
NTRCA School: ১৮তম বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা: স্কুল পর্যায় বাংলা বিষয়ের লিখিত পরীক্ষার অতিগুরুত্বপূর্ণ সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন : কবিতা
অতিগুরুত্বপূর্ণ সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন : কবিতা
প্রশ্ন নং-১ ‘এ কথা লইয়া ভাবিসাব মোরে তামাশা করিত শত’-কী কথা নিয়ে কেন ভাবিসাব তামাশা করত?
উত্তর : প্রশ্নে উদ্ধৃত অংশটুকু বাংলার শাশ্বত পল্লী জীবনের রূপকার পল্লী কবি জসীম উদ্দীন ( ১৯০৩-১৯৭৬) রচিত ‘কবর’ কবিতা থেকে গৃহীত হয়েছে। এটি বৃদ্ধ দাদুর উক্তি। একমাত্র নাতীকে উদ্দেশ্য করে তিনি এই উক্তি করেন। স্ত্রীর প্রতি ভালবাসার গভীরতার পরিচয় দিতে গিয়ে তিনি এই উক্তির অবতারণা করেন।
দাদুর উত্তাল যৌবনে বউ সেজে এসে ছিলেন তাঁর স্ত্রী। তখন তিনি ছিলেন অল্প বয়সী কিশোরী। বয়স অল্প হলেও তাঁর রূপ, গায়ের রং, সরলতা, কোমলতা আর চপলতা দাদুকে করে ছিল ভীষণভাবে বিমোহিত। সুন্দরী প্রাণবন্ত মনোহরী এই কিশোরী বধুকে সব সময়ই দাদুর দেখতে ইচ্ছে করতো। ক্ষণিকের জন্যও দাদু নব পরিণীতা সুন্দরী স্ত্রীকে চোখের আড়াল করতে চাইতেন না। তাই লাঙল নিয়ে মাঠে যাবার সময় ফিরে ফিরে দাদু স্ত্রীকে দেখতেন। উপভোগ করতে চাইতেন সুন্দরী স্ত্রীর রূপ মাধুর্য। সবার অলক্ষেই তিনি প্রেমের এই মধুর কাজটি করতে চাইতেন। কিন্তু সবার দৃষ্টি এড়াতে পারলেও দাদু তাঁর ভাবির দৃষ্টি এড়াতে পারতেন না। আর এটা নিয়েই দাদুর ভারিব করতেন তামাশা। দাদুর জীবনের এই রূপটিকে কবি বর্ণনা করেছেন এভাবে-
‘সোনালি ঊষার সোনামুখ তার আমার নয়নে ভরি
লাঙল লইয়া খেতে ছুটিতাম গাঁয়ের ও পথ ধরি।
যাইবার কালে ফিরে ফিরে তারে দেখে লইতাম কত
এ কথা লইয়া ভাবি-সাব মোরে তামাশা করিত শত।’
বস্তুত আলোচ্য উচ্চারণের মধ্য দিয়ে দাদির প্রতি দাদুর ভালবাসার স্বরূপটি অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।
প্রশ্ন নং-২: ‘জোড়া মানিকেরা ঘুমায়ে রয়েছে এইখানে তরু ছায়’ - এই জোড়া মানিক কে কে ? এদের জীবনের করুণ পরিণতির ঘটনা বর্ণনা কর।
উত্তর : প্রশ্নে উদ্ধৃত অংশটুকু বাংলার শাশ্বত পল্লী জীবনের রূপকার পল্লী কবি জসীম উদ্দীন ( ১৯০৩-১৯৭৬) রচিত ‘কবর শীর্ষক কবিতা থেকে গৃহীত হয়েছে। এটি বৃদ্ধ দাদুর উক্তি। একমাত্র নাতীকে উদ্দেশ্য করে তিনি এই উক্তি করেন। বৃদ্ধ তাঁর নাতির পিতামাতার কবর পরিচয় করিয়ে দিতে গিয়ে আলোচ্য উক্তি করেন।
‘জোরামানিক’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো 'রত্নযুগল' । এখানে পাশাপাশি কবরে শায়িত বৃদ্ধের পুত্র ও পুত্র বধুকে জোড়ামানিক বোঝানো হয়েছে। জোড়ামানিক শব্দ ব্যবহরের মধ দিয়ে চখা-চখির নিবিড় প্রণয়ের অনুষঙ্গটি স্মরণ করা হয়েছে। চখা চখি সাধারণত একে অপরের বিচ্ছেদ সহ্য করতে পারে না। বৃদ্ধের পুত্রের মৃত্যুর পর তার পুত্রবধূ স্বামীর বিরহ সহ্য করতে না পেরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লে কবি আলোচ্য শব্দমালার ব্যবহার করেন।
কবর কবিতার বৃদ্ধ দাদুর একটিই মাত্র পুত্র ছিল। সে ছিল প্রাণবন্ত এক তুরুণ যুবক। পিতার সঙ্গেই সে কৃষি কাজ করত। কোন এক ফাগুন মাসে মাঠ থেকে ফিরে এসে সে তার পিতাকে শরীরের অসুস্থতার কথা জানায় । সে বলে- ‘বা-জান, আমার শরীর আজিকে কী যে করে থাকি থাকি।' একথা শুনে তাকে ঘরের মেঝেতে বিছানা পেতে শুয়ে থাকতে বলেন। কিন্তু এই শোয়াই যে তার শেষ শোয়া হবে তা কে জানতো। অবশেষে কাফনের কাপড় জড়িয়ে বৃদ্ধ তাকে চির নিদ্রায় ঘুম পাড়িয়ে আসেন। কিন্তু স্বামীর এই বিয়োগ ব্যথায় বৃদ্ধের পুত্রবধূও শোকে ভেঙ্গে পড়ে। দিন রাত্রি তার চোখে অবিরাম ঝড়ে শ্রাবণের অশ্রুধারা। তার এই আহজারি আর হাহাকারে প্রকৃতিও যেন কাতর হয়ে পড়ে। কবিতার ভাষায়-
“গাছের পাতারা সেই বেদনায় বুনো পথে যেত ঝরে,
ফলগুনী হওয়া কাঁদিয়া উঠিত শুনো-মাঠখানি ভরে।
শুধু তাই নয় পথের পথিকেরাও তার কান্নায় ব্যথিত হয়ে উঠতো। অবশেষে সেও স্বামীর পথ অনুসরণ করে চিরনিদ্রায় স্বামীর পাশে আশ্রয় নেয়। বৃদ্ধের একমাত্র পুত্র ও পুত্রবধূর জীবনের করুণ পরিণতি এই ভাবেই ঘটে।
প্রশ্ন নং ৩ : ওই দূর বনে সন্ধ্যা নামিছে ঘন আবিরের রাগে
অমনি করিয়া লুটায়ে পড়িতে বড় সাধ আজ জাগে ।’- উক্তিটির তাৎপর্য বিশ্লেষণ কর।
উত্তর : প্রশ্নে উদ্ধৃত অংশটুকু বাংলার চিরায়ত পল্লী জীবনের রূপকার কবি জসীম উদ্দীন (১৯০৩-১৯৭৬) রচিত ‘রাখালী' কাব্যের অন্তর্গত ‘কবর’ শীর্ষক কবিতা থেকে নেয়া হয়েছে। এটি নিরন্তর বেদনার ধারক বৃদ্ধ দাদুর উক্তি।
আলোচ্য উচ্চারণের মধ্য দিয়ে আপন জন হারা বৃদ্ধ দাদু জীবনের অন্তিম আকাঙ্ক্ষার স্বরূপ উন্মোচন করেছেন।
‘কবর’ কবিতা সর্বহারা এক বৃদ্ধের হৃদয় নিংড়ানো ব্যথার মহাকাব্য। বৃদ্ধ আজ রিক্ত, নিঃস্ব। অথচ একদিন তাঁর স্ত্রী, পুত্র, কন্যা - সবাই ছিলো। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাসে একে একে সবাই তাকে ছেড়ে চলে গেছে। বৃদ্ধ পারিবারিক কবরস্থানে দাড়িয়ে একমাত্র অবলম্বন নাতীর কাছে যাপিত জীবনের স্মৃতিচারণ করছেন এবং আপন জন চলে যাওয়ার ইতিবৃত্ত বর্ণনা করছেন। বৃদ্ধ তাঁর জীবনের সবচেয়ে বর্ণিল সময়টা অতিবাহিত করেছেন স্ত্রীর সাথে। কিন্তু ভাগ্যের নিদারুণ অভিসম্পাতে বৃদ্ধের জীবনচারিণী বিদায় নেয় এই জগত সংসার থেকে। বেদনার আঘাতে নিভে যায় বৃদ্ধের জীবনের সোনালি ঊষার সোনালি আলো। এর পর বিদায় নেয় তাঁর একমাত্র পুত্র। শোক সাগরে নিমজ্জিত হন বৃদ্ধ। এই শোক কাটতে না কাটতেই বিদায় নেয় পুত্রবধু। বৃদ্ধ দাদুকে এই নির্মম যাতনাও সহ্য করতে হয়। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। কেননা, ‘অভাগা যে দিকে চায়, সাগার শুকায়।' কিছু দিনের মধ্যেই চিরতরে বিদায় নেয় প্রাণপ্রিয় নাতনী এবং ফুলকোমল মেয়ে। সকল আপন জনের শবই তিনি নিজ হাতে সমাধিতে শায়িত করেন। প্রতিটি মৃত্যুই তাঁর অন্তরের অন্তরতম প্রদেশটিকে বেদনার রাগিনীতে আচ্ছাদিত করে রাখেছে। এ কারণেই জীবনের প্রতি তার আর কোনই আকর্ষণ নেই। বিদায়ী সুর্যের মতো তিনিও পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে চান। তাই আজানের সকরুণ সুরের মধ্য দিয়ে নিজ জীবনের কিয়ামতের কথা ভাবছেন। আর এ কারণেইর বৃদ্ধের হৃদয় নিংড়ানো উচ্চারণ-
ওই দুর বনে সন্ধ্যা নামিছে ঘন আবিরের রাগে
অমনি করিয়া লুটায়ে পড়িতে বড় সাধ আজ জাগে।
বস্তুত আলোচ্য উক্তির মধ্য দিয়ে কবি জীবন যন্ত্রণায় কাতর বৃদ্ধের জীবনের অন্তিম আকাঙ্ক্ষাকে অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন।
প্রশ্ন নং -৪ : ‘যে আছে মাটির কাছাকাছি ,
সে কবির বাণী লাগি কান পেতে আছি ।’-উক্তিটির তাৎপর্য বিশ্লেষণ করুন।
অথবা, সাহিত্যের আনন্দ ভোজে ,
নিজে যা পারি না দিতে , নিত্য আমি থাকি তারি খোঁজে।’-উক্তিটির তাৎপর্য বিশ্লেষণ করুন।
অথবা, আমার কবিতা জানি আমি
গেলেও বিচিত্র পথে হয় নাই সর্বত্রগামী।’-উক্তিটির তাৎপর্য বিশ্লেষণ করুন।
উত্তর : প্রশ্নে উদ্ধৃত অংশটুকু বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ‘ঐকতান’ শীর্ষক কবিতা থেকে নেয়া হয়েছে।
স্বীয় সাহিত্য সাধনার সীমাবদ্ধতার স্বরূপ তুলে ধরতে গিয়ে এবং কবি আলোচ্য উক্তির অবতারণা করেছেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা সাহিত্যে একমাত্র নোবেল বিজয়ী কবি। সারাটা জীবন তিনি অক্লান্ত সাধনায় সাহিত্য চর্চা করেছেন। সাহিত্যের এমন কোন ক্ষেত্র নেই যেখানে তিনি কৃতিত্বের সাথে বিচরণ করেন নি। তারপরও তিনি নিজের সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করতে পেরেছেন। এই উপলব্ধির কথাই তিনি ‘ঐকতান’ কবিতায় প্রকাশ করেছেন। জীবন সায়াহ্নে এসে কবি অনুভব করেছেন যে, চাষী, তাঁতী, জেলে প্রভৃতি শ্রমজীবী মানুষ তাঁর কবিতায় স্থান পায় নি। সমাজের উচ্চাসনে বসে তিনি কবিতা রচনা করেছেন। মাঝে মাঝে সাধারণ শ্রেণীর মানুষদের পাড়ায় গেলেও তার কাব্য জগতে খুব একটা দেখা যায় না। তাই তাঁর কবিতা বিচিত্র পথে বিচরণ করলেও সর্বগামী হতে পারে নি। মাটি ও মানুষের কথা তার কাব্য জগতে খুব একটা দেখা যায় না। তাই কবি নিজেই আক্ষেপ করে সে কথা বলেছেন। নবীন কবিদের প্রতি আহবান জানিয়েছেন চাষী, তাঁতী ও কামারের কথা কাব্যে স্থান দিতে। তাঁদের বাণী শুনার জন্য কবি কান পেতে আছেন। কারণ, সাহিত্যের আনন্দের ভোজে নিজে যা দিতে পারেন নি, কবি তা কান পেতে শোনার জন্য কান পেতে অপেক্ষা করে আছেন ।
বস্তুত, নিজের সাহিত্য সাধনার সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি মাটি ও মানুষের কবির আগমনের স্বপ্ন আলোচ্য অংশে সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।
প্রশ্ন নং ৫. ‘সাহিত্যের ঐকতান সঙ্গীত সভা’- বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?
উত্তর: বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ‘ঐকতান’ কবিতায় ‘সাহিত্যের ঐকতান সঙ্গীত সভা-বলতে কবি মানবকল্যাণে সাহিত্যের সম্বিলিত উদ্যোগকে বুঝিয়েছেন।
মানুষই সাহিত্যের মূল উপজীব্য। সাহিত্য মানবমনকে গভীরভাবে আন্দোলিত করে। তার মনকে অমলিন আনন্দে ভরিয়ে দেয়। সাহিত্যের জগত আনন্দের জগৎ। মানুষ স্বেচ্ছায় সেই জগতে বিচরণ করে এবং সাহিত্যের কল্যাণ-স্রোতে নিজকে সিক্ত করে। আনন্দ দানের পাশাপাশি সমাজের দর্পন হিসেবে কাজ করে সাহিত্য। ‘ঐকতান’ কবিতায় সাহিত্যের সেই সুরের কথা বলা হয়েছে, যেখানে মানুষে মানুষে প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে সমাজের কল্যাণ নিশ্চিত করে। মানবমুখি এই সাহিত্য শ্রেণিভেদ, ধর্মভেদ, বর্ণভেদ নির্মূল করে মানুষকে মানবীয় মর্যাদার উচ্চাশনে প্রতিষ্ঠিত করে।
প্রশ্ন নং ৬. ‘যেথা পাই চিত্রময়ী বর্ণনার বাণী, কুড়াইয়া আনি’- বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?
উত্তর: বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ‘ঐকতান’ কবিতায় ‘যেথা পাই চিত্রময়ী বর্ণনার বাণী, কুড়াইয়া আনি’ বলতে কবি তার জ্ঞান আহরণের নানা উপায়কে বুঝিয়েছেন।
কবি পৃথিবীর খুবই ছোট এক অংশের অধিবাসী। এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের বিশাল আয়োজনের মধ্যে তাঁর অবস্থান খুবই নগণ্য। জ্ঞানের প্রশ্নেও তিনি অতি সামান্য জ্ঞানের অধিকারী। এই ক্ষুদ্র জ্ঞান দিয়েই কবি বিশ্বকে জানতে চান। তাছাড়া বিভিন্ন গ্রন্থাদি পড়ে তিনি পৃথিবীর বিচিত্র বিষয়ে জ্ঞানলাভের চেষ্টায় নিমগ্ন। তাই যখন তিনি যেখানে যে বস্তুই পান, তাই কুড়িয়ে এনে আপনার জ্ঞানের পরিধি বাড়াতে চান।
প্রশ্ন নং- ৭: ‘শুধু ভঙ্গী দিয়ে যেন না ভোলায় চোখ’- এ কথার অর্থ কী?
উত্তর: বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ‘ঐকতান’ কবিতায় ‘শুধু ভঙ্গী দিয়ে যেন না ভোলায় চোখ’-বলতে কবি বাইরের আয়োজন এবং মেকিকে অবস্থাকে বোঝাতে চয়েছেন।
‘ঐকতান’ কবিতায় কবি এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের আয়োজনের সাথে নিজের ক্ষুদ্র আয়োজনকে এক করে দেখাতে চেয়েছেন। নানা সুরের ও সুন্দরের ঐক্য সাধন করতে চেয়েছেন। কবির এই সাধনার মধ্যে কল্যাণ চিন্তা নিহিত। কবি তার ব্যর্থতার কথা তুলে ধরে, জ্ঞানের দীনতার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি নিজের অজ্ঞতা দূর করতে সেখানে যে অমূল্য ধন পেয়েছেন তাই সংগ্রহ করেছেন। তিনি অন্য সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেছেন তারা যেন শুধু ভঙ্গীদিয়ে অন্যের চোখ না ভোলান।
প্রশ্ন নং ৮: ‘প্রকৃতির ঐকতান ¯স্রোতে’ বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?
উত্তর: বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ‘ঐকতান’ কবিতায় ‘প্রকৃতির ঐকতান স্রোত’ বলতে কবি বিশ্বব্যাপী প্রকৃতির বিচিত্র আনন্দের মাঝে কবিদের ঐক্যকে বোঝাতে চেয়েছেন।
‘ঐকতান’ কবিতায় কবির বহুমাত্রিক চিন্ত-চেতনার প্রকাশ ঘটেছে। এখানে কবির মনে স্বদেশের অন্ত্যজ শ্রেণীর মানুষের সাথে একাত্ম না হতে পারার অতৃপ্তি প্রকাশ পেয়েছে। এদেশের গ্রামগঞ্জে যারা একতারা বাজিয়ে গান গায়, গানের কথায় ভক্তির সুর ছড়িয়ে দেয়, তারাও যেন সাহিত্যের ঐকতান সংগীত সভায় স্থান পায়। তারাও যেন সম্মনিত হয়-এটাই কবির প্রত্যাশা। শুধু শহুরে সাহিত্যের উজ্জ্বলতা নয়, ঐকতান সংগীত সভায় মানুষের প্রাণের উৎসারণও প্রয়োজন। এই সত্যটিকেই কবি আলোচ্য উক্তির মধ্য দিয়ে তুলে ধরার প্রয়াস পেয়েছেন।
প্রশ্ন নং ৯: ‘জ্ঞানের দীনতা এ আপনার মনে’ বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?
উত্তর: বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ‘ঐকতান’ কবিতায় ‘জ্ঞানের দীনতা এই আপনার মনে-বলতে কবি বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের বিচিত্র আয়োজনের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা কে বুঝিয়েছেন।
‘ঐকতান’ কবিতায় কবি অকপট চিত্তে নিজের জ্ঞানের দীনতা প্রকাশ করেছেন। দুর্বোধ্য এ বিশ্বের কত বৃক্ষলতা, গিরি-সিন্ধু-মরু, কত প্রজন্ম-তাঁর একার পক্ষে সেগুলো জানা সম্ভব নয়। তাই তিনি নিজের অপূর্ণতা স্বীকার করে এবং জ্ঞানের দীনতা প্রকাশ করে নিজের মহত্ব দেখিয়েছেন।
প্রশ্ন নং ১০ : ‘আমার সুরের এ অপূর্ণতা’ বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?
উত্তর: বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ‘ঐকতান’ কবিতায় কবি ‘আমার সুরের অপূর্ণতা’ বলতে নিজের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতাকে বুঝিয়েছেন। আর এই সীমাবদ্ধতার কারণেই পৃথিবীর সমস্ত সুরের সাথে নিজের সুরের বীণা বাজাতে অক্ষম হয়েছেন।
বিপুলা এই পৃথিবীর বিপুল আয়োজনের মধ্যে নিজের সীমাবদ্ধ জ্ঞান দিয়ে যেটুকু আয়ত্ত করেছেন তা তুলনামূলকভাবে খুবই নগণ্য। কেননা, পৃথিবীতে যেখানে যত ধ্বনি ধ্বনিত হয়েছে তার সবটুকু কবির বাঁশিতে ধরা পড়েনি বা ধ্বনিত হয়নি। প্রকৃতির মধ্যে কবি যে সুরের ঐকতান উপলব্ধি করেছেন, তাতে তাঁর সুর সামান্যই ধরা পড়েছে। কারণ ঐ সুর নিয়ে নানা কবি নানাভাবে পূর্ণতা দান করেছেন। সেই ক্ষেত্রে কবির অপূর্ণতা রয়ে গেছে। আর এ কারণেই কবি আলোচ্য উক্তি করেছেন।
প্রশ্ন নং ১১: ‘জীবনে জীবনে যোগ করা’ বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?
উত্তরঃ বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ‘ঐকতান’ কবিতায় কবি ‘জীবনে জীবন যোগ করা’- বলতে জগতের বিচিত্র কর্মে নিয়োজিত বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে একাত্মতার কথা বুঝিয়েছেন।
কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর নিজের আভিজাত্যবোধ ও জীবনযাত্রার গণ্ডি কখনও অতিক্রম করতে পারেন নি। এই জন্য তিনি সব শ্রেণির মানুষের সাথে মিলতে পারেননি। সব মানুষের হৃদয়ের সাথে নিজের হৃদয়কে মেলাতে পারেননি। অন্যদিকে তাঁর কুলীন জীবনাচরণ ও নিয়ন্ত্রিত জীবন যাপনের কারণে নিচু শ্রেণির মানুষ তাঁকে শ্রদ্ধা ও ভয়ের চোখে দেখেছে, কখন তাঁর কাছে আসেনি। আর এ জন্য কবি তাদের সাথে মিলতে পারেন নি। প্রান্তিক মানুষের সাথে মিলিত হতে পারাকেই কবি বলেছেন ‘জীবনে জীবনে যোগ করা’।
প্রশ্ন নং ১২: ‘পাইনে সর্বত্র তার প্রবেশের দ্বার’ বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?
উত্তর: বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ‘ঐকতান’ কবিতায় কবি ‘পাইনে সর্বত্র তার প্রবেশের দ্বার’- বলতে কবি সমাজের প্রান্তিক মানুষসহ সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের জীবন প্রবেশ না করতে পারাকে বুঝিয়েছেন।
কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর নিজের আভিজাত্যবোধ ও জীবনযাত্রার গণ্ডি কখনও অতিক্রম করতে পারেন নি। এই জন্য তিনি সব শ্রেণির মানুষের সাথে মিলতে পারেননি। সব মানুষের হৃদয়ের সাথে নিজের হৃদয়কে মেলাতে পারেননি। অন্যদিকে তাঁর কুলীন জীবনাচরণ ও নিয়ন্ত্রিত জীবন যাপনের কারণে নিচু শ্রেণির মানুষ তাঁকে শ্রদ্ধা ও ভয়ের চোখে দেখেছে, কখন তাঁর কাছে আসেনি। আর কবিও নিজের জীবনের সীমারেখা অতিক্রম করে তাদের জীবনে ও হৃদয়ে প্রবেশ করতে পারেন নি। এই না পারার ব্যর্থতাকেই কবি আলোচ্য উক্তির মধ্য দিয়ে তুলে ধরেছেন।
প্রশ্ন নং ১৩: ‘দেশে দেশে কত না নগর রাজধানী’- কবি কেন এ কথা বলেছেন?
উত্তর: বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ‘ঐকতান’ কবিতায় কবি ‘দেশে দেশে কত না নগর রাজধানী’ কথাটি দিয়ে এই সুন্দর পৃথিবীর বিশালত্বকে তুলে ধরেছেন।
এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের তুলনায় পৃথিবীর অবস্থান অত্যন্ত তুচ্ছ। আবার পৃথিবীর তুলনায় একজন মানুষের জীবন একেবারেই নগণ্য। পৃথিবীতে অসংখ্য ছোট-বড় নগর ও রাজধানী আছে যেগুলো সম্পর্কে মানুষ খুবই কম জানে। বিশাল এ পৃথিবীর এক কোনে বাস করে এতসব বিষয় অনুমান করা যায় মাত্র, এর সবকিছু দেখা সম্ভব নয়। অর্থাৎ এই পৃথিবী এক বিশাল স্থান। পৃথিবীর এই বিশালত্ব তুলে ধরতে গিয়েই কবি আলোচ্য উক্তির অবতারণা করেছেন।
প্রশ্ন নং ১৪: ‘নিত্য আমি থাকি তার খোঁজে’- উক্তিটির তাৎপর্য লেখ।
উত্তরঃ বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ‘ঐকতান’ কবিতায় ‘নিত্য আমি থাকি তার খোঁজে’ চরণাংশের মাধ্যমে কবির স্বীয় অসমাপ্ত দায়িত্ব সমাপ্ত করতে কোন এক কবির আগমনের আকক্সক্ষা ব্যক্ত করেছেন।
কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জন-জীবনমূল সংলগ্ন একজন কবির আগমন আশায় পথ চেয়ে বসে আছেন। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই কাক্সিক্ষত কবি দেশ, মাটি ও সাধারণ মানুষের টানে ছুটে আসবেন। কবির প্রত্যাশিত কবি এসে তাঁর অসমাপ্ত দায়িত্ব সমাপ্ত করবেন। কবির এই স্বপ্নে কথা তুলে ধরতে গিয়েই কবি আলোচ্য উক্তি করেছেন।
প্রশ্ন নং ১৫: ‘ভিতরে প্রবেশ করি সে শক্তি ছিলনা একেবারে’- উক্তিটির তাৎপর্য লেখ।
উত্তর: বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ‘ঐকতান’ কবিতায় ‘ভিতরে প্রবেশ করি সে শক্তি ছিল না একেবারে’ উক্তিটির মাধ্যমে প্রান্তিক ও সাধারণ মানুষের সাথে মিশতে না পারার ব্যর্থতাকে বুঝিয়েছেন।
কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর নিজের আভিজাত্যবোধ ও জীবনযাত্রার গণ্ডি কখনও অতিক্রম করতে পারেন নি। এই জন্য তিনি সব শ্রেণির মানুষের সাথে মিলতে পারেননি। সব মানুষের হৃদয়ের সাথে নিজের হৃদয়কে মেলাতে পারেননি। অন্যদিকে তাঁর কুলীন জীবনাচরণ ও নিয়ন্ত্রিত জীবন যাপনের কারণে নিচু শ্রেণির মানুষ তাঁকে শ্রদ্ধা ও ভয়ের চোখে দেখেছে, কখন তাঁর কাছে আসেনি। আর এ জন্য কবি তাদের সাথে মিশতে পারেন নি। সাধারণ মানুষের সাথে মিশতে না পারার কথাই আলোচ্য উচ্চারণের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন।
প্রশ্ন নং-১৬ : ‘দিন দিন আয়ুহীন , হীন বল দিন দিন , -
তবু এ আশার নেশা ছুটিল না, এ কি দায়।’-উক্তিটির তাৎপর্য বিশ্লেষণ করুন।
অথবা, ‘ফিরি দিবে হারাধন , কে তোরে , অবোধ মন ,
হায় রে ভুলিবি কত আশার কুহক- ছলে ?’ -উক্তিটির তাৎপর্য বিশ্লেষণ করুন।
উত্তর: ব্যাখ্যার জন্য নির্বাচিত অংশটুকু আধুনিক বাংলা কাব্যের জনক মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত বিরচিত ‘আত্ম- বিলাপ’ শীর্ষক কবিতা থেকে নেয়া হয়েছে।
সীমাহীন উচ্চাকাক্সক্ষা কবির জীবনে যে যন্ত্রণার সৃষ্টি করে তাই ব্যাক্ত করতে গিয়ে কবি আলোচ্য উক্তি করেন।
আশা নিয়েই মানুষ বেঁচে থাকে, আশাতেই মানুষ বসবাস করে। আশাই মানুষের জীবনে গতি দান করে। আশাই মানুষের জীবনকে পরিচালনা করে। তাই আশা ছাড়া জীবন কল্পনা করা যায় না। আশার কুহকে পড়ে মানুষ আহার, নিদ্রা, শ্রান্তি, ক্লান্তির কথা ভুলে যায়। এভাবে মানুষ একদিন পৃথিবী ছেড়ে বিদায় নেয়। তবুও মানুষের মন থেকে আশা নামক জিনিসটা পালিয়ে যায় না। কবি মধুসূদন দত্তও এর ব্যতিক্রম নন। কবির মনেও অর্থ, যশ, প্রভাব, প্রতিপত্তি আহরণ করার উচ্চাশা ছিল। এ আশা নিয়েই তিনি বিদেশে গিয়েছেন। কিন্তু তাঁর সব আশা ব্যর্থ হয়েছে এবং তাঁর জীবনের অনেকগুলো মূল্যবান বছর হারিয়ে গেছে। কবি দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে কল্পনা করেন তাঁর যে জীবন সময় হারিয়ে গেছে তাকে আর ফিরে পাওয়া যাবে না। তার আয়ু ক্রমশ হীন হয়ে পড়েছে , দুর্বল হয়ে পড়েছে শরীরের শক্তি অথচ আশা নামক নেশাটি ছাড়ছে না। কিন্তু মানুষ ও তার জীবন নিয়তির হাতে বাঁধা। তাই কবির অশ্রু বিসর্জন ও বিলাপ করা ছাড়া আর কিছুই করার নেই। সেই বেদনাই এখন তাকে কুঁরে কুঁরে খাচ্ছে। মাইকেল মধুসূদন দত্ত কবি হিসেবে বিশ্বখ্যাতি, অর্থ, যশ ও সামাজিক প্রতিষ্ঠার মোহে পড়ে স্বদেশ, স্বজাতি ও স্বধর্মকে বিসর্জন দিয়ে বিনিময়ে ব্যর্থতা, না পাওয়ার হাহাকার পেয়েছেন। তাই মেধা ,শ্রম ,স্বাস্থ্য ও সময় হারিয়ে তিনি আত্ম-বিলাপে ভেঙ্গে পড়েন ।
বস্তত, আশা ভঙ্গ হওয়ার পর আশাবাদী কবির মনে যে যন্ত্রণার সৃষ্টি হয়, তা আলোচ্য উক্তর মধ্য দিয়ে সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।
প্রশ্ন নং ১৭ : ‘যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না’।-উক্তিটির তাৎপর্য লেখ।
উত্তর: উদ্ধৃত অংশটুকু বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী কবিতা থেকে নেওয়া হয়েছে। অত্যাচারিত শোষিত, নিপীড়িত আর ক্রন্দনরত মানুষের দুঃখকষ্ট ও আর্তনাদ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত কবি বিদ্রোহ এবং প্রতিবাদ চালিয়ে যাবেন বোঝাতে এই উক্তি করেছেন।
কবি অবিরাম বিদ্রোহ করছেন সকল প্রকার অসাম্য ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে। যেখানেই কবি অত্যাচার, অনাচার আর নিপীড়ন দেখেছেন, সেখানেই বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন। নিপীড়িকের বিরুদ্ধে এবং আর্ত-মানবতার পক্ষে প্রতিবাদে ফুঁসে উঠেছেন তিনি। তাঁর হুংকারে কেঁপে উঠেছে অত্যাচারীর ক্ষমতার মসনদ। অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গেলেও উৎপীড়িত মানুষের পক্ষে বিপ্লব-প্রতিবাদ অব্যাহত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন তিনি। এবং কবি সেদিনই থামবেন যেদিন অত্যাচারী খরগ-কৃপাণ আকাশে বাতাসে ধ্বনিত হবে না।
উল্লিখিত মনোভাবকে তুলে ধরতেই কবি উচ্চারণ করেছেন-‘যাবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না’।
প্রশ্ন নং ১৮ : আমি সাইক্লোন, আমি ধ্বংস,-ব্যাখা কর?
উত্তর: উদ্ধৃত অংশটুকু বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা থেকে নেওয়া হয়েছে। কবি ভারতীয় উপমহাদেশে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ রাজশক্তির অপশাসনসহ সকল অপশক্তির ধ্বংস কামনা করেছেন। আর এ জন্য কবি নিজেই বিধ্বংসী রূপে হাজির হয়েছেন। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণে এদেশের মানুষ তখন হাঁপিয়ে উঠে। সাধারণ মানুষের জীবন প্রায় বিপন্ন। প্রথম মহাযুদ্ধের প্রভাবে এ সমস্যা আরও প্রকট হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিদেশি বেনিয়াদের সাথে দেশীয় অপশক্তির সম্মিলিত অত্যাচার-নির্যাতনে ভূলুণ্ঠিত হতে থাকে মানবতা। এমন দুঃসহ পরিস্থিতিতে সকল অত্যাচার-অনাচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন নজরুল।
কবির বিদ্রোহের স্বরূপ ও শক্তি প্রদর্শন করতেই কবি আলোচ্য উক্তি করেন।
প্রশ্ন নং ১৯ :‘চির-উন্নত মম শির’ বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন? ব্যাখ্যা কর।
উত্তর: ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় কবি কাজী নজরুল ইসলাম নিজের আপসহীন ও দৃঢ়চেতা সংগ্রামকে তুলে ধরতেই আলোচ্য উক্তি করেছেন।
পরাধীন ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী ও তাদের দোসরদের অপশাসন ও নির্মম আচরণে হাঁপিয়ে উঠেছিল এদেশের আপামর মানুষ। আর্ত আর পিড়ীত মানুষের চিৎকারে বাতাস ভারী হয়ে উঠলেও তা দেখার কেউ যেন ছিল না। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কবি এ অসাম্য ও অচলায়তনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। বিদ্রোহীর অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে মানব-মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় ব্রতী হন তিনি। এবং তিনি ঘোষণা করেন যে কোনো অত্যাচারীর অত্যাচারে তার শির আর নত হবে না। তার শির থাকবে চির উন্নত। এই মনোভাবকেক তুলে ধরতেই কবি আলোচ্য উক্তি করেন।
প্রশ্ন নং ২০: ‘মম এক হাঁতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী আর হাতে রণ-তূর্য’-ব্যাখা কর।
উত্তর: উদ্ধৃত অংশটুকু বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা থেকে নেওয়া হয়েছে। কবি কাজী নজরুল ইসলাম একদিকে রোমান্টিক প্রেমিক এবং অন্যদিকে আপোসহীন বিদ্রোহী। কবির এই দ্বৈতসত্তাকে তুলে ধরতেই আালোচ্য উক্তি করেছেন।
কবি কাজী নজরুল ইসলাম একই সাথে প্রেমের কবি, দ্রোহের কবি। মানবপ্রেম ও সাম্যচেতনা তাঁর কবিতার মূল মন্ত্র। আর তাই যেখানেই অসাম্য ও অনাচার লক্ষ করেছেন, ব্যথিত কবি সেখানেই উচ্চারণ করেছেন দ্রোহের বাণী। আলোচ্য ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় কবির দ্রোহ পরাধীনতার শৃঙ্খলের বিরুদ্ধে। তাঁর বিদ্রোহী অসাম্যের বিরুদ্ধে। আর এই সকল প্রকার বিদ্রোহের মুখ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে মানবমুক্তি। নিপীড়িত মানুষের ক্রন্দনর বন্ধ করার প্রয়াসেই তাঁর এই দ্রোহ। কবি সত্তার এই বিদ্রোহী রূপ এবং তার অন্তরালে মানবপ্রেমের বিষয়টি বোঝাতেই আলোচ্য উক্তি করেছেন।
প্রশ্ন নং ২১: কবি নিজেকে ‘মহা-প্রলয়ের নটরাজ’ বরেছেন কেন?
উত্তর: বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের এক অনবদ্য সৃষ্টি ‘বিদ্রোহী’ কবিতা। এই কবিতায় কবি নিজেকে ‘মহা-প্রলয়ের নটরাজ’ হিসেবে উল্লেখ করছেন। কারণ নটরাজ শিবের মতো ধ্বংসলীলা চালিয়ে অপশক্তিকে নাশ করবেন এবং সেখানেই গড়ে তুলবেন নিপীড়ন, নির্যাতন এবং শোষণহীন মানবিক সমাজ।
ভারতীয় পুরাণ মতে, নৃত্যকলার উদ্ভাবক হিসেবে মহাদেব শিবের আর এক নাম নটরাজ। তাঁর ধ্বংসের সময়কার নৃত্যকে তাণ্ডব নৃত্য বলা হয়। গজাসুর ও কলাসুরের নিধন করতে তিনি তাণ্ডব নৃত্য করেছিলেন। কবিও পুরাণের সে ঐতিহ্য স্মরণ করে সমকালীন প্রেক্ষাপটে অত্যাচারী ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠীসহ সকল প্রকার অপশক্তিকে ধ্বংস করতে চেয়েছেন। আর এই আকাঙ্ক্ষা থেকেই কবি নিজেকে ‘মহা-প্রলয়ের নটরাজ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
প্রশ্ন নং ২২: ‘আমি দ’লে যাই যত বন্ধন, যত নিয়ম কানুন শৃঙ্খলা’-কেন?
উত্তর: উদ্ধৃত অংশটুকু বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা থেকে নেওয়া হয়েছে। নিয়মের নিগড়ে ফেলে অত্যাচারী শাসকগোষ্ঠী সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে। তাই নিয়মের এই নিগড় ভাঙতেই কবি আলোচ্য উক্তি করেছেন।
কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষে । জন্মের পর থেকেই কবি ব্রিটিশ বেনিয়া শাসকগোষ্ঠী অন্যায়, অত্যাচার ও অবিচারকে প্রত্যক্ষ করেছেন স্বীয় অভিজ্ঞতা থেকে । এ সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে চাইলেই প্রতিবাদকারী বিরুদ্ধে নেমে এসেছে তথাকথিত আইন-কানুন আর নিয়মের বেড়াজাল। কবি তাই সব ধরনের বন্ধন ছিন্ন করে, আইনের বেড়াজাল কেটে বেরিয়ে আসার মাঝেই মুক্তি খুঁজেছেন। এই মনোভাব থেকেই কবি আলোচ্য উক্তি করেছেন।
প্রশ্ন নং ২৩: কবি নিজেকে ‘অনিয়ম উচ্ছৃঙ্খল’ বলেছেন কেন?
উত্তর: বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের এক অনবদ্য সৃষ্টি ‘বিদ্রোহী’ কবিতা। এই কবিতায় কবি নিজেকে ‘অনিয়ম উচ্ছৃঙ্খল’ বলে অভিহিত করেছেন। নিয়ম-শৃঙ্খলার নিগড়ে আবদ্ধ থেকে অন্যায়, অত্যাচারের ও অবিচারের বিরুদ্ধে লড়াই করা যায় না। তাই কবি নিজেকে ‘অনিয়ম উচ্ছৃঙ্খল’ বলে ঘোষণা করেছেন।
কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষে । জন্মের পর থেকেই কবি ব্রিটিশ বেনিয়া শাসকগোষ্ঠী অন্যায়, অত্যাচার ও অবিচারকে প্রত্যক্ষ করেছেন স্বীয় অভিজ্ঞতা থেকে । এ সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে চাইলেই প্রতিবাদকারী বিরুদ্ধে নেমে এসেছে তথাকথিত আইন-কানুন আর নিয়মের বেড়াজাল। কবি তাই সব ধরনের বন্ধন ছিন্ন করে, আইনের বেড়াজাল কেটে বেরিয়ে আসার মাঝেই মুক্তি খুঁজেছেন। অন্যদিকে কবি নিজেকেই সকল প্রকার অনিয়ম-উচ্ছৃঙ্খল বলে ঘোষণা করেছেন।
এই মনোভাব থেকেই কবি আলোচ্য উক্তি করেছেন।
প্রশ্ন নং ২৪ : কবি নিজেকে ‘ অর্ফিয়াসের বাঁশরী’ বলেছেন কেন?
উত্তর: বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের এক অনবদ্য সৃষ্টি ‘বিদ্রোহী’ কবিতা। এই কবিতায় কবি নিজেকে ‘অর্ফিয়াসের বাঁশরী’ বলে অভিহিত করেছেন। ব্রিটিশ বেনিয়াদের অত্যাচার আর নিপীড়নের নিগড়ে আবদ্ধ বাঙালি জাতিকে বিদ্রোহের অগ্নিমন্ত্রে জাগ্রত করার মানসে কবি গ্রিক পুরাণের অর্ফিয়াসের বাঁশির সাথে নিজের তুলনা করেছেন।
গ্রিক পুরানের একজন মহান কবি ও শিল্পী অর্ফিয়াস। তিনি তাঁর বাশির সুরে সকলকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখতেন। শুধু তাই নয়, সুরের ইন্দ্রজাল সৃষ্টি করে তিনি ভালোবাসার পাত্রী ইউরিডিসের মন জয় করেছিলেন। কবির প্রত্যাশা, অর্ফিয়াসের বাঁশির সুরের মতো তাঁর বিদ্রোহের সুরও মানুষের মাঝে ছড়িয়ে যাবে। সে সুরে বিদ্রোহের অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত হবে দেশবাসী। মিলবে কাঙ্ক্ষিত মুক্তি। এমন ভাবনা থেকেই কবি নিজেকে অর্ফিয়াসের বাশি বলে অভিহিত করেছেন।
প্রশ্ন নং ২৫: ‘আমি বিদ্রোহী, আমি বিদ্রোহী-সুত বিশ্ব-বিধাতৃর’-ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: উদ্ধৃত অংশটুকু বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা থেকে নেওয়া হয়েছে। কবি মনে করেন তিনি সকল প্রকার অন্যায়, অত্যাচার ও অসাম্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী চেতনার ধারক। তাই কবি নিজেকে বিশ্ববিধাতার বিদ্রোহী পুত্র বা সুত হিসেবে অভিহিত করেছেন।
কবির সমসাময়িক সময়ের ভারতবর্ষ সকল প্রকার অন্যায়, অত্যাচার, নিপীড়ন, শোষণ আর বঞ্চনার চারণভূমি। পরাধীন ভারতবর্ষে আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কারণে বৈষম্য সীমাহীন। সমাজ জীবন প্রায় অচল। এই অচলায়তনকে কবি ভাঙতে চেয়েছিলেন। এ লক্ষ্যেই তিনি উচ্চারণ করেন দ্রোহের মন্ত্র। তাঁর এই দ্রোহ কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়। অত্যাচারীর বিরুদ্ধে তিনি বিধ্বংসী রূপ নিয়ে আবির্ভূত হন। বিদ্রোহী চেতনার ধারক হিসেবে অন্যায় ও অসাম্যের বিরুদ্ধে কবি নিরন্তর দ্রোহের ধারক ও বাহক। তাই কবি নিজেকে বিশ্ব-বিধাতার বিদ্রোহী-সুত বা বীর পুত্র বলে অভিহিত করেছেন।
প্রশ্ন নং ২৬: কবি নিজেকে বেদুইন বলেছেন কেন?
উত্তর: রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে বিরামহীন সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা থেকেই কবি নিজেকে বেদুইন হিসেবে ঘোষণা করেছেন।
বেদুইন হলো আরবের যাযাবর জাতি। এদের স্থায়ী কোনো আবাস নেই। কঠিন মরুভূমির বুকে এরা প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে টিকে থাকে। মরুভূমির বিরুপ পরিবেশ বা শত প্রতিকূলতা তাদের দমন করতে পারে না। আলোচ্য অংশে কবি হতোদ্যম না হয়ে বেদু্ইনদের জীবনযুদ্ধের সাথে নিজের তুলনা করে অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে নিজের দৃঢ় অবস্থান ব্যক্ত করেছেন।
প্রশ্ন নং -২৭ : সব পাখি ঘরে আসে সব নদী ফুরায় এ জীবনের সব লেনদেন
থাকে শুধু অন্ধকার , মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন ।-উক্তিটির তাৎপর্য বিশ্লেষণ করুন।
উত্তর: প্রশ্নে উদ্ধৃত অংশটুকু আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম রূপকার কবি জীবনানন্দ দাশ রচিত ‘বনলতা সেন’ শীর্ষক কবিতা থেকে নেয়া হয়েছে।
দিনের শেষে ক্লান্ত প্রকৃতি যেমন রাত্রির কোলে আশ্রয় নেয় তেমনি কর্মক্লান্ত কবিও জীবনের শেষ প্রান্তে বনলতা সেনের কাছে প্রশান্তির আশ্রয় খুঁজে পেয়েছেন- এ কথা বোঝাতে গিয়েই কবি আলোচ্য উক্তি করছেন।
অনাদি কাল থেকে মানুষ শান্তির চেষ্টায় ব্যাকুল। ক্লান্ত চিল সারাদিনের শেষে সন্ধ্যায় ডানা থেকে রৌদ্রের গন্ধ মুছে বিশ্রামের আয়োজন করে। শান্তি প্রত্যাশী মানুষেরও এরূপ আশা অনন্তকালের। কবির অশান্ত অন্তরে শান্তির পরশ দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন। শান্তি প্রত্যাশী মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে কবি তাঁর মানসপ্রতিমাকে খুঁজেছেন। পৃথিবীর বিচিত্র প্রান্তরে খুজে খুজে অবশেষে তিনি নাটরে তাকে খুঁজে পেয়েছেন। কবি বড়ই ক্লান্ত। প্রকৃতির দেবী বনলতা সেনের সান্নিধ্যে সব ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। জীবনের আলো যখন সময়ের ভারে নিষ্প্রভ হয়ে যায়। জীবন সূর্য যখন অস্তাচলে গমন করে তখন আর কোনো আশা থাকে না। হতাশার অন্ধকারে জীবন তলিয়ে যায়। অথচ প্রিয় সান্নিধ্য তখন পারে স্বর্গীয় সুখে ভরে দিতে।
জগৎ ও জীবনে শেষ বলে কিছু নেই। যেখানে মনে হয় সব শেষ হয়ে গেল সেখানে আবার সম্ভাবনার সূত্রপাত ঘটে। তাই জীবনের সব লেনদেন শেষ করে গাঢ় অন্ধকার কবি মানসপ্রিয়াকে খুঁজে পেয়ে মুখোমুখি বসে অনাবিল সুখ অনুভব করছেন।
প্রশ্ন-নং ২৮: ভ্রমণক্লান্ত নীড়প্রত্যাশী কবি-মন কীভাবে শান্তি পেল, তা 'বনলতা সেন ’ কবিতা অবলম্বনে আলোচনা কর ।
উত্তর : আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম রূপকার কবি জীবনানন্দ দাশ রচিত ‘বনলতা সেন’ শীর্ষক কবিতায় কবির প্রেমিক মন সহস্র বছর ব্যাপী পৃথিবীর পথে বিচরণ করে চলছেন। কাঙ্ক্ষিত নারীর সান্নিধ্য লাভের আশায় সুদূর অতীতের গর্ভ থেকে বর্তমানের পাদপীঠ পর্যন্ত তিনি শান্তির সন্ধান করেছেন। মালয় সাগর, সিংহল সমুদ্র, অশোকের বিম্বিসার জগৎ ও বিদর্ভ নগরী ভ্রমণ করে কবি ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। এ দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় কবি কোথাও শান্তি খুঁজে পাননি, কোথাও দেখা হয়নি তাঁর প্রিয়তমার সাথে। অবশেষে জীবন সমুদ্রের সফেন তরঙ্গে দুলতে দুলতে তিনি বাংলাদেশের চিরপরিচিত নাটোর উপস্থিত হয়ে তাঁর দয়িতার সন্ধান পেয়েছেন। নাটোরের কল্পিত বনলতা সেন তাঁকে দু'দণ্ডের জন্য সুখ ও শান্তি দিতে পেরেছেন। পুরুষের শ্রমক্লান্ত মন শান্তি পায় তার কাঙ্ক্ষিত নারীর বাহুবন্ধনে। পুরুষ অনাদিকাল থেকে এ শান্তির পশ্চাতে ছুটে চলেছে। নীড়হারা কবি-পুরুষ নীড়ের সন্ধানে সারা পৃথিবী তোলপাড় করে ফিরছেন। আর মানুষের জীবনের সার্থকতা ঐ শান্তির নীড় প্রাপ্তির মাধ্যমেই। ঐ নারীর প্রেম, ভালোবাসার জন্যই তার এত পথ চলার বিড়ম্বনা ।
দু'দণ্ডের তরে শান্তি প্রত্যাশী কবি-মন নাটোরের বনলতা সেনের কাছে এসে শান্তি পেয়েছেন। প্রকৃত অর্থে নাটোর কিংবা বনলতা সেন প্রতীকী ব্যঞ্জনায় অভিষিক্ত।
******************************
ড. এ. আাই. এম. মুসা
অধ্যাপক-বাংলা
www.onlinereadingroombd.com
+88 01713 211 910