
NTRCA College : নাটক ও প্রহসন রচনায় মীর মশাররফ হোসেনের সাফল্য
প্রসঙ্গ: উপন্যাসে অপেক্ষা নাটক ও প্রহসন রচনায় মীর মশাররফ হোসেনের সাফল্য অধিক-আলোচনা কর।
উত্তর: বঙ্কিম-রবীন্দ্র যুগে আর্বিভুত হয়েও যে কয়জন সাহিত্যিক আপন স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করতে পেরে ছিলেন মীর মশাররফ হোসেন (১৮৪৭-১৯১২) ছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম। বিষয় বৈচিত্র্য, জীবন-চেতনা ও শিল্প-শৈলীর প্রশ্নে তিনি উনিশবিশ শতকের বাংলা সাহিত্যের এক স্বতন্ত্র ভুবনের স্রষ্টা। ‘বিষাদ সিন্ধু’ই হলো তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। ‘বিষাদ সিন্ধু’র মধ্যে দিয়েই তিনি বাঙালি পাঠকের কাছে ব্যাপক ভাবে পরিচিতি লাভ করেন। তবে নাটক ও প্রহসন রচনার ক্ষেত্রেও তিনি অর্জন করেন অপরিসীম সাফল্য। তাঁর রচিত নাটক ও প্রহসনগুলো হলো-‘বসন্তকুমারী নাটক’, ‘জমিদার দর্পণ’, ‘বেহুলা গীতাভিনয়’, ‘টালা অভিনয়’, এবং প্রহসনগুলো হলো- ‘এর উপায় কি’, ‘ভাই ভাই এইতো চাই’, ‘ফাঁস কাগজ’, ও ‘একি’। জীবন-বোধ, বিষয় বৈচিত্র্য, ঘটনা বিন্যাস, চরিত্র চিত্রণ, সংলাপ সৃষ্টি এবং নাট্যিক দ্বন্দ্ব সৃষ্টির প্রশ্নে মশাররফ হোসেনের নাটক ও প্রহসন সমূহ সমকালীন বাংলা নাট্য সাহিত্যের ধারায় বিশিষ্ট স্থান দখন করে আছে।
‘বসন্তকুমারী নাটক’ (১৮৭৩) মীর মশাররফ হোসেনের প্রথম নাটক। এই নাটকটিকে মুসলমান নাট্যকার রচিত প্রথম নাটক হিসেবে উল্লেখ করা যায়। ইন্দ্রপুরের বিপত্নীক রাজার বৃদ্ধ বয়সে যুবতী স্ত্রী গ্রহণ, রাজার যুবক পুত্রের প্রতি বিমাতার আকর্ষন এবং প্রেম নিবেদন, পুত্রের প্রত্যাখ্যান ও বিমাতার ষড়যন্ত্র, পরিশেষে পরিবারের সকলের মৃত্যু-এই কাহিনী অবলম্বনে বসন্ত কুমারী নাটক রচিত। নাটকটির অপর নাম ‘বৃদ্ধস্য তরুণী ভার্ষা’ কাহিনীর তাৎপর্য প্রকাশক। মানুষের দেহাশ্রিত কামনা বাসনার যে বিচিত্র অভিব্যক্তি আধুনিক বাংলা সাহিত্যে প্রকাশিত হয়েছে, তা আলোচ্য নাটকে উন্মোচনের মাধ্যমে মুসলিম সাহিত্যিকদের মধ্যে মীর মশাররফ হোসেন পথিকৃৎ হয়ে আছেন। তাছাড়া, কাহিনীর গ্রহনের সুসংবদ্ধতা, সংলাপের বিচিত্র চাতুরী এবং সর্বাঙ্গীণ প্রাণবন্ত ভাবপরিমন্ডল এই সমস্ত বৈশিষ্ট্যের জন্য নাটকটির স্বাতন্ত্র্য বিবেচ্য।
জমিদারদের নিষ্ঠুর অত্যাচারের কাহিনী বর্নিত হয়েছে জমিদার দর্পন নাটকে। জমিদারদের অত্যাচারের প্রতি সমাজের সচেতন মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণই ছিল জমিদার দপর্ণ নাটক রচনার উদ্দেশ্য। জমিদারী প্রথা উদ্ভবের পর থেকেই জমিদারদের অত্যাচার ও শোষণের বিরুদ্ধে অনেক আন্দোলন-সংগ্রাম হয়েছে। অনেক গল্প-উপাখ্যানে এই অত্যাচার শোষণের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। বঙ্কিমচন্দ্র ‘বাংলাদেশের কৃষক’ প্রবন্ধে লিখেছেন-
‘জীবের শত্রু জীব, মানুষের শত্রু মনুষ্য, বাঙালি কৃষকের শত্রু বাঙ্গালী ভূস্বামী।”
জমিদারের অত্যাচারের নানা ধরণ ছিল। এর মধ্যে অন্যতম হলো, জোর করে খাজনা আদায়, জরিমানা করা, জমি থেকে উচ্ছেদ করা, ঘর জ্বালিয়ে দেয়া ইত্যাদি। এই সব অত্যাচারের সাথে আরেকটি অত্যাচারের ভয়ে কৃষককুল সন্ত্রস্ত থাকত। সেই অত্যাচার হলো কৃষকদের যুবতী কন্যা ও বধুদের সতীত্ব নাশ করা। জমিদার দর্পণ নাটকে শেষোক্ত অত্যাচারের কাহিনীই বর্নিত হয়েছে। এই নাটকে লম্পট জমিদারের পাশবিক অত্যাচারের চিত্রকেই জীবন্ত করে তোলা হয়েছে।
জমিদার দর্পণ নাটকের উপর দীনবদ্ধ মিত্র রচিত নীলদর্পণ নাটকের প্রভাব রয়েছে। নামকরণেই এই প্রভাব স্পষ্ট। উদ্দেশ্যের দিক থেকে উভয় নাটকই একই রকম বলে অনেক সমালোচক মন্তব্য করেছেন। চরিত্র নির্বাচনে এবং চরিত্র চিত্রণেও এই নাটক দ্বয়ের মধ্যে সাদৃশ্য রয়েছে। সাধুচরণ ও রাইচটরণের সঙ্গে আবু মোল্লার, ক্ষেত্রমণির সঙ্গে নুরুন্নেহারের এবং পদীময়রানীর সাদৃশ্য এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাছাড়া উভয় নাটকের বিচার দৃশ্যের মধ্যেও যথেষ্ট সাদৃশ্য রয়েছে।
নীলদর্পণের সাথে জমিদার দর্পণের বিভিন্ন দিক থেকে যেমন সাদৃশ্য আছে তেমন বৈসাদৃশ্যও আছে। ‘নীলদপর্ণ’ শ্রেক্সপীয়ারীর রীতিতে লেখা পঞ্চাঙ্ক নাটক। আর জমিদার দপর্ণ তিন অঙ্কে লেখা ক্ষুদ্রাকার নাটক। নীলদর্পণে সংষ্কৃত নাট্যরীতি অনুসৃত হয় নি। তবে ভাষায় সংস্কৃতের প্রভাব রয়েছে। কিন্দু জমিদার দপর্ণ সংস্কৃত নাট্যরীতিতেই লেখা যদিও এর ভাষা ও সংলাপ সংস্কৃতের মত নয়। নীলদর্পণের ক্ষেত্রমণির উপর বলৎকারের চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু সে চেষ্টা সফল হয় নি। কিন্দু জমিদার দর্পণে গর্ভবতী নুরুন্নেহারের উপর পাশবিক অত্যাচার চালানো হয়েছে। যে অত্যাচারে গর্ভের সন্তানসহ নুরুন্নেহারের মৃত্যু হয়েছে। জমিদার দর্পণে বাস্তব চিত্র শিল্পের অনুমোদিত সীমানা ছাড়িয়ে পৈশাচিক বীভৎসতার রূপ লাভ করেছে।নীলদর্পণে শেষ পর্যন্ত অত্যাচারী শক্তির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ দেখানো হয়েছে। যদিও অত্যাচারী শক্তিই জয়লাভ করেছে। কিন্দু জমিদার দর্পণে অত্যাচার ও পাশবিকতার চিত্র আছে। বিদ্রোহের কোন প্রয়োস নেই। বস্তুত নীলদর্পণ ও জমিদার দর্পণ নাটকে বিভিন্ন বৈসাদৃশ্য থাকলেও উভয় নাটকেই তৎকালীন সমাজের উচ্চশ্রেণী ও ক্ষমতাবানদের নিষ্ঠুরতার স্বরূপটি উন্মোচিত হয়েছে।
চরিত্র চিত্রণে মীর মশাররফ হোসেন যথার্থ অর্থে সাফল্য লাভ করতে পারেন নি। তবে হায়ওয়ান আলী ও নুরুন্নেহার এই ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। হাওয়ান আলী চরিত্রটিকে মশাররফ হোসেন প্রাণবন্ত ও জীবন্ত চরিত্র হিসেবে চিত্রিত করেছেন। এমন কোন পাপ কাজ নাই যা এই চরিত্রটির বিবেকে বাধে। এই চরিত্রটির মধ্যেই কেবল নাটকীয় গুণের সমাবেশ ঘটানো হয়েছে। নুরুন্নেহার চরিত্রটিকে অবলা গ্রাম্য নারীর প্রতীক হিসাবে চিত্রিত করা হয়েছে। বস্তুত ভাব, বিষয় এবং জীবন দৃষ্টিতে মীর মশাররফ হোসেনের জমিদার দর্পণ বাংলা নাট্য সাহিত্যের ইতিহাস অনন্যা বৈশিষ্ট্যের অধিকারী।
‘বাসন্তকুমারী নাটক’ ও ‘জমিদার দপর্ণ’ নাটকের মতো বেহুলা ‘গীতাভিনয়’ ও ‘টালা অভিনয়’ ততটা সাফল্য লাভ করেনি। সমকালীন সমাজে গীতাভিনয় রচনার যে প্রক্রিয়া চলছিল তার নিয়ম রক্ষা করতেই মশাররফ আলোচ্য নাটক দুটি রচনা করেন। তবে চরিত্র চিত্রণ, ভাষা ও সংলাপ রচনার প্রশ্নে এই সমস্ত নাটকে মীর মশাররফ হোসেন স্বীয় স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করতে পেরেছিলেন। তবে নাটকীয় দ্বন্দ্ব ও নাট্যিক আবহ সৃষ্টিতে এই সমস্ত নাটকে মীল মশাররফ হোসেন স্বীয় প্রতিভার প্রতি সুবিচার করতে পারেন নি।
উনিশ শতকের পরিবতর্নশীল সমাজ বাস্তবতায় সমাজের বিভিন্ন অসঙ্গতি প্রতিটা শিল্পীরই অন্তরকে নাড়া দিয়েছিল। এরই প্রতিক্রিয়া তারা সমাজ নিষ্ঠ বিভিন্ন সাহিত্যকর্ম রচনা করেন। নাট্যকারগণও এ দিক থেকে পিছিয়ে ছিলেন না। তাদের এই প্রতিক্রিয়ার প্রতিফলন লক্ষ করা যায় তাদের রচিত প্রহসনসমূহে। মধুসূদন রচনা করেন-‘বুড়ো শালিকের ঘারে রোঁ’, ‘একেই কি বলে সভ্যতা’, দীন বন্ধু রচনা করেন- ‘‘সধবার একাদশী’, ‘জামাই বারিক’ প্রভৃতি প্রহসন। তাদের অনুকরণে মীর মশাররফ হোসেনও রচনা করেন-‘এর উপায় কি’, ‘ভাই ভাই এইতো চাই’, ‘ফাঁস কাগজ’ ও ‘একি’ নামক প্রহসন।
‘এর উপায় কি’ মীর মশাররফ হোসেনের প্রথম প্রহসন। এটি প্রকাশিত হয় ১৮৭৬ সালে। অনেক সমালোচক মনে করেন মধুসূদনের অনুকরণেই মশাররফ হোসেন আলোচ্য প্রহসন রচনা করেছেন। তবে অনুকরণ করলেও আলোচ্য প্রহসনে মশাররফের স্বাতন্ত্র্য সহজেই পরিলক্ষিত হয়। লেখক সামাজিক অনিয়ম, অনাচার আর উচ্ছৃঙখলা সমর্থন করতে পারেন নি। তাঁর প্রহসনে যে মনোভাবরে পরিচয় মিলে। তিনি নিজের জীবনে সহজ বাস্তব অভিজ্ঞতা লাভ করে তাঁর নাটক প্রহসনে তা প্রতিফলিত করে ছিলেন। অন্যায়-অনাচার রূপায়ণে তাঁর সাহসিকতাও নাটকে প্রকাশমান এবং তা যে কোনো বিচারে প্রশংসার্হ। চরিত্র সৃষ্টিতে তিনি পূর্বসূরীদের অনুসারী হলেও এ ক্ষেত্রে তিনি কৃতিত্ব দাবী করতে পারেন। নাটকে ভাষার লালিত্য বৃদ্ধি এবং সঙ্গীত সংযোজনা তাঁর নিজস্ব শিল্পকুশলী মনের পরিচায়ক। তবে অন্য প্রহসনগুলোতে মীর মশাররফ হোসেন ততটা সাফল্য লাভ করতে পারেন নি।
মোটকথা, উল্লিখিত আলোচনার প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি যে, শুধু উপন্যাস রচনার ক্ষেত্রে নয়, নাটক ও প্রহসন রচনায়ও মীর মশাররফ সমধিক কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন।
*********************************
ড. এ. আই. এম. মুসা
অধ্যাপক-বাংলা
www.onlinereadingroombd.com
+88 01713 211 910