
NTRCA School, প্রশ্ন : কবর কবিতায় বৃদ্ধ দাদুর জীবননের করুণ কাহিনী
NTRCA School, প্রশ্ন : কবর কবিতায় বৃদ্ধ দাদুর জীবননের করুণ কাহিনী নিজের ভাষায় আলোচনা কর ।
উত্তরঃ রবীন্দ্র যুগে আবির্ভূত হয়েও যে কয়জন কবি আপন শৈল্পিক স্বাতন্ত্র্যে উজ্জ্বল ছিলেন, জসীম উদ্দীন (১৯০৩-১৯৭৬) ছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম। বিষয় ও প্রকরণ শৈলীতে তিনি বাংলা কাব্যে এক নতুন ধারার সূচনা করেন। বাংলা কবিতাকে তিনি নতুন রূপ ও রসে ঋদ্ধি দান করেন। তাঁর কবিতায় পল্লী জীবনের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, প্রেম-ভালবাসা অত্যন্ত প্রাণময় হয়ে ফুটে উঠেছে। এই দিক থেকে ‘রাখালি' কাব্যের অন্তর্গত ‘কবর' কবিতা বিশেষ গুরুত্বের দাবী রাখে। কেননা, আলোচ্য কবিতায় কবি বৃদ্ধ দাদুর জীবনের মর্মান্তিক দুঃখময় ঘটনা ও অভিজ্ঞতাকে অত্যন্ত শোকাবহ বিবরণের মধ্য দিয়ে তুলে ধরেছেন। তাই এই কবিতাটিতে স্পন্দিত হয়েছে হৃদয় নিংড়ানো ব্যথার এক মহাকাব্যিক ব্যঞ্জনা।
মানব জীবনের অনিবার্য পরিণতি মৃত্যু। নিয়তিতাড়িত বস্তু জগতে এই শাশ্বত সত্যকে মানুষ মেনে নিয়েছে সর্বান্তকরণে। কিন্তু তারপরেও মনলোকের কোথায় যেন বেজে উঠে-
'মরিতে চাহিনা আমি সুন্দর ভুবনে
মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই।'
মানুষের জন্ম লালিত স্বপ্নের আরাধ্য ভুবনে এ এক কৗতুহলী উচ্চারণ। কবি জসীম উদ্দীনের 'কবর' কবিতায় বৃদ্ধ দাদুর ব্যথাদীর্ণ অভিব্যক্তি এই সত্যেরই প্রতিধ্বনি ঘটেছে। স্মৃতিচারণের মাধ্যমে এই কবিতায় বৃদ্ধ দাদু তাঁর স্বজন হারানোর যে বেদনা-গীতি পাঠকের কাছে নিবেদন করেছেন তা মূলত মানব জীবনের অমোঘ সত্যের ছন্দোবদ্ধ গীতাঞ্জলি।
কবিতার শুরুতেই বৃদ্ধ দাদু তার নাতির কাছে ত্রিশ বছরের শোকসন্তাপে সিক্তকরা দাদির কবরের ছায়াছবি এঁকেছেন। ভালবাসই মানব জীবনের প্রধান উপজীব্য। জগতকে, জীবনকে প্রয়োজনীয় উপকরণকে ও আত্মীয় পরিজনকে ভালবেসে মানুষ জীবনের সুখ শান্তি ও আনন্দ উপভোগ করতে পারে। কিন্তু হতে পারে না নিশ্চিন্ত, নির্বিঘ্ন। কারণ, মরণ মানুষের দ্বারে বার বার ভয়াল ছোবল হেনে সংসারে লাগায় শোকের আগুন। জীবন মৃত্যুর এইে দ্বন্দ্ব অহরহ চলতে থাকে। আর মুত্যুর শঙ্কা আছে বলেই তো জীবনের এত মূল্য, এত উচ্ছ্বাস আর এত স্বাদ। ‘যেখানে যাহারে জড়ায়ে ধরেছি সেই চলে গেছে ছাড়ি' - এটিই জগতের চিরন্তন রীতি।
অমোঘ সত্যের অনিবার্য নির্মমতায় যাপিত জীবনের নির্দিষ্ট পরিক্রমা শেষে প্রতিটি মানুষই একদিন পাড়ি জমায় মৃত্যুর দেশে। তেমনি দাদুর নিঃসঙ্গ জীবনেও অনেক স্বজনের পদচারণা ঘটেছে। কিন্তু তারা সবাই তাকে একে একে ছেড়ে চলেগেছে, পাড়ি জমিয়েছে অজানার দেশে। সবার মতো দাদুর প্রিয়তমা স্ত্রীও দাদুকে ছেড়ে চলে গেছে। যদিও স্ত্রীর প্রতি দাদুর ছিল গভীর প্রেম আর বিশুদ্ধ ভালবাসা। জীবনের সবচেয়ে বর্ণিল সময় তিনি পাড় করেছেন স্ত্রীর সঙ্গে। কিন্তু নিয়তির নিদারুণ অভিসম্পাতে বৃদ্ধের জীবনচারিণী বিদায় নিল এই জগৎ সংসার থেকে। বেদনার আঘাতে নিভে গেল বৃদ্ধের জীবনের সোনালী ঊষার সোনালী আলো। বৃদ্ধের হাহাকার -
‘আমারে ছাড়িয়া এত ব্যথা যার কেমন করিয়া হায়,
কবর দেশেতে ঘুমায়ে রয়েছে নিঝঝুম নিরালায়!”
তারপর বিদায় নিল একমাত্র পুত্র। শোকসিন্ধুতে উৎক্ষেপিত হলেন বৃদ্ধ দাদু। এই মৃত্যু তাঁর চিত্তকে তীব্র ব্যথাতুর করেদিল। বিশেষত তাঁর নাতি যখন জিজ্ঞাস করেছিল যে তার বাবাকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তখন শোকের তীব্রতায় দাদু নির্বাক হয়ে পড়েছিলেন। সেই মৃত্যুর শোকে পুত্রবধুর ক্রন্দন যেন সমস্ত গ্রামকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল।
‘গাছের পাতারা সেই বেদনায় বুনো পথে যেত ঝরে ফালগুনী হাওয়া কাঁদিয়া উঠিত শূন্য মাঠখানি ভরে।
একদিন পতির মৃত্যুতে শোকাভিভূত পুত্রবধূ হলো স্বামীর অনুগামী। ছেলেকে অশ্রু আশীর্বাদ করে স্বামীর মাথালখানি কবরের উপর ঝুলিয়ে দেবার অনুরোধ করে পুত্রবধু একদা মৃত্যুবরণ করে। দাদুর এই আঘাতও সহ্য করতে হয়। এমনভাবে বৃদ্ধের নাতনী ও একমাত্র ফুলকোমল মেয়েও চলে গেলো পরপারে। আর তাতে নিঃসহায় করে রেখে গেল পৃথিবীর বুকে। কিন্তু যাদের নিয়ে এত আয়োজন, এত স্বপ্ন, তারা ক্ষণিকের তরে জগতে এসে জগতকে হাসিয়ে কাঁদিয়ে আবার পরমাত্মার নিকট ফিরে গেল। কবিগুরুর ভাষায়-
‘চলিতেছে অমনি অনাদিকাল হতে
প্রলয় সমুদ্রবাহী সৃজনের স্রোতে।”
নিদারুণ নিঃসঙ্গতার অভিসম্পাতে আক্রান্ত বৃদ্ধের জীবনের বড় দুঃখ যে প্রতিটি প্রিয়জনের শব তাকে নিজ হাতে সমাধিতে শায়িত করতে হয়েছে। প্রতিটি মৃত্যুই তাঁর অন্তরের অন্তরতম প্রদেশটিকে বেদনার রাগিনীতে আচ্ছাদিত করে রেখেছে। এ কারণেই জীবনের প্রান্তসীমায় দাড়িয়ে বৃদ্ধের একমাত্র কামনা
“ওই দূর বনে সন্ধ্যা নামিছে ঘন আবিরের রাগে,
অমনি করিয়া লুটায়ে পড়িতে বড় সাধ আজ জাগে।'
সন্ধ্যার আজানের সুর লহরীতে বৃদ্ধ দাদু তাই তার আসন্ন মুত্যুর পদধ্বনি শোনতে পাচ্ছেন। আর তাই তাঁর শোকগীতিতে আমাদের হৃদয় বেদনায় আপ্লুত। কেননা-
'Our sweetest songs are those
that tells of saddest thought.'
বস্তুত, ভাষা ও ছন্দের বিন্যাসে 'কবর' কবিতায় কবি জসীম উদ্দীন বৃদ্ধ দাদুর জীবননের শোকাবহ অভিজ্ঞতাকে যেভাবে তুলে ধরেছেন তা সমগ্র বাংলা সাহিত্যের ধারায় দুর্লভ ও অভিনব।
Musa Sir
Bangla
www.onlinereadingroombd.com
+88 01713 211 910