
NTRCA School, ১৮তম বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা, রক্তাক্ত প্রান্তর নাটকের নামকরণের সার্থকতা বিচার
প্রশ্ন : রক্তাক্ত প্রান্তর নাটকের নামকরণের সার্থকতা বিচার কর।
আলোচনা : আধুনিক জীবনবোধ ও শিল্প-চেতনায় পরিদৃত মুনীর চৌধুরী (১৯২৫-১৯৭১) ছিলেন সময় ও সমাজ সচেতন সাহিত্যিক। স্বদেশ প্রেম, নির্যাতিত জনগোষ্ঠীর জন্য কল্যাণবোধ, সংরক্ত সমকাল চেতনা, বিশ্বাত্মবোধ এবং সামগ্রিক মানবিক প্রশান্তিই ছিল তাঁর সাহিত্য সাধনার অন্তর্লীন প্রেরণার উৎস। এ চেতনা স্নাত হয়েই তিনি রচনা করেন তাঁর কালজয়ী সৃষ্টি “রক্তাক্ত প্রান্তর” (১৯৬২) নাটক। ভাব, বিষয় আঙ্গিক ও জীবনচেতনার প্রশ্নে এটি বাংলা নাট্য-সাহিত্যের ধারায় অনন্য সংযোজন। শুধু শৈলী ও জীবনচেতনার প্রশ্নেই নয়, নামকরণ বিবেচনায়ও নাটকটি হয়ে উঠেছে অনন্য, অসাধারণ এবং নান্দনিক বৈশিষ্ট্যে অভিব্যঞ্জিত।
ইতিহাসের অন্যতম ঘটনা, পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধকে আশ্রয় করেই রক্তাক্ত প্রান্তর নাটকের আখ্যানভাগ গড়ে উঠেছে। মারাঠা ও মুসলমানদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামই এই নাটকের মৌল উপজীব্য। তবে যুদ্ধ এই নাটকের আশ্রয় হলেও যুদ্ধ বা যুদ্ধের ইতিহাস বর্ণনা নাট্যকারের অন্বিষ্ট নয। বরং যুদ্ধ বর্ণনার মধ্য দিয়ে যুদ্ধ বিরোধী চেতনার উন্মোচনই এই নাটকে নাট্যকারের মৌল লক্ষ্য। তাই নাট্যকার নাটকের ভূমিকায় বলেছেন-
“যুদ্ধাবসানে যে কয়টি মানবমানবীর হৃদয়ের স্পন্দন অনুভব করি তাদের
সকলের অন্তর রণক্ষেত্রের চেয়ে ভয়াবহরূপে বিধ্বস্ত ও ক্ষতবিক্ষত। প্রান্তরের
চেয়ে এই রক্তাক্ত অন্তরই বর্তমান নাটক রচনায় আমাকে বেশী অনুপ্রাণিত করেছে।”[ ভূমিকা, রক্তাক্ত প্রান্তর ]
আর এ চেতনার অন্তর্গত সত্যকে ধারণ করেই নাট্যকার এই নাটকের নামকরণ করেছেন “রক্তাক্ত প্রান্তর” । ফলে নাটকের বিষয় ও নাট্যকারের বক্তব্য সমবিন্দুকে স্পর্শ করেছে । আর এ কারণেই নাটকের নামকরণ হয়েছে সুন্দর ও সার্থক। তবে অনেক সমালোচক এই নামকরণকে মেনে নিতে পারেননি। আমরা আলোচ্য নিবন্ধে ‘রক্তাক্ত প্রান্তর' নাটকের নামকরণের যৌক্তিকতা বিচারের প্রয়াস পাব। তবে এ নাটকের নামকরণের সার্থকতা নিরূপণের পূর্বে সাহিত্য শিল্পের নামকরণের ব্যবহারিক ও নান্দনিক প্রসঙ্গ সম্বন্ধে পরিপূর্ণ ধারণা নেয়া অপরিহার্য। অন্যথায় আমাদের বিবেচনা বিভ্রান্তির চোরাবালিতে নিমজ্জিত হতে বাধ্য।
সাহিত্যে শিল্পে নামকরণের ক্ষেত্রে প্রধানত দু'টি দিককে বিবেচনা করা হয়।
প্রথমত, সাহিত্য বা শিল্পের পরিচিতি তথা ব্যবহারিক দিক
দ্বিতীয়ত, এর অন্তর্নিহিত বক্তেব্যের দিক।
এ বিশ্বে নামহীন বস্তুর অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না । নামই একটি বস্তুকে আরেকটি বস্তু থেকে পৃথক করে আমাদের কাছে পরিচিত করে তোলে। গোলাপ ও শিউলি উভয়েই ফুল হলেও কেবল নাম উচ্চারণের মাধ্যমেই এরা আমাদের কাছে স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্যে উদ্ভাসিত হয়। তেমনি সমাজ জীবনে একজন ব্যক্তি নামের কারণেই লক্ষ কোটি ব্যক্তি থেকে পৃথক পরিচিতি পায়। একজন ব্যক্তি বা বস্তুর নাম উচ্চারণের সাথে সাথে এর ব্যবকহারিক দিকটিও আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠে। এ দিক থেকে নামই ব্যক্তি বা বস্তুর পরিচিতির অনিবার্য স্মারক। সাহিত্যের অন্যতম শাখা নাটক সম্বন্ধেও এ মুল্যায়ন প্রাসঙ্গিক। কারণ নামের কারণেই একটি নাটক সমজাতীয় সমস্ত নাটক থেকে পৃথক । ‘কৃষ্ণকুমারী’, ‘নীলদর্পণ’, ‘রক্তকরবী” নামের কারণেই পরস্পর থেকে পৃথক এবং আমরা সহজেই বুঝি এগুলো একেকটি নাটক। মুনীর চৌধুরী রচিত 'রক্তাক্ত প্রান্তর' নাটকও নামের কারণেই সকল নাটক থেকে স্বতন্ত্র।
নাটকের অন্তর্নিহিত বক্তব্যের দিক বিবেচনা করেও নাটকের নামকরণ করা হয়। কেননা, শিল্প সাধনার পশ্চাতে প্রত্যেক শিল্পীরই শৈল্পিক অভিপ্রায় থাকে। আর এই অভিপ্রায়ই হলো সংশ্লিষ্ট শিল্পকর্মের কেন্দ্রীয় সত্য। সাহিত্যের অন্যতম মাধ্যম হিসাবে নাটক সম্বন্ধেও এ মুল্যায়ন প্রাসঙ্গিক । তাই আমাদের আলোচ্য ‘রক্তাক্ত প্রান্তর' নাটকেরও একটি কেন্দ্রীয় সত্য বা অভিপ্রায় বর্তমান । আর এই অভিপ্রায় হলো - নাটকের অন্তর্গত পাত্রপাত্রীর রক্তাক্ত অন্তরের বর্ণনার মধ্য দিয়ে এ যুগের অন্যতম যুদ্ধ বিরোধী মানসিকতার উন্মোচন । তাছাড়া এই নাটকের মধ্য দিয়ে জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মোচনও নাট্যকারের অন্যতম উদ্দেশ্য।
এখন দেখা যাক একজন নাট্যকার নাটকের নামকরণের সময় কী কী বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। প্রধানত নিম্ন লিখিত বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে একজন নাট্যকার নাটকের নামকরণ করে থাকেন-
১। প্রধান ঘটনা বা ঘটনা স্থল, ২। মূলভাব
৩। কেন্দ্রীয় বা নায়ক চরিত্র।
‘রক্তাক্ত প্রান্তর' নাটকে মুনীর চৌধুরী নাটকের কেন্দ্রীয় ভাবকে প্রাধান্য দিয়ে নামকরণ করার প্রয়াস পেয়েছেন।
পূর্বেই বলা হয়েছে যে, ‘রক্তাক্ত প্রান্তর’ নাটকের কাহিনী গৃহীত হয়েছে, পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধ থেকে। এর এক পক্ষে মুসলিম এবং অন্যপক্ষে মারাঠা শক্তি। যুদ্ধের ফলাফল, মুসলমানদের জয় এবং মারাঠাদের পরাজয়। এই বাহ্যিক ফলাফলের পিছনে রয়েছে উভয় পক্ষের অপরিমেয় ক্ষয়-ক্ষতির রক্তাক্ত স্বাক্ষর। সে ইতিহাস যেমনি শোকাবহ, তেমনি ভয়াবহ। যতো হিন্দু আর মুসলিম এই যুদ্ধে প্রাণ দেয়, পাক-ভারতের ইতিহাসে তেমনি আর হয় নি। আবদালীর ভাষায়-
“যা দেখেছি তা অবর্ণনীয়। লাশের উপর লাশ, তার উপর লাশ। কেউ উপুর হয়ে, কেউ চিৎ হয়ে
কউ দলা পাকিয়ে একে অন্যকে জড়িয়ে ধরেছে, আঁকড়ে ধরেছে, জাপটে ধরেছে। নানা জনের কাটা কাটা শরীরের নানা অংশ তালগোল পাকিয়ে এক জায়গায় পড়ে আছে। রক্তে রক্ত মিশেছে। কার সাধ্য এই রক্ত-মাংস-অস্থি হাতড়ে শত্রু মিত্র বেছে বেছে আলাদা করে।”[ তৃতীয় অঙ্ক · প্রথম দৃশ্য ]
অর্থাৎ যুদ্ধ শেষে পানিপথের প্রান্তর রক্তাক্ত প্রান্তরের রূপ পরিগ্রহ করেছে। আর এই দৃষ্টিকোণ থেকে নাটকের নামকরণ শিল্প-সম্মত ও সার্থক।
অন্যদিকে ‘রক্তাক্ত প্রান্তর' নাটকের চরিত্রগুলোর প্রত্যেকেই যুদ্ধের ভয়াবহতার শিকার। নিজেদের ভয়াবহ পরিণামের জন্য তারা অংশত দায়ী। তবে বেশির ভাগের জীবনের রূঢ়তম আঘাত যুদ্ধের সূত্রে প্রাপ্ত। যুদ্ধ শেষে দেখা যায়, বেশির ভাগ নর নারীর হৃদয় যুদ্ধ ক্ষেত্রের মতই রক্তাক্ত ও ক্ষত-বিক্ষত। তাই ‘রক্তাক্ত প্রান্তর' নামকরণের পরিবর্তে অনেকে “রক্তাক্ত অন্তর” নামকরণ করতে অগ্রহী ছিলেন। তবে নাটকের আভ্যন্তর ভাব এই বক্তব্যকে সমর্থন করে না । কারণ যুদ্ধ বিগ্রহ পরিপূর্ণ ঐতিহাসিক পটভূমিতে প্রেমের নাটক রচনা করতে গিয়ে নাট্যকার মূলত সংগ্রাম নয় শান্তির বাণী প্রচারে সচেষ্ট হয়েছেন। যুদ্ধ বিরোধী মানসিকতা আধুনিক মানুষের জীবনোপলব্ধির অংশ। মুনীর চৌধুরী আধুনিক নাট্যকার। সঙ্গত কারণেই তিনি যুদ্ধবিরোধী চেতনাকে এই নাটকের তত্ত্বগত ভিত্তি হিসাবে দাঁড় করাতে চেয়েছেন। আর এই উদ্দেশ্য সফল হয়েছে নাটকের নাম “রক্তাক্ত প্রান্তর” করণের মধ্য দিয়ে। কারণ, যুদ্ধের ভায়াবহ রূপ ও রক্তে রঞ্জিত প্রান্তর দর্শনে পাঠক হৃদয় কেবল আদ্রই হয় না, যুদ্ধ বিষয়ে বীতশ্রদ্ধ হয়ে উঠে, উদ্বুদ্ধ হয় যুদ্ধ বিরোধী চেতনায়। তাই আলোচ্য নাটকের নামকরণ ‘রক্তাক্ত প্রান্তর’ই যথার্থ এবং সুন্দর হয়েছে।
মোটকথা আলোচ্য নাটকের নামকরণ ‘রক্তাক্ত প্রান্তর’ করার মধ্য দিয়ে শুধু নাটকের পরিচিতির দিকই উম্মোচিত হয়নি, বরং নাটকের অন্তর্নিহিত বক্তব্য এবং নাট্যাকারের জীবনদর্শনও প্রতিফলিত হয়েছে। তাই ‘রক্তাক্ত প্রান্তর” নাটকের নামকরণ ‘রক্তাক্ত প্রান্তর' হয়েছে সার্থক ও সুন্দর।
******************************
ড. এ. আাই. এম. মুসা
অধ্যাপক-বাংলা
www.onlinereadingroombd.com
+88 01713 211 910