
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যূত্থান
প্রশ্ন : ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যূত্থান সম্বন্ধে যা জান লেখ।
উত্তর : ১৯৬৯ এর গণ অভ্যুত্থান পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অভুতপূর্ব ঘটনা। সামগ্রিকভাবে পাকিস্তানে জেনারেল আইয়ুব খানের সামরিক একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়েছে এ গণ-অভ্যুত্থান। তবে পূর্ব পাকিস্তানে এ গণ-আন্দোলন কেবল আইয়ুব সরকারের অপশাসনের বিরুদ্ধে সংঘটিত হয়নি; বরং তা পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ঔপনিবেশিক কাঠামোর বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়েছে। নিম্নে ’৬৯ এর গণ-অভ্যুত্থানের কারণগুলো বিশ্লেষণ করা হলো-
১৯৬৯ এর গণ-অভ্যুত্থানের কারণঃ
(ক) অর্থনৈতিক শোষণ ও বৈষম্যঃ
১৯৬৯ এর গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান কারণ ছিলো পাকিস্তানের দু’অংশে বৈষম্য ও অভ্যন্তরীণ ঔপনিবেশিক কাঠামো। পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই পশ্চিম পাকিস্তান, পূর্ব পাকিস্তানকে অর্থনৈতিকভাবে শোষণ করেছে। পাকিস্তানের দু’অংশে উন্নয়ন কর্মকান্ডে ব্যাপক বৈষম্য ছিলো। পাকিস্তানের রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ পূর্ব পাকিস্তান থেকে অর্জিত হলেও বার্ষিক উন্নয়ন বাজেটের ৭০ ভাগই পশ্চিম পাকিস্তানে ব্যয় করা হতো। বাঙালির পুঞ্জিভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে ১৯৬৯ গণ-অভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে।
১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব সম্বন্ধে পড়তে নিচের লিংকে ক্লিক করুন।
১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব -OnlineRedingRoom (onlinereadingroombd.com)
(খ) সামাজিক কারণঃ
১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানে সামাজিক কারণগুলো ছিল নিম্নরূপ-
১। মৌলিক গণতন্ত্রীদের অত্যাচারঃ আইয়ুব খান ক্ষমতায় এসে মৌলিক গণতন্ত্র প্রবর্তন করেন। মৌলিক গণতন্ত্রীদের দাপটে সাধারণ মানুষের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। এরই বহিঃপ্রকাশ ঘটে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে।
২। আমলাদের ভূমিকাঃ পাকিস্তানী শাসনামল আমলা ও সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা বৃদ্ধিও ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের আরেকটি অন্যতম কারণ ছিল।
৩। দুর্নীতির প্রসারঃ আইয়ূব শাসনামলে দুর্নীতির ব্যাপক প্রসার লাভ করে। প্রশাসনের সর্বত্র ব্যাপক দুর্নীতির প্রচলন হয়। ফলে জনগণ দুর্নীতির প্রসাররোধকল্পে ১৯৬৯ সালে অভ্যুত্থান ঘটায়।
৪। সাংস্কৃতিক দমন-নিপীড়নঃ পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই বাঙালির ওপর সাংস্কৃতিক নিপীড়ন নেমে আসে। রক্তের বিনিময়ে বাংলা ভাষা রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা পেলেও থেমে থাকেনি পাকিস্তানী শাসক চক্রের চক্রান্ত।
(গ) রাজনৈতিক কারণ
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের রাজনৈতিক কারণগুলো ছিল নিম্নরূপ-
১। স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা : স্বায়ত্তশাসনের তীব্র আকাক্সক্ষা বাঙালি জাতিকে আইয়ূব শাসনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করে এবং বাঙালি জাতির ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনেই গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়।
২। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা : ১৯৪৭ সালের পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত ছিল। কিন্তু ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারি করে গণতান্ত্রিক পরিবেশকে ধ্বংস করা হয়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য মানুষ এই আন্দোলনে যোগ দেয়।
৩। দমননীতি : সরকারি দমননীতিও এই আন্দোলনকে বেগবান করে।
৪। জাতীয়তাবাদী চিন্তার বিকাশ : পাকিস্তান সৃষ্টির পর ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা জন্ম নেয়। এই চেতনা গণ-অভ্যূত্থানকে গতি দান করে।
৫। ছয়দফা আন্দোলনের প্রভাব : আওয়ামী লগী কর্তৃক ১৯৬৬ সালে ঘোষিত ছয়দফা আন্দোলনও গণঅভ্যুত্থানে ভূমিকা রাখে।
৬। ছাত্রদের এগার দফা : ১৯৬৯ সালের প্রথম দিকে ছাত্ররা এগার দফা ভিত্তিক আন্দোলন শুরু করে। এই আন্দোলনও গণঅভ্যুত্থানের গতি সঞ্চার করে।
৭। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা : এই মামলাও আলোচ্য আন্দোলনকে বেগবান করে।
৮। পশ্চিম পাকিস্তানে আন্দোলন : জুলফিকার আলী ভুট্টোর নেতৃত্বে পশ্চিম পাকিস্তানেও আইয়ুব শাহী বিরোধী আন্দোলন পরিচালিত হয়। সিন্ধু, বেলুচিস্তান ও উত্তর পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চল পাঞ্জাবী আধিপত্যের বিরুদ্ধে গণ-অভ্যুত্থানে যোগ দেয়।
গণ-অভ্যুত্থানের ফলাফল ও তাৎপর্য
নিম্নে ’৬৯ এর গণ-অভ্যুত্থানের ফলাফল ও তাৎপর্য বর্ণনা করা হলো-
১। গোলটেবিল বৈঠকের আহবান: ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানকে সামাল দেওয়ার জন্য আইয়ূব খান ১৯৬৯ সালের ফেব্রæয়ারি মাসে রাওয়ালপিন্ডিতে সর্বদলীয় নেতৃবৃন্দের এক গোলটেবিল বৈঠক আহবান করেন। উক্ত গোলটেবিল বৈঠকে নিম্নোক্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। যথা-
ক) প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে প্রত্যক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হবে।
খ) যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন পদ্ধতির প্রবর্তন করা হবে। গ) মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকার প্রবর্তন করা হবে।
২। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের ফলে আইয়ুব খান সে মামলা প্রত্যাহার এবং বঙ্গবন্ধুসহ সকলকে মুক্তি দিতে বাধ্য হন।
৩। আইয়ুব খানের পতন : ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে আইয়ূব সরকারের পতন ঘটে। পরিস্থিতি সামাল দিতে আইয়ূব খান জেনারেল ইয়াহিয়া খানের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর করে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
৪। ১৯৭০ সালের নির্বাচন : ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের ফলে পাকিস্তানের শাসনকাঠামো ভেঙে পড়ে। নতুন জান্তা সরকার ১৯৭০ সালে সাধারণ নির্বাচন করতে বাধ্য হয়। এতে আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।
৫। বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ : ’৬৯ এর গণ-অভ্যুত্থান বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
৬। বঙ্গবন্ধুর উত্থান : ৬৯ এর গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়েই শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা হিসাবে আবির্ভূত হন।
৭। রাজনীতিতে ছাত্র সমাজের আবির্ভাব : ’৬৯ এর গণ-অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে ছাত্র সমাজ বিপ্লবী ভূমিকা নিয়ে আবির্ভূত হয়।
উপসংহার : ’৬৯ এর গণ-অভ্যুত্থান কোন একটি বিশেষ কারণ বা হঠাৎ করে সংঘটিত হয়নি। পূর্ব বাংলার প্রতি দীর্ঘ রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক বৈষম্য, শোষণ এ গণ-অভ্যুত্থানের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার ও শেখ মুজিবের মুক্তি দাবি ছিল গণ-অভ্যুত্থানের তাৎক্ষণিক কারণ। ’৬৯ এর গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে কেবল জেনারেল আইয়ুব খানের শাসনের অবসান ঘটেনি ; পাকিস্তানে নতুন শাসনতন্ত্র রচনাসহ গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার সুযোগ সৃষ্টি হয়। এ অভ্যুত্থানের পরই বাংলার রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ বঙ্গবন্ধুর হাতে চলে যায়। একই সঙ্গে ছাত্র-সমাজ পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতির মূল শক্তি হয়ে উঠে।
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা সম্বন্ধে জানতে নিচের লিংকে ক্লিক করুন
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা -OnlineRedingRoom (onlinereadingroombd.com)
অনলাইন রিডিং রুম শিক্ষক প্যানেল
+88 01713 211 910