
NTRCA School, ১৮তম বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা (স্কুল পর্যায়), গুরুত্বপূর্ণ রচনা : শিষ্টাচার ও সৌজন্য অথবা শুদ্ধাচার
শিষ্টাচার ও সৌজন্য অথবা শুদ্ধাচার
ভূমিকা : রাজা সলোমন বলেছেন, ’অহঙ্কার মানুষের পতন ঘটায়, কিন্তু বিনয় মানুষের মাথায় সম্মানের মুকুট পরায়’। শিষ্টাচার হল এই বিনয় বা নম্রতা, বিশেষ করে আচরণে তার সার্থক বহিঃপ্রকাশ। দেহের সৌন্দর্য অলঙ্কার, কিন্তু আত্মার সৌন্দর্য শিষ্টাচার। অলঙ্কার বাইরের সামগ্রী আর শিষ্টাচার অন্তরের এবং সৌজন্যবোধ হলো তার মার্জিততম প্রকাশ। মানুষ যতদিন অরণ্যচারী ছিল, ততদিন সে শিষ্টাচার বা সৌজন্যবোধ প্রকাশের প্রয়োজনবোধ করেনি। যখন থেকে মানুষ সমাজবদ্ধ হলো, তখন থেকে শিষ্টাচার ও ভদ্রতাবোধের প্রয়োজন অনুভূত হলো। শিষ্টাচার সমাজ-সরসীর বিকশিত শুভ্র-সমুজ্জ্বল শতদল। শুধু আমাদের ব্যক্তিজীবনের সৌন্দর্যই নয়, আমাদের সমাজজীবনেরও গৌরবজনক আভরণ। Oscar wilde Zvui ‘The importance of being Earnest’ bvU‡K e‡j‡Qb, ‘courtesy and politeness are the basic principle which directs human life smoothly.’
শিষ্টাচার ও সৌজন্য বলতে কী বোঝায় : আভিধানিক অর্থে রুচিপূর্ণ ভদ্র ব্যবহারই শিষ্টাচার-সৌজন্য। শিষ্টাচার ও সৌজন্য উভয়ই সমার্থক হলেও দুয়ের মধ্যে রয়েছে সূক্ষ্ম পার্থক্য। আত্মীয়-অনাত্মীয়, পরিচিত- অপরিচিত সকলের সঙ্গে প্রীতিপূর্ণ, রুচি-সম্মত ব্যবহারই শিষ্টাচার। শিষ্টাচারে সকলেই মুগ্ধ হয়। আর সৌজন্য বলতে বাইরের মার্জিত ব্যবহারই শুধু নয়, নয় ভদ্রতার সামাজিক রীতি অনুসরণ, এর সঙ্গে যুক্ত আছে সুজনের মহৎ হৃদয়ের গভীর উষ্ণ স্পর্শ। আছে অন্তর সৌন্দর্যে বিকশিত মহিমা।
মানবজীবনে শিষ্টাচারের গুরুত্ব : ভদ্রতা আত্মীয়তার চেয়ে কিছু কম এবং সামাজিকতার চেয়ে কিছু বেশি। আত্মীয়তা আন্তরিক, সামাজিকতা আনুষ্ঠানিক, ভদ্রতা উভয়ের মধ্যে সেতুস্বরূপ এবং উভচর। এই বন্ধনের গুণেই মানুষের সঙ্গে মানুষের যে-কোন সম্পর্ক রাখা সম্ভবপর হয়।’ (ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণী)। এই পৃথিবীর কোন মানব-সন্তানই স্বয়ম্ভূ নয় সে একদিকে যুক্ত তার পরিবারের সাথে, অন্যদিকে যুক্ত তার সমাজের সাথে। উভয়ের সাথে তার সম্পর্ক যেমন ঘনিষ্ঠ, তার কর্তব্যও তেমনি গভীর। তার এই দ্বৈত কর্তব্য অনুষ্ঠান তাকে একদিকে আত্মীয়তা, অন্যদিকে সামাজিকতা রক্ষা করতে হয়। ভদ্রতা বা সৌজন্যবোধ আত্মীয়তার মতো সুগভীর কিংবা সামাজিকতার মতো আনুষ্ঠানিকতার মতো আনুষ্ঠানিক নয়। শিষ্টাচার ও সৌজন্য সামাজিক মানুষের এক দুর্লভ সম্পদ; তার সৌন্দর্য, তার অলঙ্কার। এ তার দীর্ঘ জীবন-সাধনার পরিণত ফল। তার সিদ্ধি। বহু যত্নে আহুত এক দুর্লভ ঐশ্বর্য। একে আয়ত্ত করেই মানুষের গর্ব, তার অহঙ্কার, তার গৌরব। যে-মানুষ এই সম্পদের অধিকারী, সে- মানুষই তত ভদ্র, বিনয়ী। যে সমাজ একে সাদরে গ্রহণ করেছে, সে- সমাজই সে-পরিমাণে সভ্য। তার লোক-ব্যবহারও তত মার্জিত, সম্ভাবনামূলক। একে নির্বাসন দিয়ে মানব সভ্যতার অগ্রগতি সম্ভব নয়। উন্নত সভ্যতা তো এরই অবদানপুষ্ট। এই শিষ্টাচার ও সৌজন্য কোন অর্থ বা ঐশ্বর্য দিয়েই কেনা যায় না।
ছাত্রজীবনে শিষ্টাচারের গুরুত্ব : ছাত্রজীবন হল মানুষের প্রস্তুতি পর্ব। এরই ওপর নির্ভর তার পরবর্তী জীবনের সফলতা-ব্যর্থতা। নির্ভর করে তার ভবিষ্যৎ জীবনের গতি-প্রকৃতি। এসময়ই হল তার শিষ্টাচার ও সৌজন্য আহরণের যথার্থ কাল, উন্মেষ-লগ্ন। শিষ্টাচার ও সৌজন্যের ছোঁয়াতেই ছাত্র হয় বিনীত, ভদ্র। নতুন প্রাণ-সম্পদ হয় গৌরবাম্বিত। ছাত্রজীবনে যে গুরুজনদের শ্রদ্ধা করতে শিখল না, যার উদ্ধত, অবনীত ব্যবহারে শিক্ষক বিরক্ত, যার রূঢ়, অমার্জিত আচরণে সহপাঠী-বন্ধুরা ক্ষুব্ধ, বেদনাহত; পরবর্তী জীবনেও তার একই আচরণের পুনরাবৃত্তি ঘটে। তখন সে হয় অশুভ-শক্তি, অকল্যাণের মুর্ত প্রতীক। হতাশা, ব্যর্থতার তিল তিল দংশন-জ্বালায় সে নিজেকে নিঃশেষ করে। আর সমাজের বুকে ছড়িয়ে দিয়ে যায় অশুভ গরল। ছাত্রজীবনই মানুষের সুকুমারবৃত্তি লালনের শুভক্ষণ। এখানেই তার চরিত্রগঠনের ব্রত-অনুষ্ঠান। শিষ্টাচার ও সৌজন্য তো তার মনুষ্যত্ব অর্জনেরই সোপান । এরই মধ্যে আছে নিজেকে সুন্দর ও সার্থকতায় পরিপূর্ণ করে তোলার মহাশক্তি। শিষ্টাচার, সৌজন্য প্রকাশের জন্যে ছাত্রদের কিছু হারাতে হয় না, কোন অর্থব্যয় করতে হয় না, বরং এক মহৎ অঙ্গীকারে তার সমৃদ্ধ জীবন-বিকাশের পথ প্রশস্ত হয়। বিনয়ী, ভদ্র ছাত্র শুধু শিক্ষকের স্নেহই কেড়ে নেয় না, সে পায় শিক্ষকের আশীর্বাদ, পায় তাঁর সাহায্য। শিষ্টাচার, সৌজন্যের অভাব ছাত্রকে অবিনীত, স্বার্থপর, নিষ্ঠুর করে। ধ্বংস করে তার প্রেম, মমতা, সহানুভূতি, দয়া ইত্যাদি সুকুমার বৃত্তি। এই অভাবই তাকে ঠেলে দেয় অন্যায়, অসত্যের চোরা- অন্ধকারে। সেই অন্ধকার শুধু ব্যক্তিকেই আচ্ছন্ন করে না, গ্রাস করে গোটা সমাজকে।
সামাজিক রীতি ও শিষ্টাচার : একুশ শতকের সূচনা লগ্নে দাঁড়িয়ে আমাদের একবার হিসাব-নিকাশ করতে হবে। তা’ হলে দেখতে পাবো, সভ্যতা আমাদের শিষ্টাচার উপহার দিয়েছে, এবং তা মানুষের শ্রেষ্ঠতম সম্পদের ক্রমপুঞ্জির যোগফল। কেবল এর জন্যেই আমরা সুসভ্য মানুষ হিসেবে গর্ববোধ করতে পারি। যে সমাজ যত সভ্য, তার লোক-ব্যবহার তত মার্জিত, সম্ভাবনামূলক এবং সুরুচিব্যঞ্জক। সেই লোকব্যবহারকে কোথাও কোথাও রীতিমাত্র বলে ভ্রম হয়, সামাজিক অনুষ্ঠানে সৌভ্রাতৃত্ব ও সৌষ্ঠব রক্ষার্থে কতকগুলো নিয়ম অনুসরণ করতে হয়, তাকে রীতি বলা হয়। কিন্তু ভদ্রতা রীতিমাত্র নয়, তদপেক্ষা কিঞ্চিৎ উদার। রীতি কেবল বাইরের অভ্যাসমাত্র। যাতে অন্তরের স্পর্শ থাকে না।
আজ সমাজের নানা ক্ষেত্রেই শিষ্টাচার, সৌজন্যহীনতার নিষ্ঠুর চিত্র দেখা যায়। দিন দিনই মানুষের উচ্ছৃঙ্খলতা বাড়ছে। বাড়ছে তার সীমাহীন ঔদ্ধত্য আজ বার্ধক্যকে সম্মান করি না। শ্রদ্ধেয়দের করি অবজ্ঞা পুরাতনের প্রতি অশ্রদ্ধা। ফলে সৃষ্টি হচ্ছে মানুষে মানুষে বিরোধ। বিত্তবানের নির্লজ্জ ঔদ্ধত্য। প্রবলের সীমাহীন অত্যাচার। আজ শিষ্টাচার ও সৌজন্য দুর্বলের ভীরুতারই অসহায় প্রকাশ মাত্র। মানুষকে অপমান করতে পারলেই বুঝি তৃপ্তি। অবিনয় আজ আর তার লজ্জা নয়। শিষ্টাচার ও সৌজন্যবোধের সৌন্দর্য হারিয়ে মানুষ আজ নিঃস্ব, হৃদয়হীন। অন্তরের পুষ্পিত শতদল আজ ছিন্নভিন্ন।
শিষ্টাচার ও স্পষ্টবাদিতা বা শিষ্টাচার অর্জনের উপায় : The greatest ornament of an illustrious life is modesty and humanity. শৈশব আত্ম-সংযম ও মার্জিত প্রকাশভঙ্গিতে অনুশীলন-ফল হলো শিষ্টাচার। কাজেই আন্তরিক স্পষ্টবাদিতার সঙ্গে রয়েছে শিষ্টাচারের মৌলিক গরমিল। স্পষ্টবাদিতার দোহাই দিয়ে ইতরতা বা রূঢ়তার অস্ত্র-প্রয়োগ সামাজিক শালীনতাবোধকে পীড়িত করে। তথাকথিত ষ্পষ্টবাদীর দল লোক-সমক্ষে নিজেদের অসাধারণরূপে জাহির করবার ঘৃণা লোভ সংবরণ করতে না পেরে সামাজিক শিষ্টাচারকে পদদলিত করে এক-একসময় অত্যন্ত রূঢ় কথা বলে ফেলেন। অথচ সেই সত্য বাক্যটিকে অপ্রিয়ভাবে না বলে মার্জিত ভঙ্গিতে প্রকাশ করতে পারলে আত্মিক সমুন্নতি প্রকাশ পেতো। ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে-Courtesy costs nothing but buy everything. শিষ্টাচারের গুণে মানুষের হৃদয়ে অতি সহজেই জায়গা করে নেয়া যায়।
শিষ্টাচার ও খোশামোদ-বৃত্তি : ভদ্রতা হলো সব মানুষের প্রতি সমান দৃষ্টি, আর খোশামুদির দৃষ্টি কেবল নিজের প্রতি নিবদ্ধ। শিষ্টাচার বা সৌজন্যবোধ নিজের অসুবিধা করে পরের সুবিধা করে দিতে উৎসুক; খোশামোদ-বৃত্তি বোঝে শুধু নিজের সুবিধা আর খোঁজে আত্মসুখ ও আত্মসমৃদ্ধি। শিষ্টাচার বা সৌজন্যবোধ সৌষ্ঠবমণ্ডিত, সরল ও সুন্দর। খোশামোদ-বৃত্তি সৌষ্ঠবহীন, কুঠিল ও কুৎসিত। শিষ্টাচারে আছে বিশ্বমুখীনতা, আর খোশামোদ- বৃত্তিতে আছে আত্মমুখীনতা।
চক্ষুলজ্জা ও শিষ্টাচার : চক্ষুলজ্জা নামে একটি সামাজিক উপসর্গ শিষ্টাচারের বেনামীতে লোক-সমাজে প্রচলিত আছে। চক্ষুলজ্জার খাতিরে অসত্যকে সত্য বলে স্বীকার করা একটি গুরুতর সামাজিক ব্যাধি। শিষ্টাচারের সঙ্গে দৃঢ়তার মিশ্রণই এই ব্যাধির সঠিক চিকিৎসা। এদেশে অমায়িক এবং মানুষের খুবই অভাব। তাই আমাদের সমাজে এখনো শিষ্টাচার নামক স্বভাবটি গড়ে উঠতে পারেনি।
উপসংহার : মোটকথা, দৈনন্দিন কর্মজীবন-যাত্রায় সংসার-চক্রের অনিবার্য ঘর্ষণে যে শ্বাসরোধকারী ধূম্রজাল উত্থিত হতে থাকে, শিষ্টাচারের বুদ্ধি শান্তি-বারি সিঞ্চনেই তা নিবারিত হতে পারে। শিষ্টাচার ধুলি-ম্নান পৃথিবীর রুক্ষতাকে কোমলতা দান করে দৈনিক জীবনযাত্রাকে শোভামণ্ডিত করে তোলে। অতিসাম্প্রতিককালের মতো মানব-সভ্যতার এমন সংকট আর কখনো দেখা যায় নি। বর্তমান শতাব্দীর অপরাহ্ণে এসে সভ্যতা একেবারে দেউলিয়া হয়ে গেছে। সভ্যতার যা আত্মিক সম্পদ যা যুগ-যুগান্তরের চিৎ-প্রকর্ষের অনবদ্য যোগফল, যা কর্ম ও বাক্যের নিকষিত হেম, সেই শিষ্টাচার ও সৌজন্যবোধের দুর্ভিক্ষ আজ দিকে দিকে মরু-রসনা বিস্তার করছে।
******************************
ড. এ. আাই. এম. মুসা
অধ্যাপক-বাংলা
www.onlinereadingroombd.com
+88 01713 211 910