
NTRCA School: বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা: স্কুল পর্যায় বাংলা বিষয়ের অতিগুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা : গল্প
ব্যাখ্যা: গল্প
NTRCA School: বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা: স্কুল পর্যায়
বাংলা বিষয়ের অতিগুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা : গল্প
১ নং ব্যাখ্যা : দুইজন ভোরের প্রতীক্ষা করে ।
অথবা, বিবস্ত্র পিতার পাশে গামছা পরিহিত পুত্র। দুই জনে ভোরের প্রতীক্ষা করে।
উত্তর : ব্যাখ্যার জন্য নির্বাচিত অংশটুকু উদার মানবতাবাদী কথাসাহিত্যিক শওকত ওসমান রচিত ‘নতুন জন্ম’ শীর্ষক গল্প থেকে নেয়া হয়েছে।
প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে পিতা-পুত্রের মানসিক পরিবর্তনের স্বরূপকে তুলে ধরতে গিয়ে লেখক আলোচ্য উক্তি করেন।
গোমতী নদীর তীরে আক্কাসের জন্ম। তবে সে পিতার মতো গোমতীর মায়ায় আচ্ছন্ন থাকতে রাজি নয়। সে গোমতীর ওপর ভীষণ ক্ষুব্ধ। জলজ প্রাণীর মতো গোমতীর শত প্রতিক‚লতা মেনে নিয়ে সে কিছুতেই জীবন কাটতে চায় না। সেদিনও ছিল ঝড় বৃষ্টির রাত। সারাদিন কর্ম ক্লান্তির পর ঘরে ফিরে বাপ বেটা কিছু মুখে দিবে বলে ভাবছিল। তখনই দেখা গেল গোমতী তার চিরচেনা স্বভাবে ভাঙ্গনের খেলায় মেতে উঠলো। দুপাশের বাড়ি আর গাছ গাছালি নদীর জলে মুখ থুবড়ে পড়তে থাকলো। তারপর এল বান। দেখতে না দেখতেই ঘরের মেঝেতে এক বুক পানি হয়ে গেল। ফরাজ আলি সিদ্ধান্ত নিল এখানে আর নয়। বাপ বেটা দুজনেই সেই অন্ধকারে নদী সাঁতরে বন্যারোধী বাঁধে গিয়ে উঠল। প্রচণ্ড শীতে আর সারাদিন বৃষ্টির পানি মাথার দিয়ে যাওয়ার জন্য আক্কাস ঠকঠক করে কাঁপছিল । ফরাজ আলি সস্নেহে পুত্রকে পাশে বসাতে গেলে আক্কাস আলী জিদ ধরে এখানে সে আর থাকবে না। নদীর জলে এই সুসুঙের মতো জীবন সে চায় না, প্রয়োজন হলে শহরে গিয়ে চুরি ডাকাতি করে খাবে। পুত্রের এরূপ জোর প্রতিবাদের মুখে ফরাজ আলি শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার করে। সে সিদ্ধান্ত নেয় গোমতীর চির মায়া কাটিয়ে সেও শহরে চলে যাবে। তাইতো পুত্র আক্কাস কে বলে, “বিয়ান আইতে দে। আমিও যামু তোর লগে। মহাজনের নাও দিয়া যামু ।” বিবস্ত্র ফরাজ আলি গামছা পরিহিত পুত্রকে সস্নেহে কাঁথার মধ্যে টেনে নিয়ে আবার বলে ,“আঁই তোয়ার পোলা না, বা জান ?” এই নতুন পরিচয়ে নতুন জীবনের সন্ধানে পিতা পুত্র ভোরের প্রতীক্ষা করতে থাকে।
বস্তুত, আলোচ্য উক্তির মধ্য দিয়ে পিতা-পুত্রের মানসিক পরিবর্তনের স্বরূপকে লেখক অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন।
২নং ব্যাখ্যা: লেখাপড়া নাইবা জানলে? জজ মেজেষ্টর না হলে কী মানুষ হয় না?
উত্তর: ব্যাখার জন্য নির্বাচিত অংশটুকু জীবনঘনিষ্ট কথাসাহিতিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত 'পুঁইমাচা' নামক ছোটগল্প থেকে নেওয়া হয়েছে।
আলোচ্য অংশে গল্পকার পনের বছর মেয়েকে পাত্রস্থ করতে না পারায় কালিময় সহায়হরিকে যেভাবে কটাক্ষ করেছিলেন, তাই তুলে ধরার প্রয়াস পেয়েছেন।
সহায়হরি একজন গরিব ব্রাহ্মণ। অভাবের সংসারে চার চারটে মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ে ক্ষেন্তির বয়স পনের বছর। সে সময়ের হিন্দু সমাজের নিয়ম অনুসারে বিয়ের বয়স পার হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সহায়হরি মেয়ের বিয়ের ব্যবস্থা করতে পারছেন না। বিভিন্ন জায়গা থেকে বিয়ের প্রাপ্তব আসলেও সেগুলোকে তিনি মেয়ের জন্য উপযুক্ত মনে করেন না। কালিময় একবার ক্ষেন্তির জন্য একটি পাত্র ঠিক করে দিয়েছিলেন। কিন্তু পাত্রটির দোষের কথা শুনে আশীর্বাদের পরে সহায়হরি বিয়েটা ভেঙে দেন। এতে কালিময় আরও বেশি বিরক্ত ও অসন্তুষ্ট হন। । তিনি বিভিন্ন কটু কথায় সহায়হরিকে গালিগালাজ করেন। তির্যক উক্তির সাহায্যে বোঝাতে চেষ্টা করেন যে সহায়হরির যেহেত মেয়ের বিয়েতে তেমন কিছু দেওয়ার সামর্থ্য নেই তাই তার মতো গরিব মানুষের এত বাছাবাছি করারও অধিকার নেই। কটাক্ষ করে তিনি বলেই বসলেন, ‘দরিদ্র মানুষের এত বাছাবাছি কেন।" সুতরাং লেখাপড়া না জানল, নাই বা জজ ব্যারিস্টার কিন্তু টাকা তো আছে। তার সঙ্গে মেয়ের বিয়ে হলে ভালো হতো। সহায়হরির উচিত হয়নি দোষ ধরা।
সমাজের বিত্তবান মানুষ গরিব মানুষের উপর একদিকে যেমন আধিপত্য বিস্তার করতে চান তেমনি অন্যদিকে তাদের তাদের অপমান করতেও কুণ্ঠিত হন না। কালিময়ের আলোচ্য উচ্চারণের মাধ্যমে এই সত্যই উন্মোচিত হয়েছে।
৩ নং ব্যাখ্যা: মরণ!
উত্তর: ব্যাখ্যার জন্য নির্বাচিত অংশটুকু বাংলা ছোটগল্পের জনক হিসেবে খ্যাত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) রচিত 'শাস্তি' শীর্ষক গল্প থেকে নেওয়া হয়েছে।
‘শাস্তি’ গল্পের অন্যতম চরিত্র চন্দরা অভিমান ও ক্ষোভের সাথে আলোচ্য উক্তি করেছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত 'শাস্তি' গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র চন্দরা। তার বয়স সতেরো কি আঠারো হবে। স্বভাবের দিক থেকে সে খুবই প্রাণচঞ্চল। তার স্বামীর নাম ছিদাম রুই। ছিদামের বড় ভাই দুখিরাম তার স্ত্রী রাধাকে খুন করে। এ সময় ছিদাম তার ভাইকে বাঁচাতে নির্দোষ স্ত্রী চন্দরার উপর দোষারোপ করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ছিলাম বিদ্রোহী চন্দরার কাছে পেরে উঠে না। চন্দরা রাগে, ক্ষোভে, অভিমানে সে স্বামীর সংসার ছেড়ে ফাঁসির দড়িকেই সঙ্গী করতে চায়। তাই সে সব জায়গায় নিজেকে বাঁচাতে কোন সত্য কথা বলে নি, বরং সব জায়গায় বিশেষ করে পুলিশ, ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট, জেলা জজ সাহেব সব জায়গায় নিজের উপর দোষ চাপিয়েছে। এমনকি রাধার কোন দোষের কথা জিজ্ঞাসা করলেও সব দোষ নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে ফাঁসির মঞ্চের দিকে এগিয়ে গেছে। নিজের নিশ্চিত ফাঁসির কথা জেনেও সে এই কাজ করেছে।
অবশেষে চন্দরার ফাঁসির দিন এগিয়ে আসে। ফাঁসির পূর্বে দয়ালু সিভিল সার্জন চন্দরাকে জিজ্ঞাসা করে : “কাহাকেও দেখিতে ইচ্ছা কর?” চন্দরা এর উত্তরে তার মাকে দেখতে চায়। ডাক্তার জানায় তার স্বামী তাকে দেখতে চায়। কিন্তু এর প্রত্যুত্তরে চন্দরা বলেছে “মরণ!”
বস্তুত, চন্দরার কণ্ঠে আলোচ্য উচ্চারণের মধ্য দিয়ে গল্পকার চন্দরার ক্ষোভ ও অভিমানকে যেমন প্রকাশ করেছেন তেমনি পুরুষ শাসিত সমাজে নারীর অবস্থানকেও উন্মোচন করেছেন। একই সাথে পুরুষদের মিথ্যাচার ও স্বার্থপরতার চিত্রও এখানে প্রকাশ পেয়েছে।
৪ নং ব্যাখ্যা: বউ গেলে বউ পাইব, কিন্তু আমার ভাই ফাঁসি গেলে তো ভাই পাইব না।
উত্তর: ব্যাখ্যার জন্য নির্বাচিত অংশটুকু বাংলা ছোটগল্পের জনক হিসেবে খ্যাত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) রচিত 'শাস্তি' শীর্ষক গল্প থেকে নেওয়া হয়েছে।
এটি চন্দরার স্বামী ছিদামের উক্তি। পুরুষ শাসিত সমাজে নারীর অবস্থান ও পুরষদের স্বার্থপরতার স্বরূপ তুলে ধরতে গিয়ে গল্পকার আলোচ্য উক্তির অবতারণ করছেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'শাস্তি' গল্পের দুখিরাম রুই আর ছিদাম রুই দুই ভাই । সুখিরাম রুই ও ছিদাম রুইয়ের যৌথ সংসার। সংসারে আছে দুখিরামের একটি দেড় বছরের ছেলে। কিন্তু এ সংসারে দুই বউ মিলে সারাদনি ঝগড়া, ফ্যাসাৎ, হৈচৈ-চেচামেচি করে থাকে। এসব নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। প্রতিদিনই প্রায় ঘটে থাকে। আর এসব ঘটনায় প্রতিবেশীরাও অভ্যস্ত ছিল। বরং যেদিন তাদের বাড়ি শান্ত থাকতো প্রতিবেশীরা কোন বিপদের আশঙ্কা করতো। ঘটনার দিন দুই ভাই জমিদারের কাছারি থেকে সন্ধ্যায় বাড়িতে আসে। ক্ষুধার্ত দুখিরাম বড় বউ এর কাছে ভাত চায়। আর বড় বউ বলে-“ভাত কোথায় যে ভাত দিব, তুই কি চাল, দিয়া গিয়াছিলি। আমি কি নিজে রোজগার করিয়া আনিব।” বিশেষত শেষ কথাটায় একটা গোপন অথচ নুংড়া ইঙ্গিত ছিল। এটা বুঝতে পেরে দুখিরাম রাগান্বিত হয। সে দা নিয়ে বউয়ের মাথায় কোপ দেয় ৷ মুহূর্তেই তার মৃত্যু হয়। এই সময় হঠাৎ-ই প্রতিবেশী রামলোচন খুড়ো বাড়িতে প্রবেশ করে। ঘটনা শুনে কে খুন করেছে জানতে চাইলে ছিলাম চন্দরার নাম বলে ফেলে। আবার চন্দরাকে বাঁচানোর জন্যও ব্যাকুল হয়। রামলোচন তাকে এক বুদ্ধি দেয়- পুলিশ বা অন্যদের কাছে যেন ছিদাম তার ভাইয়ের দোষ দেয়- তাহলে তখন তার বউ বেঁচে যাবে। তখন ছিদাম রামলোচনকে উদ্দেশ্য করে উচ্চারণ করে-
‘বউ গেলে বউ পাইব, কিন্তু আমার ভাই ফাঁসি গেলে তো ভাই পাইব না।’
বস্তুত, আলোচ্য উক্তির মধ্য দিয়ে পুরুষ শাসিত সমাজে নারীর অবস্থান ও পুরষদের স্বার্থপরতার স্বরূপ অত্যন্ত চমৎকভাবে ফুটে উঠেছে।
৫ নং ব্যাখ্যা : সে মনে মনে বুঝিল, কলিযুগেও দুনিয়ায় ধর্ম আছে। (নিবন্ধন- ২০০৬, ২০০৮)
উত্তর: ব্যাখ্যার জন্য নির্বাচিত অংশটুকু সমাজনিষ্ঠ কথা সাহিত্যিক ও রাজনীতিবিদ আবুল মনসুর আহমদ বিরচিত বিখ্যাত ছোটগল্প 'হুযুর কেবলা' থেকে নেওয়া হয়েছে।
এমদাদ দর্শন শাস্ত্রে পড়া আধুনিক যুবক। ধর্মের প্রতি ছিল বিরূপ-বীতশ্রদ্ধ। হঠাৎই সে আধুনিক বেশভূষা ছেড়ে ধর্মীয় লেবাস ধারণ করে। এতে সাধারণ মানুষ তার সম্পর্কে যে মনোভাব ব্যক্ত করে তা প্রকাশ করতে গিয়ে এমদাদ আলোচ্য মনোভাবের অবতারণা করে।
এমদাদ ছিল একজন শিক্ষিত যুবক। সে কোলকাতায় দর্শন শাস্ত্রে অনার্স পড়ত। আল্লাহর অস্তিত্বে তার ছিল ঘোর সংশয়। সে ধর্ম, খোদা, রাসূল কিছুই মানত না। সে খোদার আরশ, ফেরেশতা, ওহী, হযরতের মেরাজ নিয়ে সর্বদা হাসিঠাট্টা করত। কলেজ ম্যাগাজিনে সে খোদার অস্তিত্বে অসরতা প্রমাণ করবার জন্য মিল, হিউম স্পেন্সার, কোঁত প্রমুখ লেখকের ভাব চুরি করে প্রবন্ধ লিখত। এহেন এমদাদ খেলাফত আন্দোলনে যোগ দিয়ে হঠাৎ বদলে গেল। সে ধর্মকর্মে মনোযো দিল। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তে লাগল । আধুনিক জীবনযাপনে প্রতি তার গভীর বিতৃষ্ণা দেখা দিল। আধুনিক জীবনযাপনের উপকরণগুলো সে একে একে নষ্ট করে ফেলল। বিলাতি ফিনফিনে ধুতি, সিল্কের জামা পোড়াইয়া ফেলিল; ফ্লেক্সের ব্রাউন রঙের পাম্পশুগুলি বাবুর্চিখানার বঁটি দিয়ে কোপাইয়া ইলশা কাটা করিল। সে কলেজ পরিত্যাগ করল। তারপর সে কোরা খদ্দরের কল্লিদার কোর্তা ও সাদা লুঙ্গি পরে মুখে দেড় ইঞ্চি পরিমাণ ঝাঁকড়া দড়ি নিয়ে সামনে পিছনে সমান করে চুলকাটা মাথায় গোল নেকড়ার মত টুপি কান পর্যন্ত পরে বাড়ির দিকে বওনা দিল। সেদিন রাস্তার বহু লোক তাকে সালাম দিল। এমদাদ জনগণের ধর্মের প্রতি ভক্তি দেখে অভিভূত হয়ে পড়ল। ধর্ম এবং ধর্মীয় লেবাসের প্রতি এই ভক্তি দেখে তার মনে হল কলিযুগেও দুনিয়ায় ধর্ম আছে।
বস্তুত, ধর্ম এবং ধর্মীয় লেবাসের প্রতি জনগণের শ্রদ্ধা দেখে এমদাদের ব্যঙ্গাত্মক মনোভাব আলোচ্য উচ্চারণের মধ্য দিয়ে উন্মোচিত হয়েছে।
৬ নং ব্যাখ্যা: . মরিবে না, সে কিছুতেই মরিবে না। বনের পশু যে অবস্থায় বাঁচে না, সেই অবস্থায়, মানুষ সে, বাঁচিবেই। (নিবন্ধন - 2010, 2012)
উত্তর: ব্যাখ্যার জন্য নির্বাচিত অংশটুকু ফ্রয়েডীয় জীবনদর্শনে পরিস্নাত কথাসাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বিরচিত 'প্রাগৈতিহাসিক' শীর্ষক ছোটগল্প থেকে নেওয়া হয়েছে।
একান্ত বিরুদ্ধ পরিবেশে ভিখুর টিকে থাকার বাস্তবতাকে তুলে ধরতে গিয়ে লেখক আলোচ্য মন্তব্য করেছেন।
দুর্ধর্ষ ডাকাত ভিখু। ডাকাতিই তার পেশা। সে তার দলবল নিয়ে বসন্তপুর গ্রামের বৈকুণ্ঠ সাহার গদিতে ডাকাতি করতে যায়। কিন্তু ঘটনা চক্রে সেখানে তার দলবল ধরা পড়ে। তবে ভিখু পালিয়ে আসতে সক্ষম হয়। যদিও সে বর্শার আঘাতে চরমভাবে আহত হয়। বর্শার খোঁচায় তার ডান কাঁদ ক্ষতবিক্ষত হয়। রাতারাতি আহত অবস্থায় দশ মাইল হেঁটে মাথাভাঙ্গা পুলের নিচে আশ্রয় নেয়। কাদার মধ্যে লুকিয়ে সে দিন কাটায়। পরের রাতে আরও নয় ক্রোশ পথ পাড়ি দিয়ে ভিখু চিতলপুরের পেহ্লাদ বাগদীর বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নেয়। পুলিশের ভয়ে পেহ্লাদ তাকে বাড়িতে রাখেনি। তাকে রেখে আসে লোকালয় থেকে দূরবর্তী এক বনের মধ্যে । সেখানে থাকার জন্য গাছের ঝোপের আড়ালে মাঁচা বেঁধে দিল। কিছু খাবার দিয়ে পেহ্লাদ ফিরে এল। ভিখুর কাঁধের ঘা পঁচে উঠে লাল রঙের পুঁজ পড়তে লাগল। এর মধ্যে তার খাবারও ফুরিয়ে গেল। কিন্তু ভিখু বেঁচে উঠল। বনের মধ্যে এই মানবেতর পরিবেশে বনের পশুর পক্ষেও বাঁচা সম্ভব ছিল না। মানুষ হয়েও ভিখু বেঁচে উঠল। বাঁচার তীব্র আকাঙ্ক্ষাই ভিখুকে বাঁচিয়ে দিল। বনের পশু যে অবস্থায় বাঁচে না মানুষ হওয়া সত্ত্বেও সে সেই অবস্থায় বেঁচে থাকল। ভিখুর বেঁচে উঠার এই সংগ্রামকে চিহ্নিত করতে গিয়ে লেখক উচ্চারণ করেন-
মরিবে না, সে কিছুতেই মরিবে না। বনের পশু যে অবস্থায় বাঁচে না, সেই অবস্থায়, মানুষ সে, বাঁচিবেই।
বস্তুত, ভিখুর বেঁচে উঠার সংগ্রাম আলোচ্য উচ্চারণের মধ্য দিয়ে সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।
৭ নং ব্যাখ্যা: পৃথিবীর আলো আজ পর্যন্ত তাহার নাগাল পায় নাই; কোনদিন পাইবেও না। (নিবন্ধন- ২০০৯, ২০১৩, ২০১৪)
উত্তর: ব্যাখ্যার জন্য নির্বাচিত অংশটুকু ফ্রয়েডীয় জীবনদর্শনে পরিস্নাত কথাসাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বিরচিত 'প্রাগৈতিহাসিক' শীর্ষক ছোটগল্প থেকে নেওয়া হয়েছে।
মানুষ শিক্ষা ও সংস্কৃতি চর্চার মধ্য দিয়ে তার বাইরের আচরণে পরিবর্তন আনতে পারে কিন্তু তার অন্তর্গত জৈবসত্তা অপরিবর্তনীয়। এই চিরায়ত সত্যকে উন্মোচন করতে গিয়েই গল্পকার পাঁচী ও ভিখুকে আশ্রয় করে আলোচ্য উক্তির অবতারণা করেন।
ভিখু পেশায় দুর্ধর্ষ ডাকাত সর্দার। ডাকাতি করতে গিয়ে কাঁধে বর্শার খোঁচা খেয়ে তার ডান হাত অচল হয়ে পড়ে। ফলে ভিখু ভিক্ষাবৃত্তিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। ভিক্ষালব্ধ আয়ে পেট ভরে খেয়ে ও নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে অল্পদিনের মধ্যেই সে তার পূর্বের স্বাস্থ্য ও শক্তি ফিরে পায়। আর পূর্বের স্বাস্থ্য ফিরে পাওয়ার সাথে সাথে তার আদিম কামস্পৃহা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। সে পাঁচীকে পেতে চায়। কিন্তু পাঁচী থাকে বসিরের সাথে। ভিখু তাকে তার কাছে আসার প্রস্তাব দিলে প্রত্যাখান করে। এতে ভিখু ক্ষুব্ধ হয়। অগত্যা ভিখু বসিরকে খুন করার সিদ্ধান্ত নিল। এক অমাবস্যার রাতে ভিখু একটা লোহার শিক নিয়ে বসিরের ঘরে প্রবেশ করে। কৌশলে এক হাত দিয়েই সে লোহার শিকটা বসিরের মাথার মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়। বসির নিহত হয়। পাঁচী ভিখুর হিংস্রতা দেখে ভয়ে চুপসে যায়। সে ভিখুর দমক খেয়ে পোটলা-পুটলি নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসে। আকাশে তখন নবমীর চাঁদ উঠেছে। এই চাঁদ ও মানুষের ইতিহাস আছে। কিন্তু পাঁচী ও ভিখু নতুন জীবন শুরু করে যে চেতনায় নতুন সন্তান জন্ম দেবে সে চেতনার কোনো ইতিহাস নেই। এটি প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে চলমান। পৃথিবীর আলো আজ পর্যন্ত তার নাগাল পায়নি, পাবেও না।
বস্তুত, আলোচ্য উক্তির মধ্য দিয়ে গল্পকার মানুষের জৈবসত্তার অপরিবর্তনীয় বৈশিষ্ট্যকে অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন।
******************************
ড. এ. আাই. এম. মুসা
অধ্যাপক-বাংলা
www.onlinereadingroombd.com
+88 01713 211 910