
NTRCA School, ১৮তম বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা (স্কুল পর্যায়), গুরুত্বপূর্ণ রচনা: বই পড়ার আনন্দ অথবা, সাহিত্য পাঠের আনন্দ
বই পড়ার আনন্দ
অথবা, সাহিত্য পাঠের আনন্দ
ভূমিকাঃ সাহিত্য পড়ে আনন্দ পাওয়া একটি দৈব আশীর্বাদের মতো। আশীবার্দ এই জন্য যে, এ আনন্দ যে পায় সে পায়, যে পায় না সে পায় না। সাহিত্যানুরাগের এইটেই হল সবচেয়ে বড় নিশানা যে, বই পড়ে আনন্দ পাওয়া চাই আর সে-আনন্দ বিশুদ্ধ হওয়া চাই। অর্থাৎ, বইয়ের কী জাত, বইয়ের কে লেখক, লেখকের কী জ্ঞাতি-গোত্র এ সব প্রশ্ন আনন্দের ভোজ্য গ্রহণের সময় গণনার বহির্ভূত হলে তবেই সাহিত্য পাঠের স্বাদ পুরোপুরি মেলে। অর্থাৎ আগে রচনাটি ভালো লাগা চাই, তার নিজস্ব গুণে ও আকর্ষণে, কোনরকম অবান্তর বিবেচনার খাদ না মেশানো অবস্থায়; তারপর কে লেখক কী বৃত্তান্ত এ সব জল্পনার অবসর দেখা দিতে পারে। বইয়ের ভালো-লাগা মন্দ লাগা দিয়েই বইয়ের গুণাগুণের নিরিখ ঠিক হবে, অন্যান্য প্রশ্ন তার পরে।
প্রিয় লেখক ও সাহিত্য পাঠের আনন্দ: এমন বলি না যে লেখকের প্রশ্নটা সম্পূর্ণ বাহ্য। তা হওয়া সম্ভবও নয়। বইটি ভালো লাগলে স্বতই কৌতূহল জাগবে তার লেখককে তা জানবার। তার পর সে লেখকের আরো বই পড়বার জন্যে মনে আগ্রহ জন্মাবে। এভাবে পুস্তক থেকে পুস্তকান্তরে আগ্রহকে চালনার দ্বারা এবং প্রথম ভালো লাগাটা আরো কয়েকটি বইয়ের ক্ষেত্রে সুপরীক্ষিত আর বিশিষ্ট এক সজীব সত্তার জন্ম নেয়। কিন্তু প্রথমে বিশুদ্ধ সাহিত্য পাঠের আনন্দ, তার প্রিয় লেখকের প্রতি পক্ষপাত। যখন একবার মনের ভেতর ‘প্রিয় লেখক’-এর প্রতি অনুরাগ জন্মে যায়, তখন প্রিয় লেখকের প্রতি পক্ষপাতিত্ব সাহিত্যপ্রীতিকে মলিন করে দেয়।
সাহিত্য পাঠের আনন্দ, শিশুমন ও কল্পনা শক্তিঃ সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ পাঠক হচ্ছে শিশু, কিশোর, যার বয়স পাঁচ বছর থেকে বারো থেকে তেরোর মধ্যে। শিশু ও কিশোর সাহিত্য পড়ে যে আনন্দ পায়, কোন বয়স্ক পাঠকের ভাগ্যে তার সিকি আনন্দও জোটে না। হতে পারে, শিশু মন অপরিণত, তার চিন্তা ও বিবেচনাশক্তি অগঠিত; কিন্তু এ সব অভাব পূরণ হয়ে যায় তার অপরিসীম কল্পনার ঐশ্বর্যে।
শিশুর অপরিসীম কল্পনাবৃত্তি তার সাহিত্য পাঠের আনন্দের সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ। রূপকথার গল্প পেলে শিশু নাওয়া খাওয়া ভুলে যায়। শুধু তা-ই নয়, এই ধরা-ছোঁয়ার পৃথিবী তখন তার চেতনার স্তর থেকে মিলিয়ে যায়, দেখা দেয় তারই সমান্তরাল আর এক জগৎ। সেখানে সোনার গাছে হীরের ফল ফলে রাজপুত্র পক্ষিরাজ ঘোড়ায় চড়ে তেপান্তরের মাঠ এক লহমায় পেরিয়ে যায়, হীরামন-তোতা মানুষের মতো কথা কয়, খাঁ-খাঁ করা শূন্য রাজপুরীর মধ্যিখানে যে মণি-মাণিক্য খচিত কুঠারি, তার সোনার পালঙ্কের মখমলের শয্যায় অপরূপ লাবন্যবতী এক রাজকন্যা, দুধে আলতার মতো যার গায়ের রং, ফুলের মতো পেলব যার দেহ, রাক্ষসীর জাদুমন্ত্র-প্রভাবে অঘোর ঘুমে ঘুমিয়ে থাকে। সাত-সমুদ্দুর তেরো নদীর পার থেকে পঙ্খিরাজ ঘোড়ায় চেপে আসা রাজকুমার সোনার কাঠি রূপার কাঠির ঠাঁই বদল করে রাজকন্যার কাল ঘুম ভাঙায়। রাজপুরীর সংলগ্ন দিঘির সাত হাত জলের তলায় লুকিয়ে রাখা কৌটোর ভেতর আছে রাক্ষসীর প্রাণ এক ভোমরার প্রাণ সংহার। বাস্তব জীবন এ সব কাহিনী থেকে শিশু যে রস সংগ্রহ করে, আমরা বয়স্ক পাঠকেরা শত চেষ্টা করলেও তার শতাংশ একাংশ তার থেকে পাবার আশা করতে পারি না। বয়স্ক পাঠকের চিন্তা পরিণত, বিচার-বিবেচনা সুগঠিত। কল্পনার দৌড়ে শিশুর কাছে তার পুরমাত্রায় হার। আনন্দ যদি সাহিত্য পাঠের সবচেয়ে বড় অন্বিষ্ট হয় তা হলে শিশুর আনন্দের কাছে বয়স্কের আনন্দ পরাজিত হতে বাধ্য।
কল্পনাপ্রধান শিশু সাহিত্যঃ ছোটবেলায় বাংলা শিশু সাহিত্যের জাদুকর দক্ষিণারঞ্জন মিত্রমজুমদারের ‘ঠাকুরমার ঝুলি’ ‘ঠাকুরদার ঝুলি’ সকলেই আমরা পড়েছি, পড়েছি সত্যচরণ চক্রবর্তীর, ‘ঠাকুরমার ঝোলা’, ‘ঠাকুরদার ঝোলা’, ‘দাদামশায়ের থলে’, রূপকথার গল্পের বই। সেই সঙ্গে উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী ‘ছেলেদের রামায়ণ’,‘ছেলেদের মহাভারত’,‘টুনটুনির গল্প’,‘কুলদারঞ্জন রায়ের’,‘পুরাণের গল্প’, সুখলতা রাওয়ের গল্পের ‘রামনন্দ’, চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘আরব্য উপন্যাসের গল্প’ ইত্যাদি বিচিত্র ধরনের শিশু সাহিত্য পড়ে কত না আনন্দ পেয়েছি। ভাবতে গেলেই কালের দূর ব্যবধান ভেদ করে হারানো শৈশব যেন চেতনায় উঁকি দিয়ে যায়।
সাহিত্য পাঠের আনন্দ, জ্ঞান ও কল্পনাঃ সাহিত্য সৌন্দর্যের জগৎ আনন্দের জগৎ সেই জগতের পারতে পরতে জাদু, রন্ধে-রন্ধে কল্পনার কুহর। বয়স্ক পাঠকের মুশকিল এই যে, সে যখন সাবালক চোখে পৃথিবীর দিকে তাকায় তার দৃষ্টিতে আর শিশুর মায়া কল্পনার রং মাখানো থাকে না, তার দৃষ্টিতে ফোটে জিজ্ঞাসা, কৌতূহল, এক কথায় স্থূল জানবার স্পৃহা। জানবার স্পৃহা অর্থাৎ জ্ঞানের ক্ষুধা। এখন জ্ঞানের ক্ষুধার সঙ্গে কল্পনার বৃত্তির প্রায় অহি-নকুল সম্পর্ক। অর্থাৎ মানুষের জ্ঞানের তৃষ্ণা যত বৃদ্ধি পায় তত তার কাল্পনিকতা মন্দীভূত হয়ে আসে। শিশুর অফুরন্ত কৌতূহল, কিন্তু সে কৌতূহলের সুস্পষ্ট কোন আকার নেই, তা আকাশের নীহারিকারপুঞ্জের মতো নিরবয়ব, ইতস্তত সঞ্চরমাণ, দূরবিস্তৃত কিন্তু তার অনুভবের ক্ষমতা আর মনের চোখে রঙিন ছবি দেখবার শক্তি বিশাল। জ্ঞানের অভাব সে কল্পনায় পূরণ করে নেয়। এই কল্পনাবৃত্তিই হল সাহিত্যরসের অফুরান উৎস। বই পড়ে আনন্দ পাওয়ার যদি কিছু অপরিহার্য প্রাথমিক শর্ত থাকে তো তা এই কল্পনার শক্তি।
সাহিত্যপাঠের আনন্দ ও সংসারী মানুষঃ বয়স্ক পাঠকের অসুবিধা এই যে, জ্ঞানটাই সাহিত্য উপভোগের পথের একমাত্র প্রতিবন্ধক নয়; আরো নানা কারণে তাঁর উপভোগের প্রক্রিয়ায় খাদ এসে মেশে। বয়স্ক পাঠক যখন সংসার ক্ষেত্রে প্রবেশ করে, কর্মজীবনের নানা দায়-দায়িত্ব বহন করতে হয় বলে তাঁর জীবনে এক প্রকার কঠিন বাস্তব চৈতন্যের সঞ্চার হয়। এই বাস্তব চেতনা মানুষের স্বপ্ন দেখার অভ্যাসের মূল কুরে-কুরে খায়, তার কল্পনাবৃত্তিকে ধীরে ধীরে অসাড় করে আনে।
কর্মবন্ধনকে অস্বীকার করা নয়, কর্মবন্ধনকে স্বীকার করে নেওয়া মধ্যে মনুষ্যত্বের স্ফুর্তি। সংসারে যার উপর যে কর্তব্য আরোপিত, নির্দিষ্ট, সেইভাবে পালনের মধ্যে অদ্ভূত একটা আনন্দ আছে। কিন্তু দেখতে হবে কর্তব্য পালন করতে গিয়ে জীবন থেকে স্বপ্ন না মরে যায়। দেখা যায়, তাঁরাই সাহিত্যের সবচেয়ে রসিক পাঠক হন যারা পরিণত বয়সেও বালককালীন মনের সজীবতা বজায় রাখেন।
সাহিত্য পাঠের আনন্দ ও শিশুমনঃ পৃথিবীর সাহিত্যে যারাই প্রতিভাধর স্রষ্টার মর্যাদা পেয়েছেন, লোকসমাজে বিখ্যাত হয়েছেন প্রথম শ্রেণির শিল্পী বলে দেখা যায় তাদের প্রায় সকলেরই হাতে সাহিত্য আনন্দের লীলায় পরিণত হয়েছে। সৃষ্টির নেশায় বুদ হয়ে থেকে তাঁরা সাহিত্য সরোবরে নিত্য নতুন সৌন্দর্যের কমল ফুটিয়েছেন। এই আনন্দ বা এই নেশা কখনোই তাদের আদিগত হতে পারত না যদি তাঁরা বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মনের দিক দিয়েও বুড়িয়ে যেতেন। শৈশবের বিশুদ্ধ আনন্দ চেতনা কল্পনা বৃত্তিকে তাঁরা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ধরে রাখেন।
রবীন্দ্রনাথের জীবনে, অবনীন্দ্রনাথের জীবনে, আমাদের সাহিত্যর আরো কোন কোন স্রষ্টার জীবন দ্বিতীয় শৈশবের লীলা আমরা প্রত্যক্ষ করছি। রবীন্দ্রনাথ জীবনের মধ্যবয়সে একবার আত্মকথা লিখেছিলেন ‘ছেলেবেলা’। বইটি শিশু-কিশোরদের বিশেষ উপযোগী হলেও ঠিক যে শিশু-কিশোরদের উদ্দেশ্যে তিনি তা লিখেছিলেন তা নয়। আসলে ছেলেবেলা শিশুর খাদ্যহীন বিশুদ্ধ অনুভবের দৃষ্টিতে লেখা, তাই তার পাঠ এত হৃদয়গ্রাহী, এত প্রত্যক্ষ তার আবেদন। রবীন্দ্রনাথের ‘সে’, ‘খাপছাড়া’, ‘ছড়া ও ছবি’ প্রভৃতি গ্রন্থ কিংবা তাঁর ছবি আঁকা-বিচিত্র রঙের সমাবেশে নির্জন মনের গহীনে লুকিয়ে থাকা জন্তু-জানোয়ারের জগৎটাকে আলোর সামনে মেলে ধরার প্রয়াস।
অবনীন্দ্রনাথের শেষ বয়সের ‘কুটুম-কাটুম’ শিশুর নিশ্চেতন সৃষ্টির লীলার শ্রেষ্টতম প্রকাশ। কুটুম-কাটুম রেখা বা লেখা এ দুয়ের কোনটাই নয়, ওটা আসলে হস্তশিল্পের কারিগরি-নানা রকম টুকিটাকি, যথাঃ গাছের ডাল বা কাঠের টুকরো বা নারকেলের ছোবড়া ইত্যাদি সাহায্যে খেয়াল খুশিমাফিক নানারকম নকশা তৈরির শিল্প। কিন্তু তা যে ছাঁদের শিল্পই হোক তার ভেতর প্রকাশ পেয়েছে শিশু কল্পনার শ্রেষ্ঠ অভিব্যক্তি, শৈশব স্বপ্নের মায়া-ঝুমঝুমির বোল তার মধ্যে দিয়ে ছন্দিত ও নন্দিত হয়ে উঠেছে।
টলস্টয়ের বৃদ্ধ বয়সের লেখা টুয়েন্টি থ্রি টেলস- এর গল্পগুলির মধ্যে শিল্পের যে সহজ রূপের পরিচয় পাই, তার মধ্যে নেই নাগরিক শিল্পীর জটিলতা। সমগ্র জীবনের সাধনায় অর্জিত সচেতন শিল্পনৈপুণ্য, ভাষা সংস্কার বিষয়কৌলীন্য ইত্যাদি জীর্ণ বস্ত্রখণ্ডের মতো পথের ধুলায় হেলায় নিক্ষেপ করে টলস্টয় এখানে শৈশবে আদিম সারল্যে ফিরে গেছেন। খেটে খাওয়া রুশ চাষী কিংবা মুচি কিংবা খুদে বণিক ইত্যাদির ছবি ফুটিয়ে তুলেছেন টলস্টয় গল্পগুলিতে। গল্পগুলির রূপকথায় প্রকাশ পেয়েছে শিশুসুলভ সারল্য। কেননা, সারল্যের মধ্যেই শক্তির বিকাশ। টলস্টয় জেনে-বুঝে, তাঁর সিদ্ধান্তের সম্ভাব্য সকল পরিণামফল বিচার করেই, নগর জীবনের দরকারি শিল্পরীতি ত্যাগ করে জীবনের পরিণত পর্যায়ে এসে এই শিল্পকে গ্রহণ করেছিলেন।
উপসংহার: প্রকৃত সাহিত্য ভোক্তা হতে গেলে খানিকটা শৈশব সংস্কার মনের মধ্যে ধরে রাখা দরকার। শৈশবের কাল্পনিকতা, স্বাপ্নিকতা, সহজ অনুভবের ক্ষমতা এ সব লক্ষণ উত্তর জীবনের যত বেশি আমরা জিইয়ে রাখতে পারব তত বেশি আমরা সাহিত্যের গহীনে প্রবেশ করতে পারব। কাব্য উপভোগের দেউড়িতে যে কড়া পাহারাদার মোতায়েন আছে সে হিসেবি লোকে তো নয়ই, এমনকি শুষ্ক জ্ঞানের কারবারি ব্যক্তিকেও প্রবেশের ছাড়পত্র দেয় না । স্বপ্ন অভ্যাস যার নেই, তার পক্ষে কাব্য সাহিত্যের দুয়ার রুদ্ধ। পরিণত বয়সী পাঠকের পরিণত মন বুদ্ধি নিয়েই চলতে হবে।
+88 01713 211 910