
NTRCA School, ১৮তম বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা, 'চাঁদের অমাবস্যা' উপন্যাসের বিষয় ও শিল্পরূপ
NTRCA School, ১৮তম বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা, 'চাঁদের অমাবস্যা' উপন্যাসের বিষয় ও শিল্পরূপ
প্রশ্ন : 'চাঁদের অমাবস্যা' উপন্যাসের বিষয় ও শিল্পরূপ আলোচনা কর।
অথবা, চেতনা প্রবাহরীতি কী? এই রীতি 'চাঁদের অমাবস্যা' কতটুকু ক্রিয়াশীল ছিল? আলোচনা কর।
অথবা, 'চাঁদের অমাবস্যা' উপন্যাসে অস্তিত্ববাদী জীবনদর্শনের যথার্থ রূপায়ণ ঘটেছে।’ – মন্তব্যটি যাচাই কর।
উত্তর: কোন শিল্পীর শিল্প চেতনা ও জীবনবোধের জাগরণ ও বিকাশ নিরবলম্ব ভাবে অসম্ভব । সময় ও সমাজের গর্ভে বেদনাময় যুগচৈতন্যমুলে প্রত্যক্ষে কিংবা পরোক্ষে সংলগ্ন হয়েই শিল্পীর শিল্পদৃষ্টি ও জীবনবোধ উদ্ভব ও বিকাশ লাভ করে । বাঙালা সাহিত্যের অন্যতম ঔপন্যাসিক সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ ( ১৯২২-৭১) সম্পর্কেও এ সত্য প্রাসঙ্গিক। কারণ, ১৯৪৭ এ দেশ বিভাগ, ১৯৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ এর নির্বাচনে মুসলীম লীগের পরাজয়, ১৯৫৮ এ সামরিক শাসন, প্রভৃতি জাতীয় ঘটনা যেমন প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষে ওয়ালীউল্লাহর শিরপ মানস গঠনে সাহায্য করেছে, তেমনি পোলান্ড ও হাঙ্গেরির বিদ্রোহ (১৯৫৬), রাশিয়া ও চীনের সংঘাত ও বিরোধ (১৯৬৩), ভিয়েতনামে আমেরিকার হস্তক্ষেপ (১৯৫৬), ইসরাইল কর্তৃক আরব ভূখণ্ডে আক্রমণ ও দখল (১৯৬৭) প্রভৃতি আন্তর্জাতিক ঘটনা সমূহও ওয়ালীউল্লাহর শিল্প মানস গঠনে পালন করেছে নিগুঢ় ভুমিকা। তাছাড়া দীর্ঘ দিন প্যারিসে অবস্থান কালে তিনি সমকালীন ইউরোপীয় শিল্প সাহিত্য আন্দোলন তথা- ইমপ্রেশনিজম, সাররিয়ালিজম ও একজিনসটেনসিয়লিজমের সাথে নিবিড় ভাবে পরিচিত । এই বিশ্বকেন্দ্রিক জীবন-পরিপ্রেক্ষিতের জন্যই ওয়ারীউল্লাহ্ জীবনবোধ ও শিল্প রচতনায় জাতীয় ভাবধারার উর্ধ্বে উঠে পরিস্নাত হয়েছেন আন্তর্জাতিক চেতনায় ও বিশ্বানুভুতিতে। জীবন অন্বেষার প্রশ্নে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ ছিলেন নিষ্ঠাবান। তাঁর রচনায় রাজনীতি-সজাগতা, সময় 'ও সমাজ সচেতনার পরিচয় অত্যন্ত স্পষ্ট । শিল্প সৃষ্টিতে তিনি ছিলেন অধ্যাবসায়ী, পরিশ্রমী। বিষয় নির্বাচনে তিনি বাঙলাদেশের জনজীবন মূল সম্পৃক্ত, কিন্তু বক্তব্য ও প্রকরণে সর্বজনীন, বিশ্বপ্রসারিত, স্বনিষ্ঠ, পরীক্ষা প্রিয় ও আধুনিক । মোটকথা জীবন অনুধাবন ও শিল্প প্রকরণে তিনি ছিলেন নিঃসঙ্গ, স্বতন্ত্র এবং ক্রমাগত সুক্ষ্মতার সৃষ্টি, সাফল্যের অভিযাত্রী ।
সংখ্যাগত বিবেচনায় সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ উপন্যাস বেশি লেখেননি । তিনি তিনটি মাত্র উপন্যাস লেখেন । যেমন-
১।লালসালু ২। চাঁদের অমাবস্যা
[১৯৪৮]
[১৯৬৪]
৩।কাঁদো নদী কাঁদো
[১৯৬৮]
কিন্তু জীবনবোধ, জীবন দৃষ্টি ও শিল্প প্রকরণের উজ্জ্বলতায় তাঁর উপন্যাসত্রয় শুধু বাঙলা উন্যাস নয়, সমগ্র বিশ্ব উপন্যাসের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিযোগিতায় নামতে পারে অভিনব এবং স্বাতন্ত্র্য বিলাসী ।
আলোচ্য নিবন্ধে আমরা সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর 'চাঁদের অমাবস্যা' উপন্যাসের বিষয় ও শিল্পরূপের সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরবো:
সময়, সমাজ ও ইতিহাসের সত্যকে স্বীকৃতি দিয়েই লাল সালুর বর্হিবাস্তব চাঁদের অমাবস্যায় ব্যক্তি মনের জটিল অভিজ্ঞাতায় রূপান্তরিত । এ উপন্যাসে ওয়ালীউল্লাহ অস্তিত্ববাদী দর্শনে মীমাংসিত। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ এ উপন্যাসে অস্তিত্ব দর্শন রূপায়ণে প্রয়াসী হন দরিদ্র শিক্ষক আরেফ আলীর মর্মঘাতী এক অভিজ্ঞতার মাধ্যমে । অস্তিত্বগত প্রান্তিক পরিস্থিতির সুতীব্র আঘাতে এ উপন্যাসে আরেফ আলী আত্মযন্ত্রণাকাতর, চেতনা ও অবচেতনায় রক্তাক্ত, সত্যানুসন্ধানে আত্মখননকারী এবং অভিজ্ঞতায় ক্রমসংকোচিত। আরেফ আলীর আত্মাত দ্বন্দ্ব এবং পরিণামে কাদের যে প্রকৃত হত্যাকারী এ সত্য উন্মাচনে অস্তিত্ববাদী দর্শন রূপায়িত হয়েছে । এ উপন্যাসে আরেফ আলী ব্যক্তিগত স্বার্থ, সংস্কার ও সুখ স্বাচ্ছন্দ্যবোধের উর্ধ্বে উঠে বিমিশ্র সত্তা থেকে শুদ্ধ সত্তায় উত্তরণ লাভ করে । আর এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয় উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র আরেফ আলীর চেতনায়।
আরেফ আলীর দ্বন্দ্ব, সংঘাত, সংশয় ও অস্থিরতার মাধ্যমে লেখক আমাদের জাতীয় জীবনের সংশয় ও অস্থিরতাকে এবং পরিনামে তার সুস্থিরতা দ্বারা ষাটের পরবর্তী সময়ের সুস্থিরতাকে প্রতীকায়িত করেছেন । তাছাড়া উপন্যাসের শেষে বুটের শব্দ আয়ুব খানের ১৯৫৮ সালের সামরিক শাসনকেই করেছে অভিব্যঞ্জিত।
জটিল প্লটে বিন্যাসকৃত চাঁদের অমবস্যায় আপত দৃষ্টিতে সর্বজ্ঞদৃষ্টিকোন ব্যবহৃত হলেও, এ উপন্যাসে প্রকৃত পক্ষে ব্যবহৃত হয়েছে, অস্তিত্বসংকিত ভীতসন্ত্রস্ত আরেফ আলীর অতিসংবেদনশীল প্রেক্ষণ বিন্দু । চরিত্রের আর্ন্তক্রিয়া, দ্বন্দ্ব, সংঘাত, প্রত্যাশা, অচরিতার্থতা, রক্তাক্ত অভিজ্ঞতা প্রকাশের জন্যই সৈয়দ ওায়ালীউল্ল্যাহ্ এ উপন্যাসে ব্যবহার করেছেন এক্সপ্রেশনিষ্ট পরিচর্যারীতি -
ওপরে ঝলমলে জ্যোৎস্না, কিন্তু সামনে নদী থেকে কুয়াশা উঠে আসছে ।
কুয়াশা না আর কিছু, হয়তো সে ঠিক বোঝে না ।
হয়তো একদল সাদা বকরী দেখে, যার শিং-দাঁত-চোখ কিছুই নাই,
হয়তো মনে হয় রাত্রি গা মোড়ামোড়ি দিয়ে উঠে বসেছে, চোখ ধাঁধানো
অন্তহীন জ্যোৎস্নালোকে জীবনের আভাস দেখা দিয়েছে।”
উপরের উদ্ধৃতাংশে এক্সপ্রেশনিজমের মৌল বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী ব্যক্তির আবেগ, উল্লাস, প্রেম, অনুভুতি প্রকাশে বহিজাগতিক আকারে বিকৃতি ঘটানো হয় । এই বস্তুর বিকৃত রূপ ও আকারকে প্রকাশ করা হয় মূলতঃ চিত্রকল্প ও প্রতীকের সাহায্যে । ভীতি অনুষঙ্গী শব্দ এ উপন্যাসে ব্যবহৃত হয়েছে ১৫০ বার, যা থেকে লেখকের বিশেষ মটিফ তথা অস্তিত্ববাদের অভীপ্সা প্রকাশিত হয়েছে । “ নপুংসক কীটপতঙ্গ” এবং “দীর্ঘ অন্ধকার গুহা” এ দুটি চিত্রকল্প বার বার ব্যবহার হওয়ায় তা পরিণত হয়েছে প্রকাশবাদী প্রতীকে । যা চেতনা প্রবাহরীতির প্রধান অনুষঙ্গ।
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ জীবন বিমুখ আত্মবিনাসী অন্ধকারবাসী কিংবা নৈরাশ্যবিহারী কোন শিল্পীপুরুষ নন । তার কৃতিত্ব তিনি বুর্জোয়া সভ্যতাজাত প্রতিক্রিয়ার দর্শনকে বিবেচনা করেছিলেন ক্রমশঃ হয়ে উঠা মানবীয় অস্তিত্বের কেন্দ্রবিন্দু দিয়ে । নিরস্তিত্বের শূন্যতায় ফুরিয়ে যাওয়া জীবন নয়, অন্ধকার ভেঙ্গে ভেঙ্গে অতিত্বের দায়িত্বশীল স্বাধীন সত্তায় উত্তরণই জীবন । মোটকথা অতিক্রমই জীবনার্থের মূল কথা। এ শিল্পনীতি ও জীবনবোধের রূপায়ণ ঘটেছে তাঁর চাঁদের অমাবস্যা' উপন্যাসে।
*******************************
ড. এ. আই. এম. মুসা
অধ্যাপক-বাংলা
www.onlinereadingroombd.com
+88 01713 211 910