
NTRCA বাংলাদেশের কবিতায় মুক্তিযুদ্ধের প্রভাব
প্রশ্ন : বাংলাদেশের কবিতায় মুক্তিযুদ্ধের প্রভাব আলোচনা কর।
উত্তর: ‘অসির চেয়ে মসী শক্তিশালী’ একথা সর্বজন স্বীকৃত। তাই ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনে মসী তথা লেখনীর যে ভূমিকা ছিল তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রবন্ধ, গল্প, নাটক, গান ও কবিতা-সাহিত্য কলার সবকটি মাধ্যমই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনে কিছু না কিছু ভূমিকা পালন করেছে। তবে, শেষোক্ত মাধ্যমটিই পালন করেছে অপ্রতিহত ভূমিকা।
১৯৭১ সালের ১৬ই হিসেম্বর স্বাধীন সার্বভৌম যে বাঙালাদেশের অভ্যূদয় ঘটে, তা অকস্মাৎ সম্ভব হয়নি। ইতিহাস ও সময়ে অনিবার্য নির্দেশেই তা হয়েছে। স্বাধীন বাঙলাদেশের ধারণাটি কবি চিত্তে জন্মলাভ করেছিল আজ থেকে প্রায় ৮৩ বছর পূর্বে; যখন কবি প্রদীপ্ত কণ্ঠে উচ্চারণ করলেন “আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি।” তখন। বিভাগোত্তর বাংলাদেশের কবি সাহিত্যিকদের মধ্যে ভাষা আন্দোলন যে প্রতিবাদী চেতনার জন্ম দেয়- সে চেতনা ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে পাকিস্তানবাদী জীবন ভাবনা ও মূল্যবোধের বিপরীত। এজন্যই বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের পরবর্তী সুর্দীঘ সময় ধরে আমরা আমাদের কবি সাহিত্যিকদের লিখনীতে লক্ষ কবি স্বাধীনতাকামী মনোভাব।
আমাদের দেশের বর্তমান যে ক্ষত বিক্ষত বিধ্বস্ত এবং ক্ষয়িষ্ণু অবস্থা একদিন সেরকম ছিল না। ঔপনিবেশিক শক্তির শোষণের ফলেই আমাদের দেশের অবস্থা সেরকম হয়েছে। তাই আহসান হাবিবের স্বদেশ প্রেমমূলক কবিতায় ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে প্রকাশ পেয়েছে ক্ষোভ ও ঘৃণা। যেমন-
মধ্যরাতে রাজপথে দেখি এক নারীর শরীর
যে নারী নায়িকা ছিলো কোনোকালে এই পৃথিবীর।
সর্বাঙ্গ পুড়েছে তার বণিকের তৃষ্ণার উত্তাপে,
হৃদয়ের রক্ত নিয়ে রেখে গেছে নখরের ছাপ, (আহসান হাবীব-ক্রান্তিকাল-ছায়াহরিণ)
জাতীয় মুক্তির চেতনায় যে কয়জন কবির কবিতায় প্রত্যক্ষ ভাবে প্রকাশ পেয়েছে এদের মধ্যে সিকান্দার আবুজাফর অন্যতম। তার কবিতা যেন শুধু কবিতা নয়, এ যেন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে প্রচন্ড শক্তিধর সেনাপতির নির্দেশ নামা, কারণ-
কাজ কি দ্বিধার বিষণ্নতায়
বন্দী রেখে ঘৃণার অগ্নিগিরি?
আমার বুকেই ফিরিয়ে নেবো
ক্ষিপ্ত বাজের থাবা;
তুমি আমার জলস্থলের
মাদুর থেকে নামো
তুমি বাঙালা ছাড়ো। (সিকান্দার আবু জাফর/বাঙলা ছাড়ো বাঙলা ছাড়ো।)
সিকান্দার আবু জাফরের কবিতায় সমন্বিত গুণ আন্দোলন এ ভাবেই রূপ লাভ করেছে। তার কবিতা একাত্তরের মুক্তি সংগ্রামের ইতিবাচক প্রক্রিয়ার সাথে সমান্তরাল।
১৯৬৯ এর গণ অভ্যুত্থানের পরে মুক্তি সংগ্রামের চেতনা স্পষ্টরূপে বাঙলা কবিতায় প্রকাশ পায়। এ পর্যায়ের কবিতাকে তাই দ্রোহের কবিতা হিসেবে চিহ্নিত করা যায় এ পর্যায়ে যাঁরা কবিতা লিখলেন, তাঁরা হলেন- শামসুর রাহমান, হাসান হাফিজুর রহমান, আলাউদ্দিন আল-আজাদ, আল-মাহমুদ, মনিরুজ্জামান সহ আরো অনেকে।
শামসুর রাহমান নৈঃসঙ্গ্যের অন্তরালবর্তী এক কবি। কিন্তু ভাষা আন্দোলনের শহীদ স্মৃতি তাঁর অনুভবকে করেছে রক্তাক্ত। তাই আত্নকেন্দ্রিক বলয় থেকে মুক্তির আকাঙখায় তিনি বলে উঠেন-
জিজ্ঞেস করুন
দগ্ধ, স্তব্ধ পাড়ার নিঃসঙ্গ যে ছেলেটা বুলেটের ঝড়ে
জননীকে হারিয়ে সম্প্রতি খাপছাড়া
ঘোরে ইতস্ত, তাকে জিজ্ঞেস করুন,
হায় শান্তিপ্রিয় ভদ্রজন,
এখন বলবে তারা সমস্বরে যুদ্ধই উদ্ধার। (পূর্বোক্ত, উদ্ধার বন্দী শিবির থেকে)
এ যেন কবিতা নয় প্রচন্ড শক্তিধর সেনাপতির অবশ্য পালনীয় নির্দেশ।
স্বদেশ ও স্বজাতির মুক্তির আকাঙক্ষায় সর্বদা জাগ্রত থেকেছেন হাসান হাফিজুর রহমান তাঁর বিভিন্ন কবিতায়। ভাষা আন্দোলনের প্রেরণাকে মুক্তির বীজমন্ত্র হিসেবে কল্পনা করে কবি উচ্চারণ করেন-
নিহত ভায়ের লাখ কাঁধে বয়ে ঢের
গড়েছি মিনার, হেঁটে গেছি পথ।
আর নয়, চাই শত্রুর লাশ চাই,
এইবার এই বজ্র শপথ।। (পূর্বোক্ত, শত্রুর লাশ চাই, যখন উদ্যত সঙ্গীন)
কবি হাসান হাফিজুর রহমান তাই হয়ে উঠেন মিছিলের কবি-বাঙালি জাতির রাজনৈতিক অভিজ্ঞানের মহান ভাষ্যকার।
আলাউদ্দিন-আল আজাদ হলেন মাকর্সবাদী দর্শনে স্থিতধী। তিনি জীবন দৃষ্টিতে ছিলেন শ্রেণী সচেতন ফলে ঔপনিবেশিক সমাজের কাঠামোর অন্তরালে থেকে তিনি বিক্ষোভমুখর হয়ে উঠেন। তাঁর কবিতা জাতীয় জীবনের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার ইঙ্গিতে তাৎপর্যবহ তিনি তাঁর কাব্যে নিজেকে জাগতিক অসঙ্গতির প্রতিপক্ষ হিসেবে উপস্থিত করেন।
মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান এর কবিতায় সংগ্রামী মনোভাবের রূপায়ণ অত্যন্ত স্পষ্ট। প্রথম থেকেই তাঁর কবিতায় প্রত্যয়ের চিহ্ন ফুটে উঠে। সমগ্র বাঙালি জাতি যে মুক্তি আকাঙ্ক্ষায় জেগে উঠে এর চিত্র প্রকাশ পায় তাঁর কবিতায়।
দৃঢ় প্রতিজ্ঞা নাড়া দেয় জনতাকে,
জানে প্রত্যয় প্রতিটি শহরে গ্রামে;
সব সংশয় উত্তরণের ডাকে
বাঙালি শোনিত প্রস্তুত সংগ্রামে। (পূর্বোক্ত, জার্নাল২; চব্বিশে মার্চ, ১৯৭১)
মোট কথা ১৯৫২ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত যে সমস্ত কবিতা প্রকাশিত হয়েছে সেগুলোতে রূপলাভ করেছে স্বাধীনতার চেতনা। প্রতিপক্ষ শক্তির যুদ্ধাস্ত্র যখন বাঙালির দিগন্তকে র্দীণ করতে উদ্যোত হয়েছে, তখন মুক্তিযুদ্ধের প্রতিরোধের সাথে সাথে আমাদের কবি সাহিত্যিকগণও উন্মুক্ত করেছেন তাদের চেতনার অগ্নি মশালকে।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক কবিতা সমূহ বক্তব্য ও বিষয়ে অনন্য হলেও প্রকরণের প্রশ্নে অনেকাংশে দুর্বল। তার ব্যতিক্রম যে দুএকটি নেই তা নয়। অধিকাংশ কবিতাই রাজনৈতিক ভাষ্যে পরিণত হয়েছে, যর্থাথ কবিতা হয়নি। কারণ এই সমস্ত কবিতায় প্রকাশ পেয়েছে স্বতন্ত্র্র অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠাকামী একটা জাতির রাজনৈতিক অভীপ্সা।
উল্লিখিত বিষয় ভিত্তিক কবিতায় এমন সব শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে যে গুলো বিষয়ের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ এবং সমকালীন সমাজ বাস্তবতা প্রকাশ্যেও সক্ষম। যেমন- বেয়োনেট, বেরিকেড, মিছিল, গেরিলা, ফেস্টুন, ব্যানার, পতাকা, রাইফেল, বুলেট কাঁদুনে গ্যাস, শ্লোগান, কারফিউ, মেশিনগান, মর্টার গ্রেনেট ইত্যাদি।
যেমন- স্বাধীনতা তুমি
মজুর যুবার রোদে ঝলসিত দক্ষ বাহুর গ্রন্থিলপেশী
স্বাধীনতা তুমি
অন্ধকারে খাঁখাঁ সীমান্তে মুক্তি সেনার চোখের ঝিলিক। (শামসুর রাহমান/স্বাধীনতা তুমি/বন্দী শিবির থেকে) একটি বিষয় ভিত্তিক রূপক অলঙ্কারের দৃষ্টান্ত-
বাঙলার বুকে উদ্যত বেয়োনেট
ঘরে ঘরে তাই প্রস্তুত প্রতিবোধ;
চির দুর্মর সাতকোটি বেরিকেড
রক্তের ঋণ রক্তেই হবে শোধ( মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান/জার্নাল ২৪ শে মার্চ ১৯৭১/প্রতনু প্রত্যাশা)
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক কবিতায় প্রধানত ব্যবহৃত হয়েছে অক্ষরবৃত্ত ছন্দ। যার ফলে সমকালীন জীবনের অস্থির গতিপ্রবাহ ধরা পড়েছে।
উপমা রূপক উৎপ্রেক্ষা প্রভৃতি ব্যবহারেও এ পর্যায়ের কবিতা ছিল জনমূল সংলগ্ন, বিষয়ানুগ ও বক্তব্য অনুসঙ্গী।
পরিশেষে বলা যায়, বাঙলাদেশের কবিরা বাঙলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের যথার্থ সৈনিক। কবিতা উচ্চকণ্ঠ কোন শিল্প নয় এবং সেহেতু বাস্তব অবস্থার কোনো অবিকল ফটোগ্রাফি তাতে পাওয়া যাবে না। কিন্তু বাঙালি জাতির মানস, মনন, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং ইতিহাসের সূক্ষ্ম চেতনা সমূহের দলিল এসব কবিতা। এই কবিতার মধ্যেই বাঙলাদেশের মুক্তি আন্দোলনের ধারাবাহিকতা অবিকল থেকেছে।
ড. এ. আই. এম. মুসা
অধ্যাপক-বাংলা
+88 01713 211 910