞানের চর্চা, ফ্রয়েডের মনোবিজ্ঞান, মার্কস-এর তত্ত্ব মানুষকে নতুনভাবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। আধুনিক মানুষ তাই কোন আদর্শায়িত সত্তা নয়। সে তার চেতনা, অবচেতন মনের ক্রিয়া প্রতিক্রিয়াসহই সমগ্র । এ পর্বের সাহিত্যেও তাই মানুষকে সেভাবেই নিমার্ণ করা হয়েছে। এ মানুষ কেবল শাশ্বতের অভিসারী নয়, সে জৈব চেতনার পঙ্ক-পল্ববে সমান নিমজ্জিত। মানিক বন্ধ্যোপাধ্যায় বাংলা সাহিত্যে ফ্রয়েডীয় চেতনায় অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা । প্রাগৈতিহাসিক গল্পে ভিখুর চরিত্র -নির্মাণে এই মানসিকতার অভিব্যক্তি ঘটেছে। ভিখু তাই সংলগ্ন হতে চেয়েছে ভিখারিণী পাঁচীর সঙ্গে। পাঁচী জানে বসিরের একনিষ্ঠতা ভিখুর মধ্যে প্রত্যাশিত নয়। তাই তার প্রস্তাব সে প্রত্যাখান করেছে। কিন্তু পঙ্গু হলেও ভিখু কোন পরাজয় স্বীকার করতে অভ্যস্ত নয়। পাঁচীর প্রতিরোধ তাই সে সহজেই জজ করেছে। রাতের অন্ধকারে বশিরকে খুন করে ভিখু পাঁচীর সঙ্গে নতুন জীবনের জন্যে যাত্রা করেছে। আর এভাবেই গল্পকার আদিম, অসভ্য ও প্রাগৈতিহাসিক ভিখুকে তার সত্তা-স্বরূপে উপস্থিত করেছেন।
E.M.Forster তার Aspects of the Novel গ্রন্থে কথা-সাহিত্যের চরিত্রকে দুটি অভিধায় উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে প্রতিটি গল্প ও উপন্যাসে মুখ্য বা Principal এবং Secondary বা গৌণ চরিত্র থাকে। মুখ্য চরিত্র রূপায়ণের জন্যই গৌণ চরিত্রের সৃষ্টির আকর্ষণ সহানুভূতি ও মানস নৈকট্য তাই প্রথম শ্রেণীর চরিত্রের প্রতি নিবদ্ধ থাকে।
প্রাগৈতিহাসিক” গল্পে 'ভিখু' অবশ্যই round চরিত্র এবং এ জাতীয় চরিত্রে সব সত্ত্বা ও বৈশিষ্ট্যের প্রকাশ তার মধ্যে লক্ষণীয়। ভিখু প্রবৃত্তিতাড়িত, প্রতিশোধপরায়ণ এবং কোন কিছু প্রাপ্তির জন্য সে আপোষ করতে জানে না। বন্য হিংস্র পশুদের মতোই তার অভিব্যক্তি আর তা আমাদের প্রচলিত ধারণা ও মূল্যবোধ বিরোধী হলেও বাস্তব এবং সত্য।
বস্তুত, “প্রাগৈতিহাসিক” গল্পটি মুখ্য চরিত্র ভিখুরই জীবনকাহিনী, তারই অবচেতন আকাঙ্ক্ষার শব্দরূপ, তার মানোবিকলন ও আসঙ্গলিপ্সু চেতনার লেখচিত্র; আর সে হিসেবেই গল্পটি সার্থক ও উজ্জ্বল।
Musa Sir
Bangla
www.onlinereadingroombd.com
+88 01713 211 910