
NTRCA School: আমাদের পোশাক শিল্প অথবা, বাংলাদেশের পোশাক শিল্প/বাংলাদেশের পোশাক শিল্প বর্তমান ও ভবিষ্যৎ
আমাদের পোশাক শিল্প
অথবা, বাংলাদেশের পোশাক শিল্প/বাংলাদেশের পোশাক শিল্প বর্তমান ও ভবিষ্যৎ
সূচনা : বাংলাদেশের শিল্পায়নের ক্ষেত্রে পোশাক শিল্প এক নতুন সম্ভাবনাময় সংযোজন। কর্মসংস্থান, বিশেষ করে অনগ্রসর মহিলাদের কর্মসংস্থান এবং রপ্তানি বাণিজ্যের উন্নয়নের ক্ষেত্রে পোশাক শিল্প অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। এককালে বাংলাদেশের মসলিন ও জামদানি ছিল পৃথিবী বিখ্যাত। কিন্ত ব্রিটিশদের আগমনের ফলে সে শিল্পের অগ্রযাত্রা ব্যাহত হয় । দীর্ঘ পথ অতিক্রমের পর বাংলাদেশ তার তৈরি পোশাক শিল্পের বিকাশের মাধ্যমে বস্ত্রক্ষেত্রে হারানো গৌরব পুনরুদ্ধার করে চলছে। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে এ শিল্পের অবদান উৎসাহজনক।
পোশাক শিল্পের পরিচয় : গায়ে পরার জন্য যে সকল আচ্ছাদন ব্যবহার করা হয় তা-ই পোশাক। যন্ত্রে বা হাতের মাধ্যমে কর্মকুশলতা দ্বারা পোশাকের উপর যে সকল শৈলী প্রয়োগ করা হয়, তা হল শিল্প। বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের মধ্যে শার্ট, প্যান্ট, জ্যাকেট, ল্যাবরেটরী কোট, ট্রাউজার, গেঞ্জী, সোয়েটার, নাইট ড্রেস, খেলাধুলার পোশাক ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের মান : বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের মান উন্নত বলেই বিশ্ববাজারে এ শিল্প ব্যাপক প্রশংসা লাভ করেছে। আমাদের দেশের পোশাকের মান উন্নত বলেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এর স্থান পঞ্চম। যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে হংকং, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন ও তাইওয়ানের পরেই বাংলাদেশের স্থান। শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই নয় বিশ্বের অন্যান্য দেশেও বাংলাদেশের পোশাকের প্রচুর চাহিদা আছে, যেমন: জাপান, কানাডা, নিউজিল্যান্ড, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি, মধ্যপ্রাচ্য ও বেলজিয়ামসহ মোট ২৩টি উন্নত দেশে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি হয়ে থাকে।
বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের অবস্থান : ১৯৭৭ সালে সম্পূর্ণ বেসরকারি শিল্প উদ্যোক্তাদের প্রচেষ্টায় পোশাক শিল্প যাত্রা শুরু করে। বর্তমানে প্রায় ২২০০টি পোশাক কারখানা চালু আছে। এ সকল কারখানায় প্রায় ১২ লক্ষ লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে। এদের মধ্যে ৮৫% মহিলা শ্রমিক। সমাজের নির্যাতিত, অবহেলিত, অসহায় মহিলাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিয়ে তাদেরকে নিজের পায়ে দাড়াঁতে সাহায্য করে দিয়েছে এ পোশাক শিল্প। আমাদের রপ্তানি আয়ের ৮১.৮১ শতাংশ যোগান দিচ্ছে পোশাক শিল্প।
পোষাক শিল্পের সমস্যাসমূহ : যদিও বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প খুবই সম্ভাবনাময় কিন্তু এর নানাবিধ সম্যা আছে। নিম্নে সে সমস্যাগুলো দেখানো হলো :
ক. নিম্নমানের কাঁচামাল : এদেশের পোশাক শিল্পসমূহকে অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল বিদেশ থেকে ক্রয় করতে হয়। বিদেশী বাজারে সরবরাহকারীরা সর্বক্ষেত্রে সৎ নয়, সততার অভাবে তারা নিম্নমানের কাঁচামাল সরবরাহ করে থাকে। আর এই নিম্ন মানের কাঁচামাল দিয়েই পোশাক তৈরি করতে হয়। ফলে বিদেশে বাংলাদেশী পোশাকের সুনাম ক্ষুণ্ন হয়। ব্যবসায়িক দিক দিয়ে এটি যথেষ্ট ক্ষতিকর।
খ. রপ্তানি ক্ষেত্রে বিলম্ব : আমাদের পোশাক রপ্তানিকারকগণ বিদেশ থেকে সুতা প্রাপ্তিতে বিলম্ব, শুল্ক জটিলতা, পরিবহণ ঝামেলা প্রভৃতি কারণে সময়মত পোশাক ডেলিভারী দিতে পারে না। এক্ষেত্রে বিদেশী আমদানিকারকগণ তাদের ফরমায়েশ নাকচ করে দেন। ফলে রপ্তানি কার্যক্রম বিঘ্নিত হয়।
গ. দক্ষ শ্রমিকের অভাব : বাংলাদেশে তৈরি পোশাক শিল্পের অন্যতম সমস্যা হলো দক্ষ শ্রমিকের অভাব। এদেশের বিভিন্ন গার্মেন্টস শিল্পে যেসব শ্রমিক কাজ করে তাদের শতকরা ৮৫ জনই অশিক্ষিত ও অদক্ষ মহিলা। দক্ষ শ্রমিকের অভাবে দেশ উন্নতমানের পোশাক তৈরি করতে পারে না।
ঘ. মুষ্টিমেয় কয়েক শ্রেণির পোশাক রপ্তানি : এখানকার পোশাক শিল্পের অন্যতম প্রধান সমস্যা হলো এর তৈরি পোশাকের ধরণ খুবই স্বল্প। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রায় ১১৫ প্রকার পোশাকের চাহিদা রয়েছে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশে শুধু ৫-১০ প্রকার পোশাক তৈরি হয়। অথচ হংকং ৬৫ প্রকারের, তাইওয়ান ৫৩ প্রকারের এবং চীন ৫৬ প্রকারের পোশাক সরবরাহ করে। ফলে বাংলাদেশের পোশাক আন্তর্জাতিক বাজারে-বিস্তৃতি লাভ করতে পারছে না।
ঙ. বিদেশি আমদানিকারকগণের কোটা আরোপ : ১৯৮৩-৮৪ সালে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির শতকরা সত্তর ভাগ ক্রেতা ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। অথচ ১৯৮৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে পোশাক আমদানির উপর কোটা আরোপ করে। ফলে পোশাক শিল্প সংগঠনে বিভিন্ন ধরনের বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। পূর্বে উৎপাদিত পোশাকগুলো শিপমেন্ট হওয়ার পরেই অনেক চুক্তিবদ্ধ দেশ সেগুলো গ্রহণ করেনি। ফলে গার্মেন্টসগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যার ফলে ব্যাংকগুলো পোশাক উৎপাদনকারীদের ঋণদান বন্ধ করে দেয়। সে কারণে অনেক পোশাক কারখানাই রাতারাতি বন্ধ হয়ে যায়।
চ. আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা : এদেশের শিল্পের অন্যতম সমস্যা হলো আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশকে অন্যান্য রপ্তানিকারক দেশের সাথে তীব্র প্রতিযোগিতা করতে হয়। ভারত, হংকং, তাইওয়ান, কোরিয়া প্রভৃতি দেশ পোশাক শিল্পে যথেষ্ট অগ্রগতি অর্জন করেছে। এদের সাথে ব্যবসায় টিকে থাকার জন্য বাংলাদেশকে কঠোর প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে।
ছ. রাজনৈতিক অস্থিরতা : দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা, মিটিং, মিছিল, সভা, ধর্মঘট ইত্যাদি কারণে শিল্পের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
সমাধানের উপায় : আমাদের গার্মেন্টস শিল্পের বৈদেশিক বাজারকে আরও সমৃদ্ধ করার জন্য কতিপয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন করা আবশ্যক। যা নিম্নরূপ :
১. গুণ ও মানের উৎকর্ষ সাধন : বর্তমান সময়ে হংকং, কোরিয়া, তাইওয়ান ইত্যাদি দেশসমূহ আর্ন্তজাতিক বাজার তাদের পোশাকের গুণ ও মান সম্পর্কে স্বীকৃতি লাভ করেছে। এমনকি, শ্রীলংকাও এরূপ মানসম্মত পণ্যের বহৎ রপ্তানিকারক দেশ। এসব দেশের সাথে বাংলাদেশের পোষাক শিল্পের আর্ন্তজাতিক বাজার টিকে থাকবে এর মান ও গুণাগুণের উপর।
২. দ্বিপাক্ষিক চুক্তি : দ্বিপাক্ষিক বর্তমান সময়ে আমেরিকা এবং কানাডাতে প্রচলিত কোটা অনুযায়ী পোষাক রপ্তানিকে সমৃদ্ধ করতে হলে দ্বি-পাক্ষিক চুক্তি অতি শীঘ্রই সমাধান করা উচিত। বর্তমান সময়ে চীন বিশ্ব চাহিদার ৩০ শতাংশ পোষাক রপ্তানি করছে তাদের পক্ষে বিশ্ববাজারে এরূপ অবস্থানের মূল কারণ পাক্ষিক ও দ্বি-পাক্ষিক চুক্তি।
৩. বিকল্প দেশ অনুসন্ধান : চীনের এ বৃহৎ বাজার কেবল আমেরিকা ও কানাডাতেই সীমাবদ্ধ নয়। তারা তাদের দ্রব্য সারা বিশ্বে রপ্তানি করছে। অথচ আমাদের পণ্য আমেরিকা. E.E.C এবং কানাডাতে রপ্তানি হচ্ছে। বর্তমান সময়ে প্রয়োজন নতুন বাজার অনুসন্ধান।
৪. আইটেমের সংখ্যা : বাংলাদেশে রপ্তানিজাত গার্মেন্টস দ্রব্যের আইটেম সংখ্যা খুবই কম, আমেরিকা যেখানে ৭৬ প্রকারের গার্মেন্টস পণ্য আমদানী করে। আমাদের দেশ সেখানে মাত্র ১৩ প্রকারের গার্মেন্টস রপ্তানি করে।
৫. অত্যাধুনিক মেশিনারী : গার্মেন্টস শিল্পের বিকাশ এবং দ্রুত অগ্রযাত্রাকে ধরে রাখা এবং সাফল্যমন্ডিত করার জন্য প্রয়োজন অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি বা যন্ত্রাংশ এবং প্রয়োজন দেশে উৎপাদিত আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি।
৬. রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চল : বাংলাদেশে স্থাপিত চট্রগ্রাম এবং ঢাকা E.P.Z ইতোমধ্যেই রপ্তানি বাজারে অবদান রাখতে শুরু করেছে। দেশী-বিদেশী উদ্যোগ এবং বিনিয়োগ এসব এলাকায় শুরু হয়েছে। সীমিত সুযোগ-সুবিধার কারণে এরূপ এলাকায় ব্যাপকভাবে পোষাক শিল্প গড়ে উঠছে না। চট্টগ্রাম E.P.Z -এ ২৩টি গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রি অনুমোদন লাভ করেছে এবং ঢাকায় এ পর্যন্ত ছয়টি শিল্প অনুমোদন লাভ করেছে। এইভাবে E.P.Z বৃদ্ধি করে বেশি বেশি গার্মেন্টস শিল্প প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
বাংলাদেশের পোশাক শিল্প : সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ
বিভিন্ন প্রকার সমস্যা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের ভবিষ্যৎ যথেষ্ট সম্ভাবনাময়। সেজন্যই পোশাক শিল্প দ্রুত বিকাশ লাভ করেছে। এর অন্যতম প্রধান কারণগুলো হলো-
ক. সস্তা শ্রম : বাংলাদেশে শ্রমের যোগান প্রচুর এবং শ্রম তুলনামূলকভাবে খুবই সস্তা। স্বল্প মজুরিতে তৈরির ফলে পোশাকের উৎপাদন খরচ কম হয়। এ কারণে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প বিদেশে দ্রুত ব্যাপক বাজার লাভ করেছে।
খ. নারী শ্রম : নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের অসহায় মেয়েরা পোশাক শিল্প কারখানায় কাজ করে। এমনিতেই আমাদের দেশে শ্রম সস্তা, তদুপরি নির্যাতিতা মহিলাদেরকে আরো বেশি স্বল্প মজুরিতে নিয়োগ করে লাভজনকভাবে পোশাক তৈরি সম্ভব হয়েছে।
গ. অধিক মূলধনের প্রয়োজনীয়তা কম : পোশাক তৈরির কারখানাকে আমরা বড় ধরনের দর্জির দোকান হিসাবে আখ্যায়িত করতে পারি। পোশাক শিল্পের সেলাইয়ের মেশিনগুলো বিদ্যুৎ দ্বারা চালিত হয়। স্বল্প-মূলধনের প্রয়োজন হওয়ায় বেশিরভাগ শিল্প উদ্যোক্তা এ শিল্পে বিনিয়োগে উৎসাহিত হয়েছে।
ঘ. বিনিয়োগ-উৎপাদন ব্যবধান স্বল্প : এ শিল্পে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি অতি অল্প সময়ের মধ্যে সংগ্রহযোগ্য। জমি ও ভবনের জন্য বিনিয়োগ করতে হয় না। বাড়িতেই স্থাপন করা যায় এবং চার থেকে ছয় মাসের মধ্যেই উৎপাদন শুরু করা যায়। সেজন্য এ শিল্পে বিনিয়োগ প্রবণতা তুলনামূলকভাবে বেশি।
ঙ. দ্রুত শিল্প ঋণ প্রাপ্যতা : বিনিয়োগ উৎপাদন ব্যবধানের স্বল্পতার কারণে ও দ্রুত উৎপাদন ব্যয় ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা থাকায় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো দ্রুত ও সহজ শর্তের এসব শিল্প প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দিয়ে থাকে।
চ. সরকারের উদার শিল্প নীতি : ১৯৭৫ সারের পর থেকে সরকার বেসরকারি খাতে শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে উৎসাহ প্রদান করছে। তৈরি পোশাক শিল্প মূলত বেসরকারি খাতেই গড়ে উঠেছে। নানা প্রকার কর বেয়াত, নিম্ন সুদের হার ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে সরকার পোশাক শিল্প প্রতিষ্ঠায় উৎসাহ প্রদান করেছে।
উপসংহার : বাংলাদশে পোষাক শিল্পের পূর্ণ সুবিধা ভোগ করার জন্য তথা প্রধান রপ্তানিকারক উপাদান হিসেবে জাতীয় অর্থনীতির পরিচালক হিসেবে পোষাক শিল্প নিয়ে ভেবে দেখার সময় এসেছে। সরকারি এবং বেসরকারি হস্তক্ষেপের ব্যাপক প্রত্যাশা এবং অংশগ্রহণ এ শিল্পের অগ্রযাত্রাকে অব্যাহত রাখার জন্য জরুরি।
**************************
ড. এ. আই. এম. মুসা
অধ্যাপক-বাংলা
www.onlinereadingroombd.com
+88 01713 211 910