
NTRCA School: ভাষা রীতি : সাধু ও চলিত ভাষারীতির পার্থক্য এবং সাধু ভাষা থেকে চলিত ভাষায় রূপান্তরের নিয়ম
ভাষা রীতি ( সাধু ও চলিত)
প্রশ্ন ১ : সাধু ও চলিত ভাষারীতির প্রধান ৫টি পার্থক্য দেখাও।
উত্তর: নিচে সাধু ও চলিত ভাষারীতির ৫টি পার্থক্য দেখানো হলো:
|
ক্রম |
সাধুরূপ |
ক্রম |
চলিতরূপ |
|
১ |
সাধু ভাষায় তৎসম শব্দের প্রয়োগ বেশি। যেমন: হস্তী, নক্ষত্র, কর্ণ, চন্দ্র, অভ্যন্তর। |
১ |
কিন্তু, চলিত ভাষায় অ-তৎসম শব্দের প্রয়োগ বেশি। যেমন: হাতি, তারা, কান, চাঁদ, ভিতর। |
|
২ |
সাধু ভাষায় আঞ্চলিক শব্দের প্রয়োগ হয় না বললেই চলে। |
২ |
তবে, চলিত ভাষায় আঞ্চলিক শব্দের ব্যবহার হয়ে থাকে। |
|
৩ |
সাধু ভাষায় সন্ধি ও সমাসের প্রয়োগ বেশি। যেমন : রাজাজ্ঞা, কাষ্ঠাসন, প্রবেশাধিকার, বাক্যমধ্যস্থিত ইত্যাদি। |
৩ |
বিপরীতক্রমে, চলিত ভাষায় সন্ধি-সমাস যতদূর সম্ভব বর্জিত হয়ে পৃথক পৃথক শব্দ ব্যবহৃত হয়। যেমন: রাজার আদেশ, কাঠের আসন, প্রবেশ অধিকার, বাক্যের ভিতর থেকে ইত্যাদি। |
|
৪ |
সাধুরীতি সম্পূর্ণ ভাবে ব্যাকরণ অনুসারী। |
৪ |
চলিত ভাষা ব্যাকরণ অনুসারী হলেও প্রয়োজনবোধে রীতি পরিবর্তন করা চলে। |
|
৫ |
সাধু ভাষায় সর্বনাম, অনুসর্গ, ক্রিয়া ও নঞর্থক অব্যয়ের দীর্ঘায়িত ও পুর্ণরূপ ব্যবহৃত হয়। যেমন: তাহাকে, দেখিলাম, নাই, নহে। |
৫ |
চলিত ভাষায় সর্বনাম, অনুসর্গ, ক্রিয়া ও নঞর্থক অব্যয় পদের সংক্ষিপ্ত রূপ ব্যবহৃত হয়। যেমন : তাকে, দেখলাম, নেই, নয় ইত্যাদি। |
|
৬ |
সাধু ভাষার রীতি সুনির্দিষ্ট ও প্রায় অপরিবর্তনীয়। |
৬ |
চলিত ভাষার রীতি সুনির্দিষ্ট হলেও পরিবর্তনীয়। |
|
৭ |
সাধু ভাষা কথাবার্তা, নাটকের সংলাপ ও বক্তৃতার সম্পূর্ণ অনুপযোগী। |
৭ |
চলিত ভাষা কথাবার্তা, নাটকের সংলাপ ও বক্তৃতার প্রধান বাহন। |
(সাধু থেকে চলিত ভাষায় রূপান্তরের উদাহরণ সম্বন্ধে জানতে নিচের লিংকে ক্লিক করুন:
প্রশ্ন-২: সাধু ভাষা থেকে চলিত ভাষারীতিতে রূপান্তরের ৫টি নিয়ম লেখ ।
উত্তর সাধু ভাষারীতি থেকে চলিত ভাষায় রূপান্তর করতে হলে সাধারণত নিম্নলিখিত নিয়ম বা পদ্ধতিগুলো মেনে চলতে হয়। (১) সাধু রীতির ক্রিয়াপদ দীর্ঘ হয়। তাই চলিত রীতিতে রূপান্তরের সময় এগুলোকে সংক্ষিপ্ত আকারে লিখতে হয়। যেমন :
|
সাধু রূপ |
চলিত রূপ |
সাধু রূপ |
চলিত রূপ |
|
করিতেছি |
করছি |
করিয়াছি |
করেছি |
(২) সাধু রীতির সর্বনাম পদসমূহকে সংক্ষিপ্ত আকারে চলিত রীতিতে ব্যবহার করা। যেমন:
|
সাধু রূপ |
চলিত রূপ |
সাধু রূপ |
চলিত রূপ |
|
তাহাতে |
তাতে |
ইহাদের |
এদের |
((৩) সাধু রীতিতে ব্যবহৃত বিশেষ্য, বিশেষণ, সর্বনাম, অব্যয় ও ক্রিয়া-বিশেষণ পদসমূহকে তৎসম শব্দের পরিবর্তে তদ্ভব বা প্রয়োজন হলে সুপ্রচলিত সহজ দেশী-বিদেশী শব্দে চলিত বাংলায় ব্যবহার করা। যেমন :
|
বিশেষ্য পদের ক্ষেত্রে |
বিশেষণ পদের ক্ষেত্রে |
||
|
সাধু রূপ |
চলিত রূপ |
সাধু রূপ |
চলিত রূপ |
|
কর্ণ |
কান |
অবশিষ্ট |
বাকী |
৪। সাধু রীতির সন্ধি ও সমাসবদ্ধ পদগুলোকে ভেঙে সহজ করে চলিত রীতিতে ব্যবহার করা। যেমন :
|
সন্ধির ক্ষেত্রে |
সমাসের ক্ষেত্রে |
||
|
সাধু রূপ |
চলিত রূপ |
সাধু রূপ |
চলিত রূপ |
|
অত্যধিক |
খুব বেশি |
অধ্যাত্ম |
আত্মা বিষয়ক |
|
অত্যুৎকৃষ্ট |
খুব ভালো |
আজানু |
জানু পর্যন্ত |
(৫) পদের অপিনিহিতি, স্বরসঙ্গতি ও অভিশ্রুতি জনিত পরিবর্তন সাধনের মাধ্যমে সাধু ও চলিত রীতির পরিবর্তন সাধন করা৷ যেমন:
|
অভিশ্রুতি |
অপিনিহিতি |
স্বরসঙ্গতি |
|||
|
সাধু রূপ |
চলিত রূপ |
সাধু রূপ |
চলিত রূপ |
সাধু রূপ |
চলিত রূপ |
|
বলিব |
বলব |
রাখিয়া |
রেখে |
লিখ |
লেখ |
|
জালিয়া |
জেলে |
গাহিয়া |
গেয়ে |
শৃগাল |
শেয়াল/শিয়াল |
(৬) পদের মাঝের স্বরধ্বনি এবং অনুসর্গের পরিবর্তনের কারণে ও হ-কারের লোপে বাংলা সাধু ও চলিত ভাষা ও রীতির যে পার্থক্য সুচিত হয় সে সম্পর্কে সম্যক ধারণ রাখা । যেমন : পদের শেষে ও মাঝে হ-কারের লোপঃ তাহা> তা, যাহা > যা ইত্যাদি।
প্রশ্ন-৩: আঞ্চলিক ও প্রমিত ভাষার মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ কর।
উত্তর: পৃথিবীর কোনো ভাষাই একক রূপের অধিকারী নয়। প্রতিটি ভাষারই একাধিক রূপ রয়েছে। বাংলা ভাষাও এর ব্যতিক্রম নয়। বাংলা ভাষারও দু'টি রূপ রয়েছে। এর একটি হলো - মৌখিক বা কথ্য বা চলিত রূপ এবং অন্যটি হলো লেখ্য বা সাধুরূপ। চলিত ভাষার আবার দু'টি রূপ রয়েছে। এর একটি হলো - সর্বজনগ্রাহ্য চলিত রূপ বা মান রূপ বা প্রমিত রূপ এবং অন্যটি হলো - আঞ্চলিক রূপ। নিচে আঞ্চলিক ও প্রমিত ভাষার মধ্যে পার্থক্য দেখানো হলো:
উপভাষা বা আঞ্চলিক ভাষা:
পৃথিবীর সব ভাষাতেই উপভাষা বা আঞ্চলিক ভাষা রয়েছে। বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অঞ্চলের লোকজন যে যে অঞ্চলের ভাষায় কথা বলে সেই অঞ্চলের ভাষাকেই উপভাষা বা আঞ্চলিক ভাষা বলে। অর্থাৎ কোনো একটি ক্ষুদ্র অঞ্চলের ভাষাই উপভাষা বা আঞ্চলিক ভাষা। উপভাষা বা আঞ্চলিক ভাষা হলো- একটি ভাষার ভৌগোলিক রূপভেদ।
এক অঞ্চলের জনগণের মুখের ভাষার সঙ্গে অন্য অঞ্চলের জনগণের মুখের ভাষার মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। ফলে এমন হয় যে, এক অঞ্চলের জনগণ অন্য অঞ্চলের জনগণের মুখের ভাষা একেবারেই বুঝতে পারে না। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, চট্টগ্রাম অঞ্চলের মানুষের ভাষা রংপুর বা দিনাজপুর অঞ্চলের মানুষের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়। তবে এখন উপভাষা বলতে শুধু আঞ্চলিক রূপভেদকেই বোঝায় না, বরং বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার ভাষার রূপভেদকেও নির্দেশ করে। যেমন - উকিলের ভাষা, চোরের ভাষা, সন্ত্রাসীদের ভাষা, আমলার ভাষা ইত্যাদি।
প্রমিত ভাষারীতি:
আঞ্চলিক ভাষার রূপভেদ দূর করার জন্য প্রথমে ‘জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড” এবং পরে বাংলা একাডেমি কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করে। ১৯৯২ সালে বাংলা একাডেমি 'প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম' প্রবর্তন করে। বাংলা একাডেমির এই নিয়ম প্রবর্তনের ফলে বানানে যেমন নতুনত্ব আসে তেমনি উচ্চারণেও আসে নতুনত্ব। এই নতুনত্বের প্রভাব এসে পড়ে বাংলা ভাষার চলিত, কথ্য ও লেখ্য রূপের উপর । ফলে প্রমিত বানান রীতি থেকে সৃষ্টি হয় প্রমিত ভাষা রীতি। এই প্রমিত রীতিকে আশ্রয় করে অনেক পত্রপত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে এবং অনেক গ্রন্থও রচিত হয়েছে এবং হচ্ছে।
একটি উদাহরণ দিয়ে প্রমিত ভাষারীতির রূপটি তুলে ধরা হলো-
ক. আমি যৌবনের পুজারী কবি বলেই যদি আমাকে আপনারা আপনাদের মালার মধ্যমণি করে থাকেন, তা হলে আমার অভিযোগ করার কিছুই নেই। আপনাদের মহাদান আমি সানন্দে মাথা নত করে গ্রহণ করলাম।
প্রশ্ন-৪ : উদাহরণসহ সাধু ও চলিত ভাষারীতির সাদৃশ্য দেখাও ৷
উত্তর: নিচে সাধু ও চলিত ভাষারীতির ৫টি সাদৃশ্য দেখানো হলো :
সাদৃশ্য :
১। সাধু ও চলিত ভাষা উভয়ই মান বাংলার দু'টি রূপ।
২। উভয় ভাষাতেই সংস্কৃত বিশেষ্য ও বিশেষণ জাতীয় শব্দের প্রয়োগ দেখা যায়। যদিও সাধু ভাষায় প্রয়োগ বেশি।
৩। বিদেশি ভাষা থেকে গৃহীত শব্দের ব্যবহার চলিত ভাষায় বেশি হলেও সাধু ভাষায় এর ব্যবহারে কোনো নিষেধ নেই।
৪। উভয় ভাষারীতিই ব্যাকরণ অনুসারী, তবে চলিত ভাষায় ব্যাকরণরীতির পরিবর্তন স্বীকার্য হলেও সাধুতে নেই। ৫। উভয় ভাষাতেই সাহিত্য রচনা করা সম্ভব।
*************************
ড. এ. আই. এম. মুসা
অধ্যাপক-বাংলা
www.onlinereadingroombd.com
+88 01713 211 910