
NTRCA School: বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা: স্কুল পর্যায় বাংলা বিষয়ের অতিগুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা : কবিতা
ব্যাখ্যা: কবিতা
NTRCA School: বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা: স্কুল পর্যায়
বাংলা বিষয়ের অতিগুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা : কবিতা
ব্যাখ্যা ১ : ওই দূর বনে সন্ধ্যা নামিছে ঘন আবিরের রাগে
অমনি করিয়া লুটায়ে পড়িতে বড় সাধ আজ জাগে ।
ব্যাখ্যা : ব্যাখ্যার জন্য নির্বাচিত অংশটুকু বাংলার চিরায়ত পল্লী জীবনের রূপকার কবি জসীম উদ্দীন (১৯০৩-১৯৭৬) রচিত ‘রাখালী' কাব্যের অন্তর্গত ‘কবর’ শীর্ষক কবিতা থেকে নেয়া হয়েছে। এটি নিরন্তর বেদনার ধারক বৃদ্ধ দাদুর উক্তি।
আলোচ্য উচ্চারণের মধ্য দিয়ে আপন জন হারা বৃদ্ধ দাদু জীবনের অন্তিম আকাঙ্ক্ষার স্বরূপ উন্মোচন করেছেন।
‘কবর’ কবিতা সর্বহারা এক বৃদ্ধের হৃদয় নিংড়ানো ব্যথার মহাকাব্য। বৃদ্ধ আজ রিক্ত, নিঃস্ব। অথচ একদিন তাঁর স্ত্রী, পুত্র, কন্যা - সবাই ছিলো। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাসে একে একে সবাই তাকে ছেড়ে চলে গেছে। বৃদ্ধ পারিবারিক কবরস্থানে দাড়িয়ে একমাত্র অবলম্বন নাতীর কাছে যাপিত জীবনের স্মৃতিচারণ করছেন এবং আপন জন চলে যাওয়ার ইতিবৃত্ত বর্ণনা করছেন। বৃদ্ধ তাঁর জীবনের সবচেয়ে বর্ণিল সময়টা অতিবাহিত করেছেন স্ত্রীর সাথে। কিন্তু ভাগ্যের নিদারুণ অভিসম্পাতে বৃদ্ধের জীবনচারিণী বিদায় নেয় এই জগত সংসার থেকে। বেদনার আঘাতে নিভে যায় বৃদ্ধের জীবনের সোনালি ঊষার সোনালি আলো। এর পর বিদায় নেয় তাঁর একমাত্র পুত্র। শোক সাগরে নিমজ্জিত হন বৃদ্ধ। এই শোক কাটতে না কাটতেই বিদায় নেয় পুত্রবধু। বৃদ্ধ দাদুকে এই নির্মম যাতনাও সহ্য করতে হয়। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। কেননা, ‘অভাগা যে দিকে চায়, সাগার শুকায়।' কিছু দিনের মধ্যেই চিরতরে বিদায় নেয় প্রাণপ্রিয় নাতনী এবং ফুলকোমল মেয়ে। সকল আপন জনের শবই তিনি নিজ হাতে সমাধিতে শায়িত করেন। প্রতিটি মৃত্যুই তাঁর অন্তরের অন্তরতম প্রদেশটিকে বেদনার রাগিনীতে আচ্ছাদিত করে রাখেছে। এ কারণেই জীবনের প্রতি তার আর কোনই আকর্ষণ নেই। বিদায়ী সুর্যের মতো তিনিও পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে চান। তাই আজানের সকরুণ সুরের মধ্য দিয়ে নিজ জীবনের কিয়ামতের কথা ভাবছেন। আর এ কারণেইর বৃদ্ধের হৃদয় নিংড়ানো উচ্চারণ-
ওই দুর বনে সন্ধ্যা নামিছে ঘন আবিরের রাগে
অমনি করিয়া লুটায়ে পড়িতে বড় সাধ আজ জাগে।
বস্তুত আলোচ্য উক্তির মধ্য দিয়ে কবি জীবন যন্ত্রণায় কাতর বৃদ্ধের জীবনের অন্তিম আকাঙ্ক্ষাকে অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন।
২ নং ব্যাখ্যা : যে আছে মাটির কাছাকাছি ,
সে কবির বাণী লাগি কান পেতে আছি ।
অথবা, সাহিত্যের আনন্দ ভোজে ,
নিজে যা পারি না দিতে , নিত্য আমি থাকি তারি খোঁজে।
অথবা, আমার কবিতা জানি আমি
গেলেও বিচিত্র পথে হয় নাই সর্বত্রগামী। (ঐকতান)
উত্তর : ব্যাখ্যার জন্য নির্বাচিত অংশটুকু বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ‘ঐকতান’ শীর্ষক কবিতা থেকে নেয়া হয়েছে।
স্বীয় সাহিত্য সাধনার সীমাবদ্ধতার স্বরূপ তুলে ধরতে গিয়ে এবং কবি আলোচ্য উক্তির অবতারণা করেছেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা সাহিত্যে একমাত্র নোবেল বিজয়ী কবি। সারাটা জীবন তিনি অক্লান্ত সাধনায় সাহিত্য চর্চা করেছেন। সাহিত্যের এমন কোন ক্ষেত্র নেই যেখানে তিনি কৃতিত্বের সাথে বিচরণ করেন নি। তারপরও তিনি নিজের সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করতে পেরেছেন। এই উপলব্ধির কথাই তিনি ‘ঐকতান’ কবিতায় প্রকাশ করেছেন। জীবন সায়াহ্নে এসে কবি অনুভব করেছেন যে, চাষী, তাঁতী, জেলে প্রভৃতি শ্রমজীবী মানুষ তাঁর কবিতায় স্থান পায় নি। সমাজের উচ্চাসনে বসে তিনি কবিতা রচনা করেছেন। মাঝে মাঝে সাধারণ শ্রেণীর মানুষদের পাড়ায় গেলেও তার কাব্য জগতে খুব একটা দেখা যায় না। তাই তাঁর কবিতা বিচিত্র পথে বিচরণ করলেও সর্বগামী হতে পারে নি। মাটি ও মানুষের কথা তার কাব্য জগতে খুব একটা দেখা যায় না। তাই কবি নিজেই আক্ষেপ করে সে কথা বলেছেন। নবীন কবিদের প্রতি আহবান জানিয়েছেন চাষী, তাঁতী ও কামারের কথা কাব্যে স্থান দিতে। তাঁদের বাণী শুনার জন্য কবি কান পেতে আছেন। কারণ, সাহিত্যের আনন্দের ভোজে নিজে যা দিতে পারেন নি, কবি তা কান পেতে শোনার জন্য কান পেতে অপেক্ষা করে আছেন ।
বস্তুত, নিজের সাহিত্য সাধনার সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি মাটি ও মানুষের কবির আগমনের স্বপ্ন আলোচ্য অংশে সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।
৩ নং ব্যাখ্যা : দিন দিন আয়ুহীন , হীন বল দিন দিন , -
তবু এ আশার নেশা ছুটিল না, এ কি দায়।
অথবা, ফিরি দিবে হারাধন , কে তোরে , অবোধ মন ,
হায় রে ভুলিবি কত আশার কুহক- ছলে ?
উত্তর: ব্যাখ্যার জন্য নির্বাচিত অংশটুকু আধুনিক বাংলা কাব্যের জনক মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত বিরচিত ‘আত্ম- বিলাপ’ শীর্ষক কবিতা থেকে নেয়া হয়েছে।
সীমাহীন উচ্চাকাক্সক্ষা কবির জীবনে যে যন্ত্রণার সৃষ্টি করে তাই ব্যাক্ত করতে গিয়ে কবি আলোচ্য উক্তি করেন।
আশা নিয়েই মানুষ বেঁচে থাকে, আশাতেই মানুষ বসবাস করে। আশাই মানুষের জীবনে গতি দান করে। আশাই মানুষের জীবনকে পরিচালনা করে। তাই আশা ছাড়া জীবন কল্পনা করা যায় না। আশার কুহকে পড়ে মানুষ আহার, নিদ্রা, শ্রান্তি, ক্লান্তির কথা ভুলে যায়। এভাবে মানুষ একদিন পৃথিবী ছেড়ে বিদায় নেয়। তবুও মানুষের মন থেকে আশা নামক জিনিসটা পালিয়ে যায় না। কবি মধুসূদন দত্তও এর ব্যতিক্রম নন। কবির মনেও অর্থ, যশ, প্রভাব, প্রতিপত্তি আহরণ করার উচ্চাশা ছিল। এ আশা নিয়েই তিনি বিদেশে গিয়েছেন। কিন্তু তাঁর সব আশা ব্যর্থ হয়েছে এবং তাঁর জীবনের অনেকগুলো মূল্যবান বছর হারিয়ে গেছে। কবি দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে কল্পনা করেন তাঁর যে জীবন সময় হারিয়ে গেছে তাকে আর ফিরে পাওয়া যাবে না। তার আয়ু ক্রমশ হীন হয়ে পড়েছে , দুর্বল হয়ে পড়েছে শরীরের শক্তি অথচ আশা নামক নেশাটি ছাড়ছে না। কিন্তু মানুষ ও তার জীবন নিয়তির হাতে বাঁধা। তাই কবির অশ্রু বিসর্জন ও বিলাপ করা ছাড়া আর কিছুই করার নেই। সেই বেদনাই এখন তাকে কুঁরে কুঁরে খাচ্ছে। মাইকেল মধুসূদন দত্ত কবি হিসেবে বিশ্বখ্যাতি, অর্থ, যশ ও সামাজিক প্রতিষ্ঠার মোহে পড়ে স্বদেশ, স্বজাতি ও স্বধর্মকে বিসর্জন দিয়ে বিনিময়ে ব্যর্থতা, না পাওয়ার হাহাকার পেয়েছেন। তাই মেধা ,শ্রম ,স্বাস্থ্য ও সময় হারিয়ে তিনি আত্ম-বিলাপে ভেঙ্গে পড়েন ।
বস্তত, আশা ভঙ্গ হওয়ার পর আশাবাদী কবির মনে যে যন্ত্রণার সৃষ্টি হয়, তা আলোচ্য উক্তর মধ্য দিয়ে সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।
৪ নং ব্যাখ্যা : সব পাখি ঘরে আসে সব নদী ফুরায় এ জীবনের সব লেনদেন
থাকে শুধু অন্ধকার , মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন ।
উত্তর: ব্যাখ্যার জন্য নির্বাচিত অংশটুকু আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম রূপকার কবি জীবনানন্দ দাশ রচিত ‘বনলতা সেন’ শীর্ষক কবিতা থেকে নেয়া হয়েছে।
প্রসঙ্গ : দিনের শেষে ক্লান্ত প্রকৃতি যেমন রাত্রির কোলে আশ্রয় নেয় তেমনি কর্মক্লান্ত কবিও জীবনের শেষ প্রান্তে বনলতা সেনের কাছে প্রশান্তির আশ্রয় খুঁজে পেয়েছেন ।
অনাদি কাল থেকে মানুষ শান্তির চেষ্টায় ব্যাকুল। ক্লান্ত চিল সারাদিনের শেষে সন্ধ্যায় ডানা থেকে রৌদ্রের গন্ধ মুছে বিশ্রামের আয়োজন করে। শান্তি প্রত্যাশী মানুষেরও এরূপ আশা অনন্তকালের। কবির অশান্ত অন্তরে শান্তির পরশ দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন। শান্তি প্রত্যাশী মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে কবি তাঁর মানসপ্রতিমাকে খুঁজেছেন। পৃথিবীর বিচিত্র প্রান্তরে খুজে খুজে অবশেষে তিনি নাটরে তাকে খুঁজে পেয়েছেন। কবি বড়ই ক্লান্ত। প্রকৃতির দেবী বনলতা সেনের সান্নিধ্যে সব ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। জীবনের আলো যখন সময়ের ভারে নিষ্প্রভ হয়ে যায়। জীবন সূর্য যখন অস্তাচলে গমন করে তখন আর কোনো আশা থাকে না। হতাশার অন্ধকারে জীবন তলিয়ে যায়। অথচ প্রিয় সান্নিধ্য তখন পারে স্বর্গীয় সুখে ভরে দিতে।
জগৎ ও জীবনে শেষ বলে কিছু নেই। যেখানে মনে হয় সব শেষ হয়ে গেল সেখানে আবার সম্ভাবনার সূত্রপাত ঘটে। তাই জীবনের সব লেনদেন শেষ করে গাঢ় অন্ধকার কবি মানসপ্রিয়াকে খুঁজে পেয়ে মুখোমুখি বসে অনাবিল সুখ অনুভব করছেন।
******************************
ড. এ. আাই. এম. মুসা
অধ্যাপক-বাংলা
www.onlinereadingroombd.com
+88 01713 211 910