
NTRCA School, ১৮তম বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা, ট্রাজেডি নাটক হিসাবে রক্তাক্ত প্রান্তর নাটকের সাফল্য বিচার
NTRCA School, ১৮তম বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা, ট্রাজেডি নাটক হিসাবে রক্তাক্ত প্রান্তর নাটকের সাফল্য বিচার
প্রশ্ন: ট্রাজেডি কাকে বলে ? ট্রাজেডি নাটক হিসাবে রক্তাক্ত প্রান্তর নাটকের সাফল্য বিচার কর।
উত্তর: ভারত বিভাগোত্তর (১৯৪৭) সময়ে যে কয়জন নাট্যকারের শ্রম, সাধনা ও মেধা বাংলাদেশের নাট্যধারাকে ঋদ্ধি দান করেছিল, মননশীল নাট্যকার মুনীর চৌধুরী (১৯২৫-১৯৭১) ছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম। ভাব, ভাষা, বিষয়, আঙ্গিক এবং জীবনদৃষ্টির প্রশ্নে তাঁর নাটক বাংলাদেশের নাট্যধারায় ব্যতিক্রমী সংযোজন। তাঁর রচিত “চিঠি”, ‘কবর’, ‘দণ্ডকারণ্য”, “মানুষ”, ‘নষ্ট ছেলে’, ও ‘রক্তাক্ত প্রান্তর’ প্রভৃতি নাটক বাংলাদেশের সমৃদ্ধ নাট্যধারাকে আরো ঋদ্ধ করেছে। ‘রক্তাক্ত প্রান্তর' (১৯৬২) নাটকটি এ ক্ষেত্রে স্বাতন্ত্র্যের দাবী রাখে। কেননা, ঐতিহাসিক বিষয় নিয়ে এই নাটকটি রচিত হলেও এর বক্তব্য অতীত মুখী নয়, বরং সমকালীন ও বিশ্বজনীন। অন্যদিকে বিষয় গুণে ‘রক্তাক্ত প্রান্তর” নাটকটি ঐতিহাসিক হলেও রস বিচারে ট্রাজেডিধর্মী নাটক। তবে ট্রাজেডি নাটক হিসাবে ‘রক্তাক্ত প্রান্তর’ নাটরেকর সার্থকতা বিচার করার পূর্বে ট্রাজেডি নাটকের স্বরূপ, সংজ্ঞার্থ ও বৈশিষ্ট্য নিরূপণ করা প্রয়োজন এবং সেই আলোকেই নাটকের বিবেচনা কাম্য।
(নাটকের নামকরণ বিষয়ে জানতে নিচের লিংকে ক্লিক করুন:
আত্মদ্বন্দ্বে পরাভুত মানব জীবনের করুণ কাহিনীকেই ট্রাজেডি (Tragedy) বলে। ট্রাজেডি নাটকের কালজয়ী সংজ্ঞা নির্ণয়ের প্রয়াস পেয়েছেন বিশ্বসেরা গ্রিক দার্শনিক এরিস্টটল (Aristotle)। তিনি বলেন-
"Tragedy is an imitation of an action that is serious, complete and of certain magnitude in language embellished with each kind of artistic ornaments, the several kinds being found in the separate parts of the play; in the form of actions not of narrative through pity and fear effecting the proper purgation of these emotions."
অর্থাৎ রঙ্গমঞ্চে নায়ক বা নায়িকার গতিমান জীবন কাহিনী দৃশ্য পরস্পরা উপস্থিত করে যে নাটক দর্শকের হৃদয়ে উদ্রিক্ত ভীতি ও করুণা প্রশমন করে, তার মনে করুণ রসের আনন্দ সৃষ্টি করে, তাই ট্রাজেডি নাটক। ট্রাজেডির স্বরূপ নির্ণয় করতে গিয়ে বাঙালি কবি ও সমালোচক মোহিত লাল মজুমদার কবিতার ভাষায় বলেছেন-
“দেবতা দোসর বীর তারি পরাজয় কথা
সে হৃদয় সাগর মন্থন,
নীলাকাশে ঊষাসম গরলে অমৃত রাগ
মৃত্যুজয়ী জীবন কাহিনী।”
ট্রাজেডির উল্লিখিত সংজ্ঞাসমুহ বিশ্লেষণ করলে আমরা নিম্নরূপ বৈশিষ্ট্য পাই ঃ
প্রথমত, ট্রাজেডিতে কোন হালকা বিষয় নয়, বরং গভীর ও গম্ভীর- "Action that is serious" তথা মৃত্যুজয়ী জীবন কাহিনী উপস্থাপিত হবে।
দ্বিতীয়ত, ট্রাজেডি হবে আদি মধ্য অন্ত সমন্বিত কাহিনী ভিত্তিক এবং artistic ornaments সমৃদ্ধ।
তৃতীয়ত, ট্রাজেডি হবে ঘটনা প্রধান, বর্ণনা প্রধান তথা 'Narrative' নয়।
চতুর্থত, ট্রাজেডি ভীতি ও করুণ রস উদ্রেকের মধ্যদিয়ে আনন্দ সৃষ্টি করবে।
(উপন্যাস বিষয়ে পড়তে নিচের লিংকে ক্লিক করুন:
এখন উল্লিখিত বৈশিষ্ট্যের আলোকে আমরা ট্রাজেডি নাটক হিসাবে রক্তাক্ত প্রান্তর নাটকের সার্থকতা বিচারের প্রয়াস পাব।
প্রথমত, রক্তাক্ত প্রান্তর নাটক একাটি ঐতিহাসিক নাটক। পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধের ঘটনাবলীকে কেন্দ্র করেই আলোচ্য নাটক রচিত হয়েছে। এর এক পক্ষ মুসলিম শক্তি এবং অন্য পক্ষ মারাঠা শাক্তি। মুসলিম পক্ষে রয়েছেন কাবুল অধিপতি আহমদ শাহ আবদালী, অযোধ্যার অধিপতি সুজাউদ্দৌলা, রোহিলা খণ্ডের নবাব নজীবদ্দৌলা এবং মুন্নবেগের ছদ্মাবরণে ইব্রাহিম কার্দির স্ত্রী জোহরা বেগম। অন্যদিকে মারাঠা পক্ষে রয়েছেন মারাঠা অধিপতি বালাজী রাও পেশোয়া এবং ইব্রাহিম কার্দি। তবে পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধকে আশ্রয় করে এই নাটকের আখ্যানভাগ গড়ে উঠলেও যুদ্ধ এই নাটকে প্রাধান্য পায়নি। প্রত্যক্ষ যুদ্ধ এখানে অনুপস্থিত। নাট্যকার নিজেই এই বক্তব্যকে স্বীকার করেছেন। নাটকের ভুমিকায় তিনি বলেন-
“যুদ্ধাবসানে যে কয়টি মানবমানবীর হৃদয়ের স্পন্দন অনুভব
করি তাদের সকলের অন্তর রণক্ষেত্রের চেয়ে ভয়াবহরূপে বিধ্বস্ত ও ক্ষতবিক্ষত।
প্রান্তরের চেয়ে এই রক্তাক্ত অন্তরই বর্তমান নাটক রচনায় আমাকে বেশী অনুপ্রাণিত করেছে।” [ ভূমিকা, রক্তাক্ত প্রান্তর ]
বস্তুত, যুদ্ধের চেয়ে এখানে জোহরা বেগম ও ইব্রাহিম কার্দির হৃদয়ের টানাপোড়েন, অন্তর্দ্বন্দ্ব ও আত্ম-দ্বন্দ্বই মুখ্য হয়ে উঠেছে৷ জোহরা বেগম মন্নু বেগের ছদ্মবেশে যুদ্ধ অবতীর্ণ হয়েছেন পিতা মেহেদী বেগের হত্যাকারী মারাঠাদের সমুচিত শিক্ষা দিতো কিন্তু নিয়তির পরিহাস তারই স্বামী ইব্রাহিম কার্দি আজ মারাঠা পক্ষের সেনাপতি, বীরযোদ্ধা। সে শক্তিতে অপরিমেয়, বিশ্বাসে অটল৷ তাকে জোহরা বেগম যখন ফিরিয়ে নিতে এসেছে তখন সে উচ্চারণ করেছে
“যে ফিরে যাবে সে আমি না। সে হবে বিশ্বাস ঘাতক।
সে হবে ইব্রাহিম কার্দির লাশ৷” (১ম পক্ষ/ ২য় দৃশ্য)
অপর পক্ষে জোহরা বেগমকে ইব্রাহিম কর্দি যখন কাছে পেতে চেয়েছে তখন জোহরা বেগম উচ্চারণ করেছে-
“মারাঠা দৃস্যরা আমার পিতাকে হত্যা করেছে।
এই শিবিরে তোমার আমার মাঝখানে শুয়ে আছে আমার
পিতার লাশ৷ আমি তোমার কাছে এগুবো কি করে ?” (১/২)
মোটকথা ইব্রহিম কার্দি ও জোহরা বেগমের এই আত্মদ্বন্দ্ব ও আদর্শের দ্বন্দ্বই নাটককে ট্রাজিক পরিণামের দিকে ধাবিত করেছে৷
দ্বিতীয়ত, কাহিনী বিন্যাসের ক্ষেত্রেও রক্তাক্ত প্রান্তর নাটক ট্রাজেডির বৈশিষ্ট্যকে স্পর্শ করতে পেরেছে৷ কারণ, এখানে কাহিনী বর্ণনায় বর্ণনাত্মক পরিবর্যা রীতি ব্যবহৃত হয়নি। বরং নাটকের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত নাট্যিক আবহ সক্রিয় থেকেছে
তৃতীয়ত, ট্রাজেডি নাটকের ভাষা হবে, ভাবগাম্ভীর্যময়, গতিশীল এবং বিষয়ানুগ। এ প্রশ্নেও 'রক্তাক্ত প্রান্তর' নাটকে ব্যতিক্রম লক্ষ করা যায় না। এই নাটকে যে ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে তা একদিকে যেমন গতিশীল তেমনি অন্যদিকে বিষয়ানুগ। জোহরা বেগমের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য উন্মোচন করতে গিয়ে আহমদ শাহ আবদালীর একটি মূল্যায়ন এখানে প্রাসঙ্গিক:
“বীরপনায় তুমি মুসলিম শিবিরের রত্ন স্বরূপ। এই যুদ্ধে জয়লাভের
তুমি অন্যতম স্তম্ভস্বরূপ। তুমি বীর এবং মাহান। তুমি তরুণ কিন্তু শক্তিময় ৷
তুমি কঠিন কিন্তু করুণাময়া তুমি জয়ী, তমি তুষ্ট, তুমি ক্ষুব্ধ, তুমি দুঃখী।” (৩য়/১ম)
চতুর্থত, সাহিত্যের ইতিহাসে সাধারণত দুধরনের ট্রাজেডির পরিচয় পাওয়া যায়। এর একটি হলো গ্রিক ট্রাজেডি এবং অন্যটি হলো শেক্সপীয়ারিয়ান ট্রাজেডি। গ্রিক ট্রাজেডিতে মানব পরিণতি নিয়তি দ্বারা নির্ধারিত হয় (ইডিপাস) । অন্যদিকে শেক্সপীয়ারিয়ান ট্রাজেডিতে মানব পরিণতি নির্ধারিত হয় স্বীয় কর্ম দ্বারা (ওথেলো, হ্যামলেট)। আমাদের আলোচ্য রক্তাক্ত প্রান্তর নাটক শেক্সপীয়ারিয়ান ট্রাজেডির বৈশিষ্ট্যকে স্পর্শ করেছে। কারণ, জোহরা বেগমের ট্রাজেডি এবং ইব্রাহিম কার্দির করুণ পরিণতির জন্য উভয়ের আদর্শের দ্বন্দ্ব, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও ব্যক্তিত্বই দায়ী। গভীর স্বজাত্যবোধ এবং স্বপতির প্রতি অসীম ভালোবাসা থাকলেও ইব্রাহিম কার্দির দুঃসময়ের আশ্রয়দাতা মারাঠা পক্ষ ত্যাগ করে স্বজাতি ও স্বপতির কাছে ছুটে আসতে পারে নি। জীবনের চরম পরিণতির কথা জেনেও সে পিছপা হয় নি বরং বলেছে-
“আমার সঙ্কটের দিনে যারা আশ্রয় দিয়েছে, কর্মে নিযুক্ত করেছে, ঐশ্বর্য দান করেছে, সে মারাঠাদের দুর্দিনে আমি চুপ করে থাকব? পদত্যাগ করব? সে হয় না জোহরা। আমি নিশ্চিত জানি, জয় পরাজয় যাই আসুক, মৃত্যু ভিন্ন আমার মুক্তির অন্য কোন পথ নেই।” (১ম/২য়)
অপর দিকে জোহরা বেগমও পিতৃ হত্যার প্রতিশোধের কারণে স্বামীর আহ্বানে সারা দিতে পারেনি। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই তার জীবনে নেমে আসে করুণ পরিণতি। সে হয়ে উঠে নিঃসঙ্গ, একাকী এবং নিরন্তর যন্ত্রণা ও অনন্ত বেদনার ধারক ও বাহক।
শেষত, ট্রাজেডি নাটক ভীতি ও করুণা উদ্রেকের মাধ্যমে আনন্দ সৃষ্টি করবে। Aristotle যাকে বলেছেন Catharsis | আমাদের আলোচ্য রক্তাক্ত প্রান্তর নাটকও এর ব্যতিক্রম নয়৷ ইব্রাহিম কার্দির জীবনের করুণ পরিণতি আমাদের মনে গভীর বেদনা ও ধন্ধকার সৃষ্টি করলেও তার বীরত্ব, স্বজাত্যবোধ, পত্নিপ্রেম এবং সর্বোপরি একনিষ্ঠ বিশ্বাসপরায়ণতা আমাদেরকে আনন্দের আলোকিত ভুবনে প্রবেশ করতে সহায়তা করে৷
সুতরাং ঘটনা বর্ণনা, কাহিনী বিন্যাস, চরিত্র চিত্রণ, ভাষা প্রয়োগ এবং রসনিস্পত্তিতে মুনীর চৌধুরী রচিত রক্তাক্ত প্রান্তর নাটক একটি সার্থক ট্রাজেডি নাটক এবং বাংলা নাটকের ধারায় একটি অনিন্দ্য সংযোজন।
(ঐতিহাসিক নাটক হিসেবে সার্থকতা বিচার পড়তে নিচের লিংকে ক্লিক করুন:
******************************
ড. এ. আাই. এম. মুসা
অধ্যাপক-বাংলা
www.onlinereadingroombd.com
+88 01713 211 910