
NTRCA বাংলাদেশের কবিতায় একুশে ফেব্রুয়ারি প্রভাব
প্রশ্ন : বাংলাদেশের কবিতায় একুশে ফেব্রুয়ারি প্রভাব আলোচনা কর।
উত্তর: সাহিত্য শিল্প সময়, সমাজ ও ইতিহাস নিরপেক্ষ কোন বিষয় নয়। বরং সময়, সমাজ ও ইতিহাস থেকে সত্য ও শক্তি শোষণ করেই সাহিত্য-কর্ম উদ্ভব ও বিকাশ লাভ করে। তাই সন্দেহাতীত ভাবে বলা যায় যে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের প্রভাব বাঙলাদেশের কবিতায় অবিসম্ভাবী ও সুদুর প্রসারী। একুশ আমাদের মধ্যে জাগ্রত করেছে স্বাধীকার বোধ। শিখিয়েছে প্রতিবাদী হতে-মৃত্যুর বিরুদ্ধে জীবনের, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের, স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের, অত্যাচারের বিরুদ্ধে আপোষহীনতা, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে ধর্মনিরপেক্ষতার, ফলে জাতীয় চেতনায় উব্দুদ্ধ শিল্পী মানস যথার্থ কারণেই অবক্ষয় শাসিত জীবন দৃষ্টিকে অতিক্রম করে, সৃজনশীল ভবিষ্যৎ নির্মাণে হল সদা সতর্ক, আত্মসচেতনা এবং ঐক্যবদ্ধে অন্তরঙ্গ। তাই একুশের কবিতার বিষয় হিসেবে বর্ণিত হয়েছে জাতীয় একতাবোধ, স্বাধীকার চেতনা, গণতান্ত্রিক চেতনা, স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিবাদ, স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের বেদনা হতাশা ও পরিণামে আশায় উত্তরণ, স্বজন হারানোর বেদনা, বিশ্বানুভূতি, দায়িত্বচেতনা নীতিচেতনা ও রাষ্ট্রচিন্তার ইত্যাদি বিষয়। সে কারণে তিরিশের নৈতিবাচক জীবন দৃষ্টিকে অতিক্রম করে বাঙালাদেশের কবিতায় প্রতিষ্ঠা পেল ইতিবাচক, স্বাতন্ত্র্য ও স্বাবলম্ব জীবনবোধ। সংযোজিত হল সদা সঞ্চরণশীল কাব্য-বিশ্বাস ও প্রকরণ প্রবাহ।
অনুমান করা হয় একুশের উপর প্রথম কবিতা লিখেন চট্টগ্রামের কবি মাহবুবুল আলম চৌধুরী। তাঁর কবিতার শিরোনাম ছিলো-“আমরা কাঁদতে আসিনি।”। বলা হয়ে থাকে ১৯৫২ সালেরর একুশে ফেব্রুয়ারির ঘটনার দিনই কবিতাটি লেখা হয়। স্বজন হারানোর বেদনার সুরকে অতিক্রম করে এ কবিতায় প্রকাশ পায় প্রতিবাদের সুর-
যে জননী খোকা এসেছে বলে উদ্দাম আনন্দে
সন্তানকে আর জড়িয়ে ধরতে পারে না,
যে তরুণ মাটিতে লুটিয়ে পড়ার আগে বার বার
একটি প্রিয়তমার ছবি চোখে আনতে চেষ্টা করেছিল
তাদের সবার নামে আমি শাস্তি দাবী করতে এসেছি। ( মাহবুবুল আলম চৌধুরী)।
হাসান হাফিজুর রহমানের সম্পাদনায় একুশের উপর প্রথম কবিতা সংকলন প্রকাশিত হয় ১৯৫৩ সালে। শামসুর রাহমান, হাসান হাফিজুর রহমান, আলাউদ্দিন-আল আজাদ, সৈয়দ শামসুল হকের ন্যায় প্রখ্যাত ১১ জন কবির কবিতা এতে স্থান পায়। এদেঁর কাছে একুশে ফেব্রুয়ারির দিনটি বিদ্রোহী অনুপ্রেরণার ও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের ইঙ্গিত বাহী। শামসুল হকের একটি কবিতায় তা স্পষ্ট-
তপ্তশ্বাস হাহুতাশ পাতাঝরা বিদীর্ণ বৈশাখীর
জ্বালাকরা দিনের দিগন্তে
আষাঢ়ের পুঞ্জীভুত কালো মেঘ আসবেই ঠিক। ( সৈয়দ শামসুল হক)
আমরা যে ভাষায় কথাবলি সে ভাষার একটা ইতিহাস আছে, ঐতিহ্য আছে-সমগ্র বিশ্বদরবারে তার মর্যাদা আছে। কারণ, এই ভাষাতেই জন্ম নিয়েছেন- রবীন্দ্র-নজরুল-মধুসুদন-আলাওল-এর ন্যায় বিশ্ব বরেণ্য কবিবৃন্দ। তাই এই ভাষা শুধু একটা ভাষাই নয়, এটা একটা সভ্যতার নাম। এই ভাবটি প্রকাশিত হয় হাসান হাফিজুর রহমানের একটা কবিতায়।
যেমন-
পলি রঙ হাত দিয়ে অঙ্গার কালো শ্লেটের ওপর
যখনই প্রথম লিখলে আদ্যাক্ষর “অ”,
লিখলে একটা সভ্যতার নাম।
বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস-আলাওলের হাতে তুলে দিলে কুন্দ কুসুম।
[হাসান হাফিজুর রহমান/যখন উদ্যত সঙ্গীন/আদিম অক্ষরাশি]
কিন্তু এই সভ্যতাকে মুছে দিতে চাইল শোষনের শাসনে পটু পাকিস্তানী ঔপনিবেশিক শাসক সম্প্রদায়। তবে বাঙলার ছাত্র-সমাজ তা হতে দেয়নি। সমস্ত বাঙালির সমর্থন নিয়ে তারা রাস্তায় নামল, প্রতিবাদ করল, গুলি খেল। শহীদ হল সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার এবং নাম না জানা আরো অনেকে। তারা ছিল আমাদেরই ভাই-বন্ধু, সন্তান অথবা কারো জীবন সাথী। ফলে আমাদের এই প্রিয় শহীদদের জন্য নেমে আসে সমস্ত বাঙলার শোকের ছায়া। কবি কণ্ঠে ভেসে এল
আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি।
ছেলে হারা শত মায়ের অশ্রু-গড়া এ ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি।
(আব্দুল গফ্ফার চৌধুরী।)
বিচ্ছিন্নতা নয়, একুশের শিক্ষা হল ঐক্যের শিক্ষা। জাতীয় জীবনের সমস্ত বিশৃঙখল অবস্থাকে অতিক্রম করে সুশৃঙখল পরিস্থিতিতে এবং ইতিবাচক জীবন চেতনায় উত্তরণই একুশের লক্ষ্য। একতা বোধের এই চেতনা একুশের অনেক কবিতায় প্রকাশ পেয়েছে।
বাংলাদেশের কবিতায় একুশে ফেব্রুয়ারির পরোক্ষ প্রভাবও লক্ষ্য করার মতো। একুশের পরই বাঙলাদেশের কবিতায় প্রকৃত অর্থে অসম্প্রদায়িক ও উদার দৃষ্টিভঙ্গী অনুসৃত হতে থাকে এবং যথার্থ অর্থে বাঙলাদেশের কবিতা আধুনিকতার স্পর্শ লাভ করে। গ্রাম জীবনকে অতিক্রম করে বাঙলাদেশের কবিতায় রূপলাভ করে নাগরিক জীবনের বহু-বঙ্কিম জটিলতা।
প্রবহমান সমাজ-ব্যক্তিচেতনার সঙ্গে সমান্তরাল ভাবে সাহিত্য শিল্পের আঙ্গিকের রূপান্তর ঘটে। তাই একুশ উত্তর বাঙলাদেশের কবিতায় আঙ্গিক ও প্রকরণের রূপান্তর অনিবার্য। ভাষা আন্দোলনের ফলে বাঙলাদেশের যে ইতিবাচক জীবন দৃষ্টির প্রসার ঘটে। তাতে বাংলাদেশের কবিতায় তিরিশোত্তর কবিদের নেতিবাচক জীবন দৃষ্টিকে অনুসরণ করা সম্ভব হয়নি। জীবন চেতনায় এ পর্বের কবিগণ হয়ে উঠেন জনমূল সংলগ্ন।
উপমা অলংকার ব্যবহারেও একুশের কবিতায় পাওয়া যায় জনমূল সংলগ্নতার পরিচয়। একটি বিষয় অনুষঙ্গী উৎপ্রেক্ষা অলংকার।
আমার আঙুল যেন শহীদের অজস্র মিনার হয়ে
জনতার হাতে হাতে গিয়েছে ছড়িয়ে। [নির্মিলেন্দু গুণ]
একটি চিত্রকল্পে প্রকাশ পেয়েছে শাশ্বত গ্রামীণ জীবনের প্রতিচ্ছবি। যেমন-
“কুমড়ো ফুলে-ফুলে
নুয়ে পড়েছে লতাটা,
সজনে ডাটায়
ভ’রে গ্যাছে গাছটা
আর, আমি ডালের বরি
শুকিয়ে গিয়েছি,
খোকা তুই কবে আসবি।” [আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ/মাগো ওরা বলে/সাতনরীহার]
বস্তুত প্রকরণ নিষ্ঠা ও বিষয় ও বিন্যাসে বাঙলাদেশের কবিতায় ভাষা আন্দোলনের প্রভাব দুর সঞ্চারী যে গণতান্ত্রিক চেতনা, ঐক্যবোধ, স্বাধিকার চেতনা ঐতিহ্য চেতনা, বিশ্বাত্মবোদ মানব প্রেম ভাষান্দোলনের মর্ম্মুলে প্রথিত ছিল, তারই শব্দ-ভাষ্য একুশের কবিতা। মোট কথা, 1947 সালের রাজনৈতিক বিভাজন সমকালীন কবি চৈতন্যকে যে অনিশ্চয়তা ও সংশয়ের মধ্যে নিক্ষেপ করেছিল, ভাষা আন্দোলন সেই অনিশ্চয়তা ও সংশয়ের কালো স্রোতকেই কেবল দুরীভূত করলো না, বাংলাদেশের সামগ্রিক কাব্য যাত্রার গতিবিধিতেই রূপান্তর সাধন করল।
ড. এ. আই. এম. মুসা
অধ্যাপক-বাংলা
+88 01713 211 910