
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা
প্রশ্ন : আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার উপর একটি নিবন্ধ রচনা কর।
ভূমিকা : পাকিস্তান সরকার দেশ বিভাগের পর থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে দমন করে রাখার নানা কৌশল গ্রহণ করে। বাঙালির উপর জোর করে উর্দুকে চাপিয়ে দেয়ার অপতৎপরতা থেকে শুরু করে প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল পূর্ব বাংলার মানুষকে কোণঠাসা করে রাখার। এরপর ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা সত্ত্বে তাঁরা মানুষকে ক্ষমতায় থাকতে দেয় নি। তাছাড়া সর্বক্ষেত্রে সীমাহীন বৈষম্য সৃষ্টি করে তাঁরা পূর্ব পাকিস্তানের নব্য ঔপনিবেশিক শাসন কায়েম করে। ফলে বাঙালির মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার হয়। ১৯৫২ সালের ভাষার আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের নির্বাচন, ১৯৬২ সালের ছাত্র আন্দোলন, এবং ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন বাঙালিকে অধিকার আদায়ে সোচ্চার করে। এমন পরিস্থিতিতে দিশেহারা পাকিস্তান সরকারের এক মিথ্যা মামলার নাম ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’।
রুশোর সাধারণ ইচ্ছা মতবাদ সম্বন্ধে জানতে নিচের লিংকে ক্লিক করুন:
রুশোর সাধারণ ইচ্ছা মতবাদ -OnlineRedingRoom (onlinereadingroombd.com)
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা
আইয়ুব-মোনেম চক্র ১৯৬৭ সালের ডিসেম্বর মাসে পূর্ব পাকিস্তানের ক’জন সামরিক ও বেসামরিক ব্যক্তির নামে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার অভিযোগ আনেন। আসলে শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফা কর্মসূচীকে বানচাল করার জন্য তাঁরা এ অভিযোগ তৈরি করে। এ মামলার মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল ছয় দফা কর্মসূচীকে কেন্দ্র করে যাতে বাঙালিরা সংগঠিত হতে না পারে। প্রথমে এ মামলার প্রধান আসামি করা হয় লে. কর্ণেল মোয়াজ্জেম হোসেনকে। ক’দিতন পরে হঠাৎ দেখা গেল যে, অনেক আগে থেকে আটক শেখ মুজিবুর রহমানকে এ মামলায় জড়িত করে তাঁকেই এক নম্বর আসামি করা হয়েছে। সরকার এ মামলাকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা বললেও শেখ মুজিব এ মামলাকে পিন্ডির ষড়যন্ত্র বলে আখ্যায়িত করেন। ১৯৬৬ সালের ছয় দফা কর্মসূচী ঘোষণার পর ৮ মে শেখ মুজিবকে আটক করা হয়, এর প্রায় ১১ মাস পরে ১৯৬৮ সালের ১৭ জানুয়ারি রাতে তাঁকে জেল থেকে নামমাত্র মুক্তি দেয়া হয় এবং জেলগেট থেকে আবার গ্রেফতার করে ঢাকা সেনানিবাসে একটি রুদ্ধদ্বার কক্ষে আটক রাখা হয়।
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যান্য আসামি ছিলেন কর্পোরাল আমীর হোসেন, এস.এস. সুলতান উদ্দীন আহমদ, কামাল উদ্দীন আহমদ স্টুয়ার্ড মুজিবুর রহমান, ফ্লাইট সার্জেন্ট মাহফুজুল্লাহ্ প্রমুখ। স্থল, নৌ ও বিমান বাহিনীর কর্মচারী ও ৩ জন সি.এ.পি. অফিসার সর্বজনাব আহমদ ফজলুর রহমান, রুহুল কুদ্দুস ও শামসুর রহমানসহ সর্বমোট এ মামলায় আসামি ছিলেন ৩৫ জন। ১১ জনকে রাজসাক্ষী হওয়ায় ক্ষমা করা হয়। এ মামলার অভিযোগ হলো, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা ভারতীয় যোগসাজশে এবং ভারতীয় অস্ত্র শস্ত্রের সাহায্যে পূর্ব পাকিস্তানকে পাকিস্তান থেকে আলাদা করে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের ষড়যন্ত্র করছে। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার উদ্দেশ্য ছিল শেখ মুজিবুর রহমানসহ কয়েকজন সৎ বাঙালি অফিসারকে দেশের শত্রæ হিসেবে প্রমাণ করে তাদের কঠোর শাস্তি দিয়ে পূর্ব বাংলার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ও প্রগতিবাদী আন্দোলনকে চিরতরে বন্ধ করে দেয়া।
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিচার প্রক্রিয়া
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিচার প্রক্রিয়া ছিল একটা প্রহসন। এ মামলার শুনানি শুরু হয় ১৯৬৮ সালের ১৯ জুন। মামলার বিচারের জন্য মে মাসে একটি স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়্ বিচারের শুরুতেই আসামিরা প্রত্যেককে নিজেদের নির্দোষ বলে দাবি করে। শেখ মুজিবুর রহমান এ মামলাকে তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বলে দাবি করেন। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের নিকট থেকে স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য তাঁদের উপর অমানুষিক নির্যাতন ও বর্বরোচিত অত্যাচার করা হয়। সাক্ষ্য প্রমাণে দেখা গেল, পুরো মামলাটি ছিল একটি হীন ষড়যন্ত্র। এ মামলা সাজিয়ে আইয়ুব খান তাঁর নির্বুদ্ধিতাকে প্রকাশ করেছিলেন।
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রতিক্রিয়া
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’র প্রতিক্রিয়ায় আইয়ুব বিরোধীগণ আন্দোলন দুর্বার গতিতে ছড়িয়ে পড়ে। পূর্ব বাংলার মানুষ তীব্র আক্রোশে ফেটে পড়ে। ফলে সরকার যা করতে চেয়েছিল, বাস্তবে তার ফল হলো উল্টো। আসলে এ মামলা আইয়ুব খানের একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত ছিল। এর ফলে তার পতন দ্রুত ত্বরান্বিত হয়। শেখ মুজিবুর রহমানকে মিথ্যা মামলায় জড়ানোর ফলে পূর্ব বাংলার মানুষের মধ্যে দারুন ক্ষোভ ও তীব্র অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। ছাত্ররা তাঁর মুক্তির জন্য সর্বাত্মক সংগ্রাম শুরু করে।
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাকে কেন্দ্র করে পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক আন্দোলন শুরু হয়। এ আন্দোলনের জন্য ছাত্ররা ‘ঐতিহাসিক এগার দফা’ কর্মসূচী ঘোষণা করে।
‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার’ তাৎপর্য
‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ নানা কারণে তাৎপর্যপূর্ণ। এ মামলা দায়ের করে পাকিস্তানি সরকারের মুখোশ উন্মেচিত হয়। এ মিথ্যা মামলার মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতা ও প্রগতিশীল ব্যক্তিদের চিন্তা-চেতনাকে চিরতরে স্তব্ধ করে দিয়ে তাঁদের শোষণের ভিত্তি সুদৃঢ় করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবে ফল হলো উল্টো। এ মামলায় শোষণ ও নিপীড়নের প্রতিবাদে পূর্ব পাকিস্তানের সর্বশ্রেণীর মানুষ সংঘবদ্ধ হয়। যখন এ মামলার অসারতা প্রমাণ হলো তখন আইয়ুবশাহীর স্বৈরশাসনের ভিত্তিমূল কেঁপে উঠলো। এ ‘আগারতলা ষড়যন্ত্র মামলা’কে প্রতিহত করতে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ১১ দফা কর্মসূচি দিয়ে আন্দোলন গড়ে তোলে, যার ফলে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সৃষ্টি হয় এবং আইয়ুব খানের পতন ঘটে।
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রতিক্রিয়ায় সারা পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মধ্যে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন চাঙ্গা হয়। এ মামলার আসামী সার্জেন্ট জহুরুল হক ঢাকা সেনানিবাসে পুলিশের গুলিতে শহীদ হলে আন্দোলন আরো প্রকট আকার ধারণ করে। এ আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন এগার দফার ভিত্তিতে গঠিত সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। অবশেষে ছাত্র আনোলন ও গণ-আন্দোলনের মুখে মামলাটি প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হয়। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিশেষত্ব ও এখানকার প্রধান শিক্ষণীয় দিক মিথ্যা ও অত্যাচারী যত শক্তিশালীই হোক জনরোষের কাছে তা বেশিক্ষণ টিকে থাকতে পারে না। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়েরের ফলে আইয়ুব খান তাঁর ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করতে চেয়েছিলেন, অথচ পরিণামে এ মামলা তার পতন অনিবার্য করে।
‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ মোকাবিলার পূর্ব বাংলার ছাত্রসমাজ ১১ দফা ভিত্তিক কর্মসূচির মাধ্যমে গণ-আন্দোলন গড়ে তোলে। শেষ পর্যন্ত সৃষ্টি হয় গণ-অভ্যুত্থান। এ আন্দোলন চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত হয় ঊনসত্তরের জানুয়ারিতে। ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’কে কেন্দ্র করেই এ দেশে প্রথম ধ্বনিত হতে থাকে জ্বালাময়ী শ্লোগান ‘জাগো জাগো’, বাঙালি জাগো ‘বীর বাঙালি অস্ত্রধর বাংলাদেশ স্বাধীন কর।’ এ আন্দোলনের ফলে বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনাও সুদৃঢ় হয় এবং শেষ পর্যন্ত অভিব্যক্তি ঘটে ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান। আরো শ্লোগান উঠে ‘তোমার দেশ, আমার দেশ, বাংলাদেশ, বাংলাদেশ’। কাজেই আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার তাৎপর্য অনস্বীকার্য।
উত্তর : প্রথম থেকেই পূর্ববাংলার উপর পাকিস্তানি শাসকবর্গের নীতি ছিল বৈষম্যমূলক। দুই বিচ্ছিন্ন অঞ্চল নিয়ে পাকিস্তান গঠিত হলেও অঞ্চল দু’টি সমান সম্পদশালী ছিল না। প্রাকৃতিক সম্পদের দিক সমৃদ্ধ পূর্ববাংলা। অন্যদিকে আয়তনে বড় হলেও পশ্চিম পাকিস্তানের অধিকাংশ অঞ্চল ছিল অনুর্বর ও মরুময়। কৃষির দিক থেকে কোন সম্ভাবনা ছিল না সেখানে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পূর্বে এই পশ্চিম অঞ্চলে কোন শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেনি। আর্থিক দিক থেকে দুর্বল ছিল এ অঞ্চল। অন্যদিকে পূর্ববালায় রপ্তানি পণ্য হিসেবে পাট, চা ও চামড়ার যথেষ্ট যোগান ছিল। পূর্ববাংলার প্রাকৃতিক সম্পদের কারণে অর্থনৈতিক দিক থেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার যথেষ্ট সুযোগ ছিল। কিন্ত পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী এ দেশকে সমৃদ্ধ করার কোন চেষ্টা গ্রহণ করে নি। তার বদলে চেয়েছে এ দেশের মানুষকে বঞ্চিত করে এদেশের সম্পদ নিয়ে যেত পশ্চিম পাকিস্তানে।
রাজনৈতিক বৈষম্য
শুরু থেকেই পূর্ব বাংলা রাজনৈতিক বৈষম্যের শিকার হয়। পাকিস্তানের প্রথম গণপরিষদে পূর্ব বাংলার সংখ্যা গরিষ্ঠ প্রতিনিধি থাকা সত্তে¡ও গভর্ণর জেনারেল ও প্রধানমন্ত্রী উভয়পদেই নিয়োগ দেয়া হয় পশ্চিম পাকিস্তান থেকে। পূর্ব বাংলার মতামত উপেক্ষা করে পাকিস্তানের রাজধানী হয় পশ্চিম পাকিস্তানের করাচিতে। পরে তা ইসলামাবাদে স্থানান্তর করা হয়। পূর্ব বাংলার জনপ্রিয় নেতাদের নিস্ক্রিয় করে করে রাখা হয়। এমনকি সংখ্যাধিক্য সত্তে¡ও পূর্ব বাংলাকে সংখ্যা সাম্যনীতি মানতে বাধ্য করা হয়।
অর্থনৈতিক বৈষম্যের চিত্র
যদিও পূর্ববাংলা ছিল সম্পদশালী। তবুও এই সম্পদ এদেশবাসী ভোগ করতে পারত না। পাকিস্তানি শাসকরা তা ছিনিয়ে নিত। পূর্ব পাকিস্তানে রাজস্ব আয় হতো পুরো পাকিস্তানের আয়ের ষাট ভাগ। অথচ এর মাত্র পঁচিশ ভাগ ব্যয় করা হতো আমাদের অঞ্চলে। আর বাকি সব নিয়ে যাওয়া হতো পশ্চিম পাকিস্তানে। পাকিস্তানের যা রপ্তানি আয় ছিল তার প্রায় ষাট ভাগ পণ্য যেত পূর্বপাকিস্তান থেকে। কিন্তু আমদানি দ্রব্যের মাত্র ত্রিশ ভাগ দেয়া হতো এ অঞ্চলকে। পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার ষাট ভাগের বাস ছিল পূর্ব পাকিস্তানে। কিন্তু জাতীয় আয়ের মাত্র সাতশ ভাগ ব্যয় করা হতো এ অঞ্চলের জন্য। পূর্ববাংলার সম্পদে পরিপুষ্ট হয়েছে পাকিস্তানের অর্থ ভাণ্ডার। কিন্তু এ দেশের উন্নয়নের দিকে কোন নজর দেয়া হয়নি। তাই উর্বর পূর্ববাংলা বার বার বন্যা ও ঝড়ে বিধস্ত হয়েছে। আর মরুময় পশ্চিম পাকিস্তান হয়েছে আমাদের সম্পদে শস্য-শ্যামল। শিল্পের কাঁচামাল পূর্ব পাকিস্তানে উৎপন্ন হলেও বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে থাকে পশ্চিম পাকিস্তানে। পূর্ব পাকিস্তানে যে সব শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠে তারও মালিকানা থেকে যায় পশ্চিম পাকিস্তানের হাতে। কৃষি উন্নয়নের জন্য যে ঋণ পাওয়া যেত তার সিংহভাগ কৃষিভিত্তিক অঞ্চল পূর্ব পাকিস্তানে ব্যয় না করে ব্যয় করা হতো পশ্চিম পাকিস্তানে।
শিক্ষা ও চাকরির ক্ষেত্রে বৈষম্যঃ
দেখা গেছে সকল ক্ষেত্রেই পূর্ববাংলার প্রতি পাকিস্তানের বৈষম্যমূলক নীতি ছিল। কৃষি, চিকিৎসা, বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা কেন্দ্রের বেলায় ১৬টি কেন্দ্রের মধ্যে ১৩টিই অবস্থিত ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে। উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণার জন্য বিভিন্ন বৃত্তির সিংহভাগ সুবিধা পায় পশ্চিম পাকিস্তানিরা। পূর্ববাংলায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও আনুপাতিক হারে বিদ্যালয় সংখ্যা বৃদ্ধি পায় নি। শিক্ষার ক্ষেত্রে এই বৈষম্যের ফলে ১৯৪৭-৪৮ খ্রিস্টাব্দে পূর্ববাংলায় যেখানে শিক্ষিাতের হার পশ্চিম পাকিস্তানের চেয়ে অনেক বেশি ছিল সেখানে প্রায় বিশ বছরের মধ্যেই পশ্চিম পাকিস্তানের শিক্ষিতের হার পূর্ববাংলার চেয়ে অনেক বেড়ে গেল।
বৈষম্য প্রকটভাবে লক্ষ করা গেল চাকুরি ও নিয়োগের ক্ষেত্রে। খুব সুচিন্তিতভাবেই পূর্ববাংলাকে শিক্ষার ক্ষেত্রে পিছিয়ে রাখা হয়েছিল যাতে তারা চাকুরির প্রতিযোগিতায় হেরে যায়। সিভিল, মিলিটারি ও অন্যান্য চাকরির মূল নিয়োগ দানের কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয় পশ্চিম পাকিস্তানে। ফলে নিজেদের মত করে নীতি নির্ধারণ করা সহজ হতো। দেখা যাচ্ছে, সামরিক বাহিনীর সকল পর্যায়ের এবং কেন্দ্রীয় সরকারের চাকুরির ও ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীদের প্রধান দপ্তর ছিল পশ্চিম পাকিস্তান। অনেক চাকুরির বিজ্ঞাপন পূর্ববাংলার সংবাদপত্রে দেয়াই হতো না। এ ছাড়াও মনোনয়ন বোর্ডের অধিকাংশ সদস্যই হতেন পশ্চিম পাকিস্তানি। এসব কারণে পূর্ববাংলার অধিবাসীদের পক্ষে উচ্চ পদে নিয়োগ পাওয়া খুব কঠিন ছিল।
বৈষম্য নীতির প্রতিক্রিয়াঃ
পাকিস্তানি শাসকদের বৈষম্যের চিত্র প্রকাশিত হয়ে পড়লে পূর্ববাংলার জনগণ স্বাভাবিকভাবেই বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। পৃথিবীতে আর একটি দেশও খুঁজে পাওয়া যাবে না যেখানে একই রাষ্ট্রের এক অঞ্চলের উপর অন্য অঞ্চলের এমন ব্যাপক অর্থনৈতিক শোষণ ও সাংস্কৃতিক নিপীড়িন চলে। যতদিন পর্যন্ত এই বৈষম্যের বিষয়টি পূর্ববাংলার জনগণের কাছে স্পষ্ট হয় নি ততদিন স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন তীব্র হয়ে উঠে নি। কিন্তু ক্রমে পাকিস্তানিদের চরিত্র প্রকাশিত হয়ে পড়লে এ অঞ্চলের জনগণ প্রতিবাদমুখর হয়ে পড়ে।
আইয়ুব খানের শাসনকালে (১৯৫৮-১৯৬৯ খ্রিঃ) পূর্ববাংলার অনেক নেতাই এই বঞ্চনার কথা তুলে ধরেছিলেন। কিন্তু সামরিক শাসন জারি করে আইয়ুব খান সব রাজনৈতিক তৎপরতা বন্ধ করে দেন। অবশ্য তাকে দমানো যায়নি পূর্ববাংলাকে। ক্রমে তারা অধিকারের দাবিতে সোচ্চার হয়ে ওঠে।
আর এই বৈষম্যের প্রতিক্রায় স্বরূপই ১৯৬৬ সালে ছয়দফা কর্মসূচি ঘোষিত হয়। এই কর্মসূচি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। আর এরই প্রতিক্রায়াতে ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যূত্থান হয়। সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করে। যা ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশ গঠনে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখে।
জন লকের রাষ্ট্রদর্শন সম্বন্ধে জানতে নিচের লিংকে ক্লিক করুন:
জন লকের রাষ্ট্রদর্শন -OnlineRedingRoom (onlinereadingroombd.com)
অনলাইন রিডিং রুম শিক্ষক প্যানেল
+88 01713 211 910